আভিধানিক আতিশয্য - আবদুশ শাকুর

আভিধানিক আতিশয্য - আবদুশ শাকুর
আভিধানিক আতিশয্য
আবদুশ শাকুর


একুশ শতকের প্রতি ‘বিশেষ’ সম্মান প্রদর্শনের জন্য কিনা জানি না, ২০০০ সাল থেকে অভিধান-বাজারে সর্ববিধ বানান-রীতি পাইকারী হারে বিক্রি হচ্ছে বড় দুটি শহরে এবং খুচরো রেটে ফেরি হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। প্রভাবটি সমসাময়িক অর্থশান্ত্রের হলেও, উদারীকরণে টেক্কা দিয়েছে শব্দশাস্ত্র। যে-কারণে 'বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ'-এর লেখক জ্যোতিভূষণ চাকী 'আকাদেমি বানান অভিধান' সংকলকদের বানানে জ্যোতিভূষণ 'চাকি' হয়ে গিয়েছেন। চশমা নেড়েচেড়ে সন তারিখ দেখে বুঝলাম যে আমার পরম শ্রদ্ধেয় লেখক মহোদয় বস্তু 'চাকি' হয়ে যাননি বরং চাকী রয়ে গিয়েছেন। কেননা তাঁর দীর্ঘ-ঈকারের সমাধির ওপর হ্রস্ব-ইকারের সৌধটি নির্মিত হয়েছে ১৯৯৭ সালে এবং সংস্কৃত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, যেখানে 'আকাদেমি বানান সামিতি'র সদস্য ছিলেন শ্রী 'চাকি'। আনন্দ পাবলিশার্স, তাঁদের বানানবিধি সংবলিত, শ্রী চাকীর ব্যাকরণ বইটি প্রকাশ করেছেন ২০০১ সালে। মনে হয় চাকী মহোদয়কে হ্রস্ব-ইকারের প্রচারযানটিতে ডেকে তোলা হয়েছিল ওজনদার যাত্রী বাড়ানোর জন্য। কারণ দল ভারী দেখে ব্যান্ডওয়াগনটিতে তিনি নিজেই লাফিয়ে উঠে থাকলে, পরে নেমে পড়বেন কেন। সে যা-ই হোক হবে। তবে 'সংসদ চরিতাভিধান, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০১' থেকে আর কোনোদিনই নামতে পারবেন না 'আত্মঘাতী বাঙালীর' লেখক নীরদচন্দ্র 'চৌধুরি'। কারণ তাঁর, উত্তরাধিকার হিসাবে প্রাপ্ত পদবী, 'চৌধুরী' 'হ্রস্ব-ইকার পুরস্কারে' ভূষিত হয়েছে মরণোত্তর।

গত শতকের ত্রিশের দশক থেকে চলমান বানান-বিতর্ক সম্পর্কিত প্রায় সব লেখা মোটামুটি পড়ার পরে আমার মনে হয়েছে যে বানানের সমতাবিধান হবার নয় এবং বানান বিভ্রান্তিও কাটবার নয়। বাংলা বানানের ক্ষেত্রে, ইকার-ঈকার নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলেছে, মীমাংসা হয়নি ৮০/৯০ বছরেও (মণীন্দ্রকুমার, বাংলা বানান, ৪র্থ সং, ৪১ পৃ)। বানান-বিপ্লবী রবীন্দ্রনাথ এবং সংস্কার-কর্ণধার সুনীতিকুমারের মধ্যেই মতভেদ আকাশ-পাতাল। প্রথম জন চান উচ্চারণানুগ বানান, তো দ্বিতীয় জন চান মূলানুগ। আবার প্রথম জনের ঝোঁক হ্রস্ব-ইকারের প্রতি, তো দ্বিতীয় জনের আসক্তি দীর্ঘ-ঈকারের প্রতি। অধ্যাপক দেবপ্রসাদ ঘোষ 'দায়ি' লেখার জন্য 'দায়ী' করলে 'জরাজনিত মনোযোগের দুর্বলতা'র দোহাই পাড়লেন রবীন্দ্রনাথ। 'রীপোর্ট' কেন লিখলেন জানতে চাইলে মণীন্দ্রকুমারকে সুনীতিকুমার বললেন 'খেয়াল ছিল না'। 'অর্থাৎ খেয়াল না থাকলে রবীন্দ্রনাথের কলমে আসে হ্রস্ব-ইকার আর সুনীতিকুমারের আসে দীর্ঘ-ঈকার' (প্রাগুক্ত, পৃ ৪২)। প্রমাণ ভাষাচার্যের 'একটী' 'কলমটী' থেকে ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত তাঁর 'বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা' গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠার 'খুঁটীনাটী' পর্যন্ত বানান। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'বাংলাভাষা-পরিচয়' উৎসর্গ করেন ভাষাচার্য শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের করকমলে।

আবার দেখছি, ব্যক্তিরুচির দেয়ালটিও দুর্লঙ্ঘ্য। নিম্নে-অর্থে 'নীচে'র বিপক্ষে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ওকালতি সত্ত্বেও তাঁর স্নেহধন্য, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানানসংস্কার সমিতির এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিভাষা সংসদের সভাপতি, রাজশেখর বসু নিজে তাঁর 'চলন্তিকা' অভিধানে 'নিচু' শব্দটিকে স্থান দেননি (প্রাগুক্ত, পৃ ৯৩)। রবীন্দ্রনাথও নিজের ওকালতি মোতাবেক 'ধিরে ধিরে ধিরে বও ওগো উতল হাওয়া' লিখেননি। 'বিশুদ্ধ বিস্ময় প্রকাশের কাজে' রবীন্দ্রনাথ 'কী' বানান ইচ্ছা করেছেন বলে দীর্ঘ-ঈকারকে নিষিদ্ধফলবৎ বর্জনকারীও সকল ক্ষেত্রেই 'এমনকী' লিখে চলেছেন। কারণ সম্ভবত বহুলপ্রচারিত সংসদ বাংলা অভিধান আর সংসদ বানান অভিধান। সেগুলিতে ভুক্তি আছে শুধু 'এমনকী', যেখানে রাজশেখর বসুর 'আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান চলন্তিকা'য় ভুক্তি ছিল শুধু 'এমন কি'।

