ভিটগেনস্টাইন ও তার দর্শন সম্পর্কে বাংলাদেশী দার্শনিকদের আলোচনার সংকলন “ট্রাকটেটাস ও ভিটগেনস্টাইনের ভাষাচিন্তা” | সম্পাদনাঃ আফজালুল বাসার

“ট্রাকটেটাস ও ভিটগেনস্টাইনের ভাষাচিন্তা” বইতে ‘আফজালুল বাসার’ ভিটগেনস্টাইন সম্পর্কে বাংলাদেশী দার্শনিকদের আলোচনা সংকলন করেছেন
জন্মেছিলেন ধনী গৃহে। কিন্তু ঐশ্বর্যের প্রতি কখনও কোন আকর্ষণ বোধ করেন নি। জাঁকজমকপূর্ণ জীবন ও সম্পদশালীতার প্রতি এক সহজাত দার্শনিকসুলভ নিস্পৃহতা ছিল। পেশাগত প্রয়োজনে নয়, নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সংবেদী অংশ হিসেবে দর্শন চর্চা করতেন অস্ট্রিয়ার নাগরিক জার্মানভাষী লুডউইগ ভিটগেনস্টাইন (Ludwig Josef Johann Wittgenstein)। ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতির মৌলিক যৌক্তিক রূপ ও আন্তসম্পর্ক পুনর্বিন্যাসে, পুনঃবিচারে তিনি ছিলেন গত শতকের প্রধানতম দার্শনিক। তার জীবন ও দর্শন সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ বই “ট্রাকটেটাস ও ভিটগেনস্টাইনের ভাষাচিন্তা”। বাংলাদেশের দার্শনিক পণ্ডিতগণের লেখা আটটি প্রবন্ধের এই সংকলন সম্পাদনা করেছেন চিন্তাবিদ আফজালুল বাসার

ভিটগেনস্টাইনের দর্শনের যুক্তিনিষ্ঠা ও গভীরতা এতটাই শক্তিশালী যে তা প্রচলিত ঐতিহ্যপ্রবণ দার্শনিক সিদ্ধান্তগুলোকে আত্মসমালোচনার ঘেরাটোপে আটকে ফেলে। তিনি মনে করেন জগৎ সম্পর্কে আমাদের সমুদয় বাস্তব বা সম্ভাব্য চিন্তা কতকগুলো যৌক্তিক সমষ্টি দিয়ে তৈরি। তার জগত যুক্তি দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত। যেখানে যুক্তি নেই বা যুক্তিসঙ্গত ভাষা নেই, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেন না, নিশ্চুপ থাকেন। তিনি মনে করেন যা অযৌক্তিক বা যুক্তির নীতি মানে না, সে সম্পর্কে কিছু বলা অর্থহীন। আর সেজন্যই তার চিন্তাভাবনাগুলো ভাষা ও দর্শন উভয় বিদ্যাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নোটবুকে লিখে ফেলেন তার বিশ্বকাঁপানো বিখ্যাত বই ‘ট্রাকটেটাস লজিকো ফিলোসফিকাস বা দর্শনের সমস্যা’ (Tractatus Logico-Philosophicus)। তার কাছে যুক্তিই প্রধান। যুক্তিসঙ্গত না হলে বা যৌক্তিক বা যুক্তিগ্রাহ্য জগতের বাইরে যা কিছু তা বাস্তবসম্মত রচনাধারার অংশ নয়। সংকলক তার ‘সম্পাদকের কথা’ অংশে নিজের রচনার একটি চুম্বক অংশের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন
চিন্তার সঙ্গে ভাষার এবং ভাষার সঙ্গে জগতের সম্পর্ক রয়েছে। তাই চিন্তা প্রকাশের জন্য যৌক্তিক ভাষার নিয়ম ও ব্যবহার আবশ্যক। এই নিয়মকে তিনি 'ভাষার যুক্তি বিজ্ঞান' হিসেবে অভিহিত করেছেন। পৃষ্ঠা- ১০০
ভাষা প্রসঙ্গে ভিটগেনস্টাইন যা বলেছেন, তা পরবর্তী শতক জুড়ে নতুন নতুন প্রশ্ন ও চিন্তার ঝড় তুলেছে। বিশ্বের সকল দার্শনিকের মননে দিয়েছে এক আধুনিক অভিঘাত। যা বাংলাদেশে বাস করেও অনুভবযোগ্য। যার অনুধাবন হয় সূচিপত্র পাঠ করলে-

