“আমাদের এই পৃথিবী” সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করেছেন ‘সত্যেন সেন’

 “আমাদের এই পৃথিবী” সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের আলোচনা করেছেন ‘সত্যেন সেন’

আমাদের এই পৃথিবী
সত্যেন সেন

প্রকাশকঃ দ্যু প্রকাশন, ঢাকা।
প্রচ্ছদঃ কিবরিয়া শাহীন
প্রথম প্রকাশঃ অগ্রহায়ণ ১৩৫৩
প্রথম দ্যু প্রকাশঃ আষাঢ় ১৪২৩, জুলাই ২০১৭
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১২২
মূল্যঃ ১৫০.০০ টাকা
ISBN: 978-984-92972-2-2

পৃথিবী কীভাবে সৃষ্টি হল – এ প্রশ্ন আজকের নয়। আদিম কাল থেকে যুগ বিভাগের প্রত্যেকটি ধাপে মানুষের কণ্ঠে এই প্রশ্নটি ধ্বনিত হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির মাত্রা অনুযায়ী মানুষ এর উত্তর খুঁজেছে। জানতে চেয়েছে সবুজ বন-বনানী ঘেরা, ফুলে-ফলে শোভিত, পাখপাখালীর কলকাকলীতে মোহিত, জীবজন্তুর হুংকারে কম্পিত ঋতুবৈচিত্র্যের সুন্দর এই পৃথিবীর জন্ম কীভাবে হল। বলা যায়, মানুষ যখন চিন্তা করতে শিখল, তখন থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক মানুষ প্রত্যেকে নিজের অস্তিত্বের প্রধান অবলম্বন পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য জানতে চেয়েছে। এই সহজ কিন্তু জটিল প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে সত্যেন সেন লিখিত “আমাদের এই পৃথিবী” বইতে।

“আমাদের এই পৃথিবী” বইয়ের সূচীপত্রটি একবার দেখে নেয়া যাক।
  • পৃথিবীর জন্মকথা
  • মাটির পৃথিবী
  • মাধ্যাকর্ষণ
  • ভূ-চৌম্বক শক্তি
  • সমুদ্র
  • এসো বরফের রাজ্যে
  • সৌরশক্তি
  • আবহমণ্ডল
  • আয়নমণ্ডল
  • শক্তির উৎস
পৃথিবীর জন্ম কীভাবে হল, সে প্রসঙ্গে ইতিহাসের বিভিন্ন বিজ্ঞানীর কাহিনীর উপর লেখক আলোকপাত করেছেন “পৃথিবীর জন্মকথা” নামক নিবন্ধে। আমরা জানি পৃথিবীর জন্ম বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক বিজ্ঞানী বিজ্ঞানবিরোধীদের বাধার মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০ সালে গ্রীক বৈজ্ঞানিক অ্যারিস্টারকাস যখন ঘোষণা করলেন যে সূর্য নয় পৃথিবী ঘোরে তখন তার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দটি করে নি। কিন্তু পরবর্তীতে তার মত প্রতিষ্ঠিত হতে হাজার বৎসরেরও বেশি সময় লেগে গেছে।

পৃথিবী বা অন্যান্য গ্রহগুলি কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে সে সম্পর্কে বেশ কয়েকটি মত লেখক আলোচনা করেছেন। ফলাসী জ্যোতির্বিজ্ঞানী লা প্লাস ১৭৯৬ সালে প্রকাশ করেন তার ‘নেবুলার হাইপোথিসিস’। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত তার এই মত নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নানা আলোচনা সমালোচনা চললেও নতুন কথা কেউ বলেন নি। এর পরে চেম্বারলেন ও মউলটন নামে দুজন আমেরিকান বিজ্ঞানী প্রকাশ করলেন তাদের নতুন ধারণা। তিনি একটি নক্ষত্রের সূর্যের গা ঘেঁষে ছুটে চলে যাওয়ার কথা বললেন। জানালেন যে আগন্তুক নক্ষত্রের টানে সূর্যের শরীর থেকে ছিটকে ওঠা গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জ ঠান্ডা হয়ে সৌরজগত সৃষ্টি হয়েছে। এই তত্ত্বের ত্রুটি সংশোধন করেন স্যার জেমস জিনস। তার মতকে আরেকটু পাল্টে দেন স্যার হ্যারল্ড জেফরি। তিনি বলেন আগন্তুক নক্ষত্র সূর্যের পাশ দিয়ে চলে যায় নি। বরং সূর্যের গায়ে সজোরে আছড়ে পরেছিল। আর তার ফলে ছিটকে ওঠা টুকরো টুকরো গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জগুলো ঠান্ডা হয়ে সৃষ্টি হয় গ্রহমণ্ডলীর।

