কিভাবে বই বিবরণী লিখতে হয়?

কিভাবে বই বিবরণী লিখতে হয়?

বই সমালোচনা বা বুক রিভিউ করার চাইতে বই বিবরণী লেখার কাজটি তুলনামূলকভাবে একটু সহজ। গ্রন্থালোচনায় আলোচক তার বিশ্লেষণী চিন্তা সামর্থ প্রয়োগ করেন; কিন্তু বই বিবরণীতে আলোচককে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হয়। বইয়ের ধরণ বা বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে বই বিবরণী বিভিন্নরকম হতে পারে।

বই বিবরণীর শুরুতে গ্রন্থালোচনার মতো বইয়ের শিরোনাম, লেখকের নাম, বইয়ের ধরণ, প্রধান আলোচ্য বিষয়ের সারমর্ম, প্রধান চরিত্র বা চরিত্রগুলোর বর্ণনা, ISBN ইত্যাদি উল্লেখ করতে হবে।

সাহিত্যের বই বিবরণী লিখতে গিয়ে অনেকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে পারে। কারণ কোন ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে তা অনেক সময় বুঝতে পারে না। কিন্তু গল্পের উপাদানসমূহ যেমন চরিত্র, কাহিনীবিন্যাস, সমস্যা ও তার সমাধান ইত্যাদির প্রেক্ষিতে কাজটা ততোটা জটিল নয়। কাহিনী, চরিত্রের পরিবর্তন ইত্যাদির প্রবহমানতাকে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করতে পারলে সাহিত্য অর্থাৎ গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি জাতীয় বইয়ের বিবরণী লেখা সহজ মনে হবে।

কিন্তু তথ্যমূলক মূল্যায়নের জন্য প্রথমে অনেকগুলো প্রশ্ন করতে হবে। যেমন:

  • লেখকের উদ্দেশ্য কী?
  • লেখক কি তার উদ্দেশ্য পূরণে সফল?
  • প্রধান চরিত্র কী করেছে, সে কি কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছে; তার কোনো আচরণগত বা মানসিক পরিবর্তন কি হয়েছে?
  • প্রধান চরিত্রের আচরণ ও মানসিক অবস্থা কি বাস্তবসম্মত?
  • অন্যান্য চরিত্রগুলো কি জটিল?
  • চরিত্রগুলোর জটিলতা কি বিশ্বাসযোগ্য?
  • লেখকের কোনো মানসিক বৈশিষ্ট্য কি প্রধান চরিত্র বা অন্য কোনো চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে?
  • মানবীয় চরিত্রের কোনো বৈশিষ্ট্য কি প্রধান বা অন্য কোনো চরিত্রের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে?
  • প্রধান চরিত্রের সাথে কাহিনীর সজ্জাভঙ্গি কি ঠিক আছে?
  • চরিত্র এবং উপকাহিনীগুলোর এগিয়ে চলাকে মূল গল্পকাঠামো কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

বই সম্পর্কে বিবরণী লিখতে গিয়ে কেউ কেউ একটা সাধারণ ভুল করে ফেলে। সেটা হল লেখককে ভুলে যাওয়া। লেখক নিজের ইচ্ছা, প্রবণতা, ভাষা, কাহিনীবিন্যাস, চরিত্রের উন্নয়ন ইত্যাদির প্রকাশ বিভিন্নভাবে করে থাকেন। সাধারণত আত্মজীবনী না হলে লেখক নিজে গ্রন্থমধ্যে অনুপস্থিত থেকে যান। কিন্তু সেখানেও তিনি বিভিন্নভাবে নিজের কিছু কিছু চিহ্ন রেখে দেন। আপাতবিরোধী এটাই যে লেখক সম্পর্কে আপনার অনুধাবন নির্ভর করবে গল্প থেকে নিজেকে কতটুকু বিমুক্ত করতে পারলেন তার উপর। মনে করুন আপনি একটি বিশাল আয়তনের চিত্রশিল্পের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার দৃষ্টি শুধুমাত্র রঙের বিন্দু দেখবে। মূল ছবি বুঝতে পারবেন না। যখন আপনি এক পা দুই পা করে পিছিয়ে যেতে থাকবেন, তখন ছবির অবয়ব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। একইভাবে কাহিনী থেকে যখন নিজেকে বিমুক্ত করবেন তখনই লেখকের উদ্দেশ্য, ভাবনা এবং প্রবণতা উপলব্ধি করতে পারবেন।

লেখকের উদ্দেশ্যঃ
কেউ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া লেখার ঝামেলায় যাবে না। ক্লাশের পাঠ্যবই লেখার যেমন উদ্দেশ্য আছে, ঠিক তেমন কল্পকাহিনী এমন কি রূপকথা লেখারও উদ্দেশ্য আছে। বই বিবরণীতে লেখকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়নও লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।

