পাখিদের প্রতি আগ্রহ জাগাবে ‘বিপ্রদাশ বড়ুয়া’র বই “পাখির ভূবন”

পাখির ভূবন - বিপ্রদাশ বড়ুয়া বইয়ের প্রচ্ছদ

প্রাণীজগতের সবচেয়ে কলরবমুখর সদস্য হল পাখি। সারা পৃথিবীতেই এদের দেখা পাওয়া যায়। কোথাও কম, কোথাও বা বেশি। বরফে ঢাকা অঞ্চল কিংবা উষর মরুভূমি এলাকায় পাখির বাস কম। বিপরীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রকৃতি যেখানে গাছ-গাছালি, ঝোপঝাড় প্রচুর সেখানে পাখিরা মহানন্দে বাসা বানায়, বংশ বিস্তার করে। তাপানুকুল পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাবারের কারণে পৃৃথিবীর এইসব অঞ্চলে নানা বৈচিত্র্যের পাখি দেখতে পাওয়া যায়। রঙে, আচরণে, কণ্ঠে, অভ্যাসে পাখির প্রকারভেদ অনেক রকমের হয়ে থাকে। সারা পৃথিবীতে পাখির দশ হাজারেরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে ছয়শতটিরও বেশি প্রজাতি।

বাংলাদেশ পাখিদের জন্য আদর্শ স্থান। এখানে আছে সবুজ তৃণভূমি, গুল্মলতার ঝোপঝাড়, সুউচ্চ বৃক্ষ, জলাভূমি, খাল-বিল, নদী-নালা এমনকি বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। ভূপ্রকৃতির এত রকমের বৈচিত্র্য ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির পাখিকে খাদ্য ও বাসস্থানের নিরাপত্তা দিয়েছে। আর তাই কোটি কোটি বৎসর ধরে বাংলাদেশে কয়েকশত প্রজাতির পাখি নির্ভাবনায় বাস করে আসছে।

ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে খাবারের অফুরান সরবরাহ নিয়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিদেশী পাখিদেরকেও স্বাগত জানায়। আর তাই দেশজুড়ে দেশি পাখিদের পাশাপাশি বিদেশী অতিথি পাখিদের আনাগোনা সারাবছরই লেগে থাকে। শীতকালে অবশ্য অতিথি পাখিদের ভীড় একটু বেশিই থাকে। পরিপার্শ্বের এই আনন্দমুখর বর্ণবৈচিত্র্যে ভরা প্রাণিটিকে নিয়ে বাংলা ভাষায় বইয়ের সংখ্যা কম করে হলেও কয়েকটি রয়েছে। আজ আমরা পরিচিত হব এরকমই একটি বইয়ের সাথে। নাম “পাখির ভূবন”, লেখক ‘বিপ্রদাশ বড়ুয়া’ পাখিদের প্রতি প্রবল ভালবাসা নিয়ে বইটি রচনা করেছেন। বয়স নির্বিশেষে নবীন প্রবীণ সবাই এই বইয়ের বিবরণ থেকে পাখিদেরকে সহজে চিনে নিতে পারবে।

