বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে ‘মুহম্মদ জাফর ইকবাল’ এর “ক্যাম্প” উপন্যাসটি বারবার পড়তে হবে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে ‘মুহম্মদ জাফর ইকবাল’ এর “ক্যাম্প” উপন্যাসটি বারবার পড়তে হবে

মোছা. মোনালিসা আক্তার মীম

ক্যাম্প একটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস। উপন্যাসটি রচনা করেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ক্যাম্প গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। বইটি প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশনী, তাদের ঠিকানা ৩৮/২ বাংলাবাজার ঢাকা। বইটির প্রচ্ছদ একেছেন মাসুক বেলাল। বইটি মোট ৭২ টি পৃষ্টা সংখ্যায় একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক বই । বইটি উৎসর্গ করেছেন লেখক তাঁর প্রিয় মানুষ জুয়েল আইচকে।

বাংলা সায়েন্স ফিকসনের একচ্ছত্র সম্রাট মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫২ সালে সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ ও মাতার নাম আয়েশা আখতার খাতুন। তিনি তাঁর শিক্ষাজীবন বাংলাদেশে শেষ করার পর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে ১৯৮২ সালে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনে পাড়ি দেন। কর্মজীবনে তিনি রির্সাচ অ্যাসিটেন্ট এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র এর অধ্যাপক ছিলেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। “কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ” বইয়ের মাধ্যমে জাফর ইকবালের সাহিত্যে আগমন ঘটে। কিশোর উপন্যাস “দীপু নাম্বার টু”, “আমার বন্ধু রাশেদ” এবং “আমি তপু” তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ট রচনা। ২০০৪ বিজ্ঞান লেখক হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল সর্বদা বিজ্ঞানকে নিয়ে নিত্য নতুন আবিস্কার করে গেছেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। দীপু নাম্বার টু তে দীপু ছিল এক সাহসী কিশোর। সে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে একটি পাহাড় আবিস্কার করে। টুনটুনি ও ছোটচাচ্চুতে টুনটুনি ছোট বালিকা হলেও বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করেছে।

কিন্তু “ক্যাম্প” একটু ভিন্নধর্মী রচনা লেখকের। ক্যাম্প এর মাধ্যমে পুরো মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ফুটে তুলেছেন তিনি। যা পড়ে মনে হয় যেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চিত্র / দৃশ্য দেখছি। কেমন ছিল রাজাকার বাহিনী আর কেমনি বা ছিল মুক্তিসেনারা এদেশের সাধারন জনগণ তা যেন সরাসরি উপলদ্ধি করতে পারবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙ্গালি জাতির কাছে চির স্মরনীয় হয়ে থাকবে। যুদ্ধে বাংলা মায়ের কিশোর সন্তানদের মাতৃভাষা ও মাতৃদেশ সম্পর্কে যে গভীর ভালবাসা তা যেন ফুটে উঠেছে ক্যাম্পে। ক্যাম্প উপন্যাসে ফজল নামে এক কিশোর ছিল মুক্তিবাহিনীর সদস্য। সে সদ্য মুক্তিবাহিনীতে নাম দিয়েছিল। সে প্রথম বাসায় আসার পর খবর পেয়ে গ্রামের রাজাকাররা তাকে নিয়ে যায় হাত পা বেঁধে। হাইস্কুলে তাদের ক্যাম্প ছিল। ফজল যখন রাজাকারদের কাছে ধরা পড়ে তখন জালু পাগলা নামে এক লোক তার জন্য সুপারিশ করে। তার বক্তব্য ছিল ফজল ভাল মানুষ ও মেট্রিক পাস করেছে। ফজলকে নিয়ে যাওয়া হল মেজর সাহেবের কাছে। গ্রামের রাজাকার মতিউর তার সম্পর্কে বললেন। মেজর সাহেব ফজল এর সাথে একা কথা বলতে চাইলেন। সে যাত্রায় ফজল পালিয়ে যেতে পারে। ফজল এর মত একটি কম বয়সী ছেলেকে আনা হয়। মেজর ছেলেটি কে দেখে তার নিজের ছেলের কথা মনে পড়ে। ছেলেটিকে মারবেনা বলে মেজর, কিন্তু শর্ত হচ্ছে তাকে রাজাকার হতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা ও ইন্ডিয়ার দালালদের ধরে আনতে হবে। মেজর সাহেব জানতেন যে সে কখনই এই শর্ত মেনে নেবে না। কারন সে দেশকে স্বাধীন করতে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধে নেমেছে, রাজাকার হতে নয়। এভাবে ফজল আবার ধরা পড়ে। তাকেও উক্ত কথাগুলো বলা হয়। তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়। তাকে কিভাবে মারা হবেবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়। সর্বশেষে ফজলকেও মেরে ফেলা হয়।

