‘তারারা’ পত্রিকা যাঁদের নিয়ে এমন এমন আয়োজন করেন, যাঁরা প্রতিভার উজ্জ্বল শিখরে থেকেও প্রচারের আড়ালে থেকে যান। এরকমই একজন ব্যক্তিত্ব বিমলকুমার টোপ্পো প্রখ্যাত আদিবাসী (ওরাওঁ জনজাতির) কবি, গল্পকার ও নাট্যকার। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ২০ মার্চ ১৯৫০ সালে, লস্কর পাড়া, বারবিশা, থানা কুমারগ্রামে, জেলা জলপাইগুড়ি, বর্তমানে আলিপুরদুয়ারে। প্রায় ২৪ টি প্রবন্ধের বই দুটি ছোটগল্পের বই, বারটি নাটক, অসংখ্য কবিতা এবং ছোটগল্প লিখেছেন। বহু বৈচিত্র্যময় তাঁর জীবনের স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর লেখাগুলিতে। তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য জীবন ও আত্মদর্শনের অভিমুখ তুলে ধরেছেন এই বিশেষ সংখ্যাটিতে। সুতরাং সবদিক থেকেই সংকলনটি একটি মূল্যবান সংখ্যা হয়ে উঠেছে।
সম্পাদকীয়র মূল বক্তব্যে বলা হয়েছে বিমলকুমার টোপ্পো ও কুরুখ ভাষার কদর সম্পর্কে। তাঁর জীবনযাপন অত্যন্ত সাধারণ হলেও তাঁর সাহিত্যকর্ম অত্যন্ত উচ্চমানের। বিমলকুমার টোপ্পোর নিজের মাতৃভাষা 'কুরুখ' ভাষার প্রতি unwavering (অটুট) ভালোবাসা এবং সেই ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়ার সাহসিকতাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। অনেক সময় সমাজের উঁচুতলার মানুষ বা তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ মাতৃভাষাকে অবহেলা করলেও, বিমলকুমার টোপ্পো কুরুখ ভাষাকেই তাঁর সৃষ্টির মাধ্যম বানিয়ে একে সাহিত্যের বৃহত্তর অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওরাওঁ জনজাতির কুরুখ ভাষা সম্পর্কে অন্যভাষী পাঠকদের সম্পূর্ণ ধারণা না থাকলেও, বিমলকুমার টোপ্পোর কিছু বিখ্যাত ছোটগল্পের বাংলা অনুবাদ এই সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—বাঙালি ও অন্যান্য ভাষাভাষী পাঠকরা যেন তাঁর লেখার স্বাদ ও গভীরতা অনুভব করতে পারেন, যা প্রতিবেশী হিসেবে এক দারুণ সুযোগ ও প্রাপ্তি।
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ আছে,‘তারারা’ পত্রিকা তার সূলগ্ন থেকেই আলোর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার যে প্রত্যয় নিয়েছিল, তা বজায় রাখার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশে অনুমতি দেওয়ায় এবং সার্বিক সহযোগিতার জন্য বিমলকুমার টোপ্পো ও পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত পর্দার পেছনের সকল কুশীলব ও পাঠকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিমলকুমার টোপ্পোর অসাধারণ সাহিত্যকৃতি, তাঁর মাতৃভাষা 'কুরুখ'-এর প্রচার ও প্রসার এবং উপজাতি সংস্কৃতির সঙ্গে মূলধারার সাহিত্যকে যুক্ত করার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সজাগ ভাবনাই এই সম্পাদকীয়র মূল বক্তব্য।
অভিজিৎ ভৌমিকের নেওয়া সাক্ষাৎকারটিতে (‘ফুটবলের হুইশল বাজলেই যার মন ছটফট করে’), লেখক: কবি ও সাহিত্যিক বিমলকুমার টোপ্পো সম্পর্কে যে সমস্ত পরিচয় ও তথ্য পাওয়া যায়, তা নিচে পয়েন্ট আকারে দিলাম :
সাহিত্যিক পরিচয় ও কৃতি:
তিনি কুড়ুখ ভাষার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। তাঁর প্রণীত নাটক, ছোটগল্প ঝাড়খণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। তাঁর কিছু লেখার মধ্যে খেলাধুলার প্রসঙ্গ ও ফুটবল খেলার উল্লেখ রয়েছে (যেমন— ‘কার্গিল নে পুকারা’ হিন্দি নাটক)। এ ছাড়াও তাঁর কুড়ুখ ভাষায় লেখা বিখ্যাত কয়েকটি ছোটগল্পের বাংলা ভাষায় ভাবানুবাদ রয়েছে।
খেলাধুলা ও ফুটবল প্রীতি:
তিনি প্রচণ্ড ফুটবলপ্রেমী এবং একসময়ের ফুটবলার ও মিডফিল্ডার ছিলেন। তিনি একজন সার্টিফাইড রেফারি বা জাজ হিসেবেও ফুটবল খেলা পরিচালনা ও খেলোয়ার হিসেবে মাঠ কাঁপিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও স্মৃতি:
তাঁর চোখের চিকিৎসা চলছিল। ছাত্রজীবনে ও প্রবাসজীবনে (কালিম্পং, ডাবগ্রাম, কোচবিহার ইত্যাদি এলাকায়) তিনি বিভিন্ন স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন এবং খেলাধুলার নানা স্মৃতিময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
