বই আলোচনা সমালোচনার বিভিন্ন প্রসঙ্গ

বই আলোচনা সমালোচনার বিভিন্ন প্রসঙ্গ

বই আলোচনা, গ্রন্থ সমালোচনা, পুস্তক পর্যালোচনা যে নামেই ডাকি না কেন মূলত যে বিষয়টি এদের উদ্দেশ্য তা হলো কোন একটি বইকে পাঠকের সামনে প্রত্যাশা অনুযায়ী উপস্থাপন করা। তা ব্যক্তিগত ইচ্ছাধীন যেমন হতে পারে, তেমনি হতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মমাফিক। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ভেদে বই আলোচনা সমালোচনা সম্পর্কে নীতিমালা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে সকলেই নিজ নিজ প্রয়োজন ও অবস্থান অনুযায়ী একটি বইকে পাঠকের সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে চায়। এ জন্য নির্দিষ্ট কোন নিয়ম কখনই কোনো বইয়ের সম্পূর্ণ পরিচিতিকে বিবৃত করতে পারে না; সকলের চাহিদাকে তৃপ্ত করতে পারে না। নির্দিষ্ট নিয়মাবলী আংশিক পরিচিতিকেই উপস্থাপন করে মাত্র। তবে পুস্তক পর্যালোচনার প্রধান প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে যে কয়েকটি বিষয় আলোচ্য করে তোলা যেতে পারে তার কয়েকটির উপরে নিচে আলোকপাত করা হলো।

'সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ' বা 'নিবিড় অধ্যায়নমূলক কাজ' জাতীয় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পাঠ শুরু করার আগে বই হাতে নিয়ে যা করণীয়ঃ
  • শিরোনামঃ বই হাতে নেয়ার আগেই চোখে পড়ে তার শিরোনাম। তাই নামটি ভালো করে পড়ুন। একটু চিন্তা করুন। শিরোনাম পড়ে কিছু কি বোঝা যাচ্ছে? শিরোনামটি কি কোন কিছু বলতে চাচ্ছে? শিরোনামটি একটি মাত্র শব্দ নাকি শব্দগুচ্ছ নাকি বাক্য দিয়ে তৈরি?
  • প্রচ্ছদঃ বইয়ের প্রচ্ছদটার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকান। দেখুন তো বইয়ের নামের সাথে প্রচ্ছদের কোন মিল বা অমিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কি না? প্রচ্ছদ হিসেবে কোন বিমূর্ত চিত্র নাকি কোন ফটোগ্রাফ ব্যবহার করা হয়েছে? রঙের ব্যবহারে মুন্সিয়ানার পরিচয় আছে কী?
  • প্রথম পাতাঃ বইয়ের প্রচ্ছদ উল্টানোর পর প্রথম পাতাটি আসে। এখানে বইয়ের নাম/ শিরোনাম, লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক বা সংকলকের নাম থাকবে। পাতার নিচে থাকবে প্রকাশনীর নাম।
  • প্রিন্টার্স লাইনঃ প্রথম পৃষ্ঠাটির বিপরীত পাতায় থাকে 'প্রিন্টার্স লাইন'। এখানে আবারও বইয়ের নাম, লেখকের নাম,  প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম, প্রকাশকের পরিচিতি, প্রকাশনীর নাম, প্রকাশকাল, কততম সংস্করণ, মূল্য, যোগাযোগের ঠিকানা ইত্যাদি থাকে।
  • উৎসর্গঃ এরপর সাধারণত থাকে উৎসর্গ। বইটি কারও উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে কী না? কোন সম্মানিত মৃত ব্যক্তি, প্রিয় ব্যক্তিত্ব, পিতামাতা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব যে কারও উদ্দেশ্যে লেখক বইটিকে উৎসর্গ করতে পারেন।
  • ভূমিকা/ মুখবন্ধঃ বইয়ের এই অংশে লেখক বইটি লেখার পটভূমি, উদ্দেশ্য, কার্যবিবরণ ইত্যাদি উল্লেখ করে থাকেন। লেখক যা কিছু এবং যতটুকু বলতে চেয়েছেন তা বইয়ে কতটুকু সফলভাবে প্রয়োগ হয়েছে তার বর্ণনা দেন। বইটি কোন শ্রেণীর পাঠকের জন্য লেখা লেখক সে বিষয়ে নিজের মনোভাব এখানে ব্যক্ত করেন। লিখিত বইটির বিষয়, আলোচনার পরিধি, কার কার নিকট থেকে উপকৃত হয়েছেন, কীভাবে উপকার নিয়েছেন ইত্যাদির বিবরণ এখানে থাকে। মুখবন্ধটি আদ্যোপান্ত পাঠ করে আপনার কাছে এমন কি মনে হয় যে, লেখকের আরও কিছু স্বীকার করা উচিত ছিল? একাধিক সংস্করণ বা মুদ্রণ হলে প্রত্যেক সংস্করণের জন্য স্বতন্ত্র ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয়। লেখক সে কাজ করেছেন কি?
