বিভিন্ন রকম লিখন উপাদানের কথা

বিভিন্ন রকম লিখন উপাদানের কথা

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজের মনের ভাব স্থায়ীভাবে রেখে দেবার চেষ্টা করে আসছে। আদিম গুহাবাসী মানুষের পাহাড়-পর্বতের গুহাগাত্রে চিত্রাংকন থেকে এর আরম্ভ। পরবর্তীকালে প্রাচীন এশিয়া,  পারস্য, মিশরীয়সহ সব সভ্যতায় এই প্রচেষ্টা লেখালেখির রূপ লাভ করে। আজ পর্যন্ত মানুষ তার ধারণা, চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস-আবেগ, যুক্তি-বিজ্ঞান বিষয়ে নিজস্ব মত প্রকাশ করছে এবং তা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম লিখন দ্রব্যে লিখতে চেয়েছে।

পাথর: এই বস্তুটি কঠিন প্রাকৃতিক লেখার আঁধার হিসেবে মানুষ সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছে। এর অন্য নাম শিলালিপি। গ্রিক, সিন্ধু, অ্যাসিরিয়, সুমেরীয়, ব্যবিলনীয়, মিশরীয়, পারস্যসহ প্রাচীন সব সভ্যতাতে শিলালিপি ইতিহাস বহনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের প্রাচীন শিলালিপি হলো অশোকের শিলালিপি ও স্তম্ভলিপিগুলো। এগুলোর কোন কোনটি ব্রাহ্মীলিপিতে উৎকীর্ণ। ভারতীয় কবি সোমদেবের ‘হরিকেল’ ও ‘ললিতবিগ্রহ’ নামক নাটক দুটির শিলালিপি রাজস্থানের মিউজিয়ামে আছে।
সবচাইতে বিখ্যাত শিলালিপি হলো রোসেটা পাথর। এর কারণে পৃথিবীর জ্ঞানের ভান্ডারের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ আমাদের কাছে উন্মুক্ত হয়েছে। এর আবিষ্কারের সাথে ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়নের নাম জড়িয়ে আছে। নেপোলিয়ন মিসর অভিযানের এক পর্যায়ে রোসেটা নামক স্থানে ঘাঁটি গাড়লেন। সেটা ১৭৯৯ সাল। এখানে যুদ্ধের প্রয়োজনে ট্রেঞ্চ বা পরিখা খুঁড়তে গিয়ে সৈন্যরা কালো ব্যাসল্টের একটি প্রকাণ্ড পাথর পেয়ে যায়। পাথরের গায়ে নানারকমের আঁকিবুকি খোদাই করে লেখা। সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রকৌশলী বোসার্দ ছিলেন খুব কৌতুহলী যুবক। সেসময়ে মিসরের প্রাচীন লিপি হায়ারোগ্লিফিকস মানুষের কাছে অচেনা ছিল না। সারা পৃথিবীর ভাষাবিজ্ঞানীরা ব্যাপক গবেষণা চালিয়েও এই ভাষার পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। প্রকৌশলী বোসার্দ বিষয়টা জানতেন বলেই পাথরটির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি দেখলেন পাথরটির তিনটি ভাগে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় নানাকিছু লেখা রয়েছে। প্রথম ধাপে ছবি আঁকা মিশরের দুর্বোদ্ধ হায়ারোগ্লিফিকস ভাষা, দ্বিতীয় ধাপে পরবর্তীকালের ডেমোটিক লিপি এবং শেষ ধাপে গ্রীক ভাষায় লেখা আছে। পাথরটি মিসরের রোসেটা নামক স্থানে পাওয়া গেছে বলে এর নাম দেয়া হয় ‘রোসেটা পাথর’। প্রকৌশলী বোসার্দ পাথরটি নেপোলিয়নের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। সংস্কৃতিপ্রেমী নেপোলিয়ন পাথরটির গুরুত্ব বুঝতে ভুল করেননি। তিনি এর অনেকগুলো নিখুঁত ছবি করে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা বিজ্ঞানীদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। মূল পাথরটি পাঠিয়ে দিলেন ফ্রান্সে। ফ্রান্সের বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত জ্যাঁ ফ্রাঁসোয়া শ্যাম্পোলিয় পাথরটি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি গবেষণা চালিয়ে গেলেন। পাথরটির শেষ ধাপের গ্রীক ভাষার বক্তব্যের সাথে তিনি উপরের ধাপদুটির আধা পরিচিত ডেমোটিক ভাষা ও অপরিচিত চিত্রবহুল হায়ারোগ্লিফিকস ভাষার বক্তব্যকে মেলাতে চেষ্টা করলেন। অবশেষে তিনি সফল হলেন। রোসেটা পাথর তার দীর্ঘদিনের মৌনতা ভাংতে বাধ্য হলো। সম্ভব হলো মিসরীয় প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার করা। মিসরীয়রা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে থেকে হায়ারোগ্লিফিকস লেখা আরম্ভ করেছিলো। রোসেটা পাথর লেখা হয়েছে অনেক পরে। ১৯৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। এই সময় মিসরের রাজা ছিলেন টলেমী। তিনি গ্রীক ছিলেন বলেই পাথরটিতে হায়ারোগ্লিফিকস এবং ডেমোটিক লিপির পাশাপাশি গ্রীক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। ফলে বিশ্ববাসী মিসরের প্রাচীন ভাষা হায়ারোগ্লিফিকসের পাঠোদ্ধার করে জানতে পেরেছে অনেক প্রাচীন ইতিহাস। খুলে গেছে অনেক অন্ধকার দরজা।

