গ্রন্থ পর্যালোচনা লেখার সহায়িকা - ড. কুর্ট হ্যাকেমার

গ্রন্থ পর্যালোচনা লেখার সহায়িকা- ড. কুর্ট হ্যাকেমার
ড. কুর্ট হ্যাকেমার
একজন গ্রন্থ আলোচক দায়িত্ববোধ এবং বিশ্বাসযোগ্যতার এক বিশেষ ভূমিকায় অবস্থান করেন। তাকে সারমর্ম টানতে হয়, প্রাসঙ্গিক থাকতে হয়, লেখার দৃঢ়তা বর্ণনা করতে হয় এবং দুর্বলতাকে চিহ্নিত করতে হয়। আমাদের সকলের পক্ষ থেকে তিনি কার্যকারণ এবং সামঞ্জস্যতার সাথে এক বিশেষ কর্তব্যবোধ অনুভব করেন। -এইচ জি রিকওভার

বই আলোচনা ইতিহাসভিত্তিক কাজগুলোতে এক বিশেষ দূতিয়ালীর কাজ করে। একই ক্ষেত্রে অন্যরা যে কাজ করছে তার অন্তর্দৃষ্টি এবং পরিপ্রেক্ষিত একটি বই ধারণ করতে পারে। সব প্রধান পেশাভিত্তিক জার্নালগুলো (যেমন: জার্নাল অফ আমেরিকান হিস্টোরি, সিভিল ওয়ার হিস্টোরি এবং ত্রৈমাসিক উইলিয়াম ও মেরি) গ্রন্থালোচনা প্রকাশ করে। কেউ কেউ এত বেশি আন্তরিক যে জার্নালের প্রায় অর্ধেক পৃষ্ঠায় তারা বই আলোচনা ছাপে। 'রিভিউস ইন হিস্টোরি' পত্রিকার সব প্রসঙ্গই বই নিয়ে।

আপনার আলোচনাটিকে সম্পূর্ণভাবে মার্জিত বা পরিশীলিত একটি কাজ হওয়া উচিত। এর শিরোনামে বইয়ের একটি পূর্ণ পরিচিতি থাকা দরকার। এখানে থাকবে লেখকের নাম, বইয়ের শিরোনাম, প্রকাশনার স্থান, প্রকাশক, প্রকাশের তারিখ, পৃষ্ঠাসংখ্যা এবং অন্য উপাদান যেমন ম্যাপ এবং ছক। উদাহরণ নিম্নরূপ:

“উইলিয়াম. এম. ফাউলার জুনিয়র, জ্যাক টারস এন্ড কমোডোরস: দ্যা আমেরিকান নেভী, ১৭৮৩-১৮১৫ (বোস্টন: হাফটোন মিফিন কোং. ১৯৮৪, পৃষ্ঠা: xii, ৩১২, অলংকরণ, ম্যাপ)”

মাথায় রাখুন যে বই আলোচনা বইয়ের বিবরণী নয়। বইয়ের বিবরণ হল কেবল একটি বইয়ের সারাংশ মাত্র। বিপরীতে বই আলোচনা বইয়ের সমালোচনা বিশ্লেষণ করে।

একটি ভালো আলোচনার বিভিন্ন উপাদান
  • লেখকের আলোচনার বিষয় ও প্রসঙ্গ চিহ্নিত করুন। তিনি কেন এই বই লিখেছেন? তিনি কী প্রমাণ করতে চান? বিষয়কে চিহ্নিত করতে পারাটাই যথেষ্ট নয়। লেখক যা বলতে চেয়েছেন আপনাকে তা উল্লেখ করতে হবে।
  • কাজের পরিধিকে চিহ্নিত করুন। যেমন, কোন সময়কাল নিয়ে লিখিত; উপপ্রসঙ্গ কোনটি?
  • লেখক তাঁর রচনাকে কীভাবে সাজিয়েছেন তা ব্যাখ্যা করুন। তিনি নিজেকে প্রমাণে কতটুকু সফল তা পরিমাপ করুন।
  • সমাধান টানার জন্য লেখক কোন ধরণের প্রমাণাদি ব্যবহার করেছেন তার ব্যাখ্যা দিন। নির্দিষ্ট করে বলুন। তিনি মুখ্য ও গৌণ উৎস ব্যবহার করেছেন- এমন সরলভাবে বলবেন না। উৎসের প্রকারভেদ উল্লেখ করুন। মৌখিক সাক্ষাৎকার, নিজস্ব গবেষণা, পত্রিকার উপাদান, পরিসংখ্যান এভাবে সুনির্দিষ্ট করে বলুন।
  • লেখকের রচনাভঙ্গিকে মূল্যায়ন করুন। যেমন- তিনি কী বর্ণনাত্মক, নাকি বিশ্লেষণাত্মক?
  • যদি বইয়ের শিরোনাম থেকে বোঝা না যায় তাহলে বইয়ের সাধারণ প্রকৃতি বর্ণনা করুন। এটা কী কূটনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামরিক অথবা মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস?
  • বইটি যদি কোন সিরিজের অংশ হয়, তাহলে তার উল্লেখ করুন।
  • প্রাসঙ্গিক বিষয়ে যদি লেখকের কোন বিশেষ অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ থাকে তাহলে তার উল্লেখ করে বিবরণ দিন।
  • বইয়ের উদ্দিষ্ট পাঠক কারা তা উদঘাটন করুন।