বাংলা 'যুবতী' পেছন থেকে পেঁচিয়ে দীর্ঘ-ঈকারের শাড়ি পরত। নিতম্বিনী শব্দটিকে বেশ দেখাত। সম্প্রতি বাংলাবাষার কোষকার-কার্টেল 'যুবতী'টির পশ্চাদ্দেশ থেকে দীর্ঘ ঈ-কারের প্যাঁচের শাড়িখানি খুলে নিয়ে তার বক্ষদেশে হ্রস্ব ই-কারের ওঁচা ওড়নাটা ছুড়ে দিয়েছে। কারণ দর্শিয়েছে 'যেসব বানানের একাধিক রূপ প্রচলনে আছে, তার থেকে একটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। অনেক সংস্কৃত শব্দের একাধিক শুদ্ধ রূপ আছে- দারিদ্র্য, দারিদ্র; যুবতি, যুবতী'। আমি বলি, সেই বেছে নেওয়ার কাজটি বিংশ শতাব্দের প্রথমার্ধেই হয়ে গিয়েছে এবং বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠতম মনন ও সৃজনশীলগণ কর্তৃক। বাছাই শব্দ দুটি হল: 'দারিদ্র্য ও যুবতী' এবং  সেই থেকে রূপটি প্রচলনেও রয়েছে। অতএব একই অজুহাতে, অর্ধশতও পার না-হতেই, বানান-দুটির পুনর্বদল অনাবশ্যক। দীর্ঘ-ঈকারের বিশেষ সৌন্দর্যের মতো অন্ত্য য-ফলার বিশেষ শৃঙ্খলাও দুর্নিরীক্ষ্য নয়। একদিকে ফলাটি সংশ্লিষ্ট শব্দটিকে সুদৃশ্য একটি বাঁধুনিতে বাঁধে। আরেকদিকে প্রচলিত বানানে দীর্ঘ-ঈকার বদল ও য-ফলা বর্জনঘটিত অপশান বাড়ানোর পরিণামে বানানের পরিচ্ছন্ন অঙ্গনটি জঙ্গুলে হয়ে ওঠে। এ ধরনের কাজকেই তো বলে নন্-ওয়ার্ক অর্থাৎ ন-কাজ, যা ক্ষেত্রবিশেষে কু-কাজেরও অধম। এ-সত্যটাই আজ পদে পদে প্রমাণিত হচ্ছে এবং পদগুলিতে রক্তও ঝরছে ক্ষণে ক্ষণে।

ভাবলাম শাড়ি-হারানো-গামছা-পরানো যুবতীর করুণ কাহিনীটি লিখব। কলম খুলেই ধন্দে পড়লাম; 'কাহিনী'র বানানটিও আক্রান্ত হয়েছে কিনা। শব্দটিকে আক্রান্তরূপেই পেলাম বানান-কোষগুলিতে--'কাহিনি'। ২০০০ সালের সংসদ বাংলা অভিধানের সংশোধিত ও পরিমার্জিত পঞ্চম সংস্করণে এ-শব্দটির দীর্ঘ-ঈকার হরণের কারণও পেলাম যে শব্দটি 'অসং.'। অভিধানটির ১৯৮৪ সালের চতুর্থ সংস্করণে দেখলাম শব্দটি 'সং' এবং ঈ-কার পরিহিতা। অর্থাৎ সনাতন সেই তৎসম-অর্ধতৎসম-তদ্ভব-তৎসদৃশ সংক্রান্ত পুরাতন পুঁজি নাড়াচাড়া করার শশব্যস্ততা আরকি। আমি বলি সময়ের এত অল্প পরিসরে শব্দটি, রবীন্দ্রনাথের পরিভাষায়, প্রাকৃত হয়ে যাবার দুর্ঘটনাটি কী ঘটল? অধিকন্তু, জাত হারালেও শব্দটির বানান বদলানোর বাধকতাটাই বা কী। তৎসম শব্দ তদ্ভব হয়ে যাবার পরেও মূলানুগ যে-বানান প্রচলনে রয়েছে, তাকে রেখে দিলে অসুবিধেটি কী? বিশেষ সুবিধেটি হল, বানান নিয়ে কোনো ধন্দ সৃষ্টি হয় না।

বলবেন, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'তৎসম শব্দে বানানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মানবেন কিন্তু তদ্ভব শব্দে তিনি স্বমতে চলবেন' (বাংলা বানান, পৃ ২৯)। তাঁর দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও ভাবতে পারি-তদ্ভব শব্দেও আমি তৎসম'র নিয়মেই চলব, তাতে বানান নিয়ে ঝামেলা বাড়বে না। যেমন, সংস্কৃত 'ধূলি'র দৃষ্টান্তে, প্রাকৃত হলেও, 'ধূলো-ধূলা'ই লিখব। তাতে বানানটিকে নিয়ে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হবার জো থাকবে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেন 'যেখানে পারি সেখানে খাঁটি বাংলা উচ্চারণের একমাত্র হ্রস্ব-ইকারকে মানব' (প্রাগুক্ত, পৃ ৪৫)। আমি ভাবি, অত পারার দরকারই বা কী-যেহেতু উচ্চারণের সঙ্গে তাল মেলানোর বাধকতা নেই বানানের। নেই এক্তিয়ারও। থাকলে, তাঁর এক দাদার নামের বানান হবে 'দিজেন্দ্রনাথ' আরেক দাদার নামের বানান হবে 'দারকানাথ'। বাংলা ভাষার চেয়ে ঢের অগ্রসর ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায় প্রচুর শব্দে অনুচ্চারিত বহু অক্ষর সংরক্ষিত রয়েছে। উচ্চারণানুগ না-হবার কারণে ভাষা দুটি পিছিয়ে তো পড়ছে না।

উক্ত কোষ-কার্টেলের অনাবশ্যক বানান-বদল গত পাঁচ বছরে তাঁদের বাংলা অভিধান এবং বানান অভিধানগুলির অনেক শতাংশই দখল করেছে। এসব বদল আবশ্যক নয় বলে অনেক মান্যগণ্য কোষকারের সাম্প্রতিক অভিধানেই গৃহীত হয়নি- যেমন অধ্যাপক মিলন দত্ত ও অমলেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বাংলা অভিধান (শব্দসঞ্চয়িতা, ১৯৯৫), ঋষি দাস সংকলিত (আধুনিক বাংলা অভিধান, ৪র্থ সং, ১৯৯৮), জামিল চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত 'বাংলা বানান-অভিধান, বাংলা একাডেমী, পরিবর্ধিত ও সংশোধিত সংস্করণ, ২০০১)। ফলে বাংলা বানানের উদ্যানটি হালে জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক বানানবিষয়টি একটা ব্যাপক বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েছে। খাল কেটে আনা এ-কুমীরটির বিশেষ শিকারে পরিণত হয়েছে সাধারণত বইপাড়া এবং পত্রপত্রিকার কর্মীগণ এবং বিশেষত তাঁদের প্রুফরিডার সম্প্রদায়টি।