গাছের বাকল: গাছের বাকলকে কাগজের মতো ব্যবহার করার প্রচলন এক সময় পৃথিবীর সর্বত্রই ছিলো। ভারতবর্ষের মালাবার উপকূলবাসীরা আজও গাছের বাকল লিখন সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করছে।

তুত, বট ও নিমগাছের বাকল, পদ্মপাতা, কলা ও অন্যান্য পাতা: গাছের পাতাকে লিখন উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার প্রথা ছিল প্রাচীন ভারতসহ সারা বিশ্বে। কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম নাটকে শকুন্তলা পদ্মপাতায় দুষ্মন্তকে চিঠি লিখেছিলেন। সাধারণত গাছের পাতায় নখ দিয়ে লেখা হতো। কেতকীপাতায় লেখার কথাও অনেক প্রাচীন সাহিত্য থেকে জানা যায়। এছাড়াও মানুষ বিভিন্ন গাছের পাতা বিভিন্ন সময়ে লিখন উপাদান হিসেবে ব্যাবহার করেছে।

প্যাপিরাস: জার্মান ভাষায় কাগজকে প্যাপিয়ার বলে। পেপার শব্দটি এসেছে প্যাপিরাস থেকে। মিসরের নীল নদের তীরের জলাভূমিতে প্রচুর পরিমানে এই লম্বা গাছগুলো জন্মাতো। এখনো যথেষ্ট জন্মায়। এর গোড়ার দিকের ছালগুলো খুব পাতলা ও মোচার খোলার মতো। এগুলি চওড়া পাথর বা কাঠের উপর রেখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুলতে হয়। এরপর খোলা ছালগুলো খাড়াভাবে পাশাপাশি রেখে আঠা দিয়ে একটার পর একটা জুড়ে দিতে হয়। এরপর কোন ভারী জিনিস দিয়ে চাপ দিয়ে তারপর রোদে শুকিয়ে নিলে এক একটা প্যাপিরাস তৈরি হতো। খ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ৩৫৫০ বৎসর আগে থেকে মিশরে লিখন সামগ্রী হিসেবে প্যাপিরাস ব্যবহৃত হতো।

