বাঙালী কাকে বলি- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বাঙালী কাকে বলি- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বাঙালী কাকে বলি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা
প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল
প্রথম প্রকাশঃ ১৯৮৮
অন্বেষা প্রকাশঃ ২০১১
পৃষ্ঠাঃ ১২৬
মূল্যঃ ১৬০.০০
ISBN: 978-984-7116-13-6

বাঙালীর সংজ্ঞা কী? কাকে বাঙালী বলে; কি কি বৈশিষ্ট্য থাকলে একজন মানুষকে বাঙালীত্বের অধিকারী বলে মনে করা হবে- এরকম বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে খোঁজা হয়েছে এই বইয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্বনামখ্যাত অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর নিজস্ব বিচারবোধ থেকে বাঙালীত্বের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি বলেন-
বাঙালী কাকে বলি- এর একটি সংজ্ঞা বইটিতে সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও পাওয়া যাবে। সেটি হলো এই যে, বাঙালীর প্রথম পরিচয় সে বাংলা বলে এবং বাংলার চর্চা করে। এখানে সে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেটাই একমাত্র নয় বাঙালীত্বের। অবাঙালীও বাংলা বলতে পারেন, কেউ কেউ যে বলেন না এমনও নয়। বাঙালীকে বাঙালী হওয়ার জন্য অন্য বাঙালীর প্রতি সংবেদনশীল হওয়া আবশ্যক। তার মানে বাঙালী যে দুর্দশায় নির্লিপ্ত অবস্থায় রয়েছে সেখান থেকে তাকে মুক্ত করার চেষ্টা করাটাও বাঙলীত্বের পরিচয় বটে। তিনটি উপাদানই অত্যাবশ্যক।
অর্থাৎ লেখক মনে করেন শুধু জন্মসূত্রে বাঙালী হলেই হবে না কর্মসূত্রেও বাঙালীত্বকে ধারণ ও বহন করতে হবে। বাঙালি হওয়ার জন্য বিশেষ রকমের কিছু কাজ করার পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, চিন্তা, আচরণ ইত্যাদিতে বাঙালীত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসূচক প্রকাশ থাকাও প্রয়োজন। শুধু নামে বাঙালী হলে তা হবে আত্মপ্রতারণার সামিল।

বইয়ের সূচীপত্রে চিন্তাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মনোভঙ্গি স্পষ্টঃ
  • পাকিস্তানীদের জাতীয় পিতা
  • গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি
  • পোশাক কি হবে
  • কপালের দোষ
  • কেবল ভাষার নয়
  • পাশ ফেরা
  • ইলা মিত্র
  • সুরের আগুন
  • একজন অভদ্রলোক
  • রণাঙ্গনে
  • আরেক রণাঙ্গন
  • যা থাকে দেবার
  • দূরে নয়, কাছেই
  • নব্য ধর্মপ্রচারকেরা
  • প্রজন্মের ব্যবধানে
  • খাঁটি বাঙালী

প্রতিটি নিবন্ধে লেখক পরিপার্শ্বের প্রেক্ষিতে বাঙালীর অবস্থা, তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ভাষিক, সাংস্কৃতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করেছেন। দেখিয়েছেন ইতিহাসের কালপর্বগুলোতে বাঙালী জনগোষ্ঠী নিজেদের উদারতা, সহমর্মিতার বিনিময়ে তেমন কিছুই পায়নি। বিদেশী ও দেশী শাসকেরা নানারকম রূপ ধরে বাঙালীত্বের মানবিকতাকে ব্যবহার ও অপমান করেছে।

