গণিতের রহস্য আবিষ্কার করুন ‘মুহম্মদ জাফর ইকবাল’ এর “গণিতের মজা মজার গণিত” বই থেকে

গণিতের রহস্য আবিষ্কার করুন ‘মুহম্মদ জাফর ইকবাল’ এর “গণিতের মজা মজার গণিত” বই থেকে
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গণিত যেভাবে আছে, তা শিক্ষার্থীদের জন্য সত্যিই ভীতিকর। গণিতকে আনন্দের মজার করেও যে উপস্থাপন করা যায়, তা আমাদের শিক্ষকেরাও হয়তো জানেন না। ফলে গণিতে অনাগ্রহী ও অদক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশী জনশক্তি আধুনিক বিশ্বের মুখোমুখি হচ্ছে। গণিত মানুষের যুক্তিবোধের অনুভূতিকে তীক্ষ্ণ করে, যারা গণিত ভালবাসেনা, গণিত চর্চা করে না, তাদের যুক্তি সম্পর্কিত ধারণাগুলো দুর্বল হবে এটাই স্বাভাবিক। এরকম পশ্চাৎপদ সামাজিক সংস্কৃতিতে যারা আলোর বার্তা নিয়ে এসেছেন, তাদের মধ্যে শিক্ষক ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল অন্যতম।

666, প্রাইম সংখ্যা, পেলিনড্রমিক সংখ্যা, গ্রাহাম সংখ্যা, শূন্য

শিশুকিশোরদের চিন্তাজগত তার প্রিয় জায়গা। কল্পনা দিয়ে গড়া এই জগত তিনি মণিমুক্তার মত ঐশ্বর্য দিয়ে সাজাতে চান। তাদের চিন্তাসান্নিধ্য থাকতে তিনি আনন্দবোধ করেন। শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণীদের বুদ্ধিচর্চায় গণিতকে অবশ্য প্রয়োজনীয় মনে করেন। এই উদ্দেশ্যে রচনা করেছেন গণিত বিষয় বই “গণিতের মজা মজার গণিত”। এই বইটি লেখার কারণ বা উদ্দেশ্য তিনি বইয়ের সূচনাতে ভূমিকা'র ১ম অংশে পরিষ্কার করে জানান। তিনি বলেন -
এই বইটির উদ্দেশ্য গণিত শেখানো নয়, বইটির উদ্দেশ্য গণিতে উৎসাহী করে তোলা। গণিতের যে বিষয়গুলো আমার কাছে চমকপ্রদ, রহস্যময় বা মজার বলে মনে হয়েছে তার কিছু এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
সূচিপত্র দেখলে লেখকের মনোভঙ্গী স্পষ্ট হবে।