তালপাতা: ভারতীয়রা সর্বপ্রথম তালপাতা ব্যবহার করতে শেখে। বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারে লিখন উপাদান হিসেবে তালপাতা যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করা হতো। আমাদের দেশের বহু প্রাচীন গ্রন্থ তালপাতার উপর লেখা। এর আকার হতো প্রায় ২ থেকে ৩ ফুট লম্বা এবং ১ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চি চওড়া। দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রতীরে তালপাতা বেশি ব্যবহৃত হতো। প্রথমে শুকিয়ে নিয়ে গরম জলে সিদ্ধ করা হতো। তারপর আবার শুকিয়ে শংখ বা মসৃণ পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে পাতাগুলো পালিশ করা হতো। তালপাতা সাধারণত দুপ্রকার। একটির নাম ‘তাল’ ও অপরটির নাম ‘শ্রীতাল’। শ্রীতালের পাতা কাগজের মতো পাতলা। এটি কালি শুষে নিতো। তাই এর চাহিদা ও মূল্য বেশি ছিলো। এর তৈরি পদ্ধতিও ভিন্নতর। এ পাতা শুকিয়ে গেলে তিনমাস কাদার নিচে পুঁতে রাখতে হতো। তারপর কাদা থেকে তুলে শুকিয়ে ঐ পাতাকে ধোঁয়ার মধ্যে রাখা হতো। দক্ষিণ ভারত ও উড়িষ্যায় প্রথমে ধারালো বা চোখা লেখনী দিয়ে অক্ষর উৎকীর্ণ করা হতো। উত্তর ভারতে তালপাতায় কালি দিয়ে লেখা হতো। প্রাচীন কালের যেসব তালপাতার গ্রন্থ পাওয়া গেছে সেগুলোর অধিকাংশেরই প্রাপ্তিস্থান কাশ্মীর ও নেপাল। তালপাতায় লেখার প্রাচীনতম প্রমান পাওয়া গেছে জাতকে। বুদ্ধের দেহান্তরের পর ত্রিপিটক তালের পাতায় লেখা হয়েছিলো। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও তালপাতায় লেখার কথা আছে। হিউয়েন সাঙ, আবুল ফজল প্রমুখের লেখায় তালপাতার কথা আছে। খ্রিষ্টিয় ২য় শতকে অশ্বঘোষের একখানা নাটক পাওয়া গেছে যা তালপাতায় লেখা।

ভূর্জপত্র: ভূর্জপত্র কোন গাছের পাতা নয়। এটা এক ধরণের গাছের বাকল। হিমালয় অঞ্চলে এই গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। প্রথমে গাছের বাকলের ভিতরের অংশটি বিভিন্ন মাপে কেটে নেয়া হতো। এগুলো দৈর্ঘ্যে ১ গজ ও প্রস্থে ৯ ইঞ্চি পরিমাণ হতো। গাছ থেকে ছাড়ানোর পর তেল মাখিয়ে পালিশ করা হতো। বাকলের ভিতরের অংশকে প্রাচীনকালে ‘লেবার’ বলা হতো। এই লেবার শব্দটি পরবর্তীকালে Libre (লিব্রে) রূপ লাভ করে। এর বাংলা অর্থ বই। লাইব্রেরি শব্দটির মধ্যেও লিব্রে শব্দটি রয়েছে।

ভূর্জপত্রের বই পাতার পর পাতা সাজিয়ে মাঝখানে ছিদ্র করে কাঠের ফলকের মলাট লাগিয়ে সুতো দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। গ্রীক ঐতিহাসিকরা এর কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। মহামতি আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় ভারতে লিখন পত্র হিসেবে ভূর্জপত্রের ব্যাপক ব্যবহার ছিলো। ভারতের কাশ্মীরে ভূর্জপত্রের একাধিক পুঁথি পাওয়া গেছে। ১৮৯২ সালে ভূর্জপত্রে লিখিত একটি প্রাচীন পুঁথি পাওয়া গেছে ভারতের খোটান নামক স্থানে। ‘খরোষ্ঠী’ লিপিতে বৌদ্ধধর্মীয় গ্রন্থ ‘ধর্মপদ’ এর কিছু অংশ নিয়ে এই পুঁথিটি রচিত। পুঁথিটির রচনাকাল খ্রি. ২য় বা ৩য় শতক। খ্রিষ্টিয় ৩য় শতকে রচিত ভূর্জপত্রে লেখা আর একটি সংস্কৃত পুঁথির নাম ‘সংযুক্তাগম’।

কাঠ: প্রাচীন গ্রীস, ব্যবিলন ও চীনে কাঠের তক্তার উপর মোম মাখিয়ে তাতে ধাতুর শলাকা দিয়ে আঁচড় কেটে লেখা হতো। কতগুলো তক্তা একত্র করে যে বই হতো তাকে গ্রীক ভাষায় বলা হতো Codex.