সূচিপত্র
  • সম্পাদকের কথা
  • আবদুল মতীন: দার্শনিক ভিটগেনস্টাইন
  • এ. এম. হারুন অর রশীদ: ভাষার সীমানায় ল্যুডভিগ ভিটগেনস্টাইন
  • আনিসুজ্জামান: ভিটগেনস্টাইনের ভাষাদর্শন
  • এ. কে. এম. শামছুর রহমান: ভিটগেনস্টাইন: বিশ্বজগৎ ও ইচ্ছার সম্পর্ক
  • আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ: ভিটগেনস্টাইন: সংশয়বাদের অর্থহীনতা প্রসঙ্গে
  • আনিসুজ্জামান: অন্য মনের সমস্যা প্রসঙ্গে ভিটগেনস্টাইন
  • এ. কে. এম. শামছুর রহমান: ভিটগেনস্টাইন: অর্থের ব্যবহারতত্ত্ব
  • আফজালুল বাসার: ভিটগেনস্টাইন: দর্শন-ভাষা-সাহিত্য
  • ট্রাকটেটাস লজিকো-ফিলোসফিকাস (ইংরেজি)
ভাষা সম্পর্কিত যৌক্তিক বিশ্লেষণের আলোকে বিশ্বজগতের মতো বাস্তবের অন্ত ও আকারগত অহমের পার্থক্য অনুমিত হয়। ভিটগেনস্টাইন মনে করেন এর জন্য প্রয়োজন মৌলিক বচনের। বিশ্বজগত ও জীবন অভিন্ন এবং এ দুটির অস্তিত্ব বাস্তবে রূপ পাওয়ায় তা ‘বাইরের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল’ এক ধরণের অনুভূতি হিসেবে বিবেচিত। জীবন, ভাষা, দর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি নিয়ে এমন দুর্নিবার যৌক্তিক ও বিশ্লেষণী চিন্তার কারণে ভিটগেনস্টাইনকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। তার প্রকট প্রশ্নমালার মুখোমুখি হওয়া যেন অনিবার্য ভবিতব্য হয়ে উঠেছে। তাকে নিয়ে তাই প্রয়োজন আরো বেশি আলোচনার।

এই বই প্রকাশ হয়েছে ২০০৩ সালে। সেই সময়ে ছিল না ইন্টারনেট বা অনলাইন পাঠাগার। ভিটগেনস্টাইনের ট্রাকটেটাস বইটিও সেকালে সহজলভ্য ছিল না। তাই চিন্তাপ্রবণ পাঠকদের কথা ভেবে সংকলক ‘ট্রাকটেটাস’ এর ইংরেজি ভার্সন বইয়ের শেষে সংযুক্ত করেছেন। আগ্রহী পাঠক বাংলায় বিশ্লেষণ বিবরণ পড়ার পাশাপাশি মূল পাঠ পড়ে নিজের যুক্তিবোধ যাচাই করতে পারবেন। ১৯২১ সালে জার্মান ভাষায় ট্রাকটেটাস প্রকাশিত হওয়ার পর পৃথিবীর তাবৎ দার্শনিকগণের চিন্তাজগতে সাড়া পড়ে যায়। কয়েক বৎসরের মধ্যে এর একাধিক ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। তবে বইয়ের শেষে সংযুক্ত ইংরেজি অনুবাদটি কত সালে কার করা, তা উল্লেখ নেই। ফলে এর প্রামাণ্যতা নিয়ে একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে।

আলোচ্য বইটি বাংলাভাষায় ভিটগেনস্টাইনের চিন্তাচর্চা সহজলভ্য ও সহজবোধ্য করেছে। লেখকগণ প্রত্যেকেই প্রথিতযশা সমাজ ও চিন্তা বিশ্লেষক। সভ্যতাকে মহিমান্বিত করে নতুন চিন্তা। যে কালে বাংলাভাষায় নতুন ভাবনা কিংবা জটিল দর্শনচিন্তার কল্পনা করা দুরূহ, সেকালে এমন বই প্রকাশ করে সংকলক ও প্রকাশক দুঃসাহসী কাজ করেছেন। ভিটগেনস্টাইনের দর্শনচিন্তার সাথে আরো বেশি বাংলাভাষী পরিচিত হোক, যৌক্তিক অনুধাবনকে বাঙালী পাঠক বিশ্লেষণী পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করুক- এই প্রত্যাশা করি।

~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~:~
ট্রাকটেটাস ও ভিটগেনস্টাইনের ভাষাচিন্তা
সম্পাদনাঃ আফজালুল বাসার


প্রচ্ছদঃ রওজাতুল জান্নাত চম্পা

প্রথম প্রকাশঃ ২০০৩
প্রকাশকঃ দিব্য প্রকাশ, ঢাকা
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১৯০
মূল্যঃ ১৫০ টাকা
ISBN: 984-483-126-1

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।