গ্রন্থপঞ্জীঃ সংজ্ঞা, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয়তা

গ্রন্থপঞ্জী (Bibliography) এর সংজ্ঞা, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয়তা

'গ্রন্থ' শব্দের সাথে 'পঞ্জী' শব্দ যোগ করে তৈরি হয়েছে ‘গ্রন্থপঞ্জী’। গ্রন্থ অর্থ বই পুস্তক ইত্যাদি এবং পঞ্জী ( বানানভেদঃ পঞ্জি, পঞ্জিকা) অর্থ বিবরণী। দুটো শব্দ একত্রে মিলে অর্থ দাঁড়ায় গ্রন্থের বিবরণী। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Bibliography’ এসেছে গ্রীক শব্দ Bibliographia থেকে। Biblion অর্থ বই এবং Graphia শব্দটির দ্বারা 'লেখা'কে বোঝায়। উৎপত্তিগত দিক থেকে Bibliography শব্দের অর্থ বই লেখা। তবে পরবর্তীকালে শব্দটি দিয়ে বই সম্পর্কিত লেখাকে বোঝায়। তবে বর্তমানে এর ব্যবহারিক অর্থ আরও ব্যাপক ও আধুনিক।

গ্রন্থপঞ্জী কাকে বলে, এর সংজ্ঞা কী সে সম্পর্কে একাধিক মণীষী বিভিন্নরকম মন্তব্য প্রদান করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি হলঃ
  • জার্মান Bibliographer হলবার্ট বলেছেনঃ “Bibliography হলো একটি বিজ্ঞান যা সাহিত্য সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করে”। পরে অবশ্য এই সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়। বলা হয় এটি ‘বই’ এর বিজ্ঞান।
  • W. W. Gregg বলেন “কোন জিনিসকে পাবার জন্য বই পড়াই হল গ্রন্থপঞ্জী যা সাহিত্যের দলিল সম্পর্কিত প্রচার বিজ্ঞান”।
  • Girija Kumar এবং Krishan Kumar বলেন “Bibliography is an organized list of documents which is not limited to a particular collection” অর্থাৎ “গ্রন্থপঞ্জী হলো দলিলসমূহের সুসংগঠিত তালিকা যা নির্দিষ্ট গ্রন্থাগারের সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়”।
  • Dr. Hume এর মতে “Bibliography is the science of organizing written knowledge” অর্থাৎ “লিখিত জ্ঞান সংগঠনের বিজ্ঞানই হলো গ্রন্থপঞ্জী”।
  • মো. সা'দত আলী বলেন “প্রকাশনা জগতে যাবতীয় পাঠোপকরণ ও সহায়ক তথ্য সামগ্রীর সার্বজনীন তালিকার নাম গ্রন্থপঞ্জী”।
  • প্রখ্যাত গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানী Louis Shores বলেছেন “হাতে লেখা হোক বা মুদ্রিত হোক অথবা অন্য যে কোনভাবে প্রণীত হোক না কেন, গ্রন্থপঞ্জী হলো মূলত সভ্যতার লেখা। যার অন্তর্ভুক্ত হবে বই, পত্র-পত্রিকা, সাময়িকী, ছবি, মানচিত্র, পুঁথি অথবা ভাব বিনিময়ের যে কোন মাধ্যম। এসব লিখিত উপাদানের তালিকাকে যেমন গ্রন্থপঞ্জী বলা হয়, তেমনি এ তালিকা প্রণয়নের শিল্পরীতিকেও বলা যায় গ্রন্থপঞ্জী”।
এছাড়াও বিভিন্ন উৎস থেকে গ্রন্থপঞ্জী'র সংজ্ঞা পাওয়া যায়।
  • Encyclopedia of Library and information science এ রয়েছে “Everything which is a part of the book considered as a book is the concern of Bibliography”
  • UNESCO এর বর্ণনায় “গ্রন্থপঞ্জী হচ্ছে লিখিত বা প্রকাশিত বিবরণী সমূহের নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকাশিত বর্ণনানুক্রমিক তালিকা”।
সার্বিক বিবেচনায় সহজে গ্রন্থপঞ্জী এর সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায় -
“Bibliography is a scientific systematic listing of books”
এবং
“Bibliography is the art or science of description of the books”
সুতরাং বিভিন্ন মণীষীগণের মতামত থেকে আমরা বুঝতে পারি গ্রন্থপঞ্জী হল এমন একটি বিজ্ঞানসম্মত সুসংহত তালিকা যা বই, পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য প্রকাশনাসমূহকে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মাধ্যমে কোন প্রকাশনার লেখক, শিরোনাম, প্রকাশক, প্রকাশনার স্থান, প্রকাশনার তারিখ, মূল্য, পৃষ্ঠাসংখ্যাসহ অন্যান্য তথ্য জানা যায়। এই বিজ্ঞানসম্মত তালিকা পুস্তক, পাণ্ডুলিপিসহ অন্যান্য পাঠোপকরণের পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ বা আংশিক বিবরণী প্রদান করে। তাই একে বইপত্রের জীবনচরিত বা জীবনীকোষও বলা যায়।