মাটির টালি বা ইট: ব্যবিলনের অধিবাসীরা নিজেদের জ্যেতিষবিদ্যার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছে মাটির টালির উপর। এই রকম কয়েকটি মাটির টালি মিলে এক একটা বই রচনা করা হতো সেকালে। মাটি কাদা অবস্থায় তার উপর লিখে রোদে শুকিয়ে নিয়ে আগুনে পোড়ানো হতো। এভাবে মাটির টালির বই তৈরি করা হতো। এই বইকে Brick of book বলা হতো। ইউরোপের অনেক মিউজিয়ামে এই রকমের ইটের বই রাখা আছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার গোপালপুর গ্রামে অক্ষত অবস্থায় কিছু মাটির টালি পাওয়া গেছে। এতে বৌদ্ধধর্মের অনেকগুলোসূত্র লেখা আছে। এর মাপ ১১ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ ৯১/২ ইঞ্চি। ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপ্রাচীন সভ্যতা মহেঞ্জোদারো থেকেও বেশ কিছু মাটির টালি পাওয়া গেছে। গ্রিস, রোম, মিসরেও মাটির টালি লিখন উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

তুলা ও রেশমজাত বস্ত্র: একে পট, পটিকা ইত্যাদি বলে। বেশি টেকসই নয় বলে খুব পুরনো পাওয়া যায়নি। তুলা ও রেশমজাত বস্ত্রের উপর লেখার জন্য কাপড়ের উপর ভাত বা ময়দার মাড় বেশি করে মাখিয়ে নিয়ে শুকিয়ে শংখ বা পাথর দিয়ে পালিশ করে নেয়া হতো। ভারতের মহীশূর অঞ্চলে তেতুলের বীজ গুঁড়া করে আঠা বানিয়ে কাপড়ে লাগানো হতো। তারপর কালো রং করে সাদা চক দিয়ে লেখা হতো। প্রতিদিনের হিসাব রাখতে কাপড়ের প্রচলন বেশি ছিলো। আসামে তুলাপটের ব্যাপক প্রচলন ছিল। রেশমী কাপড়ে লেখা একটি রাজবংশ লতিকা ভারতের নগরকোট দূর্গে আছে। এটি বিখ্যাত পরিব্রাজক আলবেরুণী দেখেছিলেন। চীনেও কাপড়ের তৈরি লিখন দ্রব্যের ব্যবহার ছিল।

হাতির দাঁত: প্রাচীন গ্রিস, মায়ানমার ও ভারতে হাতির দাঁতকে পাতের সাইজে কেটে নিয়ে তাতে খোদাই করে লেখা হতো। অন্য একটি পদ্ধতিতে পাতগুলো কালো রং করে তার উপর সোনা বা রূপার জল ঢালাই করে বর্ণ লেখা হতো।

তুলট কাগজ: আমরা জানি ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে চীনে কাগজ আবিষ্কার হয়। কিন্তু এর আগেই ভারতে তুলট কাগজ আবিষ্কার হয়েছিলো। এটা মুলত হাতে তৈরি কাগজ, হালকা হলুদ রঙের। তুলো, হরিতাল ইত্যাদি দিয়ে এই কাগজ তৈরি হতো। দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের সেনাপতি ‘নিয়ারকোস’ ৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ভারতে এসেছিলেন। তিনি এই কাগজ ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করতে দেখেছিলেন। চীনা পরিব্রাজক ইৎসিং ৭ম শতকে ভারতে এটি দেখেছেন। তবে সর্বপ্রাচীন পাওয়া গেছে ৫ম শতকের। মধ্যযুগে ভারতের মোগল সম্রাটরা এর ব্যাপক ব্যবহার করতেন। একবার সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে শিয়ালকোটে ১ বছরে ৯ লাখ টাকার কাগজ তৈরি হয়েছিলো। কাগজ প্রস্তুতকারকরা ছেঁড়া কাপড়, পাট ও শনকে চুনের পানিতে ২-৯ দিন ডুবিয়ে রাখতেন। তারপর ধুয়ে মণ্ড তৈরি করতেন; এই মণ্ডকে মসৃণ পাথর দিয়ে ঘষে কাগজের মতো পাতলা আকার দেয়া হতো। তেতুলের বীজের গুঁড়ো, চাউলের লেই মিশিয়ে তুলট কাগজকে মসৃণ করা হতো।

