শিমুল মাহমুদ রচিত ''দেশভাগ হইল একফালি নকশাদার লাল তরমুজ" এবং "ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত" কাব্যদ্বয় প্রসঙ্গেঃ নাজমুল হোসাইন

শিমুল মাহমুদ রচিত ''দেশভাগ হইল একফালি নকশাদার লাল তরমুজ" এবং "ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত" কাব্যদ্বয় প্রসঙ্গেঃ নাজমুল হোসাইন

আমার কবিতা ভাবনাঃ
কবিতা শুধুই কোনো ঘটনা/ঘটনাংশ/দৃশ্যের কিংবা কিছু কথার ছান্দিক-রসিক-ক্রমিক-আলঙ্কারিক বর্ণনা নয়। তাহলে?

ঘটনার পেছনে যেমন কার্যকারণ থাকে তেমনি থাকে কিছু ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ঘটনা। যা খালি চোখে (!) দেখা যায় না।

একাধিক ছোটছোট বস্তু নানান ক্রিয়া-বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বৃহৎ কোনো বিষয়কে দৃশ্যমান করে তোলে। আবার একাধিক বস্তু দৃশ্যমান বিষয়টিকে প্রভাবিত করতে থাকে। প্রভাবিত করার ঘটনার কোনো সীমা নেই। ফলে, দৃশ্যমান বিষয়টি প্রতিমুহূর্তে বদলায়। বাস্তব ঘটনাও এভাবে কখনোকখনো ইলুশনের তৈরি করে।

বাস্তবতা, বাস্তবতা পেরিয়ে ইলুশন (ভ্রম), এবং ইলুশন পেরিয়ে কবিতা প্ররোচনার কাজ করে। এই প্ররোচনায় আপনি মুগ্ধ হয়ে মুহূর্তের মধ্যে অস্বীকার করতে পারবেন খোদ নিজের অস্তিত্বকে।

ইলুশন পেরিয়ে কবিতা প্ররোচনার কাজ করে
ধরুন, রোদের মধ্যে পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। ফলে, পাখির ডানার দিকে ছুটে আসা আলোক রশ্মিগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নানান আকৃতি। নতুন আকৃতি। নয় কোনো ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, পঞ্চভুজ, ষড়ভুজ....। আবার এসবের বাইরেরও কিছু না। আশলে এমন কোনো আকৃতি মানুষ আগে কখনো দেখেনি। ফলে দ্রষ্টাবৃন্দ না পারছে একে সংজ্ঞায়িত করতে, না পারছে অস্বীকার করতে। এইযে, নতুন কিছু— যা কিনা প্রবলতরভাবে আত্মপ্রাকাশেচ্ছুক, সামনে দাঁড়ালেই আপনার প্রথাগত চিন্তা ভেঙে পড়ছে, আপনার পরিচিত জগৎ ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে গুড়িয়ে যাচ্ছে, আপনি নতুন করে ‘পরিচয়’ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন; আমি একেই কবিতা বলব। এই ‘পরিচয়’ হতে পারে আপনার সমস্ত ইন্দ্রিয় ঘটিত কার্যের, চিন্তার, বাক্যের, ভাষার, এমনকি স্বয়ং আপনার নিজের।

এইসমস্ত কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা নেই। এটা শুধু কবিতা। শুধুই কবিতা। বিজ্ঞান-সম্পর্কিত সাবজেক্টগুলো স্কেল দিয়ে বস্তুর দৈর্ঘ-প্রস্থ-উচ্চতা মাপে। একজন কবি কখনোই একটি বস্তুর ভর, ওজন নিয়ে মাথা ঘামান না। বরং, কবি বস্তুটির না থাকা গুণ-ধর্ম বস্তুটিতে আরোপ করেন। এবং, কবির উপর কেউ নেই ক্ষমতাবান, যিনি তা অস্বীকার করেন।

কবিতার নির্দিষ্ট কোনো আকৃতি, ধাঁচ, ফর্ম হতে পারে না। যে-ক্ষেত্রটিতে এই বিস্ফোরণ ঘটানো যায়, সেই ক্ষেত্রটিই হয়ে ওঠে কবিতা। যা কিনা কোনও অলঙ্কার, উপাদানরেও গুনতিতে ধরে না। বরং বলা যেতে পারে, চিন্তা ও ভাষার দ্বারা যে-জার্নি করতে/করাতে চাচ্ছেন, যা-যা জার্নির জন্য সহায়ক, তা-ই হয়ে উঠতে পারে কবিতার উপাদান।

ভাষা যেহেতু আমাদের চিন্তা প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম সেহেতু আমরা কবিতা লিখি ভাষায়। শব্দের দ্বারা। আমি ভাষাকে কবিতা লেখার শুধুই ‘মাধ্যম’ মানছি। এর বেশি কিছু না। পরোক্ষভাবে হলেও বলতে চাই ভাষা ছাড়াও কবিতা হতে পারে।