  • সূচীঃ একটি বইয়ের বিভিন্ন আলোচ্য বিষয় এই অংশে সাজানো থাকে। এই সূচীপত্র দেখে বইটির আলোচ্য বিষয়ের ব্যাপ্তি, গুরুত্ব ইত্যাদি বোঝা যায়। বইয়ের বিভিন্ন অংশ বা পরিচ্ছেদের নাম কী, কততম পৃষ্ঠায় কোন অংশ রয়েছে, তা এখান থেকে চট করে দেখে নেয়া যায়। তাই কোনো বই পাঠ শুরু করার আগে 'সূচীপত্র' পাঠ করা অবশ্য কর্তব্য।
  • বইয়ের অবয়বঃ বইয়ের আকার, পৃষ্ঠার মান, পৃষ্ঠাসংখ্যা, বাঁধাই ইত্যাদি দেখে নেয়া দরকার।
  • অনেক বইয়ের শেষে গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তালিকা, নির্ঘন্ট, পরিশিষ্ট, ছক, ছবি, সংক্ষিপ্ত বা বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ সংযুক্ত থাকতে পারে। সেগুলো দেখে নেয়া অবশ্য কর্তব্যের মধ্যেই পরে।

এবার বইটি পাঠ করা শুরু করা যেতে পারে।  হাতের কাছে খাতা ও কলম প্রস্তুত অবস্থায় রাখতে হবে। চেয়ার টেবিলে বসে পড়ুন বা বিছানায় শুয়ে পড়ুন- খাতা কলম ছাড়বেন না। বইটি পাঠ করতে করতে যা কিছু আপনার মনোযোগ আকর্ষণ করবে তা লিখে ফেলুন, কোন শব্দ, কোন বাক্য বা কোন অনুচ্ছেদ (প্যারাগ্রাফ) পৃষ্ঠা নম্বরসহ লিখে ফেলুন। আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো খাতায় টুকে নেয়ার জন্য যা কিছু লক্ষ্য করা প্রয়োজন, তা নিম্নরূপঃ
  • ধরণ/ শ্রেণীঃ বইটি শিল্পসাহিত্যের কোন রীতির প্রতিনিধিত্ব করছে তা অনুভব করুন। এটা সাহিত্য, দর্শন,  ভূগোল, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, বিজ্ঞান নাকি শিশুতোষ কোনো বই?
  • দৃষ্টিকোণঃ লেখকের দৃষ্টিকোণ বোঝার চেষ্টা করুন। তিনি কোন অবস্থানে নিজেকে রেখে বইটি লিখেছেন? কোন শ্রেণীর পাঠককে উদ্দেশ্য করে বই রচনা করেছেন?
  • উদ্ধৃতিঃ বইটির কোনো বাক্য বা অনুচ্ছেদ কি আপনার ভালো লেগেছে, মনে অনুরণন তুলেছে, চিন্তায় আলোড়ন তুলেছে? তাহলে সেই অংশটুকু সঙ্গে সঙ্গে খাতায় উর্ধ্বকমার মধ্যে লিখে ফেলুন। পাশে ব্রাকেটের মধ্যে পৃষ্ঠা নম্বর লিখতে ভোলা যাবে না।
  • লেখকের ভঙ্গীঃ লেখক কী প্রথামতো নাকি গল্পের মতো আত্মজীবনীর ভঙ্গীতে বইটি লিখেছেন? যে শ্রেণীর পাঠককে উদ্দেশ্য করে লেখা তাদের জন্য উপযোগী হয়েছে কী?
