বরফের ছুরি- মাসুমুল আলমঃ ছুরিটা গলে যাচ্ছে চোখের ভেতর- তানজিন তামান্না

বরফের ছুরি- মাসুমুল আলম

মাসুমুল আলম একজন কথাসাহিত্যিক, গদ্যকার এবং অনুবাদক। তিনি ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের তিন তারিখে যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন। নব্বই দশক থেকে তাঁর লেখালেখির শুরু। এবছর ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বইমেলায় উড়কি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘বরফের ছুরি’।

‘বরফের ছুরি’ গ্রন্থটি মোট বারটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি গল্পের বিষয়বস্তুকে একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে ফেলা কঠিন। বরং তাঁর লেখার বিষয়বস্তুগুলো খুব চেনা ও সমসাময়িক হয়েও বৈচিত্র্যময়। যেন গল্পগুলোর ঘটনা পাঠকের চোখের সামনেই ঘটছে এবং পাঠক এমন বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত দেখছেন। সাধারণ মানুষের নিত্য জীবনযাপনের ভেতর ব্যক্তিজীবনের নানা গল্প এবং তারই সঙ্গে রাজনৈতিক ঘটনার চমৎকার উপস্থাপনা কখনও স্পষ্ট, কখনও সাংকেতিক, কখনও নাটকীয় বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মাসুমুল আলমের গল্প নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হয়েও বহুরৈখিক ভাবনার জন্ম দেয়। এবং গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পাঠকের মনে থেকে যায় অশেষ কম্পন। গল্পের শুরুর অভিনবত্ব নিয়েই একটি দীর্ঘ এবং চমৎকার আলোচনা করা যেতে পারে। শুরুতেই পাঠক অদ্ভুত এক মায়াজালে বাঁধা পড়েন। আর এই জাল থেকে বেরোনোর জন্য পাঠক কিন্তু ছটফট করেন না। বরং তিনি আরও নিমজ্জিত হতে থাকেন গল্পের গভীরতায়।

এই বইয়ের প্রথম গল্পটি: ‘ছিন্ন খঞ্জনার মতো’

শিরোনামটির ভেতর যেন একটি নস্টালজিক অনুভূতি খেলা করে যায়। যদিও গল্পটি শুধুমাত্র নস্টালজিক বিষয়ের নয়।
“টানা তিনদিন বৃষ্টি হলে ফের শহর জুড়ে জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব বেড়ে যায়।” —শুরুর এই বাক্যটা সম্পূর্ণ নাগরিক জীবনের একটি বাস্তবতা দিয়ে শুরু হয়। বাক্যের এই চুম্বকশক্তি পাঠককে গল্পের প্রতি মনযোগী করে তোলার ক্ষমতা রাখে। গল্প শেষ না করে পাঠকের উঠে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকেনা।
“তীব্র গরমে ঠান্ডা দিনের কথা মনে হয়।
এখন এতটাই গরম যে, ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ফিলস লাইক ৪৮। কেমনে কি, সহ্য হয়? একদা অদ্রীশ বর্ধনের আমার মা সব জানে- এর পরিবর্তে এখন এই গুগল মামাই সব জানেন। এখন তিনিই ভরসা।”    [গল্প: ‘শীতগ্রীষ্মের স্মৃতি’]
এই রসাত্মক বাক্যগুলোর ভেতরে ভেতরে বয়ে যাচ্ছে সূক্ষ্ম স্যাটায়ার।   লেখকের সেন্স অফ হিউমার দারুন শক্তিশালী, সাবলীল এবং সহজাত। তীর্যক ভঙ্গিমার ভেতর দিয়েই সিরিয়াস ঘটনার দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায়। বারটি গল্পের প্রত্যেকটি গল্পের শুরুর বাক্যটা পাঠকের হাত ধরে টেনে নেয় গভীর আকর্ষণে।