ভাষা একটা 'ইনার্ট প্রোসেস' অর্থাৎ অতৎপর প্রক্রিয়া। সে চলতেই থাকে, আনমনে। চলার পথে তার গায়ে অনেক কিছুই লাগে, কোনোটা তাকে কোনোটা থাকে না। তাতে তার নিজের কোনো মর্জি নেই, তাই অন্যের বেশি মর্জিও থাকতে নেই। অথচ বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলা বানান-সংস্কারের অনতিপরেই শতকটির দ্বিতীয়ার্ধেও বানান-সংস্কারের নামে যখন তখন কমিটি বসছে, নসিহত হচ্ছে এবং নানানভাবে হস্তক্ষেপও চলছে।

সঘন সংস্কারের মোহে না পড়ে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি রাজশেখর বসু, আবদুল ওদুদ, শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, মিলন দত্ত, অমলেন্দু মুখোপাধ্যায় (সং. ১৯৯৫), ঋষি দাস (সং. ১৯৯৮) ও সর্বাধুনিক ইংরেজী-বাংলা কোষকার গৌরীপ্রসাদ ঘোষ (সং. ১৯৯৯) প্রমুখ পদাঙ্কিত সদর সড়কেই রয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী আমি। ভিন্ন কথায়, বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভূমিষ্ঠ বাঙালী হিসাবে, আমি সংসদ অভিধানের চতুর্থ সংস্করণের ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত মুদ্রিত 'বাঙালী'ই আছি, ২০০০ সালের পঞ্চম সংস্করণ কর্তৃক সংস্কৃত হয়ে 'বাঙালি' বনে যাইনি। অন্যকথায়, ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত মুদ্রিত সংশোধিত তৃতীয় সংস্করণের 'সংসদ চরিতাভিধানে'র বাঙালীই আছি, অভিধানটির দ্বিতীয় খণ্ডের ২০০১ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণ কর্তৃক সংস্কৃত হয়ে বাঙালি বনে যাইনি। বাঙালি বনে না-গেলে অসুবিধে হবে না একুশ শতকে ভূমিষ্ঠজনেরও। বানান বদল না-করে বহু জেনারেশনের ইংরেজদের যেমন অসুবিধে হয়নি।

'জ্ঞানেন্দ্রমোহন লিখেছেন: অধিবাসী-অর্থে বাঙ্গাল+ঈ বাঙ্গালী (তুল-পঞ্জাব হতে পঞ্জাবী, নেপাল হতে নেপালী, বিহার হতে বিহারী)। তেমনি নিবাসার্থে 'দেশী' বিদেশী' 'ভিনদেশী' 'পরদেশী'। মন্দ কী? দেখতেও ই-কার কাঁচির মতো হলে, ঈ-কার মালার মতো। তবু, টানা-লেখার ঈ-কার ফেলে- ছাড়া লেখার ই-কারে তেমন কাজ কী? 'কথাপ্রসঙ্গে সুনীতিকুমার একদিন বলেওছিলেন "দীর্ঘ-ঈকার 'ী' লেখা সোজা।" বাস্তবিকই বাংলা বর্ণবিন্যাসে স্বরচিহ্নের মধ্যে হ্রস্ব-ইকার 'ি' লেখাই সর্বাপেক্ষা কষ্টদায়ক' (মণীন্দ্রকুমার, বাংলা বানান, পৃ ৪৩)।

আলোচনার প্রবর্তনায় মনে হবে, দীর্ঘ-ঈকারকে আমি আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই। বস্তুত তা নয়। আমি বিশেষণকে 'সঙ্গী' রেখে বিশেষ্যকে 'ভঙ্গি' করি। আমার কথাসাহিত্যের চরিত্র 'সরকারী' রাস্তা দিয়ে দোকানে যায় 'সরকারি' করতে। আমার গল্পের এক স্ত্রীলোক 'পুরুষালি' সহ্য করে না, তো আরেক স্ত্রীলোক 'পুরুষালী' চেহারার বর কামনা করে। কেউ কেউ 'তৈরি' করার ঝামেলা এড়িয়ে 'তৈরী' বাড়িই কেনে। কারণ দীর্ঘ-ঈকার ভীতির মতো হ্রস্ব-ইকার প্রীতিও বেদরকারী।

বলবেন, 'বঙ্গীয় শব্দকোষ' সঙ্কলক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন: হ্রস্ব, দীর্ঘ ও প্লুত এই ত্রিমাত্রিক ইকারের মধ্যে বাংলায় কেবল হ্রস্ব ও প্লুত ইকারই সংস্কৃতর মতো যথাযথ উচ্চারিত হয়, দীর্ঘ ঈ-কার উচ্চারণে হ্রস্ব-ই; দীর্ঘ কেবল নামে আর লেখনে। আমি বলি, দেখনেও দীর্ঘ। এবং দেখনের সৌন্দর্য বলেও একটা কথা আছে, যাকে বলে দর্শনদারি। 'কাহিনী' শব্দটিতে দুটি ইকারের একটিকে দীর্ঘ-ঈকার লিখলে দৃশ্যটি হয় সুষম এবং সেজন্যই দর্শনদারি বাড়ে। আর দুটিকেই হ্রস্ব-ইকারে 'কাহিনি' লিখলে দেখতে মনে হবে- হয়তো বাঙালী দীর্ঘ-ঈকারটির ভারে কাহিল হয়ে পড়েছে অথবা বাঙালীর অনটনহেতু অনাহার বুঝি এবার ভাষাকেও কাহিল করে ফেলেছে। বিশ্ববিখ্যাত ফরাসী ভাষা দেখনের জন্যেই- মানে উচ্চারণের জন্যে নয়, কেবল লেখনের প্রয়োজনেই- অনেক শব্দের মধ্যে বহু অনুচ্চারিত বর্ণ রেখে দিয়েছে। অর্থাৎ উচ্চারিত হয় না বলে ফেলে দেননি মহতী ভাষাটির মহান ভাষীগণ।