জীবজন্তুর চামড়া: পৃথিবীর অনেক স্থানে জীবজন্তুর চামড়া লিখন দ্রব্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই এই লিখন উপাদানটি দুই প্রকার।

পার্চমেন্ট ও ভেলাম: পার্চমেন্ট ও ভেলাম উভয়ই পশুর চামড়ার তৈরি লিখন সামগ্রী। সত্যিকার অর্থে পার্চমেন্ট ভেড়া অথবা ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি হয়। অপর দিকে ভেলাম তৈরি হয় ছোট বাছুড়ের চামড়া দিয়ে। খ্রিষ্টের জন্মের ১৫০০ বছর পূর্বেও পার্চমেন্ট লিখন সামগ্রী হিসেবে পরিচিত ছিলো। এশিয়া মাইনর অঞ্চলের ‘পারগামাম’ নামক অঞ্চলে চামড়াকে লিখন উপাদান হিসেবে ব্যবহারের পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়।
ভেলাম একই নামের এক প্রকার পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি হয়। এটি পার্চমেন্টের চেয়েও মসৃণ এবং বাহ্যিক দিক থেকে অধিকতর সাদা। সবচেয়ে ভালো ভেলাম তৈরি হতো অপ্রাপ্তবয়স্ক বাছুড়ের চামড়া থেকে। বৈজ্ঞানিক দিক থেকে চামড়া দুভাগে বিভক্ত। উপরের অংশের নাম ‘এপিডামিস’ ও নিচের অংশের নাম ‘ডামিস’। ভেলাম তৈরিতে গোটা চামড়া ও পার্চমেন্ট তৈরিতে শুধু ডামিস ব্যবহার করা হতো।

কাগজ: কাগজ শব্দটি এসেছে প্যাপিরাস শব্দ থেকে। প্যাপিরাস এর প্রতিশব্দ পেপার (Paper)। বাংলায় একে বলা হয় কাগজ। আজকের দিনে আমরা যাকে কাগজ বলি তার জন্ম হয়েছিলো যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ১০০ বছর পরে। চীনারা সর্বপ্রথম কাঠ থেকে কাগজ আবিষ্কার করে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার আঁশ থেকেও কাগজ তৈরি হয়। আনুমানিক ১০৫ খ্রিষ্টাব্দে চীনে সর্বপ্রথম কাগজ তৈরি শুরু হয়। আধুনিক কালে কাঠ, বাঁশ, আখের ছোবড়া ইত্যাদি দিয়ে কাগজ তৈরি করা হয়।

ধাতু: বিভিন্ন রকম ধাতু মানুষ যুগে যুগে কালে কালে ব্যবহার করেছে। সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে কোন স্মরণীয় লেখা ধাতু দিয়ে লিখে স্থায়ী করার চেষ্টা আধুনিককালেও দেখা যায়। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ধাতু লিখন দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সোনা: এটি মূল্যবান ধাতু হবার কারণে ধর্মীয় বা রাজার অনুশাসন, জমির দলিল, পত্র বা নীতিকথা এতে লিখিত হতো। সোনার পাতের উপর লেখা উপকরণকে ‘সুবর্ণপট’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। জাতকের কাহিনীগুলো মধ্যে সুবর্ণপটের উল্লেখ আছে। তক্ষশীলার গঙ্গু নামক স্থানে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম খরোষ্ঠী লিপিতে লেখা একটি সুবর্ণপট উদ্ধার করেছিলেন।