‘পাকিস্তানীদের জাতীয় পিতা’ নিবন্ধে তিনি বাঙালীদের সাথে 'জিন্নাহ' কীভাবে বিভিন্নরকম মিথ্যাচার করেছেন তা বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণসহ দেখিয়েছেন। সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী সময়ে জিন্নাহর জীবনবোধ, রাজনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে যা কিছু বাঙালী জেনেছে তার বেশিরভাগই ছিল কৃত্রিম। যে পাকিস্তানের কথা বলে তিনি বাংলাদেশী কাছ থেকে নিজের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন আদায় করেছেন, সেই পাকিস্তানের স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তাও তিনি স্পষ্ট করে কখনো বলেন নি। একেকবার একেক রকম কথা বলে বাংলাদেশী বাঙালীদের বিভ্রান্ত করেছেন। এই প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছেন আবদুল ওয়ালী খান এর লেখা বই 'ফ্যাক্টস আর ফ্যাক্টস, দি আনটোল্ড স্টোরি অব ইন্ডিয়াস পার্টিশন' (Facts are facts: the untold story of India's partition- Abdul Wali Khan) বই থেকে। জিন্নাহ ভারত ভাগের জন্য কেন তাড়াহুড়া করছিলেন তার বিবরণ রয়েছে 'ফ্রিডম এট মিডনাইট' ( Freedom at Midnight by Larry Collins, Dominique Lapierre ) বইতে।

‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি’
বাংলাদেশের সমাজে কতটুকু সম্পন্ন হয়েছে সে নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে যারা এই প্রস্তুতিতে সহায়তা করেছেন, এমন কয়েকজন সংস্কৃতিমান ব্যক্তিত্ব এই প্রবন্ধের প্রধান আলোচ্য। লেখক একে একে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল ফজল, কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক এ. কে. নাজমুল করিম, অধ্যাপক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, কবি আবদুল কাদির প্রমুখ ব্যক্তিত্বের জীবনকে উন্মোচন করেছেন। দেখিয়েছেন সাংস্কৃতিক চেতনা শুধুমাত্র বক্তৃতার বিষয় নয়, ব্যক্তিগত আচরণের মাধ্যমে, চর্চার মাধ্যমে তাকে ধারণ ও বহন করতে হয়; পরিপার্শ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয়।

‘পোশাক কি হবে’ প্রবন্ধটিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাঙালীর পোষাক নিয়ে তাঁর খোলামেলা মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। পোষাক নিয়ে তিনি কোন কূপমণ্ডুকতার আশ্রয় নিতে চান না। কারণ জাতীয় পোশাক কি হবে এ নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন। কিন্তু তাঁর অবস্থান নির্দিষ্ট। তিনি বলেনঃ
জাতীয় পোশাক কি হবে সে নিয়ে আমার কোন দুশ্চিন্তা নেই। আমি বরঞ্চ দুশ্চিন্ত বস্ত্র নিয়ে।

“কপালের দোষ” রচনাটিতে লেখক বাংলা ভাষা শেখার পরিমাণ বিশ্বপরিমণ্ডলে দিনে দিনে কমে যে যাচ্ছে সে কথা আলোচনা করেছেন। বাংলা ভাষার প্রতি বাংলাদেশীদের মনোযোগের অভাব তাকে ব্যথাতুর করে তোলে। বিদেশী পণ্ডিতেরা কেউ কেউ বাংলা শিখছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের 'এশিয়ান স্টাডিজ' বিভাগে বাংলা পড়ানো হত। কিন্তু বিদেশে ভ্রমণরত বাঙালীদের বাংলায় বাক্য বিনিময়ের অনীহা বাংলা ভাষাকে বিদেশীদের কাছেই মূল্যহীন করে তুলছে। উইলিয়াম রাদিচে, চীনের কিছু মানুষ বাংলা শিখেছেন; বাঙালী সংস্কৃতিকে মর্মে অনুভব করতে চান। কিন্তু বাঙালীরাই এখন আর বাঙালী থাকতে চায় না। প্রসঙ্গক্রমে তিনি চল্লিশের দশকে হাঙ্গেরীতে প্রকাশিত একটি উপন্যাসের কথা বলেছেন। দুর্ভাগ্য যে বইটির নাম তিনি উল্লেখ করেন নি। বইটি ইংরেজিতেও অনুবাদ হয়নি। সেই বইতে এক দম্পতির কথা আছে। স্ত্রী হৈমন্তী একজন হাঙ্গেরিয়ান নারী, তিনি বাঙালী হতে চান, তাই বিয়ে করেছিলেন একজন বাঙালীকে। কিন্তু বাঙালী স্বামী অমিয় চক্রবর্তী বাঙালী থাকতে চান না। আরেক বাঙালী আলী হায়দার অমিয় চক্রবর্তীকে ঈর্ষাকাতর হয়ে গুলি করে। কিন্তু অমিয় বেঁচে যান। শেষে অনেক ঘটনার পর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে আবার মিলন হয়। উপন্যাসটির প্রসঙ্গ এনেছেন উদাহরণ হিসেবে। লেখকের মূল বক্তব্য হল বাঙালীর কপাল খারাপ। কারণ বাঙালীরা আর বাঙালী থাকতে চাইছে না। নানা কারণ, অজুহাতে নিজেদের বাঙালীত্ব বিসর্জন দিতে চায়।