কিন্তু কবে ঘটে সে ভয়ানক ঘটনা! সে সম্পর্কে বিভিন্নজনের রয়েছে বিভিন্নরকমের মত। যে মতগুলি কোনরকম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে প্রদান করা হয় না, সেগুলি সম্পর্কে কিছু বলাই বাহুল্য।
 তবে বিজ্ঞানীদের মতগুলো অধিকতর প্রামাণ্য। কারণ তাদের মতামতগুলো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কার্যকারণ বিচার করে দাঁড় করানো হয়। কোন ভুলত্রুটি থাকলে সংশোধন করা যায়; সন্দেহ হলে প্রশ্নও তোলা যায়। বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা বিচার করে বলে থাকেন যে, প্রায় ১০০ থেকে ৩০০ কোটি বৎসর আগে পৃথিবী ঠান্ডা হওয়া শুরু করে। তার পূর্বে পৃথিবী গ্যাসীয় অবস্থায় কতদিন ছিল সে সম্পর্কে গবেষণা এখনও শেষ হয় নি।

“মাটির পৃথিবী” অধ্যায়ে লেখক পৃথিবীর শরীরের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেছেন। জানিয়েছেন পৃথিবীর আকার কেমন; কী দিয়ে তৈরি? ভূপৃষ্ঠের নীচে প্রত্যেক ৫০ ফুট পরপর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট করে বাড়তে থাকে। এই হিসেবে বলা যায় পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা অনেক বেশি। আর সেই তাপমাত্রায় কোন বস্তু তার কাঠিন্য ধরে রাখতে পারে না, তরলে পরিণত হয়। প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের কম্পন আমাদেরকে ভূপৃষ্ঠের তলদেশ সম্পর্কে অনেক খবর দেয়। কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি ভূকম্পন থেকেও ভূপৃষ্ঠের তলদেশের নানা গোপন বিষয় অনুধাবন করা যায়।

“মাধ্যাকর্ষণ” নামের আলোচনায় লেখক পৃথিবীর এই অমোঘ শক্তির নানা দিক উন্মোচন করেছেন। এই শক্তির উৎস কোথায় তা এখনও বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন নি। কিন্তু জানা গেছে কোন বস্তুর ওজন বলতে আমরা যা বুঝি তা আসলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে টানের রকমফের। আর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে কর্মক্ষম নয়।

আলোচ্য বইয়ের চতুর্থ নিবন্ধ “ভূচৌম্বক শক্তি”। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ সালে চীনারা প্রাকৃতিক চুম্বক ব্যবহার করে কম্পাস বানাতে পারত। এটা তারা কী কাজে ব্যবহার করত তা জানা যায় নি। তবে জাহাজ চলাচলের কাজে প্রথম কম্পাস ব্যবহার করে ভাইকিংরা অষ্টম- দশম শতকে। পৃথিবীর নানা স্থানে প্রাকৃতিক চৌম্বক পাওয়া যায়। সেরকম কিছু চুম্বক দিয়ে পরীক্ষা করে ১৬০০ সালে উইলিয়াম গিলবার্ট নামক একজন বিজ্ঞানী ধারণা করেছিলেন যে পৃথিবী নিজেই একটি চৌম্বকশক্তিসম্পন্ন গোলক। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন পরীক্ষার ফলে জানা যায় পৃথিবী নিজে চৌম্বকীয় গোলক না হলেও চুম্বকদণ্ডের মত একটি চৌম্বকক্ষেত্র তাকে ঘিরে রয়েছে। কিন্তু এই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে কীভাবে সে প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীদের অনেক ভাবিয়েছে। পরে অবশ্য একটি সমাধান পাওয়া গেছে, কিন্তু এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকী আছে। মেরুজ্যোতি, পৃথিবী গা বেয়ে চলা বিদ্যুৎ তরঙ্গ ইত্যাদির সাথে চৌম্বকীয় বলয়ের কী সম্পর্কে সে প্রসঙ্গেও আলোচনা রয়েছে এই নিবন্ধটিতে।

“সমুদ্র” নামক অধ্যায়ে লেখক সমুদ্রের নানা দিক আলোচনা করেছেন। নানারকম ঢেউ সমুদ্রের বুকে মাতামাতি করে। বাতাসের ধাক্কায় সৃষ্ট ঢেউ এর পাশাপাশি ভূকম্পন, ভূবিচ্যুতির ফলে সৃষ্ট ঢেউ অনেক সময় ভয়ানক রূপ ধারন করতে পারে। সুনামী নামের এই ঢেউ জলোচ্ছাসের মাধ্যমে উপকূলবর্তী জনপদের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে জানমালের প্রভূত ক্ষতি করতে পারে।