ইংরেজরাও, উচ্চারণ হয় না বলে programme (প্রোগ্রাম) শব্দের বাড়তি me ফেলে দেয়নি যদিও তারা আমেরিকানদের কোষজনক নোয়াহ্ ওয়েবস্টারকে অক্ষর-দুটি ফেলতে দেখে আসছে ১৭৮৩ সাল থেকে। ওয়েবস্টারের নেতৃত্বে এমনি বানান সংস্কার হাজারও করেছে প্রয়োগবাদী মার্কিনীরা ১৮২৮ সাল থেকে। কিন্তু ইংরেজরা ভাষার শব্দ ছিমছাম করার তালিম মার্কিনীদের কাছ থেকে নিচ্ছে না- যদিও তাদের প্রযুক্তি নিচ্ছে পাওয়ামাত্রই। কারণ প্রযুক্তি হচ্ছে সিভিলাইজেশন বা সভ্যতার অংশ, যা একজনের থাকলে তার কাছ থেকে আরেকজনে নিতে পারে। প্রতিপক্ষে ভাষা হচ্ছে কালচার বা সংস্কৃতির অংশ, যা ভাষাভাষী হিসাবে আমার অংশ। ফলে আমার অংশ আমি সহজে ছাড়তে পারি না, অপরেও তা সহজে কাড়তে পারে না। ম্যাকাইভারের বহুশ্রু উক্তিটি আরেকবার স্মরণ করুন: সিভিলাইজেশন ইজ ওয়ট্ উই হ্যাভ্, কালচার ইজ ওয়ট উই আর্।

ইংলিশ-ইংলিশের দেড় হাজার বছরের ঐতিহ্য আছে শেক্সপিয়ার-মিল্টন আছে- যে সম্পদ আমেরিকান-ইংলিশের নেই। অতএব তেমনি ঐতিহ্যহীন মার্কিন আভিধানিক তার ইংলিশের অঙ্গে যা করতে পারে, প্রাচীনতর ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ইংরেজ তার ইংলিশে তা করতে পারে না সংগত কারণেই। তাই তারা সংরক্ষণ করছে চসারের (১৩৪০-১৪০০) ব্যবহার করা ত্রয়োদশ শতকের শব্দ victual (ভিটল্) এবং চতুর্দশ শতকের শব্দ  victualler (ভিটলা্র)। বাংলা ভাষাকেও তার অমূল্য ঐতিহ্যের প্রতি নজর রাখতে হবে। কথায় কথায় কয়েকদিন পরপর বানান সংস্কারে মেতে ওঠার প্রয়োজনটা কেমন জরুরী, বারবার তা তৌলদণ্ডে মেপে দেখতে হবে। ভাবতে হবে, অপরিহার্য কারণ ছাড়া সঘন সংস্কারের ফলে বাংলার অমর ভাষাশিল্পী বঙ্কিম-রবীন্দ্র-রচিত সাহিত্য সাধারণ্যে অচেনা হয়ে যাচ্ছে কি না, কেবলমাত্র প্রাচীন পুঁথির পাঠোদ্ধারকারী গবেষকদের সেব্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না।

জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের 'বাঙ্গালা ভাষার অভিধান'- এর ভূমিকায় ভাষাবিজ্ঞ সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত লিখেছেন : 'শব্দসম্ভারের বিপুলতায়, ব্যুৎপত্তির বিশুদ্ধতায়... এই দুই অভিধানই বাঙ্গালীর অবিস্মরণীয় কীর্তি (অপরটি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বঙ্গীয় শব্দকোষ')... ইহারা একই আদর্শে সংকলিত হইলেও ইহাদের মধ্যে পার্থক্যও আছে এবং সেই পার্থক্যের জন্য একে অপরের পরিপূরক।... আভিধানিকদের মধ্যে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসই বাংলা শব্দের উচ্চারণকে বিধিবদ্ধ করিয়া বাঙ্গালীকে মাতৃভাষা উচ্চারণ করিতে সাহায্য করিয়াছেন।' তাহলে এই বিখ্যাত ভাষাবিদের মতানুযায়ী বাংলার দুই অতৃতীয় কোষকারকে পরস্পরের পরিপূরকরূপে ব্যবহার করা যাক।

হরিচরণ বলেছেন বাংলা ভাষায় দীর্ঘ-ঈকার উচ্চারণে দীর্ঘ হয় না। দীর্ঘ কেমন করে করতে হয়, সেটা শিখিয়ে দিয়েছেন জ্ঞানেন্দ্রামোহন: 'জিহ্বার অগ্রভাগ নীচের পাটির দাঁতের পশ্চাতে রাখিয়া মধ্যভাগ তালুর নিকটে আনিয়া অধর নিম্নদিকে ঈষৎ ঝুকাইয়া এবং মুখবিবর অপেক্ষাকৃত সঙ্কুচিত করিয়া উচ্চারণ করিতে হয়।' এ ধরনের কসরতে খুবই সুরেলা একটা 'উ' উচ্চারিত হয় জার্মান এবং ফরাসী ভাষায়, যে-রকম 'উ' ইংরেজী ভাষায় নেই। জিভ-তালু আর ওষ্ঠ-দন্তের অন্দরে চৌদিক থেকে চেপে ধরে ধ্বনিকে এমন চাঁচাছোলা করে ছাড়া হয় যে- স্বরটি ক্ষীরের মতো লেপ্টে থাকে সুরের গায়ে। আসলে উচ্চারণের উত্থানপতন এবং বেশকম সংবলিত বিবিধ কারুকার্যই একটি ভাষার আবৃত্তিশিল্পকে সমৃদ্ধ করে। উদাহরণস্বরূপ আরবী-ফরাসী-মৈথিলী-ব্রজবুলি শ্রব্য।

সারকথা, দীর্ঘ-উচ্চারিত হয় না বলে দীর্ঘ-ঈকারকে বাদ না দিয়ে উচ্চারণেও ওটাকে দীর্ঘ করাই তো সংগত। আর বাদ দিতে হলে, উচ্চারণ শেখার কষ্টটাই না হয় বাদ দিন। দীর্ঘ-ঈকারটিকে রেখে দিন- স্রেফ দেখার জন্যে হলেও। দেখতে ওটি হ্রস্ব-ইকারের দ্বিগুণ অলংকৃত। হিন্দী ভাষার মতো নয় যে-হ্রস্ব-ইকারকে বিপরীত দিক থেকে লিখলেই দীর্ঘ-ঈকার হয়ে যাবে। বাংলা ভাষায় বিপরীতমুখী হ্রস্ব-ইকারকে ঘুরিয়ে এনে একটা এলায়িত মালা বানিয়ে দিলে- তবেই অধিকতর দর্শনদারী দীর্ঘ-ঈকারটি লিখিত হয়।