রূপা: প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার তক্ষশিলায় রূপার উপর লেখা দুটি পাত পাওয়া গেছে। ভারতের আজমীরের জৈন মন্দির থেকে ধর্মীয় মন্ত্র লেখা বেশ কিছু সংখ্যক রূপার পাত পাওয়া গেছে। অনেকসময় তালপাতার পুঁথিতে রূপার জলে লেখা হতো।

তামা: এগুলোকে তাম্রশাসন, তাম্রফলক, তাম্রলিপি ইত্যাদি বলা হয়। ভারতের প্রাচীনতম তাম্রশাসন ‘সগৌরা’। ভূমিদান ও বৃত্তিদান এই তাম্রফলকে লেখা হতো। বালির ছাঁচে লিপি উৎকীর্ণ করে গলিত তামা ঢালাই করা হতো। এছাড়াও হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে বাটাল দিয়ে খোদাই করে তামার পাতের উপরে লেখা হতো। মৌর্য শাসকেরা তাম্র ফলকের ব্যবহার বেশি করেছিলেন। বিজয়নগর, শ্রীলংকা, মায়ানমার প্রভৃতি অঞ্চলে তাম্রপাতে লেখার প্রচলন ছিলো। সম্রাট মহামতি অশোক অসংখ্য তাম্রফলক সরকারি আদেশ প্রচারের কাছে ব্যবহার করেছিলেন।

সীসা: সীসা পিটিয়ে পাতে পরিণত করে তাতে লিপি খোদাই করা হতো। দলিল, স্মরণীয় বাণী ইত্যাদি খোদাই করার জন্য এই রকম পাত ব্যবহার করার রীতি ছিল।

পিতল: পিতলের উপর খোদাই করে লেখার প্রচলন ছিল প্রাচীন রোমে। বিভিন্ন জৈন মন্দিরে মূর্তির বেদীতে পবিত্র মন্ত্র লেখা একাধিক পিতলের পাত পাওয়া গেছে। সেকালে পিতল দিয়ে কোমরের বেল্টের বকলেস কিংবা তলোয়ারের অলংকরণ করা হতো।

টিন: বৌদ্ধদেবের একটি পুঁথি টিনের পাতে লেখা হয়েছিলো। এটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে আছে।

কচ্ছপের খোল: অপ্রচলিত হলেও এর বেশ কয়েকটি নমুনা ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত আছে।

মানুষ অন্যান্য প্রাণীদের মতো ভাবনাহীন, ভাষাহীন নয়। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে সচেতনভাবে চিন্তা করতে পারে এবং সেই চিন্তার গুরুত্ব ও স্থায়ীত্ব বিচার করতে পারে। তাই যুগে যুগে মানুষের চিন্তার স্থায়ীত্ব ও গুরুত্ব অনুযায়ী লিখন উপাদান ও প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হয়েছে। অপেক্ষাকৃত ভালো লিখন উপাদানের জন্য মানুষের গবেষণার অন্ত নেই। আধুনিক যুগে মানুষ কলম দিয়ে লেখার যুগ পিছনে ফেলে প্রবেশ করেছে কম্পিউটারের যুগে। নিজের লেখাকে শত শত বৎসর স্থায়ী করার জন্য আবিস্কৃত হয়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মান রয়েছে সি.ডি., মাইক্রোফিল্ম ইত্যাদির। এরপরও আরো ভালো লিখন উপাদান ও মাধ্যমের জন্য মানুষের তৃষ্ণা কমেনি। সন্ধানী মানুষ কুসংস্কার ও অপবিশ্বাসের ফাঁদে নিজেদেরকে বন্দী করে রাখে না। তাই নতুন পথ-মত-প্রযুক্তি-আবিষ্কার মানুষের হাজার বছর ধরে গড়ে তোলা কৃতিত্বকে চিরভাস্বর করে রাখবে- আজকের সামাজিক বাস্তবতায় বিজ্ঞান সচেতন মানুষেরা এটাই প্রত্যাশা করে।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। বিস্তারিতভাবে কিছু জানাতে চাইলে এখানে ক্লিক করে ই-মেইল করুন।