কার্যপ্রণালি বা পদ্ধতির পরামর্শসমূহ
  • সমস্ত বইটি সাবধানে পড়ুন। মাঝে মাঝে একটু থেমে লেখক কী করার চেষ্টা করছেন তা চিন্তা করুন। পরবর্তীতে সাহায্যে লাগতে পারে এমন কিছু লিখে রাখুন। প্রত্যেক অনুচ্ছেদের শেষে পড়া থামিয়ে লেখক যা বলতে চেয়েছেন তা কয়েক ছত্রে লিখে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
  • আপনার নিজের আলোচনার প্রথম খসড়াটি লিখে ফেলুন। এই খসড়াটি দ্বিতীয়বার পুনর্পাঠ করার আগে এক বা দুই দিনের জন্য দূরে সরিয়ে রাখুন।
  • এই পরামর্শগুলো দ্বিতীয়বার খসড়া লেখার আগে আর একবার বিবেচনা করুন।
  • কোথাও পাঠাবার আগে আপনার পাণ্ডুলিপি সতর্কতার সাথে সম্পাদনা করুন।

ভঙ্গি এবং ব্যাকরণগত যা মনে রাখতে হবে
  • লেখক এবং বই সম্পর্কে লেখার সময় বর্তমান কাল (Present tense) -এ লিখতে হবে। বইয়ের বিষয় নিয়ে লেখার সময় অতীতকাল ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন: “লেখক মনে করেন যে হ্যাসলি ঠিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল...”
  • বইয়ের শিরোনাম বারবার উল্লেখ করবেন না। সাধারণত দুর্বল সূচনাবাক্যে লেখক ও বইয়ের নামের পুনরাবৃত্তি করা হয়।
  • যখন কাউকে প্রথমবার উল্লেখ করবেন তখন তার সম্পূর্ণ নাম লিখুন।
  • যিনি পূর্বে পড়েননি, তিনি যেন আপনার লেখা পড়ে বইটি 'বুঝতে পারে' এরকম সুনির্দিষ্টভাবে লিখুন।
  • যেখানে প্রয়োজন সেখানে কর্তৃবাচ্যে লিখুন। তবে স্মরণে রাখুন যে কখনও কখনও কর্মবাচ্য অধিক উপযোগী।
  • বই থেকে যে বাক্য অথবা শব্দবন্ধ উদ্ধৃতি হিসেবে দেবেন তার পৃষ্ঠা নম্বর বন্ধনীর মধ্যে উল্লেখ করুন।

যা এড়িয়ে যাবেন
  • বলুন-"এটা একটি ভাল বই।" এমন বলবেন না যে -"আমি মনে করি এটা একটা ভাল বই"। কারণ সম্পূর্ণ লেখাটা আপনার নিজের।
  • অশালীন শব্দ। মনে রাখবেন যে, বই আলোচনা একটি আনুষ্ঠানিক কাজ।
  • একেবারে অতি সংক্ষেপ করে লেখা।
  • পাঠক জানে বলে ধারণা করা যায় এমন তথ্য বারবার উল্লেখ করা। যেমন ধরে নেয়া হয় যে - "জাপান যে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবার আক্রমণ করেছে তা পাঠক জানে।"
  • অতিশয়োক্তি ব্যবহার:- যেমন: এটা এই বিষয়ে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বই।
  • বই থেকে লম্বা উদ্ধৃতি ব্যবহার। নিজের ভাষায় উক্ত কথাগুলো বর্ণনা করাই উত্তম।

অনুমতিক্রমে প্রকাশ করা হল।
 মূল লেখার ঠিকানা

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে এখানে ক্লিক করে ই-মেইল করুন।