অন্যদিকে ভিন্ন চরিত্র মতিউরের। সে গ্রামের রাজাকারের সাথে হাত মিলিয়ে রাজাকার হয়েছে। মুক্তিবাহিনীদের ধরে এনে হত্যা করে । যুদ্ধে হিন্দু জাতিদের উপর যে অত্যাচার ও নির্যাতন করা হয়েছে তারও চিত্র ফুটে ওঠে। যুদ্ধ যে হচ্ছিল ধর্মের নামে। মতিউরের ধারণা ছিল দেশ স্বাধীন হবে না, সে ভেবেছিল শেখ মুজিবুর রহমান এখন জেলে, ইয়াহিয়া একদিন ফাঁসিতে লটকে দেবে। তার মতে, মুসলীম লীগ রাজনীতি বোঝেনা। রাজনীতি করবে শুধু জামাতে ইসলামী। 'শাপে বর' কথাটিতে হিন্দু হিন্দু গন্ধ আছে বলে নাম পরিবর্তন করে 'গজবে মেহেরবানি' রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। 'কালীনগর' রেলষ্টেশনের নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হলো 'ফাতেমা নগর'। 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া'র পরির্বতে 'মৌলভীবাজার', যাতে ব্রাহ্মণ শব্দটি উচ্চারন করতে না হয়। 'নারায়ণগঞ্জ'কে 'ইউসুফ নগর'। কেন করা হল কারণ নামগুলো হিন্দুজাতির।

উপন্যাসটির শেষ পর্যায়ে একটি তের চৌদ্দ বয়সী বালিকার কথা আসে। ফজল শেষ বারের মত ধরা পড়ে যাবার পর মেয়েটির সাথে তার জানালার পাশে দেখা হয়। ফজল দেখে মেয়েটি কাঁদতেছিল। মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছিল ফজল। সে বুঝতে পেরেছিল চোখের জল ছিল তার বেদনার জন্য। ফজল ভেবেছিল মেজর সাহেব তাকে ছেড়ে দিবে সে ছুটে যাবে তার মায়ের কাছে, মীর্জাবাড়ির পাশের বাসায় মেয়েটিকে ডাকবে, সে ফিরে এসেছে বলবে। কিন্তু বলতে পারিনি। শেষ পর্যায়ে দেশ স্বাধীন হয়। সেই মীর্জাবাড়ির মেয়েটি ড. সুরাইয়া হয়ে ওঠে। একদিন সে তার মেয়ে শারমিনকে উক্ত ঘটনা বলে। সে এখনো ফজলের চাহনিটা ভুলতে পারে নি। এভাবে উপন্যাসটির সমাপ্তি ঘটে।

বইটি বেশ ভাল। বইটি পরে আমার বেশ ভাল লেগেছে। বইটি তরুণ প্রজন্মকে বারবার পড়তে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে।

====================
ক্যাম্প
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
প্রচ্ছদঃ মাসুক হেলাল
প্রথম প্রকাশঃ ২০০৪
প্রকাশনীঃ অনন্যা, ঢাকা।
পৃষ্ঠাঃ ৭২
মূল্য ৬০/= টাকা
ISBN: 9844123747


কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।