গ্রন্থপঞ্জীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রখ্যাত চিকিৎসক গ্যালেন (Galen) সর্বপ্রথম নিজের লেখা বইগুলোর একটি শ্রেণীকৃত গ্রন্থপঞ্জী প্রণয়ন করেন। তার অনুসরণে পরবর্তীযুগে প্রণীত গ্রন্থপঞ্জীর বেশিরভাগ ধর্ম বিষয়ক বইয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি হতো। সে সময়ে প্রতিটি গ্রন্থের লেখকের জীবনীসহ তাঁর লিখিত অন্যান্য বইয়ের নামও সংযোজন করা হত। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য দুইটি গ্রন্থপঞ্জী হল St. Jeromeরচিত ‘De Scriptoribus Ecclesiasticis’ ও Gennadius Massiliensis প্রণীত ‘De Ilustribus Viris’। প্রথমটিতে ১৩৫ জন ও দ্বিতীয়টিতে ৯৯ জন লেখকের জীবনী ও কর্মসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ১৪৬৭ সালে দুটিই মুদ্রণ করা হয়।

ইংল্যান্ডের John Boston ১৯৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে সেগুলোর পাঠ্য সামগ্রীর একটি তালিকা ‘The catalogues scriptorum ecclesiac’ নামে ১৪১০ সালে প্রকাশ করেন। এটা বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থপঞ্জী হিসেবে স্বীকৃত। এই গ্রন্থে ৭০০ জন লেখকের বিভিন্ন ধর্মীয় বইয়ের নাম পাওয়া যায়।

Johann Tritheim ১৪৯৪ সালে ‘Liber de Seriptoribus Ecclesiasticis’ শিরোনামে একটি গ্রন্থপঞ্জী প্রকাশ করেন। এতে সাত হাজারেরও বেশি বই এবং এর লেখকগণের নাম বর্ণানুক্রমিক নিয়মে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছিল। আইন বিষয়ক বইয়ের উপর ভিত্তি করে Giovanni Nevizzano ১৫২২ খ্রিস্টাব্দে একটি গ্রন্থপঞ্জী প্রকাশ করেন। এতে এক হাজারেরও বেশি আইনশাস্ত্রের বইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।

গ্রন্থপঞ্জীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
অনুসন্ধিৎসুকে গ্রন্থ, ডকুমেন্ট বা কোন প্রবন্ধে প্রকাশিত জ্ঞান সম্পর্কে সন্ধান দেয়াই গ্রন্থপঞ্জীর  প্রাথমিক ও প্রধান উদ্দেশ্য। একজন গবেষককে তাঁর উদ্দীষ্ট বিষয়ে কি কি প্রকাশনা ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তা অবগত ও সনাক্ত করতে সাহায্য করে গ্রন্থপঞ্জী। আরও যেসব বিষয়ে গ্রন্থপঞ্জী সহায়তা করে থাকে সেগুলো নিম্নরূপঃ
  • গ্রন্থপঞ্জীর প্রতিটি এন্ট্রিতে সেই গ্রন্থের পূর্ণ পরিচয় থাকে।
  • যে কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য এক শ্রেণীর এন্ট্রিগুলি একত্রে বিন্যস্ত থাকে।
  • একজন গ্রন্থকারের রচিত যাবতীয় গ্রন্থের পরিচয় একত্রে পাওয়া যায়।
  • একটি বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বইয়ের সন্ধান দেয়।
  • কোন নির্দিষ্ট গ্রন্থ সম্পর্কিত নানাবিধ তথ্য, যেমন- গ্রন্থের সম্পূর্ণ নাম, লেখকের নাম, সম্পাদক বা সংকলকের নাম, সংস্করণ, প্রকাশনার তারিখ, প্রকাশনার স্থান, মোট পৃষ্ঠার সংখ্যা, পরিশিষ্ট, সূচী, মানচিত্র, ছক ইত্যাদি পাওয়া যায়।
গ্রন্থপঞ্জীর প্রকারভেদ
গ্রন্থপঞ্জীর প্রকারভেদ নিয়ে পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। তবে এই মতভেদ প্রধানত শ্রেণীকরণের ভঙ্গি নিয়েই। একেকজন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন গ্রন্থপঞ্জীকে বিভিন্ন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