প্রথম পর্ব : গণিতের মজা
  1. 1=2
  2. আবার 1=2
  3. আরও একবার 1=2
  4. শেষবার 1=2
  5. গাউস দিয়ে শুরু
  6. ফিবোনাচি ধারা
  7. ফিবোনাচি পদ
  8. মৌমাছির বাচ্চা
  9. সোনালি অনুপাত
  10. টাওয়ার অফ হ্যানয়
  11. মারজেন প্রাইম ও পারফেক্ট সংখ্যা
  12. সসীম ক্ষেত্রের অসীম পরিসীমা
  13. বাইনোমিয়ালের সূত্র এবং প্যাস্কেলের ত্রিভুজ
  14. বর্গমূল কত?
  15. উৎপাদক কত?
দ্বিতীয় পর্ব:
  • একশ মজার গাণিতিক সমস্যা
  • সমাধান
তৃতীয় পর্ব :
  • একশ চমকপ্রদ সংখ্যা
পরিশিষ্ট
  • বই এবং ওয়েবসাইটের তালিকা
প্রথম পর্বে পনেরোটি মজার গাণিতিক প্রসঙ্গ আকর্ষণীয় ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। পনেরটি প্রসঙ্গই বেশ অবাক করা। অভীষ্ট পাঠকশ্রেণী তরুণ বয়সী বলে ভাষাভঙ্গী সরল ও সাবলীল। গণিতের এরকম ঘটনাগুলো সত্যিই বিস্ময়কর। যেমন দেখুন প্রথম পর্বের প্রথম চারটি অধ্যায়ে বারবার ১ (এক) এর সমান ২ (দুই) প্রমাণিত হচ্ছে। কোন কারণে বা কোন শর্তে বারবার এরকম হচ্ছে সেটাই মজার বিষয়।  ফিবোনাচ্চি যিনি বোঝেন, তিনি জানেন যে খরগোশ বা মৌমাছির বংশবিস্তার কেন দ্রুত ঘটে। ‘সোনালী অনুপাত’ অধ্যায়ে প্রকাশ করা হয়েছে সৌন্দর্যের গোপন রহস্য। দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রাকৃতিক বা মানবীয় সৌন্দর্য বিশ্লেষণে সাহিত্য-দর্শন বা নন্দনতত্ত্বের নানাবিধ তত্ত্ব থাকলেও গাণিতিক বাধ্যবাধকতাই যে প্রধান তার প্রমাণ এই সোনালি অনুপাত (Golden Ratio)। যিনি গণিত বোঝেন তিনি জানেন যে এটাই সৌন্দর্যের নিয়ামক।
---------------------*---------------------
গণিতের আরও কয়েকটি বই রিভিউ
---------------------*---------------------
বলা হয় সকল বিজ্ঞানের মাতা হল গণিত। বিজ্ঞান হিসেবে গণিত সরাসরি ব্যবহারিক কর্ম। অর্থাৎ সাহিত্য বা দর্শনের সমস্যা শুধু চিন্তা করে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু গণিতের ক্ষেত্রে সেরকম সম্ভব নয়। একজন গণিত চর্চাকারীকে অবশ্যই চিন্তা করার পাশাপাশি হাত দিয়ে খাতার উপরে অঙ্ক করতে হবে। বিভিন্ন সংখ্যা ও গাণিতিক বিভাজক চিহ্ন ব্যবহার করে চিন্তায় কল্পিত সমস্যা বা তার সমাধানের প্রামাণ্য চিত্র আঁকতে হবে। হাতে কলমে অঙ্ক না কষলে গণিতের আনন্দ অধরা থেকে যাবে। বিষয়টিকে প্রধান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লেখক ভূমিকাতে আগেই জানিয়ে দেন -
গণিতের সমস্যা না করা হলে গণিতের মজাটুকু পুরোপুরি বোঝা যায় না, তাই খুঁজে পেতে একশ সমস্যা এখানে জুড়ে দেয়া হয়েছে। … সমস্যাগুলো এমনভাবে বেছে নেয়া হয়েছে যে গণিতের জ্ঞান খুব বেশি না হলেও কোন ক্ষতি নেই, যে-কেউ এখানে দাঁত বসাতে পারবে। সত্যি কথা বলতে কি, কিছু কিছু সমস্যা আসলে খাঁটি গণিতের সমস্যা নয় – যুক্তিতর্ক এবং লজিকের সমস্যা।
বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে দেয়া হয়েছে একশতটি চমকপ্রদ সংখ্যা। কাপ্রিকার ধ্রুবক, পাই এর মান, নিজেকে নিজে ব্যাখ্যা করা সংখ্যা, শূন্য, 666, রামানুজমের অসুস্থাবস্থায় আলোচিত সংখ্যা, প্রাইম সংখ্যা, মূলদ – অমূলদ সংখ্যা, পেলিনড্রমিক সংখ্যা, গ্রাহাম সংখ্যা, স্মিথ সংখ্যা, গুগোল, রহস্যময় অশুভসংখ্যাসহ সংখ্যার বিভিন্ন রকম অবস্থা ও অবস্থানের রোমাঞ্চকর অবাক করা কাহিনী এই অংশের আলোচ্য বিষয়।
এই বইটির উদ্দেশ্য গণিত শেখানো নয়, বইটির উদ্দেশ্য গণিতে উৎসাহী করে তোলা।
সংখ্যার প্রকারভেদ এবং তাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এতসব মজার কাণ্ড যে থাকতে পারে, তা গণিতকে যারা ভালবাসেনা, সংখ্যার সাথে খেলা করেনা, তারা এর কিছুই জানে না। যারা সংখ্যাকে ভালবাসেন তারা নিজেদের মগজে সারাক্ষণ সংখ্যা নিয়ে মগ্ন থাকেন, বিভিন্ন যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, ভগ্নাংশ, সূত্র, বিভিন্ন জ্যামিতিক অবয়ব ইত্যাদি নিয়ে নিরন্তর ব্যস্ত থাকেন। তারা সংখ্যাকে যেমন ভালবাসেন, তেমনি সংখ্যাও তাদেরকে নিঃস্বার্থভাবে আনন্দ দিয়ে থাকে। লেখক জাফর ইকবাল বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে গণিতের প্রতি তেমন ভালবাসা বপন করতে চান। তিনি চান এদেশের প্রতিটি কিশোর কিশোরী গণিতের রোমাঞ্চগুলোর সাথে পরিচিত হোক, রহস্যগুলোর প্রতি ভয়ার্ত নয়, কৌতুহলী হোক। আমাদেরও কামনা লেখকের প্রত্যাশা বাস্তব হোক, শিক্ষার্থীদের মন থেকে গণিতের প্রতি ভীতি দূর হোক।

বইয়ের প্রচ্ছদটি বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে। সংখ্যা ও সূত্রের সাথে ব্লাকবোর্ডের কম্পোজিশন অসাধারণ হয়েছে। প্রচ্ছদ শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর যথাযথভাবে বইয়ের মূল ভাবটি বইয়ের মুখাবয়বে ফুটিয়ে তুলেছেন। গণিতের মজার ও আকর্ষণীয় বিভিন্ন দিক নিয়ে এই ধরণের বই আরও প্রকাশিত হোক।  সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের সাথে গণিতের সম্পর্ক উন্নয়নে দেশের প্রতিটি পাঠাগারে এই বইয়ের কপি রাখা উচিত।

=০=০=০=০=০=০=০=০==০=

গণিতের মজা মজার গণিত
মুহম্মদ জাফর ইকবাল


প্রচ্ছদঃ মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশকঃ তাম্রলিপি, ঢাকা।

প্রকাশকালঃ প্রথম তাম্রলিপি প্রকাশ ২০১৫, তৃতীয় মুদ্রণ: ২০১৮
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১৫৮
মূল্যঃ ২৭০
ISBN: 984-70096-0272-6


কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।