আলীমুজ্জামানের বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ‘সন্ধানী’: যে কাহিনীর সাথে আমরা সকলেই পরিচিত

আলীমুজ্জামানের বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ‘সন্ধানী’

খান আলাউদ্দিন

কার্ল সাগান তাঁর বেস্টসেলিং বই 'কসমস'-এ এরকম অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে পৃথিবীর চেয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন এমনকি বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পুরোনো সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেসব সভ্যতা থেকে কেউ কি পৃথিবী পরিদর্শন করতে আসেনি, যখন পৃথিবীতে কেবলমাত্র উন্মেষ ঘটেছে সরীসৃপ, মানুষের পুর্বপুরুষ ও ড্রাগনফ্লাইগুলোর? তাঁর অভিমতকে সমর্থন করেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনী সন্ধানীর শুরু। সন্ধানীর প্রথমাংশেই আমরা লক্ষ্য করি তিরিশ লক্ষ বছর আগের চিত্র। পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রোটো মানুষেরা। খাদ্য গ্রহণের তাগিদে বনে-জঙ্গলে দিন কেটে যায় তাদের। কেবল ডাইনোসরদের রাজত্বের অবসান ঘটেছে। সেই সময় পৃথিবী পরিভ্রমণে আসে নক্ষত্র সন্তানেরা। সোজা কথায় আমরা যাদের এলিয়েন বলি। তারা আসে স্ফটিকস্বচ্ছ ফ্লাইং সসারে চড়ে। পৃথিবীতে উন্নততর জীবন ও বুদ্ধিমান প্রাণের দেখা না পেয়ে ফিরে যায় তারা। তবে যাবার আগে শনির উপগ্রহ জ্যাপেটাসে তারা ভূগর্ভস্থ করে যায় নক্ষত্রতোরণ।

নক্ষত্রতোরণের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে যায় সময় এবং শূন্যতা। লেখক একবার ও উচ্চারণ করেননি নক্ষত্রতোরণ কি, তবে আমরা বুঝে যাই নক্ষত্রতোরনই ওয়ার্মহোল। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ কিপ থর্ন স্পেস টাইমের কন্টিনিয়ামে প্রচুর শক্তির সাহায্যে এটি তৈরীর কথা বলেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করা সম্ভব স্পেস এবং টাইম। আইনস্টাইনের সাধারন আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে ওয়ার্মহোলের ধারনাটি এসেছে। ভরের কারণে ত্রিমাত্রিক স্থান বেঁকে গিয়ে একটি সিলিন্ডার আকৃতির টানেল তৈরী করে। আন্তঃনক্ষত্রিক ভ্রমনের জন্য শর্টকার্ট পথ হিসেবে কাজ করে এটি। অর্থ্যাৎ ওয়ার্ম হোলের একপ্রান্ত দিয়ে ঢুকে সহজেই অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে ভিন্ন গ্যালাক্সিতে পৌঁছা যায়। ঠিক তাই। সন্ধানীর নায়ক রবি তার মহাকাশযান নিয়ে নক্ষত্রতোরণ বা ওয়ার্মহোলের মধ্যে প্রবেশ করে উপস্থিত হয় সম্পুর্ন নতুন এক বিশ্বে। পৃথিবী থেকে শত শত আলোকবর্ষের চেয়েও দুরের মহাকাশ বন্দরে। যেখানে উপরে তাকালেই চোখে পড়ে অসংখ্য কালো কালো বিন্দু, আকাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ব্ল্যাকহোল।

আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজ লেখা হয়েছিলো ইন্ট্যারগ্যালাকটিক মানব সভ্যতাকে কেন্দ্র করে। সন্ধানী সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। ত্রিশ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হয় মানুষেরা। আনবিক যুগ শেষে মানব সভ্যতা প্রবেশ করে মহাকাশ যুগে। চাঁদে স্থাপন করে স্পেস কলোনি । সন্ধানী নামের মহাকাশতরীকে পাঠায় শনি অভিযানে। সন্ধানী জ্যাপেটাসের গুপ্তসুড়ঙ্গ বা ওয়ার্মহোলের মধ্য দিয়ে চলে যায় নক্ষত্র তোরণ স্রষ্টাদের সান্নিধ্যে।
 