এই দর্শনদারির সূত্রেই হস্তী-উপাখ্যানটি মনে পড়ে গেল। দীর্ঘ-ঈকারধারী 'হাতী' দেখলে আজ শব্দটিকে গ্রাম্য বধূর পত্র থেকে রসব্যঞ্জক উদ্ধৃতি বলে মনে হবে। অথচ জ্ঞানেন্দ্রোহনের অভিধানে লেখা আছে 'হাতী'র গ্রাম্যরূপ 'হাতি'। বিশাল হাতীকে জাদুবলে ঝাঁকি মেরে পেছন থেকে পাকখাওয়া ধুতির মতো ঈ-কারটি ছুটিয়ে নিয়ে, মধ্যিখানে আলতো হাতে মেলে-দেওয়া গামছার মতো ই-কারটি ঝুলিয়ে দিতে কৈশোরে আমার বেশ কষ্ট হয়েছিল। মানলাম 'হস্তী' 'করী'র দীর্ঘ ঈ-কারে হাত দেওয়া যাবে না বলেই নিত্যব্যবহার্য কথ্য শব্দ হাতীর ঈকার হ্রস্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বৃহৎ 'চীন' দেশটিকে ঈষৎ হ্রস্ব-ইকার দিয়ে 'চিন' দেশ বানানোর দৃশ্যটি দেখে তো আমার বুকটিই 'চিনচিন' করে। বস্তুত চীন তো উচ্চারণও লোকে রয়েসয়েই করে- 'ঘিন' করার মতো ফিক করে তো করে না।

আসলে এসব হল 'মেডিস্লিম ডায়েট সাপ্লায়ারে'র ব্যবসাদারি। ব্যবসাটি  দৈনিক পত্রিকার হুড়োহুড়ি-ছুটোছুটিতে 'জয়ন্তি' পর্যন্ত গড়িয়ে 'রবীন্দ্র-জয়ন্তী'র রবীন্দ্রকেও রবিন্দ্র বানানোর দোড়গোড়ায় গিয়ে পৌঁছেছে। বানিয়ে ফেললে একটা প্র্যাকটিকাল জোকই হত। তাঁর হস্তলিপিতে হ্রস্ব-ইকার আশ্চর্য রূপলাবণ্য লাভ করার কারণেই তিনি দীর্ঘ-ঈকারের প্রতিকিঞ্চিত বিপিতাসুলভ আচরণ করেছিলেন বলে আমার আমুদে ধারণা। অথবা হ্রস্ব-ইকারের প্রতি দুর্বলতা তাঁর দীর্ঘ-আকারের মানুষ হওয়ার কারণে হওয়াটাও মানবপ্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। আসলে আমি ভাবছি- সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠতম আভিধানিক বলে বিবেচিত - ওই দুই মহীরূহের বিশাল ছত্রতলে থেকেই যুগোপযোগী বানান চর্চা করা যাবে না কেন। ভুললে চলবে না যে ভাষা হচ্ছে শত শত বছরের লক্ষকোটি ভাষাভাষীর পুঞ্জিভূত আবেগের আধার। তার বুনটে ঢুকে নিরুদ্বেগ ক্রিয়াবিক্রিয়া সততই ঝুঁকিপূর্ণ। সেজন্যই, ভাষাকোষে যখনতখন-যেমনতেমন হস্তক্ষেপ কাম্য নয় মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট অঙ্গটিতে ক্ষিপ্রবুদ্ধির যত চমৎকার ফুলঝুরিই ছুটুক না কেন।

আইরিশ-ইংলিশভাষী, অতিমাত্রায় ধ্বনিসচেতন, সুকণ্ঠ বার্ণার্ড শ'র লেখকজীবনের শুরুশেষ প্রকট একটা মাথাব্যথা ছিল ইংরেজী ভাষার বানান এবং উচ্চারণের ব্যাপক-বিরাট গরমিল নিয়ে। লন্ডনের ককনি উপভাষা নিয়ে তাঁর আবেগ প্রথম প্রকাশ পায় 'ক্যান্ডিডা'-নাটকে (১৮৯৪) এবং, যদ্দুর মনে পড়ে, সে-মনোযোগ তুঙ্গে ওঠে 'পিগম্যালিয়ন'-নাটকে (১৯১৪)। মাঝে 'ক্যাপ্টেন ব্র্যাসবাউন্ডস্ কনভার্শান' - নাটকের (১৮৯৯) ফেলিক্স ড্রিংকওয়াটারের মুখে লন্ডনের উপভাষা এবং নায়কের মুখে মার্কিন উপভাষার ধ্বনি-নির্দেশক বানান উচ্চারণানুযায়ী লিখে দেখানোর চেষ্টাও করেছেন বানানাবিষ্ট বার্ণার্ড শ (যেমন 'কনডুসিভ্')। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল : যে-ভাষায় 'ঘোটি' লিখে, ওটিকে 'ফিশ' উচ্চারণ করা যায়, সে ভাষার সংস্কার দরকার (gh = ফ, যেমন রাফ্, o=ি, যেমন কানিসার, ti= শ, যেমন মোশন)।