  • ভাষাঃ বইয়ের ভাষা কি সহজ, সরল, স্পষ্ট, প্রাঞ্জল, সাবলীল নাকি অস্পষ্ট, জটিল, অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহারে ভারাক্রান্ত।
  • পাদটীকা: বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোতে পাদটীকা বা ফুটনোট ব্যবহার করা হয়েছে কি না? উল্লেখযোগ্য টীকাসমূহ পৃষ্ঠার পাশের কলামে অথবা পৃষ্ঠার নিচে ব্যবহার করা হয়। কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে? পাদটীকাতে উল্লেখ করা তথ্য মূল প্রবন্ধের কোনো শব্দ বা বাক্য বা সিদ্ধান্তকে যথাযথ উদাহরণ, বিশ্লেষণ দ্বারা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে কী? ফুটনোটে উল্লেখিত তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য? ফুটনোটে ব্যবহৃত তথ্যগুলোর উৎস ঠিকমতো উল্লেখ করা হয়েছে কি?
  • ম্যাপ, ছবি, ছক ইত্যাদি ব্যবহার করে আলোচ্য গ্রন্থটিকে পাঠকের নিকট অপেক্ষাকৃত সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে কী না? সেগুলো রঙিন নাকি সাদাকালো; ছাপানোর মান স্পষ্ট নাকি দুর্বোধ্য তা খেয়াল করুন।
  • বানানের বিষয়ে লেখকের অবস্থান কীরূপ? তিনি কি তাঁর বইটিকে বানানবিভ্রাটমুক্ত রাখতে পেরেছেন? বানানরীতি হিসেবে তিনি কোন নিয়মকে গ্রহণ করেছেন?
  • লেখক তার ধারণাটিকে কি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে পেরেছেন? কোথাও অস্পষ্ট মনে হচ্ছে না তো? যদি হয়, তাহলে কেন এরকম মনে হচ্ছে বলে মনে করেন?
  • বইয়ে প্রদত্ত ভাষ্য কতটা নিখুঁত? কোন অতিশয়োক্তি বা অসম্পূর্ণতা আপনার চোখে পড়ছে কী?
এবার বইয়ের পর্যালোচনা সমালোচনা বিশ্লেষণ আলোচনা লেখার কাজটি শুরু করা যেতে পারে। বইটি পড়তে পড়তে খাতাতে যে বিষয়গুলো টুকে নিয়েছেন, সেগুলো একবার দেখে নিন, মাথায় গেঁথে নিন। এই অংশটি কিছুটা সৃষ্টিশীল।  এখানে আলোচ্য বইয়ের বিষয় সম্পর্কে আপনার জ্ঞানের গভীরতা, মানবিক বোধ, শব্দভান্ডার, বাক্য গঠনে সামর্থ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ইত্যাদির পরিচয় থাকবে।
  • আলোচনাটির একটি নাম ভাবুন। নামটি প্রথমে দিতে না পারলেও লেখা শেষ করে দিতে পারেন। একটি উপযুক্ত নাম আপনার আলোচনাটিকে পরিচিতি দেবে; অতএব সাবধানে, সুচিন্তিতভাবে নাম পছন্দ করুন। একটি মাত্র শব্দ, দুই বা ততোধিক শব্দ দিয়ে তৈরি শব্দবন্ধ অথবা পুর্ণাঙ্গ একটি বাক্য আপনার সমালোচনাটির শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। নামচয়নে আপনার চিন্তার মৌলিকতা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটান।
  • আলোচ্য বইটির শিরোনাম, লেখকের নাম, প্রকাশকাল, প্রকাশনী, পৃষ্ঠাসংখ্যা, প্রকাশের তারিখ, প্রকাশের স্থান, কততম প্রকাশ বা মুদ্রণ বা সংস্করণ, মূল্য, ISBN এই তথ্যগুলো উল্লেখ করুন।