নক্ষত্রতোরণ স্রষ্টারা ইতোমধ্যে নশ্বর দেহ বর্জন করেছে। দেহের বন্ধন থেবে মুক্ত তাদের মন এখন সর্বব্যাপী। শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় চেতনা এসে মিলিত হয়েছে সন্ধানীর সীমানায় ।

ধর্মের আর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আত্মা। বলা হয় আত্মা অবিনশ্বর। আত্মা সময় নিরপেক্ষ এবং দেহাতীত।


কিছু কিছু সায়েন্স ফিকশন শেষ দিকে এসে আধ্যাত্মিক হয়ে উঠে। সন্ধানীও আধ্যাত্মিক, বস্তবাদের বিরোধী হয়ে উঠেছে।

কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে আমরা প্রায়ই দেখি নিউরনসমৃদ্ধ মানবিক অনুভুতিসম্পন্ন কম্পিউটার, অনেকসময় যা মহাকাশযান নিয়ন্ত্রণ করে। একে আবার নিয়ন্ত্রণ কম্পিউটার বা সিসিও বলা হয়। ধারণা করা হয় ডিপলার্নিংয়ের মাধ্যমে সুপারইন্টেলিজেন্ট হয়ে উঠা কম্পিউটার বা ডিজিটাল ব্রেইন মানুষের প্রতিদ্বন্ধী হয়ে উঠতে পারে। মানুষ বনাম কম্পিউটারের দ্বন্ধে মানুষের শোচনীয় পরাজয় ঘটবে। সন্ধানীর ষষ্ঠবাসিন্দা ‘হেল এইচ এ এল’। হিস্টিরিক্যালি প্রোগ্রামড অ্যালগরিদমিক কম্পিউটার। মানুষের মত বুদ্ধিমান। হেলের বিশ্বাসঘাতকতায় বাঙ্গালী আমেরিকান রবি রেমান ব্যতীত সন্ধানীর অপর ক্রুরা মহাশূন্যে প্রাণ হারায়। যন্ত্রের উপর নির্ভরশীলতা নিয়ে মানবজাতির অমূলক আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়। কম্পিউটার জগতের লুসিফার হিসেবে চি‎হ্ণিত হয়ে থাকে অসামান্য প্রতিভাধর হেল।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে এমন কিছু উদ্ভাবনী ধারণার অবতারণা করা হয় যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বাস্তবে রূপ লাভ করে। ভবিষ্যতে বাস্তবে পরিণত হতে পারে সেরকম কিছু চিন্তা বিচ্ছুরণ সন্ধানীতে জ্বলে উঠতে দেখি : স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার পরিচালিত রেডিও হিপনোসিস। যার সাহায্যে একটা দেশের সমস্ত মানুষকেই অল্প সময়ের মধ্যে অজ্ঞান বা সম্মোহিত করে ফেলা যাবে। প্লাজমাজেট। মহাকাশে থাকা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্রোত। যে স্রোতের সাহায্যে চলাচল করতে পারবে নভোযানগুলো। একায়া সিটি। ইন্ট্রাগ্লেসিয়ার টাউন।

রবি রেমানের নি:সঙ্গতা সন্ধানীর অন্যতম প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে। নি:শব্দ পরিবেশে অসীম শূন্যতায়, মহাশূন্যে একলা এক মহাকাশচারীর মানসিক অবস্থা সহজেই অনুমেয়। উপন্যাসের শেষেও তার নিংসঙ্গতা রয়ে যায়। যখন সে আত্মার স্তরে উঠে আসে।

নিজের মানবীয় দিনগুলোর কথা মনে করল নক্ষত্র শিশু। হঠাৎ ভীষণ নিংসঙ্গ মনে হলো নিজেকে। এই নিংসঙ্গতা অনন্তপ্রসারিত। যতদিন না সমস্ত মানবসভ্যতা তার স্তরে উঠে আসে ততদিন এভাবেই থাকতে হবে। একা।


-০-০-০-০-০-
সন্ধানী
আলীমুজ্জামান

প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৬
প্রকাশনী : সেবা প্রকাশনী
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৪০
মূল্য : ৮৬ টাকা
ISBN 984-16-0056-0

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