সাধারণ অর্থে গ্রন্থপঞ্জীকে তিনভাগে ভাগ করা হয়।
  • (ক) বিষয় গ্রন্থপঞ্জী (Subject Bibliography)
  • (খ) শিরোনাম গ্রন্থপঞ্জী (Title Bibliography)
  • (গ) লেখক গ্রন্থপঞ্জী (Author Bibliography)
পণ্ডিত Esdaile তাঁর Student Manual Of Bibliography বইয়ে গ্রন্থপঞ্জীকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন।
  • (ক) প্রাথমিক গ্রন্থপঞ্জী (Primary Bibliography)
  • (খ) মাধ্যমিক গ্রন্থপঞ্জী (Secondary Bibliography)
  • উল্লিখিত দুটোভাগকে আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপঃ
  • প্রাথমিক গ্রন্থপঞ্জীকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
  • (ক) সার্বজনীন গ্রন্থপঞ্জী (Universal Bibliography)
  • (খ) ইনকুনাবুলা গ্রন্থপঞ্জী (Incunabula Bibliography)
  • (গ) বাণিজ্যিক গ্রন্থপঞ্জী (Trade Bibliography)
  • (ঘ) নির্ধারিত গ্রন্থপঞ্জী (Selective Bibliography)
  • (ঙ) জাতীয় গ্রন্থপঞ্জী (National Bibliography)
মাধ্যমিক গ্রন্থপঞ্জীকে আবার চারভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমনঃ-
  • (ক) লেখক গ্রন্থপঞ্জী (Author Bibliography)
  • (খ) বিষয় গ্রন্থপঞ্জী (Subject Bibliography)
  • (গ) ব্যক্তিগত গ্রন্থপঞ্জী (Personal Bibliography)
  • (ঘ) গ্রন্থপঞ্জীর গ্রন্থপঞ্জী (Bibliography of Bibliography)
উপর্যুক্ত বিবিধ প্রকারকে অনেকটা ঠিক রেখে Girija Kumar এবং Krishan Kumar তাঁদের  Bibliography গ্রন্থে  Bibliography’কে তিনটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত করেছেন।
  • (ক) পদ্ধতিগত বা প্রণালীবদ্ধ গ্রন্থপঞ্জী (Systematic or Enumerative Bibliography)
  • (খ) বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থপঞ্জী (Analytical or Critical Bibliography)
  • (গ) ঐতিহাসিক গ্রন্থপঞ্জী (Historical Bibliography)
পদ্ধতিগত বা প্রণালীবদ্ধ গ্রন্থপঞ্জীকে নিম্নোক্তভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমনঃ
  • (ক) সার্বজনীন গ্রন্থপঞ্জী (Universal Bibliography)
  • (খ) জাতীয় গ্রন্থপঞ্জী (National Bibliography)
  • (গ) বাণিজ্যিক গ্রন্থপঞ্জী (Trade Bibliography)
  • (ঘ) নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জী (Selective Bibliography)
  • (ঙ) ইনকুনাবুলা গ্রন্থপঞ্জী (Incunabula Bibliography)
  • (চ) লেখক গ্রন্থপঞ্জী (Author Bibliography)
  • (ছ) বিষয় গ্রন্থপঞ্জী (Subject Bibliography)
  • (জ) গ্রন্থপঞ্জীর গ্রন্থপঞ্জী (Bibliography of Bibliography)
বিশ্লেষণাত্মক বা সমালোচনামূলক গ্রন্থপঞ্জীকে তাঁরা দুইভাগে বিভক্ত করেছেন। সেগুলো হলঃ
  • (ক) বর্ণনামূলক গ্রন্থপঞ্জী (Descriptive Bibliography)
  • (খ) মূলগ্রন্থ সম্বন্ধীয় গ্রন্থপঞ্জী (Textual Bibliography)
পরিশেষে বলা যায়, মানব কর্তৃক যাবতীয় সৃষ্টিশীল চিন্তাচেতনাকে সুসংহতভাবে বিন্যস্ত করার ক্ষেত্রে গ্রন্থপঞ্জীর ভূমিকা অপরিসীম। গ্রন্থপঞ্জীর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অনুসন্ধিৎসু পাঠক বা গবেষক তাঁর প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পেতে পারেন। আবার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে গ্রন্থপঞ্জী প্রণয়নের মাধ্যমে একজন লেখক তাঁর পঠিত গ্রন্থসমূহকে পাঠকের সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে একটি সুরচিত গ্রন্থপঞ্জী জ্ঞান অন্বেষণকারী গবেষক-পাঠকদের সময় ও অর্থের অপচয় থেকে রক্ষা করে। তাঁদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণে গ্রন্থপঞ্জীই প্রধান সহায়।

গ্রন্থপঞ্জী বিষয়ক এই রচনাটি প্রস্তুতকালে নিম্নোক্ত বই দুইটি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
  • বিবলিওগ্রাফী, রেফারেন্স এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস – এ. ডি. এম. আলী আহাম্মদ, ২০১৪, কৃষ্ণচূড়া প্রকাশনী, ঢাকা।
  • গ্রন্থপঞ্জী রেফারেন্স ও তথ্যসেবা - ড. মোঃ মিজানুর রহমান, ২০১৫, নিউ প্রগতি প্রকাশনী, ঢাকা।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।