  • প্রথম বাক্যটিকে আকর্ষণীয় করে লিখুন। শুরুতেই হয়তো কাঙ্ক্ষিত বাক্যটি মাথায় আসবে না। সেজন্য অপেক্ষা করুন। সম্পূর্ণ সমালোচনা লিখে শেষ করার পর প্রথম বাক্যটিকে পুনর্লিখন করতে পারেন।
  • আপনার বলার ভঙ্গী পাল্টাবেন না। অর্থাৎ নির্মোহ বা আড্ডা/ বৈঠকী যে ভঙ্গিতেই শুরু করুন না কেন তা বজায় রাখুন।
  • বইটি আমাদের কী শিক্ষা দেয়। বইটির নিবিড় পাঠ আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়, তার ব্যাখ্যা দিন।
  • সমস্ত বইটির একটি সারসংক্ষেপ উল্লেখ করুন। বইটি একাধিক অনুচ্ছেদ বা অধ্যায়ে বিভক্ত থাকলে প্রত্যেকটা অনুচ্ছেদের সারমর্ম আলাদা আলাদাভাবে বর্ণনা করুন। সারসংক্ষেপ বলতে মূলভাবকে বোঝানো হচ্ছে। একেবারে কয়েক লাইনের সারাংশ হলে হবে না।
  • লেখকের রচিত অন্য কোন বইয়ের সাথে আলোচ্য বইটির ভাষা, বিষয়বস্তু, উপস্থাপন ভঙ্গী ইত্যাদির তুলনা করতে পারেন।
  • একই বিষয়ে অন্য লেখকের লিখিত বইয়ের সাথে আলোচ্য বইটির তুলনামূলক বিচার করা যেতে পারে।
  • একই বই হয়তো অন্য কেউ আলোচনা করেছেন। তার আলোচনার সাথে আপনার নিজের আলোচনা কতটা স্বাতন্ত্রমণ্ডিত  ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তার উল্লেখ করতে পারেন।
  • আপনি জীবনে যতগুলো বই পড়েছেন, তার মধ্যে এই বইটির অবস্থান কোথায়, কেমন লেগেছে, কেন লেগেছে তার বর্ণনা দিতে পারেন।
  • লেখক সম্পর্কে তথ্য দিন। তার সাহিত্যিক জীবন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবন, মানবিক বৈশিষ্ট্য, দার্শনিক বোধ ইত্যাদির উল্লেখ করতে পারেন।
  • যে পাঠক আপনার করা বিশ্লেষণটি পড়ছে, তার বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি ভাবুন। তার চোখ দিয়ে নিজের লেখাটি আরেকবার পড়ুন।
  • বইটি কোন বয়সের বা কোন মানসিকতার পাঠকদের উপযোগী করে রচিত তা উল্লেখ করতে পারেন। তাহলে আপনার আলোচনা পড়ে পাঠকের বই বেছে নিতে সুবিধা হবে।
  • বইটি কি আপনি অন্যদের পড়তে বলবেন? উত্তর যদি ইতিবাচক হয় তাহলে কেন অন্যদেরও এই বই পড়া উচিত তা উদাহরণসহ বর্ণনা করুন। নেতিবাচক হলে তারও ব্যাখ্যা দিন।
  • কোনো বইয়ের কোনো একটি মাত্র উপাদান হয়তো আপনাকে আকৃষ্ট করেছে; সেটাকেই আলোচ্য করে তুলতে পারেন।
  • লেখক এবং লেখকের বই- এই বিষয়দুটোকে সংক্ষিপ্তাকারে উপসংহারে উল্লেখ করুন। সার্বিক বিবেচনায় বইটি সম্পর্কে সংক্ষেপে দুই একটা কথা উল্লেখ করে সমাপ্তি টানুন।
  • প্রথম লিখনে বানান, বাক্য, শব্দচয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভুলত্রুটি থেকে যেতেই পারে। তাই লিখিত আলোচনাটি কয়েকদিন ফেলে রাখুন। দু'চারদিন পর নিজের লেখাটি আবার পড়ুন। কোথায় সংশোধন করতে হবে, তা নিজেই বুঝতে পারবেন। কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আপনজনকে আপনার লেখা আলোচনাটি পড়তে দিতে পারেন। সে আপনার দুর্বলতা অন্যকে জানাবে না। কিন্তু  ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে আপনার রচনাবৈশিষ্ট্যকে আরও নির্ভুল, মার্জিত করে তুলতে পারবে।