পিগম্যালিয়ন - এর ভূমিকায় ব্যক্ত, বার্নার্ড শ'র মতে, ইংরেজ তার ভাষা না জানে বানান করতে, না জানে বানানুযায়ী উচ্চারণ করতে। বানান করতে পারে না, কারণ তা করার মতো বর্ণমালাই তার নেই। যেটা আছে, সেটা পুরাতন এবং বিদেশী- যার তেমন বাকমূল্য নেই। ফলে ভাষার পাঠ থেকে ধ্বনি বের করা অসম্ভব। ইউরোপের প্রায় সব ভাষাই এখন (১৯১৬ সালে) তাদের লিখিতরূপেই বিদেশীদের কাছে বোধগম্য। শুধু ইংরেজী আর ফরাসী ভাষাই, বিদেশী তো দূরাস্ত, ইংরেজদের এবং ফরাসীদের কাছেও বোধগম্য নয়। তাই সংস্কারক হিসাবে শ'র প্রয়োজন তেজী এবং উৎসাহী একজন ভাষাধ্বনিবিৎ। সেজন্যেই তিনি তাঁর জনপ্রিয় নাটক পিগম্যালিয়নের নায়ক বানিয়েছেন ফোনেটিশিয়ান প্রফেসর হিগিন্সকে। বার্ণার্ড শ' তাঁর প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভাষা সংস্কারক ধ্বনিবিজ্ঞানীকে সংক্ষিপ্ত একটি রেসিপিও দিয়েছেন। সেটি নিম্নরূপ:
'সম্পূর্ণ এবং যথাযথ লিপি প্রবর্তন ব্যবহারিক তো নয়ই, সাধারণ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয়ও নয়। অতএব, ইংরেজী বর্ণমালাকে বাড়িয়ে অন্তত রাশান্ বর্ণমালার সমান করে, ইংরেজী বানানকে অন্তত স্প্যানিশ বানানের মতো ধ্বনি-নির্দেশক করে নিলেই- ইংরেজী ভাষার উন্নতি হবে মস্ত বড়'।

এই বিশাল কর্মকাণ্ডের খরচ মেটানোর জন্য শ' তাঁর সেকালের চার লক্ষ পাউন্ড ভূসম্পত্তির মূল অংশটিই উইল করে গিয়েছেন। ইংরেজী ভাষার বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় নির্বাহের পর, অবশিষ্ট সম্পত্তি সমানভাগে পাবে তিনটি প্রতিষ্ঠান- ব্রিটিশ মিউজিয়াম, রয়েল অ্যাকাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্ট এবং ন্যাশনাল গ্যালারি অফ আয়ার্ল্যান্ড। তহবিল বন্টনের ধরনেও বানান সংস্কারের অগ্রাধিকার লক্ষণীয়।

১৯৫০ সালে জর্জ বার্ণার্ড শ'র মৃত্যুর পর আজ অর্ধশতাব্দীর বেশি বিগত। অথচ ইংরেজী ভাষার অঙ্গে তেমন হস্তক্ষেপ আজো দৃষ্টিগোচর নয়। এখনও সে ভাষায় 'ঘোটি' লিখে 'ফিশ' উচ্চারণ চলছে- অর্থাৎ বানান করা হচ্ছে এক রকম, উচ্চারণ করা হচ্ছে আরেক রকম- যেমন 'কাবাড্' (cupboard)। নজিরটি টেনে আমি বলতে চাচ্ছি যে, উচ্চারণের মোহে অন্ধ হয়ে শব্দের অঙ্গে চঞ্চল এবং ব্যাপক হস্তাবলেপ ভাষাকে সচল করে না- করে বরং বিশৃঙ্খল।

ভাষার বানান প্রমিত হয়ে যায় মূলত দুটি পর্বে। প্রথমত, শ্রুতলিপি থেকে মুদ্রিত লিপিতে উত্তরণপর্বে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে- ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ব্যবহৃত পঞ্চানন কর্মকারের কাঠের টাইপের কথা বাদ দিলে- ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে শ্রীরামপুরের মনোহর কর্মকারের সীসার টাইপ খোদাই করার পরপরই। ইংরেজী ভাষার ক্ষেত্রে উইলিয়াম ক্যাক্সটনের প্রিন্টিং প্রেস প্রবর্তনের পরে পঞ্চদশ শতকের শেষ পাদে। দ্বিতীয়ত, সর্বজনস্বীকৃত শব্দকোবিদ কর্তৃক অভিধান সঙ্কলিত হবার পর্বে। বাংলা ভাষায় সেটা হচ্ছে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস কর্তৃক বাঙ্গালা ভাষার অভিধান প্রকাশের কাল (১৯৬১-১৯৩৭) ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ প্রকাশের কাল (১৯৩৩-১৯৪৬)। ইংরেজদের ভাষায় সেটা হচ্ছে ডক্টর স্যামুয়েল জনসন কর্তৃক 'ডিকশনারি অফ দ্য ইংলিশ ল্যাঙ্গোয়েজ'- সঙ্কলনটি প্রকাশের কাল (১৭৫৫)। ইংরেজী ভাষায় তারপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রচলিত শব্দের বানান আর বদলায়নি, কেবল নতুন উৎস থেকে এসে নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ওদিকে ১৭৮৩ সালে 'এলিমেন্টারি স্পেলিং বুক' এবং ১৮২৮ সালে 'অ্যামেরিক্যান ডিকশনারি অফ দ্য ইংলিশ ল্যাঙ্গোয়েজ' প্রকাশের মাধ্যমে নোয়াহ্ ওয়েবস্টার লঘুকৃত অ্যামেরিকান-ইংলিশকে চিরায়ত করে ফেলেছেন। তবু ব্রিটিশ-ইংলিশ তার বানানে আজো Programme শব্দটি থেকে 'বেদরকারী' শেষ দুটি হরফ বাদ দেয়নি। এদিকে প্রধানত ইংরেজী বানানকে উচ্চারণানুগ করার জন্য আইরিশ-ইংলিশ বার্নার্ড শ তাঁর তখনকার চার লক্ষ পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি উইল করে যাবার বায়ান্ন বছর পরেও ইংরেজী ভাষা ত্রয়োদশ শতকের শব্দ ভিটল (victual) এবং চতুর্দশ শতকের শব্দ ভিটলার (victualler) থেকে 'অনাবশ্যক' হরফগুলিকে ছুটি দেয়নি। ছয় লক্ষ শব্দের সঙ্গে পাঁচ লক্ষাধিক টেকনিক্যাল শব্দসহ প্রায় সোয়া মিলিয়ন শব্দসংবলিত আজকের বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ভাষাটির ইতিহাসের দৃষ্টান্তে মনে হয়, বানান সংস্কার শতকের সকাল-বিকাল করার মতো বিষয় নয়।

