'পলাশ দেব' এর গোয়েন্দা উপন্যাস "টেমস হতে টাইবারের পথে" আলোচনা করলেন 'শামিমা সীমা'

'পলাশ দেব' এর গোয়েন্দা উপন্যাস "টেমস হতে টাইবারের পথে" আলোচনা করলেন 'শামিমা সীমা'

শামিমা সীমা

বইটা শুরু হয় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদযাপনের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড ভ্রমণ দিয়ে আর শেষ হয় শ্বাসরুদ্ধকর এক গোয়েন্দা অপারেশনের পরিসমাপ্তির মধ্য দিয়ে। অনেক বাঁক ও রহস্যের ঘেরাটোপে ভরা এই উপন্যাসটি। বইয়ের প্রতিটি পাতা পড়ার সময় নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছি, 'এটা পলাশ দেব'এর লেখা তো?' লেখক পলাশ দেবকে দেখি একেবারে জীবনঘনিষ্ঠ সব গল্প কবিতা লিখতে, কথাসাহিত্যে তার দক্ষতা প্রশংসার দাবীদার। সেই সরল প্রাণ পলাশ দেব কী করে এত চমৎকার রহস্যে ঘেরা একটি গোয়েন্দা উপন্যাস লিখে আমাকে একেবারে তাজ্জব করে দিলেন, সেটাই মিলাতে পারি না। যাইহোক, গল্পের প্রথমাংশ শুরু হয় অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের একটি এওয়ার্ড বিতরণ অনুষ্ঠান উদযাপন উদ্দেশে লন্ডনের পথে যাত্রার মধ্য দিয়ে। গল্পের প্রথমার্ধের নায়ক কামরুল হাসান পার্থ একজন সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব, বড় মাপের অভিনেতা, তার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অভিনেত্রী মিস আরোহীর। অভিনেতা পার্থ একটা আন্তর্জাতিক স্মাগলিং দলের সাথে সম্পৃক্ত যেটা আরোহী জানেনা। যদিও পার্থের কিছু কিছু আচরণে আরোহীর মনে খটকা লাগে তবু তেমনভাবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না।

অনেক বাঁক ও রহস্যের ঘেরাটোপে ভরা এই উপন্যাসটি।

পার্থ ইংল্যান্ড যাবার পথে আরোহীকে দিয়ে একটা প্যাকেট ক্যারি করায়, আরোহী নিজেও জানেনা কী আছে সেই প্যাকেটে। ওদিকে ইংল্যান্ড এয়ারপোর্টে আরোহীর সাথে আলাপ হয় আরেক সুদর্শন যুবক শাহরিয়ারের সাথে।আরোহী বুঝতে পারে না এই যুবক তাকে কীভাবে চিনল আর কেনোইবা ফলো করছে।

ইংল্যান্ডে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর নাটকীয় ভাবে খুন হয় অভিনেতা পার্থ। আর আসল ঘটনার শুরু হয় এখান থেকেই। আরোহী জানতে পারে এই শাহরিয়ার ইন্টারপোলের একজন গোয়েন্দা।মূলত আরোহীকে দিয়ে অই প্যাকেটে পার্থ এমন কিছু মূল্যবান ধাতু আনিয়েছে যার রেডিয়েশন ক্ষমতা এ-পর্যন্ত আবিস্কৃত সকল মৌলের চেয়ে অনেকগুন বেশি। যার নেতিবাচক ব্যাবহারে তৈরি করা সম্ভব হাইড্রোজেন বোমার চাইতেও অধিক শক্তিশালী পৃথিবী বিধ্বংসী বোমা। আর এই মৌলের জন্য ব্যাকুল বিশ্বের বড় বড় দেশের আন্ডারগ্রাউন্ডের লোকজন ও গোয়েন্দা সংস্থা পর্যন্ত যার বিন্দুবিসর্গ জানেনা আরোহী।  আর শাহরিয়ার আগেই এই ইনফর্মেশন পেয়েছিল। চলতে থাকে বৃটিশ পুলিশের সহায়তা নিয়ে খুনের তদন্ত। এই তদন্তে প্রথমেই উঠে আসে বাংলাদেশের এক ইউনিভার্সিটির অধ্যক্ষের নাম যে কিনা পার্থের সাথে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাইড ফিজিক্সে পড়ান, সাম্প্রতিক রিচার্সের জন্য অক্সফোর্ডে যান এবং সেখানে যেয়ে পার্থর কাছে জানতে পারেন তার প্যাকেটের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতিতে পাওয়া এক অতি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মৌলিক পদার্থের। ধারনা করা হয় সেই প্যাকেট হাতিয়ে নেবার জন্যই হয়ত তিনি পার্থকে খুন করেছেন।

তৈরি করা সম্ভব হাইড্রোজেন বোমার চাইতেও অধিক শক্তিশালী পৃথিবী বিধ্বংসী বোমা।

দ্বিতীয়ত উঠে আসে রোমের 'লা সাপিয়েনজা' ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মি.জ্যাকব-এর নাম। আরোহীকেও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেন না মি. শাহরিয়ার। ক্রমাগত ঘটনা এগিয়ে যেতে থাকে আরো রহস্যময়তার দিকে। শাহরিয়ার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সব প্রব্লেম সলভ করতে থাকেন। ঘটনার একেবারেই শেষের দিকে সন্দেহের তীর যায় বাংলাদেশ কালচারাল সেক্রেটারি মিস্টার আনোয়ার পারভেজের দিকে এবং ঘটনার সুরাহা হয় তাকে কেন্দ্র করেই। মূল কালপ্রিট আসলে তিনিই। তিনিই বিদেশি আন্ডারগ্রাউন্ডের স্মাগলারদের কাছে চড়া মূল্যে দেশের সম্পদ ও তথ্য পাচার করতেন। শাহরিয়ার উদ্ধার করেন সেই মূল্যবান মৌলের, তুলে দেন বাংলাদেশ সরকার প্রধানের হাতে।

ভেবেছিলাম লেখক বুঝি এমন রোমান্সহীনভাবেই বইটা শেষ করবেন, কিন্তু না, তিনি আমার মত রোমান্স প্রিয় পাঠককেও নিরাশ করেননি। শেষতক আরোহী আর শাহরিয়ারকে বন্দি করেন একই বাঁধনে।

এই বই নিয়ে নেগেটিভ কিছু বলার মত খুঁজে পাইনি। তবে লেখক লন্ডনের পথে ঘুরাঘুরির এত বর্ণনা আর রাস্তাঘাটের এত নাম না লিখলেও পারতেন। এসব তুচ্ছ বিষয়। আমি অভিভূত পলাশ দেবের লেখায়।

================

টেমস হতে টাইবারের পথে
পলাশ দেব

প্রকাশনীঃ মুক্তচিন্তা, ঢাকা।
প্রকাশকালঃ ২০১৯ ফেব্রুয়ারি, বইমেলা।
প্রচ্ছদঃ অপরূপ দে রিপন
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৯৬
গায়ের মূল্যঃ দুইশত টাকা
ISBN: 978-984-8073-16-2

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।