'পবন চন্দ্র বর্মন' এর ভাষ্যে 'বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়' রচিত "আদর্শ হিন্দু হোটেল"

'পবন চন্দ্র বর্মন' এর ভাষ্যে 'বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়' রচিত "আদর্শ হিন্দু হোটেল"

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা পড়ব পড়ব করে আর পড়া হয় না। ছুটির দিনে শুরু করলাম তার অনবদ্য সৃষ্টি-- "আদর্শ হিন্দু হোটেল"।

এঁড়োশোলা গ্রামের একজন সাধারণ হিন্দু ব্রাহ্মণ হাজারী দেবশর্মা চক্রবর্তী নামক একজন রাধুনীর জীবনে একটা হোটেল প্রতিষ্ঠার শখ, স্বপ্ন এবং তার বাস্তবায়নই এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু।  মাসিক ০৭ টাকা মাইনে ও খাওয়ার চুক্তিতে রাণাঘাট রেলবাজারে হাজারী চক্রবর্তী মনিব বেচু চক্কত্তির হোটেলে রাধুনীর কাজ করতো। গ্রামে তার পরিবারের তিনবেলা খাবারও জুটতো না সবসময়। মনিবের হোটেলের রাধুনীর চাকরির সময় সকল অনিয়ম, অসততা এবং খদ্দেরদের সাথে প্রতারণা তাকে খুব পীড়া দিতো। রাধুনীর কাজ করলেও শয়নে, স্বপ্নে সবসময় ভাবতো নিজেই একদিন একটা হোটেল চালাবে, যেই হোটেলে কোন বাসী-পচা খাবার চলবে না, কোন অনিয়ম চলবে না, গরীবদের বিনামূল্যেও খাওয়াবে, খদ্দেরদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে, নিজে মালিক হলেও স্বয়ং মন-প্রাণ দিয়ে রান্না, বাজার করবে, হোটেলের সার্বিক তত্ত্বাবধান করবে। খদ্দেরদের খাবার পর বিশ্রামের জায়গা থাকবে, পান-বিড়ি ফ্রীতে খাওয়াবে, একটু আরাম আয়েশ করবে।
সবসময় সে  ঠাকুরের নিকট প্রার্থনা করতো মারা যাবার আগে একটা হোটেলের মালিক হয়ে যেন শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারে।
এই হাজারী চক্রবর্তীর  জীবনের সকল চাওয়া পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতেও এই একটি আশা এবং সময়ে অসময়ে সবসময় তার প্রার্থনার অন্যতম বিষয়বস্তু এবং লোকজনের নিকটে তার গল্পের বিষয়বস্তুই হলো একটি হোটেল চালু করা। মনিবের হোটেলে রাধুনীর চাকুরী করাকালীন তাকে অনেক তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য, অপবাদ, অপমান সইতে হয়, এমনকি মিথ্যা চুরির অপবাদে জেলও খাটতে হয় এবং ০২ মাসের মাইনে বাকী রেখে চাকরিচ্যুতও করা হয়। ঘটনার কালক্রমে হাজারী একপর্যায়ে মেলায়, মানুষের বাসা-বাড়ীতে রাধুনীর কাজ করে, কিন্তু তার স্বপ্ন দেখা কখনো থমকে যায় নাই। সবসময় সে  ঠাকুরের নিকট প্রার্থনা করতো মারা যাবার আগে একটা হোটেলের মালিক হয়ে যেন শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারে।

তারপর অনেক কষ্টের সাগর পেরিয়ে, অনেক অপমান সহ্য করে, চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে স্বপ্ন পূরণের জন্য যখন দিন-রাত হাতরাচ্ছিল, ০৩ টা মেয়ে তখন তার জীবনের লালায়িত স্বপ্ন পূরনের জন্য ভাগ্যলক্ষী  হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং সে সত্যি সত্যি একদিন হোটেলের মালিক হয় এবং সেই হোটেলটির নাম দেয়- "আদর্শ হিন্দু হোটেল" এবং রাণারঘাট রেল বাজারেই তা চালু করে। শুরু হয় তার জীবনের নতুন ছন্দ, তড়তড়িয়ে এগিয়ে চলে তার হেটেল ব্যাবসা, একটা থেকে দুটো, কালক্রমে সদূর বোম্বে থেকে তাকে শুধু রাধুনী হিসেবেই মাসিক-১৫০/- টাকা মাইনেই নিয়োগ করে। লেখক এখানে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে হাজারীর সাহায্যদাতাদের তুলে ধরেছেন এবং হাজারীর সাহায্যদাতাদের হাজারী তার হোটেলের অংশীদার করে নিজেকে ও তাদেরকেও প্রাপ্য সম্মান দিয়েছেন। হাজারীর হোটেল ব্যবসার যখন সুসময় চলমান অনেক সুযোগ আসে তার বিগত জীবনের সকল অপমানের, লজ্জার, লাঞ্চনার শোধ নেওয়ার কিন্ত হাজারী তাদের  শুধু সবাইকে ক্ষমা করেই দেয়নি, যারা একদিন তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিল, মিথ্যা চোরের অপবাদ দিয়ে চাকরীচ্যুত করেছিল, এমনকি তাকে একজন মানুষ হিসেবেও গণ্য করেনি, তাদের বিপদ ও দুর্দিনে তারই হোটেলে তাদের চাকরি দিয়েও করুণা করেছে এবং সম্মানিতও করেছে। পদ্ম, রাজবংশী, মতি, অসতী, কুসুম, নরেন, আশালতা, হরিচরণ, যতিন এই উপন্যাসের  উল্লেখযোগ্য চরিত্র।

সর্বোপরি একটা মানুষের স্বপ্ন কিভাবে পূরণ করা সম্ভব হয়, তার  উজ্জ্বল স্বাক্ষর লেখক হাজারী চক্রবর্তী চরিত্রের মাধ্যমে চিত্রায়ন করে বাংলা সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন।

-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-:-
আদর্শ হিন্দু হোটেল
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

মোট পৃষ্ঠাঃ ১৪৮

আলোচকঃ পবন চন্দ্র বর্মন, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, কুড়িগ্রাম।

২টি মন্তব্য:

  1. রিভিউ তেই যেন সমস্ত বইটা পড়লাম। বেশ ভালোই লাগলো। ধন্যবাদ এমন সুন্দর ওয়েব সাইটের জন্য।

    উত্তরমুছুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।