ভাষা আমাদের চিন্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন শব্দের গায়ে বিভিন্ন অর্থের ট্যাগ লাগিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া আছে ভাষার বাগানে। সাহিত্য করা মানে, এই বাগানের রাখাল। তার কাজ চরে বেড়ানো নয়, রাখালি করা।


শিমুল মাহমুদের কবিতা: অনিবার্য অর্থবিস্তারীঃ
চিরাচরিত দৃষ্টি-দৃশ্য পরিহার করে শিমুল মাহমুদ কবিতায় নির্মাণ করেন নতুন জগৎ। যেটা শুধুমাত্র ভাষিক নয়। চিন্তার। কিংবা, এমন জগৎ, যেখানে প্রতিটি শব্দ চিন্তায় উস্কানি ছড়ায়। চিরচেনা-চিরঅচেনার মধ্যে হাজার-হাজার আলোকবর্ষের যে-দূরত্ব, পাঠক হয়ে ওঠে তার সকল পথ-অলিগলির পথিক ও মাস্তান।

শিমুল মাহমুদ কবিতায় দৃশ্যকে ‘মেরামত’ করেন না।
চোখ খুললেই যে-দৃশ্য দেখা যায়, সেই দৃশ্যকে নতুন করে রঙ দিয়ে সাজানো হলেও তা পুরাতন। সেটাকে আর দেখানোর কিছু নাই৷ মানুষের অতিশক্তিশালী কল্পনার কাছে অন্তত সেই জগৎ রঙহীন, আবেদনহীন। একজন কবি তারই স্রষ্টা, চোখ খুলেও যার নাগাল পাওয়া যায় না। শিমুল মাহমুদ কবিতায় দৃশ্যকে ‘মেরামত’ করেন না। বরং, ভেঙে নতুন করে গড়েন। ফলে, পাঠক চমকে ওঠার পরিবর্তে প্রচণ্ড বিধ্বংসের মুখোমুখি হয়।



দেশভাগ হইল একফালি নকশাদার লাল তরমুজঃ
তরমুজের ভেতরটা: তিনটি দীর্ঘ কবিতা দিয়ে সাজানো।

  • ১. দেশভাগ হইল একফালি নকশাদার লাল তরমুজ
  • ২. হারানো চাবিগুলো খুঁজছি
  • ৩. মানুষ এবং মানুষদিগের বচনসমূহ

এই তিনটি দীর্ঘকবিতার সাথে দীর্ঘকবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ (ভূমিকা)। যার শিরোনাম: ‘দীর্ঘকবিতা: বচন ও জীবনের যৌথযাপন’।


ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিতঃ
ঘোড়াউত্রা প্রকাশনী থেকে দেড় ফর্মা সিরিজের বইগুলোর একটি। বইটিতে রয়েছে ২২টি কবিতা।
এই ২২টি কবিতায় দেখা পাওয়া যাবে নতুন এক শিমুল মাহমুদকে। যিনি মোটেও আশির দশকের কবি নন, বরং একবিংশ শতাব্দীর একজন তরুণ, যে-তরুণ দুঃসাহসিকতার সাথে প্রচলকে এড়িয়ে একুশের উপাদান দ্বারা নির্মাণ করেছেন কবিতাগুলো।


সর্বচিন্তায় অনুবাদযোগ্য পাঠপ্রতিক্রিয়া:
কবিতা এগিয়ে যায়: পাঠের ভেতর দিয়ে। জাগরণ একধরনের সমুদ্র, যার ভেতর পাঠক কবিতার সাথে হাঁটে, গান গায়, বিড়ি টানে, বাঁশি বাজায়, চাঁদ ঢেকে রাখে, চেপে রাখে বগলে। সমুদ্রের ভেতর থেকে গড়িয়ে পড়ে কবিতা। কবিতা ও পাঠক হাত-ধরাধরি করে হাঁটে, শোয়, গড়াগড়ি খায়। কবিতার ভেতর ঢুকে পড়ে সমুদ্র। সমুদ্র কবিতার ভেতর সাঁতরায়। সমুদ্রও কবিতা। কবিতা সাঁতরায়। কবিতা কবিতার ভেতর সাঁতরায়। জার্নি করে। পাঠক ভিজে যায়। পোশাক ভেজে।
.
ভেজা পোশাক খুলে রেখে একটা গর্ভজাত-স্নান সেরে নিচ্ছি।
===============

বইয়ের নাম: দেশভাগ হইল একফালি নকশাদার লাল তরমুজ
প্রকাশনী: বেহুলা বাংলা
প্রচ্ছদশিল্পী: মিজান স্বপন

বইয়ের নাম: ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত
প্রকাশনী: ঘোড়াউত্রা
প্রচ্ছদশিল্পী: মাইদুল রুবেল
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৬
দাম: ৩৫

0/আপনার মতামত জানান/টি মন্তব্য

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।

নবীনতর পূর্বতন