‘তরুণকুমার ঘটক’ অনুদিত ‘মারিও ভার্গাস ইয়োসা’র ‘কুকুরছানা’ : সোসাইটির ‘পুরুষত্ব’ ম্লান হইয়া পড়ে যে ন্যারেটিভে - ‘মেহেরাব ইফতি’

‘তরুণকুমার ঘটক’ অনুদিত ‘মারিও ভার্গাস ইয়োসা’র ‘কুকুরছানা’ : সোসাইটির ‘পুরুষত্ব’ ম্লান হইয়া পড়ে যে ন্যারেটিভে - ‘মেহেরাব ইফতি’

‘কুকুরছানা’
(১৯৬৭) এই বহি’র নাম ক্যানো, এইটা নিয়া আমি ভাবতেছিলাম; ঠিক হইল কি নামকরণ? আইডিয়ালিস্ট জিন্দেগী না যাপন করা, আন-এথিকাল লাইফরে ইঙ্গিত কইরা ইয়োসা যে জীবন বোধরে দেখাইতে ছিলেন, এবং লগে অশিক্ষা+কু-শিক্ষারে প্লাস কইরা যা আমরা পাই, মনে হয় বইয়ের নামকরণ সঠিক হইল না। কুত্তার জীবন বহুলাংশেই ফিলোসফারের জিন্দেগী, সহি সিনিকের জিন্দেগী। এটা ঠিক, ‘উপন্যাসোপম’ এই গল্পে অ্যান্টি-হিরোরা আশ্রয় পাইছে প্রায়শ-ই; যেমন কুত্তা বিষয়ক দুর্ঘটনার পর সেইটারে শীতকালের লেপ দিয়া ঢাইকা দেওনের রূপক হিশাবে ‘সাদা খরগোশ’ আনা হইছে; তখন অই কুত্তা যার নাম থাকে ‘হুদাস’ সে হইয়া যায় ক্রিমিনাল। পাঠিকা দেখেন, কি সুন্দর কইরা পুচুপুচু মার্কা নির্দোষ-নিরীহ-প্রাণী আইনা একটা ক্রাইমরে লুকাইয়া ফেলা হইল। হুদাস অবশ্য এই কাহিনীর মূল নায়ক যে (কোয়েইয়ার), তাঁর অণ্ডকোষে কামড় দেওয়ার অধিক আর কোনো পাপকাম নিজের কান্ধে লন নাই।

উপন্যাসের বর্ণনা দুর্দান্ত। ৭২ পেইজে লেখক একদল পোলাপাইনের স্কুলজীবন থেকে শুরু কইরা সংসার জীবন পর্যন্ত বয়ান করছেন; মুখ্য চরিত্রে থাকেন কোয়েইয়ার নামের এক পোলা, পরে সে গল্পেগল্পে তরুণ হয়, তাঁর মুষ্কছেদন হয়, সে মালখোর হইতে থাকে এবং, একদিন ড্রাইভ করতে গিয়া...(!)। কিন্তু লেখকের বর্ণনায় পুরা গল্পে একটা বিভ্রান্তির জাল ছড়ায়ে আছে। এনালিসিস করলেই দ্যাখা যায়, চরিত্রগুলার স্ব-বিরোধিতার প্রাবল্য। ৬ অধ্যায়ে লেখক বর্ণনা করছেন কাহিনী। টাইম ফ্রেমটা এইরকমঃ
  • ২ বছর = প্রথম অধ্যায়।
  • ৫ বছর = দ্বিতীয় অধ্যায়।
  • ৫ বছর = তৃতীয় অধ্যায়।
  • ২ বছর = চতুর্থ অধ্যায়।
  • ২ বছর = পঞ্চম অধ্যায়।
  • ১০ বছর = ষষ্ট অধ্যায়। (এইটা নিয়া বিবাদ আছে)
টীকাস্বরূপ, পয়লা অধ্যায়ে অই সকল যুবক হগলের বয়স আছিল ৮ টু ১০ বছরের মধ্যে। এই হইল গল্পের টাইম পিরিয়ড।

গল্প বলার সময় ন্যারেটর গল্প কন অতীত> বর্তমান> ভবিষ্যৎ হিশাবে; আর, যারা পাঠিকা তাহারা টাইম ফ্রেম পাইবেন বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের। ক্রমঘটনায় চরিত্রগুলার জীবন ধারণ থেকে ধরে ধরে গল্প বলা স্টার্ট হয়। ন্যারেটর কখনো গল্প থেকে বাইর হইয়া যান; কখনো চরিত্রের টোনে কথা বলেন আবার কখনো একটা সার্কেল গ্রুপ হইয়া একত্রে কথা কইতে থাকেন, অথবা পুরা গল্প হইতেই ন্যারেটর দূরে গিয়া বইসা গল্পরে ছাইড়া দেন পারিপার্শ্বিক সিচুয়েশনের কাছে। অর্থাৎ, আমি-সে; একবচন-বহুবচনের নানান গোলযোগ পুরা বর্ণনাতেই। খুব কেয়ারফুলি রিড না করলে পূর্বের প্যারা আবার পয়লা থেকে রিড কইরা পাঠে ফিরতে হইতে পারে।