লেখকের উদ্দেশ্য নবীনদেরকে পাখি চেনানো। তাই বইটি রচনা করতে গিয়ে তিনি কিছুটা ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য এরকম -
কোথায় কী পরিবেশে কোন পাখিটি দেখেছি এবং সেই সঙ্গে আমার অনুভূতিও জানাতে চেষ্টা করেছি। আবার যে সব পাখি প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখি নি তার বর্ণনা হয়েছে ভিন্ন রকম। বর্ণনা সংক্ষিপ্ত করে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্যগুলো সন্নিবেশিত করেছি পাখিটিকে চিনতে সুবিধার জন্য। একজন নবীন পাঠকের জন্য বা যারা প্রথম পাখি চিনতে চেষ্টা করছেন তাঁদের দিকে দৃষ্টি সজাগ রেখেছি। দীর্ঘ বর্ণনা সর্বতোভাবে পরিহার করেছি। রচনাকে রসগ্রাহী করার জন্য ভিন্নমাত্রা যোগ করার চেষ্টা করেছি, একই কৌশল সব লেখায় না রেখে মাঝে মাঝে ব্যত্যয় ঘটানোর প্রয়াস নিয়েছি।
লেখকের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। যারা পাখি চিনতে চায়, যারা প্রশ্ন করে কীভাবে পাখি চিনতে হবে, বা কিভাবে পাখি দেখতে হবে তারাই লেখকের উদ্দিষ্ট পাঠক। আমিও মনে করি পাখি চিনতে হলে এই বই প্রাথমিক পাঠ হিসেবে যথেষ্ট। আমাদের পরিপার্শ্বের পরিবেশ যে প্রাণীটি সারাক্ষণ কলকাকলীতে ভরিয়ে রাখে, তাকে চেনার আগ্রহ আমাদের থাকা উচিত বৈকি। লেখক পাখি দেখার জন্য কী কী উপকরণ লাগবে, তারও একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান -
পাখি চিনতে হলে প্রথমে দরকার একটি ছোট নোট খাতা ও পেন্সিল। আর ছোট একটি বাইনোকুলার হলে আরো ভালো হয়।… কোনো পাখি দেখার সঙ্গে সঙ্গে নোট খাতায় তার বৈশিষ্ট্য, রঙ, ডাক নোট করে রাখতে হবে; আর যেমনই হোক আনাড়ি হাতে হলেও স্কেচ করে রাখবেন পাখিটিকে। তারপর ঘরে এসে বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে পাখিটির পরিচয় বেরিয়ে আসবে।
ভূমিকায় লেখক বিভিন্ন পাখির আচরণগত কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। যেমন কিছু পাখি জলাশয়ের আশেপাশে দেখা যায়। কিছু পাখি ইলেকট্রিক খুঁটি ও তারে বসে থাকে। কোন কোন পাখি আবার মাটিতে চড়ে বেড়ায়। কেউ কেউ গাছের ডাল ছাড়া কোথাও বসে না। কোনো পাখি আবার আকাশের অনেক উঁচুতে সবসময় উড়ে বেড়ায়। কোনো পাখির ঠোঁট সুন্দর, কোন পাখির লেজ আকর্ষণীয়, কারও পা লম্বা, কারও গ্রীবা দীর্ঘ, কারও বা ঝুঁটি ঝলমলে। ঋতুভেদে কিছু কিছু পাখির রঙ ও ডাক পাল্টে যায়। কোনো পাখি লোকালয়ের কাছে থাকতে ভালবাসে, কোনো কোনো পাখি আবার অরণ্যচারী। কোনো পাখি দলবদ্ধ হয়ে থাকে, আবার কোনো পাখি থাকে জোড়ায় জোড়ায়। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় পাখিদের উল্লেখ আছে। কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে বাঙালি লেখকেরা পাখিদের নানা কাহিনী তুলে এনেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সূধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমীয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী প্রমুখের লেখাতে পাখিদেরকে বিভিন্ন প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তবে পাখিদের কথা সবচেয়ে বেশি আছে জীবনানন্দ দাশের কবিতায়। তিনি পাখিদের প্রসঙ্গ তাঁর কবিতায় এত বেশি এনেছেন যে অবাক হয়ে যেতে হয়।