‘আমি যদি তুমি হতাম’ গল্পের শুরু হয়েছে এভাবে:
“ভালো হতো।
আমি যদি আপনার মতো হতাম। কিন্তু আমি আমার মতো। আমি আপনি হইতে পারব না। আপনার মতো। আর আপনেও না, আমার মতো, বুঝছেন তো? আট বছর আগে আপনি সেই বিবাহিত নারীটির সঙ্গে কক্সবাজার থেকে সোজা ফিরে এসেছিলেন, যখন নাকি আমরা পরদিনই সেইন্টমার্টিন যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।”
এরপর এভাবেই গল্পটি এগিয়ে যাবে । গল্পটি পড়ার সাথে সাথে পাঠকও নিজেকে সেই ‘আপনি’ ভেবে নিলে অবাক হওয়ার কিছুই নাই। যেখানে গল্পের শুরুটাই পাঠককেই এই গল্পের মূল বক্তা হিসেবে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা রাখে। বাক্যগুলোর ভেতরগত কাব্যময় ধাঁধাঁ যেন পাঠকের মনে সেইন্টমার্টিন যাওয়ার প্রস্তুতি জাগিয়ে দেয়। মাসুমুল আলমের গল্পের ভেতরগত সমসাময়িক ঘটনাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গল্পের আদলে, ঠিক তথ্যের ভঙ্গিমায় নয়।
“এবং সেই ঘটনা অনেকের মতো তার মনকেও অধিকার করে রাখছে। জনমন নিয়ন্ত্রণের এ এক চমৎকার ব্যবস্থাপনা। যাতে তুমি একটা কিছু নিয়ে ভাবতে না ভাবতেই আরেকটা ভাবনা এসে তোমার আগের ভাবনার স্থলাভিষিক্ত হয়ে তোমার মনের অধিগ্রহণ না করে। ফলে, তুমি ডেংগু নিয়ে কি বাল-টা ভাববা সোনা, মশার কামড়ে হাজার লোকের মৃত্যুতে জরুরি অবস্থা জারি করা যায় কি যায় না, ভাবতে ভাবতেই দ্যাখো দেশজুড়ে ক্যাসিনো কাণ্ড। পাবলিকের পুরো গিল্টি জাম! আর তোমার সারাদিন মাটিকাটার মতো হিসেবের কড়ি গুণতে গুণতেই তোমার নাভিশ্বাস অথচ ক্যাসিনো রয়েলের জুয়াড়ি মামুসমাজের কিন্তু কারো কারো একরাতের-ই ইনকাম মনে করো দিয়েথুয়ে পঞ্চাশ লাখ? শুনে তোমার বিচি এখন শুকায়ে যাইতেছে ওস্তাদ!”        [গল্প:‘ছিন্ন খঞ্জনার মতো’]
ভাবনাগুলো গল্পের চরিত্র ‘চেতনার’। এবং এই চরিত্রটিকে গল্পের শুরুতে একজন নারী মনে হলেও, গল্পের শেষে মনে হতে পারে: না এটা কোনো মানব চরিত্রের নাম নয় বরং এটা আপনার, আমার মতো সাধারণ নাগরিক মানুষের মনোজগত, যেখানে প্রতিনিয়ত নাগরিক অস্থিরতা বয়ে যায়। যে মনোজগতে প্রতিনিয়ত সহাবস্থান করে রাজনৈতিক অস্থির ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনা। ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা আবার এক। আবার পাঠকের মনে হতে পারে চেতনা একজন নারীই। এভাবে শুধুমাত্র চরিত্রের রহস্যময়তাই নয়, ঘটনার রহস্যময়তাও পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে।

মাসুমুল আলমের লেখার অদ্ভুত আকর্ষনীয় উপস্থাপনা, গল্পের চরিত্রের আপনতা, ঘটনার নানা দিক এসব নিয়ে জানতে জানতেই পাঠক কিন্তু জেনে যাবেন গল্পগুলোর চমৎকার নাটকীয় উপস্থাপনার দিকটিও। গল্প পড়তে পড়তে পাঠক গল্পটি দেখতে শুরু করতে পারেন মঞ্চে। যেন কোনো নাটকের দৃশ্য পাঠকের সামনেই মঞ্চস্থ হচ্ছে এবং পাঠক তার নীরব দর্শক!

‘চেতনার’ মতো রহস্যময় চরিত্রের পাশাপাশি মাসুমুল আলম সৃষ্টি করেছেন ‘রাইসুলের’ মতো একজন সাধারণ সরকারী চাকুরিজীবির চরিত্র। আর এই চরিত্রের অভ্যস্ত দাম্পত্য জীবনযাপন, ভরসা এবং অফিসিয়াল ক্রাইসিসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ক্ষমতার চমৎকার চিত্রায়ন করেছেন তিনি। মাসুমুল আলমের লেখনীর আরও একটি বিশেষদিক, যেখানে তিনি গল্পজুড়ে প্রতিবাদ বিপ্লবী নানা ভাষণ না লিখেও খুব সাধারণ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এগোতে এগোতেই এমন একটি শক্তিশালী বাক্য লিখে ফেলতে পারেন যে, একটি বাক্যই সমগ্র গল্পের মেজাজ বহন করে।
“এখন, অফিসে বসে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, ক্ষমতা আর ইচ্ছার জোর একটা আজব জিনিশ। ক্ষমতা থাকা মানে ইচ্ছা-অনিচ্ছার জোরটাও থাকা।”     [গল্প: শীতগ্রীষ্মের স্মৃতি]

“আমার দেশ আসলেই ওরকম না। কেননা, এখানে অপরাধীর মুক্তি চেয়ে শুয়োরের বাচ্চারা রাস্তায় রাস্তায় মিছিল বের করে।
আর শোকোচ্ছ্বাসে ভদ্দরলোকের বাচ্চাদের চোখের কোণ ভিজে উঠেই ফের শুকিয়ে যায়। কেননা, তখন কোথাও রক্তচক্ষু কোকিল ডাকে অথবা আকাশে সেদিন চমৎকার এক রঙধনু উঠেছিল।”        [গল্প: নজরবন্দী]
গল্পের ভেতর দিয়ে মাসুম কেবল কোনো চরিত্র আর শুধু ঘটনারই বর্ণনা করে যান না বরং তিনি তাঁর অন্তর্গত চেতনা উন্মোচন করেন। এবং এই চেতনাগত উপস্থাপনায় পাঠকের মনে স্বয়ং মাসুমুল আলম ঢুকে পড়েন। আর অতি সন্তর্পনে প্রজ্জ্বলন করেন একটি দেশলাইয়ের কাঠি। তারপর অন্তহীন জ্বলে ওঠেন পাঠক। মাসুমুল আলমের গল্প আমাদের পুড়ে যেতে অবদান রাখে। ছাই হয়ে আমরা পুনর্জন্ম লাভ করি। 

।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।
।। বরফের ছুরি
।। মাসুমুল আলম

।। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২০
।। প্রকাশক: উড়কি
।। প্রচ্ছদ: মোশারফ খোকন
।। মূল্য: ১৫০.০০ টাকা

0/আপনার মতামত?/টি মন্তব্য

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।

নবীনতর পূর্বতন