গল্পটা শুরু হয় স্কুলিং দিয়া এবং শেষও হয় শুরু হওনের সময় যারা স্কুলে রিড করত তাগো পোলাপানের স্কুলিং দিয়া। স্কুলে থাকার সময় খেলার মাঠে ফুটবল, বয়ঃসন্ধিতে মাইয়াগো প্রতি অ্যাফেকশন, খোলামেলা পার্কে (এডি মনে হয় এডাল্ট পার্ক বা ডেটিং-প্লেস টাইপ কিছু ) যাইতে শুরু করা, ক্লাবে, সমুদ্র সৈকতে হাওয়া খাইতে যাওয়া, তারপর যৌবনে হোম থেকে বাইরে নাইট আউট করার ফ্রিডম লওয়া, ক্যাবারে যাওন, বেশ্যাখানায় যাওন। হেরপর পেটের দিকে একটু চর্বি জমা শুরু হইলেই দল ভাঙ্গতে শুরু করা। কোনোডা বিবাহ করে, কেউ বিদেশ যায় গা, ডিগ্রি-ফিগ্রি লইয়া আহে। আইসা মিরাফ্লোরেস-এর লুম্পেন প্রোলেতারিয়েত সমাজে নিজেগো পাটাতন শক্ত করে। ম্যালা জিনিসের মালিক হইয়া উঠে তারা।

সবকিছুর মাঝখানে ন্যারেটর শুদ্ধ নিজেই নায়ক বানায়ে ফেলেন কোয়েইয়াররে। স্কুলেই আকামটা ঘটে আরকি! হুদাস নামের এক কুত্তা খাঁচায় আটকানো থাকে; অইটা কোয়েইয়ারের অণ্ডকোষে কামড় দিয়া দেয়। এক্সিডেন্ট-ই মনে হইতেছিল প্রথমে! সেখান হইতেই ন্যারেটর বারবার কোয়েইয়ারের সঙ্গ দেন (সিম্প্যাথি উৎপাদন!), মরার আগ পর্যন্ত। অর্থাৎ, এই উনিই হইলেন গিয়া সেন্ট্রালে। যাইহোক, সে এই যুবক দলের মধ্যে থাইকাও থাকে না, নিয়ম মানে না ট্রাইবের। একটু যাচাই করলেই দেখা যায় ট্রাইবে যে চরিত্রগুলা আছে সেগুলার মনোভাব-প্রতিক্রিয়া সব এক; তফাৎ নাই। বেশিরভাগই সব বিষয়ে একমত হয়; ব্যতিক্রম থাকে শুধু কোয়েইয়ারের মতামতে। বন্ধুসকল নিজগো জীবন পার করেঃ স্কুলিং> মাইয়া> ইনিবারসিটি> প্রফেশন> বিবাহ এইভাবে। এগো লগে সমাজের বা বৃহত্তর জগতের (নেচারেরও) কোনো ফাইট হয় না। কিন্তু, কোয়েইয়ারের ফাইট সবকিছুর লগে; এমনকি নিজের লগেও।

গল্পের একবারে শেষ দিকে দেখা যায় সবাই কইতেছে,
... তখন আমাদের বউ, গাড়ি সন্তান সব হল, সন্তানরা শোঁম্পানাতে পড়াশুনো করে...এবং ওরা গ্রীষ্মবাস তৈরি করে আনকন-এ।
ঠিক তখন ন্যারেটর বলেন, কোয়েইয়ার চইলা যায় পাহাড়ে, তিঙ্গো মারিয়ায়, সে কফি চাষ করবে।

মারিও বেনেদেত্তি বলেন-
কুকুরের কামড়ে তার পৌরুষ শেষ হয়ে যায়... এ কামড় পরবর্তী সময়ে জীবনও শেষ করে দেয়।
সোসাইটির-ই নানাবিধ মিথের মইধ্যে ‘পৌরুষ’ও একটা মিথ; নাকি!

====================
কুকুরছানা
মারিও ভার্গাস ইয়োসা (Mario Vargas Llosa)
স্প্যানিশ থেকে অনুবাদঃ তরুণ কুমার ঘটক

প্রচ্ছদশিল্পী :  কল্লোল সাহা
প্রকাশক : এবং মুশায়েরা
প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১১
পেইজ সংখ্যা : ৭২
আইএসবিএন : 9789381170113

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।