“কেবল ভাষার নয়” রচনায় লেখক দেখিয়েছেন মানুষে মানুষে পার্থক্য ভাষাকেন্দ্রিক অসাম্যের জন্ম দেয়। ধনীর ভাষা ও দরিদ্রের ভাষার মধ্যে যে ব্যবধান, তা শুধুমাত্র আঞ্চলিকতা বা গ্রাম্যতার অজুহাত নয়, তা অর্থনৈতিক সামর্থ্যেরও পরিচায়ক। অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর ‘বাংলার রেনেসাঁস’ বইতে বলেছিলেনঃ
বিদগ্ধ নাগরিকের মার্জিত ভাষা যেন ভিটামিনবর্জিত ছাঁটা সিদ্ধ চালের ফ্যানগালা ভাত। তার না থাকে স্বাদ, না থাকে পুষ্টি।
একই বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মন্তব্য করেনঃ
বাংলার রেনেসাঁস বহু অঘটন ঘটিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভদ্রলোক ম্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যকার ব্যবধানটি ঘোচাতে পারে নি। আর এই না-ঘোচা ব্যবধানেরই একটি অভিব্যক্তি হচ্ছে ভাষার ব্যবধান। সাহিত্যের ভাষাকে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি আনার ব্যাপারে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন, এনেছেনও খানিকটা, কিন্তু খুব বেশি দূর এগোয় নি। সাহিত্যের ভাষা আলাদা হয়েই রইল। আর সেই ভাষাই হয়ে দাঁড়ালো বিদগ্ধ নাগরিকের মার্জিত ভাষা।
সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা সাহিত্যে ব্যবহারের চেষ্টা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বিদগ্ধ মার্জিতজনেরা নিজেদের উন্নাসিকতা বিসর্জন দিতে চাননি। জনগনের ভাষা থেকে সচেতন প্রচেষ্টায় নিজেদের ভাষাকে আলাদা করে রেখেছেন। আর সাধারণের ভাষাকে দিয়েছেন অমার্জিত ভাষার মর্যাদা।