বিপ্রদাশ বড়ুয়া সহজ বাক্যে, সরল ভাষায় পাখিদের বর্ণনা করেছেন। ফলে পাঠ করতে করতে খুব সহজে পাখিটির একটি অবয়ব কল্পনায় ফুটে ওঠে। বইয়ের শুরুতে রয়েছে চারটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ। প্রবন্ধগুলি হলঃ
  • পৃথিবীর আদি পাখি
  • যাযাবর বা ভ্রমণবিলাসী পাখি
  • বনের পাখি গানের পাখি
  • তিন সহস্রাব্দের বিখ্যাত পাখিগণ
ভূমিকাসহ ছাব্বিশ পৃষ্ঠায় ছাপানো প্রবন্ধ চারটির পরেই শুরু হয়েছে পাখিদের বর্ণনাত্মক বিবরণী। মোট একশতটি পাখির পরিচয় রয়েছে এই বইয়ে। কোনরকম শ্রেণীবিন্যাস না করে পরপর পাখিদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে গেছেন। পাখিদের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি একটি সাধারণ নীতি গ্রহণ করেছেন। প্রথমে পাখিটির একটু সাধারণ বর্ণনা। এই অংশে পাখির আকার, ঠোটের মাথার গলার পালকের বুকের ডানার তলদেশের লেজের রঙ। পুরুষ পাখি ও স্ত্রী পাখির আলাদা আকার ও রঙের বিবরণ। এরপর রয়েছে সেই পাখির খাদ্যরুচি কিরকম তার কথা। মাটিতে হাটতে হাটতে, নাকি উড়তে উড়তে খায় সে কথাও রয়েছে। রয়েছে তার বাসস্থান ও বাসার বর্ণনা। বিদেশী পাখি হলে এরপর দিয়েছেন বৎসরের কোন সময় এদের দেখা যায় তার বিবরণ। এরপর রয়েছে প্রজনন ঋতুর কথা। এই অংশে রয়েছে কতটি ডিম হয়, বাচ্চাদের সাথে মা পাখি ও পুরুষ পাখির আচরণ কীরকম তার কথা। প্রজনন কালে পুরুষ পাখি ও স্ত্রী পাখির রঙ ও আচরণ কীরূপ হয় সেকথাও জানাতে ভোলেন নি। পাখিটির ডাক কিরকম, তার কণ্ঠ  সুরেলা নাকি কর্কশ; থেমে থেমে ডাকে নাকি একটানা ডেকে চলে। আর সবশেষে কোন বই বা কবিতায় পাখিটির কোন বর্ণনা যদি থাকে সেকথাও যোগ করেছেন। প্রত্যেকটি পাখির বর্ণনার প্রথমে বাংলা তারপর ইংরেজি ও সবশেষে বৈজ্ঞানিক নামটিও তিনি উল্লেখ করে দিয়েছেন। তবে পাখি সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত রচনার কোথাও কোন ছবি ব্যবহার করা হয় নি; বরং বইয়ের একেবারে শেষে ষোলটি পৃষ্ঠায় ক্রমানুসারে মোট ছিয়ানব্বইটি পাখির রঙিন ছবি রয়েছে। বইয়ের দাম কমানোর জন্য যে এই কাজ করা হয়েছে তা বোঝা যায়।

বইয়ের শক্ত মলাটটি রঙিন ছবিযুক্ত গ্লোসি কাগজে মোড়ানো। সাধারণ সাদা কাগজে বর্ণগুলো গাঢ় কালো কালিতে ছাপানো। কিন্তু ফন্টের আকার বেশ ছোট হয়ে গেছে। এক একটি পৃষ্ঠাতে রয়েছে প্রায় ছত্রিশটি লাইন। এর ফলে অবশ্য অল্প কাগজে বেশি তথ্য যোগ করা গেছে। তবে পড়তে গিয়ে বয়স্ক পাঠকের চোখের উপর কিছুটা চাপ পড়তেই পারে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, পাখিদের চিনতে, পাখিদের প্রতি ভালবাসা জাগাতে, পাখিদের জীবনযাত্রার প্রতি উৎসাহিত করতে এই বই সক্ষম। নতুন প্রজন্ম পাখির প্রতি যত আগ্রহী হবে, নিজের পরিবেশকে যত বেশি চিনতে চাইবে, প্রকৃতির প্রাণপ্রবাহকে তত বেশি ভালবাসবে।

=================

পাখির ভূবন
বিপ্রদাশ বড়ুয়া

প্রচ্ছদঃ ধ্রুব এষ
সময় প্রকাশন, ঢাকা
প্রথম প্রকাশঃ ২০০২
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১২৮+১৬
মূল্যঃ ১২৫.০০ টাকা
ISBN: 984-958-346-2

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।