লেখকের উদ্দেশ্যকে চিহ্নিত করতে এই জাতীয় প্রশ্ন করতে পারেন।
  • লেখকের লক্ষ্য আমাকে তথ্য নাকি শুধু আনন্দ দেয়া?
  • আমি কি কিছু শিখলাম?
  • আমি কি বিনোদিত হয়েছি?
  • আমি কি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি?
  • যদি আমি বইটি পাঠে আগ্রহ হারাই তাহলে কি অন্যশ্রেণীর পাঠকের জন্য এটা লিখিত?
  • লেখক কি আমাকে কোনো নির্দিষ্ট পথে চিন্তা করতে প্ররোচিত করছেন?
  • কোন বিষয়ে প্ররোচিত করছেন?
  • লেখক কোন পদ্ধতিতে আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন?
  • আমি কি প্রভাবিত হয়েছি?

লেখকের মতামতঃ
বইয়ের ভূমিকাতেই লেখকের অভিপ্রায় বা ধারণা বা ভাবনা লিখিত থাকতে পারে; অথবা সেগুলো বর্ণনাকারীর বাক্য বা প্রধান চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।

লেখকের ভাবনা বা মনোভঙ্গি বুঝতে হলে নিচের প্রশ্নগুলো করার চেষ্টা করুন:
  • বইয়ের প্রধান সমস্যা কী?
  • এটা কী ব্যক্তিগত, সামাজিক অথবা নৈতিক সমস্যা?
  • জীবন সম্পর্কে আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে এই সমস্যার কতটা মিল আছে?
  • জীবন ও সমাজ সম্পর্কে লেখক কী ধরনের চিন্তা ধারণ করেন?
  • প্রধান চরিত্র বা চরিত্রগুলো কোন ধরনের শিক্ষা লাভ করেছে?
  • সেগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?
  • সাধারণ মানুষ, সমাজ, নৈতিকতা বিষয়ে সেই শিক্ষার বক্তব্য কীরূপ?

লেখকের মনোভাবঃ
লেখক যে ভাবনাগুলো প্রকাশ করতে চাচ্ছেন, তা যখন ধরতে পারবেন তখন এর পাশাপাশি সেই ভাবনাগুলো নিয়ে লেখক কী মনোভাব পোষন করেন তাও আপনাকে বুঝতে হবে। সম্পূর্ণ কাজের মেজাজ, ভঙ্গি থেকে এটা উপলব্ধি করা যায়।

আমরা প্রয়োজনবোধে বিশেষণ ব্যবহার করে লেখকের ভাবনার সুরকে বর্ণনা করতে পারি। সোজাসুজি, জটিল, বেদনাদায়ক, তিক্ত, হাস্যরসাত্মক, বিয়োগান্তক, বিদ্রুপাত্মক, রোমাঞ্চকর- এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করলে বর্ণনা অনেকাংশেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আলোচ্য গ্রন্থটিতে লেখকের মনোভাব বা ভাবনার সুর স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার আগে নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করুন।
  • আপনার মনে আকর্ষণীয় লেগেছে এমন কোন বিশেষ পদ্ধতিতে কি বইয়ের কাহিনী সাজানো হয়েছে?
  • কোন বিশেষ দৃশ্য কি আছে, যা আপনাকে মনোযোগী করেছে?
  • সেই দৃশ্যের প্রভাব কেমন? তা কি সমস্ত বইতে ছড়িয়ে রয়েছে?
  • লেখক কি আশাবাদী না নিরাশাবাদী; নাকী বাস্তববাদী? লেখক তার এই মানসিক অবস্থা কীভাবে প্রকাশ করেছেন?
  • প্রধান চরিত্রের মধ্যে কোনো একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা বা আবেগ প্রাধান্য পেয়েছে কী? আপনি এর নাম কী দিবেন? এটা কি রচনার প্রতিনিধিত্ব করে?
  • লেখকের কল্পনাবৈশিষ্ট্যকে বুঝতে রচনার মেজাজ আপনাকে সাহায্য করছে নাকি বাঁধা দিচ্ছে।
উপসংহারে বলা যায় আসলে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে লেখক সম্পর্কে একটি বুদ্ধিদীপ্ত মতামতে উপস্থিত হওয়া। কারণ একটি বইয়ের মূল্যায়নকার্য লেখক তাঁর কাজ কত ভালোভাবে করতে পেরেছেন তার মূল্যায়ন করবে। আপনার কাছে কতটুকু ভাল লেগেছে শুধুমাত্র তা বলবে না।


ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন রচনা থেকে অনুলিখিত।


কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।