জিঞ্জিরা জেনোসাইড - নির্মলেন্দু গুণ

জিঞ্জিরা জেনোসাইড - নির্মলেন্দু গুণ

জিঞ্জিরা জেনোসাইড
-নির্মলেন্দু গুণ

প্রকাশনী: ছায়াবীথি, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ: ২০১২
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য: ১৩০.০০ টাকা, পৃষ্ঠা: ৮৮

উৎসর্গ: ধর্মনিরপেক্ষতার পথিকৃৎ ভাই গিরীশ চন্দ্র স্মরণে।

কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখা 'আত্মকথা ১৯৭১' গ্রন্থের 'জিঞ্জিরা গণহত্যা' অংশের পরিবর্ধিত রূপ এই বইটি। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের উপর বর্বর হত্যাকান্ড চালিয়েছিল। স্থানীয় রাজাকারদের সাথে নিয়ে একের পর এক গ্রামে তারা ঢুকেছে আর সামনে যাকে সন্দেহ হয়েছে তাকেই পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। কালের বিবর্তনে অনেক ঘটনা মানুষের মন থেকে মুছে যায়। ইতিহাসের তলানীতে চাপা পড়তে যাওয়া এমন একটি ঘটনা 'জিঞ্জিরা জেনোসাইড' বা 'জিঞ্জিরা গণহত্যা'।

১৯৭১ সালের ০২ এপ্রিল তারিখে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঢাকা থেকে পালিয়ে গিয়ে জিঞ্জিরা অঞ্চলে আশ্রয় নেয়া মানুষদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ করে। কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজে সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। নিজের চোখে যা দেখেছেন তাই তিনি আবেগপ্রবণভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এই ঘটনাকে ভিয়েতনামের মাই লাই গণহত্যার সাথে তুলনা করেছেন। ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশের ঘুমন্ত মানুষদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে। সারা দেশে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষের অনেকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। নির্মলেন্দু গুণ অন্যদের মতো সাময়িকভাবে গা ঢাকা দেয়ার জন্য ঢাকার জিঞ্জিরা অঞ্চলে গিয়েছিলেন।

২ এপ্রিল ১৯৭১ সালের ভোরবেলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা এলাকার শুভাড্যা গ্রামের আক্রমণ শুরু করে। দুপুর পর্যন্ত একটানা চলা এই আক্রমণে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছিল। 'স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র' বইয়ে সকাল পাঁচটা তেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত আক্রমণের কথা স্পষ্ট করেই লেখা আছে। হিন্দুপ্রধান এই অঞ্চল ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা হিন্দু-মুসলমান সবাইকে আশ্রয় দিয়েছিল। দুই এপ্রিল ভোর থেকে শুরু হওয়া নির্বিচার গোলাগুলি থেকে হিন্দু-মুসলমান কেউই বাঁচতে পারেনি। সকলের রক্ত একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল শুভাড্যা গ্রামের মাটিতে।

নির্মলেন্দু গুণ অন্তরের তাগিদ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন। তিনি প্রধানত কবি, আবেগের চর্চাই তার প্রধান কাজ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাসবিদদের মতো নির্মোহ থাকেননি। একটি ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক আরো ঘটনা স্মৃতি থেকে টেনে এনেছেন। প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত উল্লেখ করেছে। নানা দার্শনিক উপলব্ধির কথা প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আন্তরিকভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন: গোলাগুলি চলার মধ্যে যখন তিনি পালাচ্ছিলেন। কখনও মসজিদের দেয়ালের আড়ালে, কখনও কচুরীপানার ডোবায় লুকিয়েছিলেন। পিছনে পাকিস্তানীরা মেশিনগান আর মর্টার গান দিয়ে গুলি করছিল। অন্যদের মতো তিনিও উদভ্রান্তের মতো প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। একটি জনশূন্য বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে তিনি ভাবলেন আর পালাবেন না; ছোটাছুটি করবেন না। প্রাণ বাঁচানোর জন্য আর কোন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করবেন না। এরকম একটি অবস্থায় তাঁর দার্শনিক বোধ এরকম।

“আমি যখন মরতে রাজি হলাম, দেখলাম আমার বুকের ভিতর থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেছে। আমি খুব নির্ভার বোধ করলাম। বুঝলাম, ওটা ছিল জীবনের বোঝা।"

২ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত সেই ভয়াবহ গণহত্যার সময় নির্মলেন্দু গুণ খুব কাছ থেকে পাকিস্তানীদের নৃশংসতার দৃশ্য দেখেছেন। বাঙালিদের জীবন ওদের কাছে কতটা মূল্যহীন তার প্রমাণ পেয়েছেন। মুহুর্মুহু গুলিবৃষ্টির মধ্যে পলায়নরত অবস্থায় নির্মলেন্দু গুণ একটি ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছিলেন।

“একটি ডোবার ভেতরে মাথা গুঁজে বসে আমি তখন এমন একটি করুণ মৃত্যুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি যা আমি কোনদিন ভুলে পারবো না। পারি নি। আমি দেখি, শেলের আঘাতে একজন ধাবমান মানুষের দেহ থেকে তার মস্তকটি বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়েছে আমি যে ডোবায় লুকিয়ে ছিলাম সেই ডোবার জলে, কিন্তু ঐ মানুষটি তারপরও দৌড়াচ্ছে। শেলের আঘাতে তার মাথাটি যে দেহ থেকে উড়ে গেছে, সেদিকে তার খেয়ালই নেই। মস্তকছিন্ন দেহটিকে নিয়ে কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করার পর লোকটা আর পারলো না, তার কবন্ধ দেহটা লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। মস্তকহীন দেহ থেকে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্তস্রোতে ভিজে গেল শুভাড্যার মাটি।"

মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা আমাদের অজানা থেকে গেছে। নয় মাস ব্যাপী সংঘটিত গণহত্যার নির্মমতা কত ব্যাপক ছিল, তা অনেকে কল্পনাতেও আনতে পারে না। 'জিঞ্জিরা গণহত্যা'র মত আরও অসংখ্য হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ঘটেছিল। গ্রামে গ্রামে ঘটে যাওয়া সেইসব ঘটনার একটি নিয়ে বই রচনা করে নির্মলেন্দু গুণ ইতিহাসের দায় সামান্য হলেও শোধ করতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে সংঘটিত হওয়া এরকম গণহত্যাগুলো নিয়ে আরও বই রচনা হওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের সামনে উন্মোচন হোক বিস্মৃত অনেক ইতিহাস। বইটির ব্যাপক প্রচার ও পঠন প্রত্যাশা করি।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।