“পাশ ফেরা” নিবন্ধে লেখক নীতিভ্রষ্ট রাজনীতিবিদদের কথা বলেছেন। নাতিদীর্ঘ রচনাটিতে তিনি পাকিস্তান আমলের বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তবে তিনি রাজনীতিবিদদেরকে নিয়ে চিন্তিত নন। তিনি বরং বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানীদের অন্তঃসারশূন্যতা নিয়ে আশংকিত। তিনি বলেনঃ
পার্শ্বপরিবর্তনকারী রাজনীতিকদের বক্তব্যের তাও সমালোচনা হয়, ধিক্কার ধ্বনি পর্যন্ত শোনা যায়। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যগুলো নীরবে নিভৃতে ক্ষতি করে যায়। শুকনো পাতার চেয়েও অধম তারা, কেননা শুকনো পাতা মাটিকে উর্বর করতে পারে, এসব বক্তব্যের সে গুণটুকুও নেই।
“ইলা মিত্র” রচনাটি লেখক প্রবল ভালবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে লিখেছেন। ইলা মিত্রকে নতুন প্রজন্ম ভুলে যেতে বসেছে। বিবিধ অজুহাত থাকলেও লেখক তা মানতে রাজি নন। তিনি বরং ইলা মিত্রকে বারবার আলোচনা করতে চান। সাধারণ মানুষের জন্য ইলা মিত্রের বিশাল ত্যাগের কথা তুলে ধরতে চান। ইলা মিত্র নিজের ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধার কথা ভাবেন নি। জমিদার বাড়ির গিন্নী তিনি। সাত মহলার বাড়িতে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারতেন। অট্টালিকার চারপাশে যাদের বসতবাড়ি তাদের জীবনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নির্মোহ জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু ইলা মিত্র অন্যদের মতো আত্মসুখে নিমগ্ন ছিলেন না। গ্রামের নিরন্ন মানুষদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় তিনি নিজের ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের হাতে নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। যে বাঙালীরা পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষায় ইলা মিত্রের উপর খড়গহস্ত হয়েছিল তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল যারা বাঙালীত্বের অপমান সহ্য করতে পারে নি। তাই তাঁর বন্দীদশায় সভ্যতার দূতের মতো কেউ না কেউ এসে তাঁকে রক্ষা করেছে, সান্তনা দিয়েছে, যন্ত্রণার উপশম ঘটিয়েছে। ইলা মিত্র লিখেছেনঃ
ওসি রহমান সাহেব রাতে সবার অলক্ষ্যে সেলে এসে আমার মাথা ধুইয়ে দিতেন, ফল খাইয়ে যেতেন। সে মহানুভবতার কথা আমি ভুলবো না।
এই রচনার উপসংহারে লেখকের সচেতন আশাবাদী মনোভঙ্গিটি স্পষ্ট।
আমাদের ইতিহাসে আত্মসমর্পণ আছে, আর আছে প্রতিরোধ। আত্মসমর্পণের ইতিহাসটাকেই গৌরবের বলে প্রচার করা হয়। প্রতিরোধের ইতিহাসটা হারিয়ে যায় অন্ধকারে। ইলা মিত্র একা নন, আরো অনেকে ছিলেন, এখনও আছেন। তাঁদের ইতিহাসটাই আসলে আলোর, যদিও কাজ করেছেন তাঁরা অন্ধকারে। অন্ধকারের বিরুদ্ধেই লড়াই তাঁদের। ভাই চম্পার, বোন পারুলের। জীবন ও মৃত্যুর আলো ও অন্ধকারের এই দ্বন্দ্ব চলছে, চলবে।
“সুরের আগুন” রচনাটি একটি বই পাঠের অভিজ্ঞতা ও সেই সম্পর্কিত নানা ভাবনা নিয়ে লেখা। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বেতারে যে সব গান গাওয়া হত তা নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। নাম “চির দুর্জয়”। এই সংকলনে পাকিস্তানের পক্ষে উদ্দীপনামূলক যে সব গান বাঙালী শিল্পীরা গেয়েছিলেন, সে সব গান ও তাদের গায়কদেরকে নিয়ে লেখক পরিহাস করেছেন। সেই সময়ের প্রধান কবি, অনেক খ্যাতিমান কবির রচিত গান এই সংকলনে রয়েছে। পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদকে সমুন্নত রাখতে তাদের প্রচেষ্টা লেখককে হাস্য রসে আলোড়িত করেছে। এই কবিগণ প্রত্যেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছিল। ১৯৬৫ এর পরের বছর ১৯৬৬ সালেই এসেছিল ছয় দফা। এরা যে পাকিস্তানের মহত্ব নিজেদের কবিতা ও গানে তুলে ধরেছিলেন তার অন্তঃসারশূন্যতা যে কতটা প্রকট ছিল তা হয়তো অনেকে অনুধাবন করতে পারেন নি। লেখক এই বিভ্রান্ত কবি-সাহিত্যিকদের কারও নাম উল্লেখ করেন নি। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন
এই কবিরা তা-ই করেছেন, যা তাঁদের শ্রেণীর পক্ষে করা স্বাভাবিক ছিল।
এই জাতীয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে ফরাসী ঔপন্যাসিক ফ্লবেয়র তাঁর 'ভাবালু শিক্ষা’ বইতে সতর্ক করেছেন। তাদের সম্পর্কে ফ্লবেয়র এর বর্ণনা এরকমঃ
কমপক্ষে চারটি সরকারের অধীনে কাজ করেছে এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য, এমনকি মুহূর্তের অসুবিধা বা অস্বস্তির হাত থেকে নিজেকে বাঁচবার জন্য, অথবা হয়তো-বা নিছক দাসমনোভাবের কারণে কিংবা পশুশক্তির প্রতি অন্তর্নিহিত শ্রদ্ধাবোধের অনুপ্রেরণায় ফ্রান্সকে, দরকার হলে গোটা মানবজাতিকেই, বিক্রি করে দিতে প্রস্তুত ছিল।
লেখক অবশ্য আশাবাদী। সচেতন তরুণদের উপর তাঁর আস্থা অপরিসীম। এই তরুণরা তারুণ্যধর্মের কারণেই নিজেদের প্রবল আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে পথ চলে। তিনি বলেনঃ
ভরসা ওই তরুণেরা। যারা সবকিছু লক্ষ্য করছে এবং তপ্ত হচ্ছে, যারা আছে বলেই কবি ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা বিভ্রান্তির ধূম্রজাল সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও দেশ এগুচ্ছে।
“বাঙালী কাকে বলি” বইয়ের অন্যান্য রচনাগুলোও মূলত বাঙালীত্বের স্বরূপ সন্ধান করেছে। বিভিন্ন সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, রাজনীতিবিদ প্রমুখের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেছেন। আর এই সবকিছু মাধ্যমে তিনি জানতে চেয়েছেন, জানাতে চেয়েছেন বাঙালী নিজেদেরকে কতটা আবিষ্কার করতে পেরেছে; নিজেদের আত্মশক্তির কতটুকু উন্মোচন করতে পেরেছে। অনেক ঘটনায় বাঙলীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বাঙালীরাই বিরোধীতা করেছে। বৃটিশ আমলে প্রতিপক্ষ ছিল ইংরেজরা, পাকিস্তানী আমলে ছিল পাকিস্তানীরা; কিন্তু বাংলাদেশ আমলে তো তারা নেই। এখন সাধারণ নিরন্ন, খেটে খাওয়া বাঙালীর শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বাঙালীরাই। অর্থাৎ আমরাই আজ নিজেদের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। আর বিদেশী শত্রুর দরকার নেই। নিজেরাই আমরা পরিণত হয়েছি নিজেদের শত্রুতে।

লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে নতুন করে পরিচয় করে দেয়ার কিছু নেই। তাঁর ভাষা সরল, তথ্যবহুল; কোথাও জটিল অপ্রচলিত শব্দের পাণ্ডিত্যে হোঁচট খেতে হয় না। তিনি ইতিহাস সচেতন অবস্থান থেকে সমাজের সকলের জন্য সমান অধিকার প্রত্যাশা করেন। নিজেকে তিনি তথাকথিত সামাজিক উচ্চমার্গীয় কাতারের কেউ বলে মনে করেন না। তাই তাঁর রচনায় থাকে সাধারণ মানুষের জীবনের কথা, অধিকারের কথা। আলোচ্য গ্রন্থটিতেও তার পরিচয় স্পষ্ট। “বাঙালী কাকে বলি” বইটি সংস্কৃতিপ্রেমী প্রত্যেক পাঠকের অবশ্যই পড়া উচিত। বইটির পুনর্মূদ্রণ ও বহুল প্রচার প্রত্যাশা করি।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।