শব্দের বুনটে চঞ্চল হস্তাবলেপ বিশৃঙ্খলা কমায় না, বানানের বিকল্পবিধান বরং বিভ্রান্তি বাড়ায়। তাই বাংলা ভাষায় বিংশ শতকের সকালবেলা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনে যুগন্ধর ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে যে-সংস্কার হয়েছে, এত তাড়াতাড়ি তার বেশি বাইরে যাবার জরুরী প্রয়োজন আমি দেখি না। প্রয়োজন শুধু ব্যাপক প্রচারের জন্য অভিধানের পরিশিষ্টশীর্ষক গৌণ অবস্থান থেকে উদ্ধার করে, ব্যতিক্রম ও বিকল্পবিধান কমিয়ে, সংস্কারগুলিকে মূল বানান-অভিধানে সন্নিবেশিত করা। নতুন বানানরীতির অভিধান প্রণয়ন করা নয়। সারকথা: বানান, পাঠকের দ্বিতীয় স্বভাব। তাই একান্ত অপরিহার্য ক্ষেত্র ছাড়া, প্রচলিত বানানের দাবি বাতিলযোগ্য নয়। তাই বাংলা একাডেমীর একাডেমী-শব্দটির ইব়্যাশনাল বানান বাতিল হয়নি। কারণ, পরিহার্য ক্ষেত্রে বাতিল করাটা হবে ক্ষতিকর সংস্কার-বিলাসিতার নামান্তর।

চেনামহলে আমি অভিযুক্ত হই, বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখিত প্রবন্ধগ্রন্থ 'মহামহিম রবীন্দ্রনাথ'- এর লেখক হয়েও রবীন্দ্রনাথের অনুকরণে 'বাঙালি' লিখি না বলে। আমি বলি : আপাদশির পীরানে-পীর, আমার দাস্তগীর গুরুদেব উচ্চারণানুগ বানান চান বলে- নবেম্বর, গবর্মেন্ট, মানচি, চালাচ্চি, করলেম, এলুম, মিলচি নে ইত্যাদি লেখেন। সেসব নিত্য পড়েও আমরা কেউই তো শব্দগুলি তেমন বানানে কখনোই লিখি না। তাঁর লেখা অনুসরণ করে কেউ আজ আর 'কালেজে' যায় না, কিছু 'কাপি'ও করে না। কারণ উচ্চারণ বদলে যায়- স্থানভেদে, কালভেদে, পাত্রভেদে।

উচ্চারণের পিছু নিলে শব্দটি কালে কালে অজ্ঞাতপরিচয় হয়ে যেতে পারে। এই ভয়েই ইংরেজী ভাষায় পঞ্চদশ শতকের 'গ্রেট ভাওয়েল শিফট'-এর পরে knife ও night এর k ও gh ইত্যাদির উচ্চারণ লোপ পাওয়া দেখে বাষাবিদগণ উৎস থেকে হরফ যোজন করে শব্দের পরিচয় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন, যার ফলে- পূর্বেকার doute- শব্দটির ল্যাটিন উৎস dubitare- এর b হরফটি যোজনাক্রমে doubt- শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে ষোড়শ শতকে। আসলে তিনি তাঁর নাম উচ্চারণানুগ 'রোবিন্দ্রোনাথ' লিখেননি (কথাটি উল্লেখ করে মণীন্দ্রকুমার ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন 'উচ্চারণপন্থীরা সর্বত্র দৃষ্টি দিচ্ছেন না কেন?', বাংলা বানান, পৃ ৩১), আমিও তাই আমার জাতি উচ্চারণানুগ 'বাঙালি' লিখি না।

বস্তুত ইকার- ঈকার নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথের 'পথে চলে যেতে যেতে' গানটির (গীতবিতান, পৃ ২৩৫, বিশ্বভারতী, ১৩৮০ সং) প্রথম অন্তরাতে- 'কি অচেনা কুসুমের গন্ধে, কি গোপন আপন আন্দে', ই-কার সংবলিত 'কি' লেখা পাচ্ছি বামের পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রস্বাক্ষরিত রবীন্দ্র-হস্তলিপিতে। অথচ মুদ্রিত ডানের পৃষ্ঠায় একই গানের একই কথায় 'কী' পাচ্ছি ঈ-কারসংবলিত। রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরের 'কি' ও বিশ্বভারতীর মুদ্রণের 'কী'র এই মুখোমুখি অবস্থানে আপনি কোনখানে যাবেন?

হ্রস্ব-ইকার দীর্ঘ-ঈকার প্রসঙ্গে ১৮৮৫ সালে 'শব্দতত্ত্ব'- যুগ থেকে ১৯৩৮ সালের 'বাংলাভাষা-পরিচয়'-কাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন আর যা করেছেন তার মধ্যে স্ববিরোধিতা ছিল নানাবিধ। বলেছেন 'প্রাকৃত বাংলা'য় দীর্ঘ-ঈকার নেই, তাই তিনি 'মাসি'
লিখেছেন। কিন্তু আমার জানামতে 'শালি' লেখেননি, লিখেছেন বরং 'শ্যালী'। তিনি বলেন দীর্ঘ-ঈকার সংস্কৃত ভাষার, অথচ সংস্কৃত 'ঘটী'-কে তিনি লেখেন 'ঘটি'।

১৯৩৭ সালের ২৯ জুন রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপক দেবপ্রসাদ ঘোষকে লিখেছেন যে, বানান সংস্কারকল্পে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রস্তাব দেন তিনি তদ্ভব শব্দের ব্যাপারে, তৎসম শব্দের বানান তিনি মানেন। (ভাষাচার্য সুনীতি চাটুয্যের মতে বাংলা ভাষায় বিশুদ্ধ তৎসম শব্দ শত-করা ৪৪টা)। অথচ রবীন্দ্রনাথ তৎসম শব্দের বানানও বদলেছেন প্রচুর (অভ্যেস, সুবিধে, বিদ্যে)। 'শব্দতত্ত্ব'র (১৯৯০) 'প্রাকৃত ও সংস্কৃত' নিবন্ধে তিনি বলেন 'কথিত বাংলা'ই প্রাকৃত বাংলা। প্রশ্ন উঠল : 'কার কথিত'? তাঁর উত্তর : 'কলিকাতা অঞ্চলের উচ্চারণ কেই আদর্শ ধরিয়া লইতে হইবে। কারণ কলিকাতা রাজধানী। কলিকাতা সমস্ত বঙ্গভূমির সংক্ষিপ্তসার' (প্রবন্ধ: বাংলা উচ্চারণ, গ্রন্থ: শব্দতত্ত্ব)। মণীন্দ্রকুমারের মন্তব্য: কলকাতার বাগবাজার-কালীঘাটের সকলের উচ্চারণ এক নয়। কলকাতাবাসী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, চারু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ভাষাতাত্ত্বিকের উচ্চারণে সামঞ্জস্য ছিল না- যেমন ছিল না তিনকড়ি চক্রবর্তী, তারাসুন্দরী, দানিবাবু প্রমুখ অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং আবৃত্তিশিল্পীদের উচ্চারণে।