গ্রন্থ আলোচনার এই ধাপগুলোর প্রত্যেকটি মেনে চলতে হবে এমন কোন কথা নেই। শুধু খেয়াল রাখুন আপনার আলোচনা যেন বই পরিচিতিতে পর্যবসিত না হয়। এই নির্দেশনামূলক লেখাটিতে কোনো বই সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে যে বিষয়গুলোর দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন তা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি ইচ্ছে করলে এর মধ্যে যে কোনটি বাদ দিতে পারেন অথবা এখানে উল্লেখ করা হয়নি এমন কোন বিষয় আপনি নিজের থেকে বিশ্লেষণ বা বর্ণনা করতে পারেন। আপনার চিন্তার মৌলিকতাকে আড়াল করে রাখবেন না; বরং তার চর্চা করুন।

কোন বিখ্যাত লেখকের বই আলোচনা করতে গিয়ে দ্বিধা বোধ করবেন না। অনেক বিখ্যাত লেখকের খুব সাধারণ মানের বই আছে। আপনি নির্ভার মনে সমালোচনা লিখতে থাকুন। হয়তো দেখা যাবে, আপনি যে বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন, তা লেখকের মাথায় আসেইনি। ব্যক্তিগতভাবে জানাশোনা আছে, কারও প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা বা ঘৃণা আছে, এমন কারও বই সমালোচনা না করা উচিত। কারণ আপনার ব্যক্তিগত আবেগের স্পর্শ লেখাটিকে একপেশে একঘেয়ে করে তুলতে পারে। আপনার লেখার গ্রহণযোগ্যতা তখনই বাড়বে, যখন নির্মোহ অবস্থান থেকে আলোচনা করতে পারবেন। নৈর্ব্যক্তিক হওয়া ততোটা সহজ নয়। চর্চা করুন। ধীরে ধীরে ব্যক্তিনিরপেক্ষ অবস্থান কোনটা তা বুঝতে পারবেন। পাঠক হিসেবে নিজের কথা ভাবুন। কোনো বিশেষ ধরণের বই কি আপনি বেশি পছন্দ করেন? উপন্যাস, গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান বা রোমান্টিক, রহস্যগল্প, গোয়েন্দাগল্প, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, শিশুসাহিত্য কোন একটি বিষয়ে কি আপনি বেশি আগ্রহী? তাহলে প্রাথমিকভাবে শুধু সেই বইগুলো নিয়েই আলোচনা শুরু করে দিন। ধীরে ধীরে আপনার মধ্যে বিশ্লেষণ সামর্থ তৈরি হোক; আলোচনা সমালোচনায় দক্ষ হয়ে উঠুন। তারপর না হয় প্রবন্ধ, গবেষণা গ্রন্থ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

আবারও বলছি গ্রন্থ সমালোচনা করার জন্য আপনার জানার পরিধি, চিন্তাসামর্থ, বিশ্লেষণ দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, পাঠাভ্যাস ইত্যাদিই যথেষ্ট। কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে আটকে রাখা অনুচিত। কুয়োর ব্যাঙের মতো নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে বিচরণ না করে নিজের স্বাধীনচেতনাকে অর্গলমুক্ত করুন। মোদ্দাকথা আপনি যে বইটির আলোচনা করছেন, সেই বইটি সম্পর্কে অন্যকে উৎসাহী করে তোলার মধ্যেই রয়েছে আপনার রচনাসামর্থের কৃতিত্ব।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।