সমুদ্রের অগাধ জলরাশির মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্তর। এক এক স্তরের বৈশিষ্ট্য এক এক রকম। এই স্তরগুলোতে রয়েছে বিভিন্নমুখী স্রোত। সমুদ্রের জলরাশির উপরভাগের স্রোত যে দিকে যায়, গভীরের স্রোত যেতে পারে একেবারে ভিন্ন দিকে। একইসময়ে বিপরীতমুখী স্রোতের ধারা মানুষকে অবাক করে দেয়। সমুদ্রের এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণের কারণ সূর্যের তাপ। এই তাপের কারণে সমুদ্রের জলের ঘনত্ব ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্নরকম হতে পারে। ফলে পরিবর্তন হয় লবনাক্ততার। প্রসঙ্গক্রমে লেখক ‘সোফার প্রণালী’, ‘গালফ স্ট্রিম’ জোয়ার ভাটার মজার ঘটনা ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

আলোচ্য বইয়ের অন্যান্য প্রবন্ধগুলো পৃথিবী গঠনের অন্যান্য উপাদান নিয়ে লেখা। পৃৃথিবী বলতে আমরা শুধু ভূপৃষ্ঠকে বুঝি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা ভিন্নরকম। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ টান যতদূর ততদূর পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর সীমানা ততদূর পর্যন্ত। বিশেষ করে বায়ুমণ্ডল তো পৃথিবীরই অংশ। পৃথিবী গঠনে, প্রাণীজগতকে বাঁচিয়ে রাখতে সূর্যের ভূমিকাই প্রধান। পৃথিবীর সমস্ত শক্তির উৎস সূর্য। আমাদের জানা ইতিহাসেরও অনেক আগে সমস্ত ভূপ্রকৃতি বরফের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল। সেই কনকনে হিমযুগের শেষ এখনও হয় নি। বেতার মাধ্যমে যোগাযোগ সম্ভব হত না যদি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরে আয়নমণ্ডলের চাদর না থাকত। পৃথিবী সম্পর্কে এরকম নানা উপাদান নিয়ে লেখকের অদম্য কৌতুহল লিখিত রূপ পেয়েছে “আমাদের এই পৃথিবী” বইয়ের পাতায় পাতায়।

বইটির প্রথম প্রকাশ ৭০ বৎসরেরও আগে। এর মধ্যে কতগুলো সংস্করণ বা মূদ্রণ হয়েছে সে বিষয়ক কোন তথ্য দ্যু প্রকাশন সংস্করণের কোথাও লেখা নেই। যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ক বই, সেহেতু আধুনিক তথ্যের সংযোজন কতটুকু হয়েছে ও পুরাতন তথ্যের কতটুকু পরিত্যক্ত হয়েছে সে বিষয়ক কিছু একটা বিবরণী থাকা দরকার। না থাকলে একজন অনভিজ্ঞ পাঠক যেমন বিভ্রান্ত হতে পারে, তেমনি সতর্ক পাঠক বইটিকে গ্রহণ নাও করতে পারে। তবে আমি সম্পূর্ণ বই পাঠ করে দেখেছি,  অনাধুনিক কিছু চোখে পরে নি।

বইয়ের ভাষাভঙ্গি খুবই সহজ সরল। পড়তে গিয়ে বিজ্ঞানের বই বলে মনেই হয় না। কৌতুহলী নবীন পাঠক আগ্রহভরে এই বই পড়া শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারবে না। নতুন নতুন ঘটনা ও তথ্য তাকে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। সত্যেন সেনের রচনাশক্তির এমনই গুণ যে তিনি নিজের কৌতুহলকে পাঠকের হৃদয়েও সঞ্চার করতে পারেন। তার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে “আমাদের এই পৃথিবী” বইটিতে। অর্ধশতাব্দী পার করে এখনও বইয়ের প্রকাশ হওয়া সেই গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ। সত্যেন সেনের বই শতায়ু হোক। আগামী দিনের তরুণ কৌতুহলী পাঠকের পৃথিবী সম্পর্কে জানার ইচ্ছাকে তৃপ্ত করুক- সেই প্রত্যাশা করি।

1 টি মন্তব্য:

  1. এই বইয়ের কথা জানা ছিল না। সত্যেন সেন যে এরকম বই লিখেছেন, তাই জানতাম না। ধন্যবাদ বইটির খবর দেবার জন্য।

    উত্তরমুছুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।