আমার প্রশ্ন হল মাথা-কে মাতা, কথা-কে কথা, দেখি-কে দেখি, গেছি-কে গেচি, আছে-কে আচে, ছিল-কে ছ্যাল ইত্যাদি বনেদী কোলকাতাবাসীর বিশিষ্ট উচ্চারণকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের লেখার বানানে রূপ আমরা কেন দেব। জটিলতা আরো বেড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ যখন অন্যত্র বলেন 'এই বইয়ে যে ভাষার রূপ আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি, তাকে বলে বাংলার চলিত ভাষা। আমি তাকে বলি প্রাকৃত বাংলা' (ভূমিকা, বাংলাভাষা-পরিচয়, ১৯৩৮)। তাহলে চলিত ভাষা আর কথিত ভাষা কি এক? প্রমথ চৌধুরী ও রাজশেখর বসু বলেন: এক নয়। চলিত ভাষার অভিধানেও সম্পূর্ণ কথিত শব্দাবলীর স্থান হবার নয়।

সুকণ্ঠ বার্ণার্ড শ যেমন, সুরেলা রবীন্দ্রনাথও তেমনি উচ্চারণপূজারী। তাঁর গদ্যে, কাব্যে, সঙ্গীতে, সবকিছুতেই তিনি উচ্চারণের 'জাদু' লাগিয়েছেন। তাই তাঁর উচ্চারণ উপচে পড়ে শব্দের বানানকেও রাঙিয়ে দিতে চায়। হরফের বুনটে শব্দগঠন প্রথমত ব্যাকরণ দ্বারা শাসিত এবং দ্বিতীয়ত রেওয়াজ দ্বারা শাণিত। ভাষার ভিত্তিভূমি শব্দের লিখিতরূপও উচ্চারণের দখলীভূতি হবার পরিণাম হবে ভয়াবহ- সৃষ্টি হবে জেনারেশন-গ্যাপের চেয়েও বেশি বিপত্তিকর ল্যাঙ্গোয়েজ-গ্যাপের। (তৃতীয় অভিযানে লাপুটাতে গালিভারের দেখা অবিনশ্বর লাগনাগবাসী স্ট্রাল্ডব্রাগদের দুর্ভোগ স্মরণ করুন: যাদের অনেক প্রজন্মের কাছে অনেক প্রজন্মের ভাষা সম্পূর্ণ অপরিচিত বলে জেনেছেন ক্যাপটেন এমুয়েল গালিভার)।

রবীন্দ্রনাথের 'শব্দতত্ত্ব' - গ্রন্থের 'উচ্চারণ' - প্রবন্ধের ৬ষ্ঠ নিয়মানুযায়ী পোণ-ধোন-জোন-ক্ষোণ মোতাবেক উচ্চারণানুগ বানান লিখলে যে-'নোতুন' বাংলা ভাষার সৃষ্টি হবে- সে-ভাষায় বাংলার শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিক বাকপতি 'রোবিন্দ্রোনাথে'র ক্ল্যাসিক সাহিত্য সাধারণের পাঠের আওতায় থাকবে না, লুপ্ত ভাষার পাঠোদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞের গবেষণার বিষয় হয়ে যাবে (বাংলা বানান, মণীন্দ্র)।

বস্তুত রবীন্দ্রনাথের বানান নীতি ও রীতি বানানতাত্ত্বিকের নয়, উচ্চারণশিল্পীর। বানানতত্ত্ব বলতে চায়: বর্ণমালা লিখিতভাষাকে রেওয়াজ মোতাবেক বুনে যাবে। কেননা কোনো বর্ণমালাই কথিত ভাষার পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। মোটামুটি পারে কেবল দুটি ভাষার বর্ণমালা- জার্মান আর স্প্যানিশ। ইংলিশে তো ছাব্বিশটি বর্ণ দিয়ে চল্লিশটি প্রাথমিক ধ্বনি লিখতে হয়।

প্রচলিত বাংলা বর্ণমালাও প্রয়োজনীয় সকল উচ্চারণ লিপিবদ্ধ করতে পারবে না। করা অপরিহার্যও নয়, যেহেতু অনেক ভাব কেবল স্বরভঙ্গি দিয়েই প্রকাশ করা হয়। দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। বক্র 'আ' বা বিকৃত 'এ' ধ্বনিটি সংস্কৃত ভাষায় নেই, তাই সেই ধ্বনি প্রকাশক কোনো বর্ণও সংস্কৃত বর্ণমালায় নেই। ফলে বাংলা ভাষায়ও ধ্বনিটির প্রতীক কোনো বর্ণ নেই। যদিও বাংলা ভাষায় ধ্বনিটি আছে (বাংলা ভাষায় শুদ্ধ স্বরধ্বনি সাতটি- অ, আ, ই, উ, এ, অ্যা, ও। অথচ বর্ণ আছে ছয়টি, 'অ্যা' কোনো বর্ণ নয়)। রাজশেখর বসু এই ধ্বনিটি বোঝানোর জন্য একটি নতুন স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে তার যোজ্য চিহ্ন উদ্ভাবন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও চিহ্ন দুটি পছন্দ করেছিলেন। হয়তো সমকালীন বানান-সংস্কার-সমিতিতে সেই সংস্কার প্রস্তাবটি তোলার সাহস কারো হয়নি, নয়তো উত্থাপিত প্রস্তাবটি সমিতি কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ ওটিই ছিল প্রকৃত এবং অপরিহার্য বানান সংস্কার।

বলতে চাচ্ছি- ভাষার শিকড়গুলি এমনি গভীরে প্রোথিত থাকে যে সেগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ-রাজশেখরেরও সাধ্যের অতীত ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। অথচ শব্দের বুনট তথা বানান নিয়ে বাংলাভাষাী অনেকেই আজ-কাল কত সহজেই-না নাড়াচাড়া করেন।

রচনাকাল ২০০২

রচনাসূত্র:
আবদুশ শাকুর রচনাবলী, প্রথম খণ্ড,
প্রকাশক: ঐতিহ্য, ঢাকা।
প্রকাশকাল: ২০০৯

আবদুশ শাকুর এর ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে এখানে ক্লিক করে ই-মেইল করুন।