'হারিয়ে ফেলা নিজেকে খোঁজার তাগিদে' — স্বাগতা বিশ্বাস কর্তৃক সাহিত্যিক বিমলকুমার টোপ্পোর সাক্ষাৎকারটি বিশ্লেষণ করলে তাঁর জীবনদর্শন, সাহিত্যচিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।
মানুষ গড়ার কারিগর:
বিমলকুমার টোপ্পো কেবল জীবিকার জন্য শিক্ষকতা করেননি, একে তিনি একটি মহৎ দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, প্রতিদিনের ক্ষুদ্র প্রয়োজন মেটানোই জীবনের সব নয়; মানুষ গড়ার তৃপ্তি এক বিরাট জগৎ।
সহজ সরল জীবনবোধ:
সাধারণ মানুষের জীবনের ছোটো ছোটো ঘটনা, দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ ও সরল সংলাপকে তিনি তাঁর সাহিত্য ও নাটকের উপাদান করেছেন। তিনি অহংকারমুক্ত এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য।
মাতৃভাষায় সৃষ্টির তাগিদ:
মাতৃভাষায় কথা বলার মানুষ কম থাকায় এবং চোখের সামনে তার অস্তিত্ব হারিয়ে যেতে বসার বেদনা থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু।
কুরুখ ভাষার চর্চা ও বিস্তার:
নিজস্ব কুরুখ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। তিনি মনে করেন, উপজাতীয় বা আদিবাসী সমাজের জীবনযাত্রা, কৃষ্টি ও ইতিহাস নিজের ভাষায় তুলে ধরার অধিকার ও দায়বদ্ধতা তাঁদেরই রয়েছে। এই ভাষার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং একদিন এটি বৃহত্তর সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মনেও তৃপ্তি আনবে বলে তিনি আশাবাদী।
লেখালিখির উৎস ও প্রেরণা:
ভেতরের বিবেক এবং আত্মিক তাগিদই তাঁকে লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ করে। আদিবাসী জীবনের নানা ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সংস্কৃতি তাঁকে সৃষ্টির প্রেরণা জোগায়।
সাহিত্যের লক্ষ্য ও দায়বদ্ধতা:
তাঁর মতে, লেখকের লেখা যেন সমাজে কোনো ভুল বার্তা না পাঠায়। সাহিত্যের মূল কাজ হলো সমাজের কুসংস্কার, কুপ্রথা, অশিক্ষা, অন্ধবিশ্বাস, এবং মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়-অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং মানুষকে শিক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানানো।
কালজয়ী সাহিত্য:
বিমলকুমার টোপ্পোর মতে, যে লেখকের লেখায়
কালের মানুষ মহাকালের রসদ পাবেন, প্রতি মুহূর্তে তাঁর লেখা থেকে উত্তরণের নির্দেশনা পাবেন
— সেই জাতীয় লেখাকেই কালজয়ী বলা চলে।
বাস্তবমুখী ও সৎ সাহিত্য:
তিনি বিশ্বাস করেন কঠিন বা জটিল ভাষা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের সহজ ভাষা দিয়েই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো সম্ভব। তাঁর সাহিত্য মূলত প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
কৃতজ্ঞতাবোধ ও সাফল্য:
জীবনের নানা পুরস্কার ও সম্মাননাকে তিনি বড় করে না দেখে মূলত কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন। সাহচর্যে পাওয়া তাঁর গুরু রামরাজ হেমরম এবং পরিবারের সদস্যদের অবদান তিনি সবসময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বিমলকুমার টোপ্পোর জীবনদর্শন হলো মাটি ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা, এবং সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করে এক মানবিক ও সুশিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার নিরলস প্রয়াস।
এই সংখ্যায় প্রচুর লেখা আছে যা বিমলকুমার টোপ্পোকে চিনিয়ে দিতে পারবে। তাঁর নিজের লেখা গল্প এবং তাঁকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ, সব মিলিয়েই সংখ্যাটি মনে রাখার মতো।
**********
তারারা
একাদশ বর্ষ। প্রথম সংখ্যা, মার্চ ২০২৬
বিশেষ সংখ্যা: বিমল কুমার টোপ্পো
সম্পাদক
আশুতোষ বিশ্বাস
সহ-সম্পাদক
স্বাগতা বিশ্বাস

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম