দশটি নান্দনিক প্রচ্ছদ পরিচিতি - সুশান্ত বর্মণ

১০টি বাংলা বইয়ের নান্দনিক প্রচ্ছদ পরিচিতি


‘গ্রন্থগত' ওয়েবসাইটের উদ্যোগে আজকের আয়োজন বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে। বই আমাদের জীবনপথের অন্যতম সহায়ক। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে রূপ পাল্টালেও বইয়ের আবেদন ম্লান হয়নি। কারণ বই অতীতের জ্ঞানকে ভবিষ্যতে পৌঁছে দেয়। বইয়ের হাত ধরে সভ্যতা এগিয়েছে। বইয়ের পথ বেয়ে চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। বইয়ের পদযাত্রা পাথর, মাটির ফলকের যুগ পেরিয়ে যখন পার্চমেন্ট, তালপাতা, কাপড়, ভূর্জপত্রের যুগে প্রবেশ করে তখন তার শরীরে যোগ হয় এক নতুন অনুষঙ্গের। বইকে নিরাপদ রাখতে এর দুপাশে পাতলা কাঠ ব্যবহার শুরু হয়। পাঠ্য পত্রগুলোকে একখানে গুছিয়ে রাখতে সবগুলোকে কাপড় বা চামড়ার মোড়কে আবদ্ধ করা হয়। এসব ছিল সেকালের বইয়ের মলাট।

ধীরে ধীরে শুরু হয় বইয়ের বহিরঙ্গের এই উপাদানগুলো অলংকরণের কাজ। বইয়ের দুপাশে থাকা কাঠের তক্তা এবং সূচনাপত্রসহ অন্যান্য পাতায় সূক্ষ্মদর্শী মানুষ নিজেদের নান্দনিক ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে লাগলেন। বইয়ের মলাটে, সূচনাপৃষ্ঠায় ধারালো শলাকার খোদাই, রঙিন কালি, সোনা-তামার সূক্ষ্ম কাজ সজ্জিত যে অলংকরণ থাকে তার নাম 'প্রচ্ছদ'। মানুষের চিন্তা ও চরিত্রের প্রতিচ্ছবি যেমন মুখাবয়বে ফুটে ওঠে, একইভাবে বইয়ের মূল ভাববস্তু অবয়ব পায় প্রচ্ছদপটে। গ্রন্থস্তুপে আলাদাভাবে নির্দিষ্ট অন্বেষনকে বিশেষায়িত করে প্রচ্ছদ। বিশ্বের সবচেয়ে নান্দনিক অবয়ব হল প্রচ্ছদ। এর চেয়ে সুন্দর আর কী আছে?

বই রচনার পাশাপাশি লেখক নিরন্তর প্রচ্ছদ নিয়ে ভেবে চলেন। ইচ্ছাডানায় ভর করে কল্পিত দৃশ্যপটকে সবিনয়ে প্রকাশ করেন শিল্পীর কাছে। লেখকের প্রত্যাশার সাথে প্রচ্ছদশিল্পী মিশিয়ে দেন নিজের মনের রঙ। লেখকের অব্যক্ত দৃশ্যশৈলীকে চাক্ষুষ রূপ দান করেন। তৈরি হয় চিত্রকলার আরেকটি শাখা 'বইয়ের প্রচ্ছদ'। 

লেখক কখনও কখনও শিল্পীর ইচ্ছার উপরে নিজের আশার ভার ছেড়ে দেন। বইয়ের আদ্যান্ত পাঠ ও অনুধাবন শেষে শিল্পী সিদ্ধান্ত নেন। নিজের জীবন ও জিজ্ঞাসাবোধের সাথে এক অপার্থিব সংযোগ ঘটিয়ে হাতে তুলে নেন রঙিন তুলি। বই রূপ পায় এক বর্ণিল আনন্দের। লেখক ও শিল্পীর যৌথ সহযোগ তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনা। কোন কোন বইয়ের হাজার পাঠকের মনোযোগ কেড়ে নেয়ার প্রধান কৃতিত্ব প্রচ্ছদশিল্পীর। আর তাই, চিন্তাশৈলীতে সৃজনশীল প্রচ্ছদশিল্পী গড়ে তোলেন নিজের স্বতন্ত্র ভূবন ও পরিচিতি।

হাতে লেখার যুগ পেরিয়ে ছাপাখানার যুগে প্রবেশ করার সাথে সাথে বই প্রকাশের হার বাড়ে। নতুন নতুন লেখক ও বইয়ের জন্ম হয়। বেড়ে যায় প্রচ্ছদের বর্ণিল বৈচিত্র্য ও বহু রকমের ভঙ্গিমা। ব্লক, লিথোগ্রাফ, এচিং প্রভৃতি পদ্ধতি পেরিয়ে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে প্রচ্ছদশিল্প। প্রচ্ছদের আবেদন ও মূর্তিমানতা হয়েছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক বই হাতে নিয়ে অথবা নেয়ার আগে প্রথমেই তাকায় প্রচ্ছদের দিকে, মনোযোগী হয়। আলোচ্য বিষয়কে বুঝে নিতে চায় কয়েক পলকে।

পাঠককে প্রভাবিত করতে প্রচ্ছদশৈলীর ভূমিকাই প্রধান। যিনি বিষয়নিষ্ঠ পাঠক তিনিও বই হাতে নিয়ে প্রচ্ছদকে অনুভব করতে চান, বুঝতে চান। প্রবাদ আছে 'একটি ছবি শতটি বাক্যের সমান।' ফলে একটি প্রচ্ছদচিত্রে বইয়ের সমস্ত আবেগ, অভিজ্ঞতার সম্মিলন ঘটে। এ যেন স্বল্পের মাঝে বিরাটের ব্যঞ্জনা। তবে সবসময় প্রচ্ছদশিল্পী লেখকের ইচ্ছাকে নিজের অভিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে প্রচ্ছদে ছড়িয়ে দিতে পারেন তা নয়। আবার বইয়ের ভাববস্তু শিল্পীর হৃদয়ে যে ভাবসঙ্গতি তৈরি করে তা কখনও কখনও যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন না প্রচ্ছদপটে। লেখকের কল্পনাতীত ইচ্ছা ও প্রকাশকের টানটান অর্থনীতি দুয়ে মিলে কখনও কখনও প্রচ্ছদচিত্র শিল্পীর মানসসঞ্জাত নাও হতে পারে।

শুধু বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে বাংলা ভাষায় আলোচনা সমালোচনার পরিমাণ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। বই নিয়ে আলোচনা সমালোচনার কাজ 'গ্রন্থগত' শুরু করেছে ২০১৮ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে। এর পর বাংলা বই রিভিউয়ের কাজ অনেকে শুরু করেছে। কেউ থেমে গেছে, কেউ এগিয়ে গেছে। সময়ের চাহিদা মেটাতে এখন ভিডিও মাধ্যমে অনেকে বই রিভিউয়ের কাজ শুরু করেছে। কিন্তু বইয়ের 'প্রচ্ছদ রিভিউ' যে আরেকটি বই সম্পর্কিত আলোচনার বিষয় হতে পারে, তা আমরা অনেকেই বুঝি না। পরিবারে, বন্ধুমহলে শুধু বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়েও যে আলোচনা করা যায় তা অনেকে জানে না। গ্রন্থগত ওয়েবসাইট এবারে শুরু করেছে শুধু প্রচ্ছদ নিয়ে আলোচনা। প্রচ্ছদ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে প্রচ্ছদ রিভিউয়ের এই আয়োজনে সকলকে স্বাগতম।

সৃষ্টিশীল লেখক ও প্রচ্ছদশিল্পী এই দুইয়ের দৃশ্যমান মিলন ঘটানোর লক্ষ্যে 'গ্রন্থগত' ওয়েবসাইটে বিভিন্ন শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী একাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ছবিসহ প্রকাশ করা শুরু হল। এই উদ্দেশ্যে, এখন থেকে অনিয়মিত হলেও 'প্রচ্ছদ' শীর্ষক বিভাগকে আঁকড়ে ধরে একাধিক প্রকারের বইয়ের আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ প্রকাশ করা হবে। কবিতা, গল্প, ইতিহাস, দর্শন, ভ্রমণ, জীবনী, বিজ্ঞান, প্রবন্ধ, শিশুতোষ প্রভৃতি প্রসঙ্গের পাশাপাশি একজন লেখকের একাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ; এমনকি একই রঙের প্রচ্ছদকেও আলোচ্য করা যেতে পারে।

তবে, সব ক্ষেত্রেই মৌলিক প্রচ্ছদকে প্রাধান্য দেয়া হবে। হাতে আঁকার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে আঁকা শৈল্পিক সৃজনকেও আমরা স্বীকৃতি দিতে চাই। মর্যাদা দিতে চাই প্রচ্ছদ শিল্পীর সৃষ্টিশীল হৃদয়কে। সম্মানিত করতে চাই তাঁর সুকুমার ভাবনার মানসস্বরূপকে।

সাম্প্রতিককালে প্রচ্ছদ নিয়ে বাংলাভাষায় আলোচনার পরিমাণ বেড়েছে। ইদানীং বিভিন্ন আয়োজনে প্রচ্ছদশিল্পীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রচলন হয়েছে। সাক্ষাৎকারসমূহে সমকালীন প্রচ্ছদশিল্পচর্চার ইতিহাস, আঙ্গিক, বৈচিত্র প্রভৃতি উঠে আসছে। প্রচ্ছদশিল্পীরা আলোচনা করছেন। তাদের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন। বহুবর্ণা পৃথিবী ও ক্লান্ত বিকেল সমান বৈপরীত্য নিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়। পাঠক আগ্রহী হয় প্রচ্ছদের সামাজিক স্বরূপ নিয়ে।

একটি ছবি শতটি বাক্যের সমান
১০টি বইয়ের প্রচ্ছদ দিয়ে সাজানো আজকের আয়োজন বাংলা ভাষায় বই আলোচনা সমালোচনার ধারায় প্রচ্ছদশিল্পকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করার প্রত্যাশায় উপস্থাপিত হল। আজ এই রচনার মাধ্যমে 'গ্রন্থগত' ওয়েবসাইট অনলাইনে লেখা ও ছবির যৌথ মিলনে ওয়েব ভিত্তিক ডিজিটাল উপাদান হিসেবে বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ধারার সুচনা করা হল। আজকের এই উপস্থাপনের শুরুতে আধুনিক বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পের পথিকৃত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলাদেশ অঞ্চলে প্রচ্ছদশিল্পের অগ্রদূত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নাল আবেদীন ও আবুল কাশেমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। স্মরণ করছি কাইয়ুম চৌধুরী, কামরুল হাসান, হাশেম খান, রফিকুন্নবী, ধ্রুব এষ প্রমুখ মেধাবী ও কীর্তিমান প্রচ্ছদশিল্পীগণকে। এরা দেশভাগের পরে বাংলাদেশ অংশে শুরু হওয়া প্রচ্ছদকর্মকে সমৃদ্ধ করতে উদ্যোমী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলা সাহিত্য এদের আঁকা প্রচ্ছদের রঙিন রেখা বাঙালি পাঠকের হৃদয় রাঙিয়ে তুলেছে। বাংলা ভাষার প্রকাশনাশিল্প পেয়েছে নতুন উচ্চতা। একালের কয়েকজন প্রচ্ছদশিল্পী হলেন সব্যসাচী হাজরা, রাজীব দত্ত, নির্ঝর নৈঃশব্দ, শিবু কুমার শীল, চারু পিন্টু, রাশেদুন্নবী সবুজ প্রমুখ। এই তুমুল তরুণ শিল্পীগণ আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচ্ছদশিল্পের অন্যতম অশ্বারোহী। তাদের আলতো ছোঁয়ায় ছলকে ওঠা রঙের ছটা রূপ পায় অপার পিক্সেলে। 


প্রচ্ছদচিত্র নিয়ে প্রথম আয়োজনে ১০টি আলোচিত বইয়ের প্রচ্ছদ আলোচনা ও সংক্ষিপ্ত বিবৃতি


পঞ্চতন্ত্র- সৈয়দ মুজতবা আলী বইয়ের প্রচ্ছদ

(১) পঞ্চতন্ত্র- সৈয়দ মুজতবা আলী

প্রচ্ছদশিল্পী: রঘুনাথ গোস্বামী

১৯৫২ সালে প্রথম প্রকাশ ঘটে। দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল তখন। এখন দুই খণ্ড একত্রে পাওয়া যায়। অধিকাংশ লেখা রবিবারের 'বসুমতি' ও সাপ্তাহিক 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রচ্ছদ এঁকেছেন রঘুনাথ গোস্বামী। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে 'পঞ্চতন্ত্র' নামে একটি উপদেশমূলক কাহিনীগ্রন্থ আছে। নামটি সেখান থেকে নেয়া হলেও সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন আত্মজীবনীমূলক ভ্রমণ কথা। সেক্ষেত্রে বহুবিধ প্রকারের বিচিত্র মানুষ তার গল্পে প্রাণ পেয়েছে।

প্রচ্ছদশিল্পী রঘুনাথ গোস্বামী বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কথা ভেবেই সম্ভবত প্রচ্ছদে পাঁচ রকমের মানুষের অবয়ব তুলে ধরেছেন। আঙ্গিক হিসেবে ব্রিটিশ আমলের ব্লকে ছাপা অংকন ভঙ্গিকে ব্যবহার করেছেন। 


ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ বইয়র প্রচ্ছদচিত্র

(২) ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি- সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ

প্রচ্ছদশিল্পী: আবুল আজাদ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত বই। ছড়া প্রসঙ্গে তত্ত্ব ও ইতিবৃত্ত, লোকছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবন, ধর্ম, সংস্কার, আচার, উৎসব, রাজনৈতিক ঘটনা, শিল্পচর্চা, বিনোদন প্রভৃতি বইটির প্রধান আলোচ্য।

আলোচ্য বিষয়, প্রসঙ্গ ও সাংস্কৃতিক অনুধাবনের প্রতিফলন ঘটেছে আবুল আজাদ অংকিত প্রচ্ছদে। বইয়ের প্রিন্টার্স লাইনে উল্লেখ আছে যে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর আঁকা সেঁজুতি ব্রতের আলপনা অনুকরণে প্রচ্ছদটি অংকন করা হয়েছে। বাংলার ছড়া, রূপকথার আমেজে শিশুদের হাতে আঁকা লোকজ অংকনভঙ্গি, চিহ্ন, মানুষ ও গাছপালার অবয়ব প্রচ্ছদটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে রঙের ব্যবহারের শিল্পীকে আরও সতর্ক থাকতে হত। কারণ লেখকের নামের রঙ প্রচ্ছদের শরীরের মূল গাঢ় রঙের সাথে প্রায় মিশে গেছে।


নিরন্তর পুরুষভাবনা- আকিমুন রহমান বইয়ের প্রচ্ছদ

(৩) নিরন্তর পুরুষভাবনা- আকিমুন রহমান

প্রচ্ছদশিল্পী: নাজির আহমেদ


নারী লেখকদের রচিত রোমাঞ্চ উপন্যাসে পুরুষদের ভাবমূর্তি কেমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তার আলোচনা রয়েছে আকিমুন রহমান রচিত 'নিরন্তর পুরুষভাবনা' বইয়ে। রোমেনা আফাজ রচিত 'দস্যু বনহুর' উপন্যাস লেখকের প্রধান বিবেচ্য। নারীর চোখে পুরুষের আচরণ, মানসিকতা, ভাবনাপদ্ধতি কেমনভাবে ধরা পরে তা তিনি অন্বেষণ করেছেন?

নারী যেন জানে, পুরুষের ভাবনায় নারীর অবয়ব অথবা পুরুষের চোখে নারীর উপস্থিতি- এই রূপকল্পকে একত্রিত করে প্রচ্ছদ এঁকেছেন নাজির আহমেদ। বৃত্তাবদ্ধ জীবনের ছায়ায় নারী কি পুরুষকে শুধু একজন লোভাতুর হিসেবে চিহ্নিত করে, নাকি নারী হয়ে ওঠে এক সৃষ্টিশীল, শক্তিময়ী প্রভাবক- প্রচ্ছদশিল্পী নাজির আহমেদ এইসব প্রশ্ন খুঁজেছেন তার প্রচ্ছদচিন্তায়।


বঙ্গভাষা ও সাহিত্য – দীনেশচন্দ্র সেন বইয়ের প্রচ্ছদ

(৪) বঙ্গভাষা ও সাহিত্য – দীনেশচন্দ্র সেন

প্রচ্ছদশিল্পী: অমিয় ভট্টাচার্য


১৯০১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষা ও লিপির উৎপত্তি, সংস্কৃত, প্রাকৃত, বিভিন্ন যুগভাগ, চৈতন্য সাহিত্য ও চৈতন্যযুগ প্রভৃতি বিষয়ে আকরগ্রন্থ।

বিষয়ের প্রাচীনত্বকে প্রাধান্য দিয়ে প্রচ্ছদ এঁকেছেন অমিয় ভট্টাচার্য। বাংলাদেশের প্রাচীন মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ টেরাকোটা ব্যবহার করে প্রচ্ছদচিত্র অংকিত হয়েছে। বইয়ের প্রসঙ্গ ও গভীরতাকে বিবেচনায় নিলে প্রচ্ছদটিকে যথার্থ বলতেই হবে।


মানুষের ঠিকানা - অমল দাশগুপ্ত বইয়ের প্রচ্ছদ

(৫) মানুষের ঠিকানা - অমল দাশগুপ্ত

প্রচ্ছদশিল্পী: সমর মজুমদার


এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন, বিকাশ, পরিযায়ন, সমাজ তৈরি, অস্ত্র উদ্ভাবন, ভাষা, নগর সভ্যতার উদ্ভাবন, লিপির আবিষ্কার প্রভৃতি মানবীয় প্রসঙ্গ আলোচনার বই। প্রকাশকাল ১৯৯১।

জীব হিসেবে মানুষের টিকে থাকার ইতিহাস, বিরূপ প্রকৃতিতে নিজের লড়াই, খাদ্য ও আশ্রয় সংগ্রহের ঐতিহাসিক বিবরণকে মাথায় রেখে সমর মজুমদার তৈরি করেছেন মার্জিত প্রচ্ছদটি।

হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত সীলগুলো থেকে সংগৃহীত একজন শিকারীর ছবি প্রচ্ছদের প্রধান উপাদান। এই একটিমাত্র ছবি দিয়েই প্রচ্ছদশিল্পী বইয়ের আলোচনা মানুষের হাজার বছরের টিকে থাকার লড়াইকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।

জার্মানীর জার্নাল- সৈয়দ আবুল মকসুদ বইয়ের প্রচ্ছদচিত্র

(৬) জার্মানীর জার্নাল- সৈয়দ আবুল মকসুদ

প্রচ্ছদশিল্পী: কাইয়ুম চৌধুরী


১৯৭৯ সালের জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী মাসে সৈয়দ আবুল মকসুদ জার্মানী ভ্রমণ করেছিলেন। জার্মানীর বার্লিন, বন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ প্রভৃতি শহরের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা বইয়ের প্রধান আলোচ্য। পাশাপাশি লন্ডন ও আসা যাওয়ার পথের বিরতিস্থান দিল্লীর অভিজ্ঞতা লেখক আগ্রহভরে বিবৃত করেছেন।

প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী প্রচ্ছদ আঁকতে গিয়ে কোন শহরের কোন দেশকে সামনে আনেননি। বইয়ের নামকে প্রাধান্য দিয়ে হাতের লেখায় ডায়রির পাতার ছবিকে প্রচ্ছদে বিবেচনা করেছেন। পাশাপাশি শহরের ছবির মত একটি বিমূর্ত চিত্র প্রচ্ছদের নিচে রেখে দিয়ে নগরের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। বেশি কিছু না, ডায়েরির পাতায় হস্তলিপি ও নগরের হেলানো বিমূর্ত অবয়ব একটি আধুনিক নাগরিক সভ্যতা ভ্রমণের অনুকৃতি তৈরি করেছে প্রচ্ছদের শরীরজুড়ে।

 

(৭) টেরি ঈগলটন সাহিত্যতত্ত্ব - অনুবাদ: খোন্দকার আশরাফ হোসেন

প্রচ্ছদ করেছেন উত্তম সেন


পোস্টমডার্নিজম ধারাকে একেবারে তুলোধুনো করেছেন টেরি ঈগলটন। প্রশ্ন ছুঁড়েছেন- যে সমাজ আধুনিকতার দেখা পায়নি, সেই সমাজে উত্তরাধুনিকতাবাদের অর্থ কী বোঝায়? তার জনপ্রিয় বই Literary Theory: An Introduction বইয়ের বাংলা অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত লিটলম্যাগ 'একবিংশ' এর সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক খোন্দকার আশরাফ হোসেন।

প্রচ্ছদ করেছেন উত্তম সেন। সাহিত্যতত্ত্বের নিগুঢ় ব্যাখ্যাকে রঙের কোমলতায় ও লিপির ভঙ্গিমায় প্রকাশ করেছেন। গাছের পাতার শিরা-উপশিরার ডিজাইনের পটভূমিতে লালমাটির কাদারঙের ছটা দিয়ে চিন্তার গভীরতাকে বুঝিয়েছেন কী? নৈঃশব্দ কি প্রচ্ছদচিত্রে ফুটে উঠছে না? রঙভরা চতুষ্কোণগুলো হয়তো বর্গাকার চিন্তার প্রতিচ্ছবি। প্রচ্ছদের নীচে একই রঙের একটি গতিশীল তুলির টান তত্ত্বের গতিময়তাকে বোঝায় কী?


ইউরোপের ভাস্কর্য- অশোক মিত্র বইয়ের প্রচ্ছদ

(৮) ইউরোপের ভাস্কর্য- অশোক মিত্র

প্রচ্ছদশিল্পী: সন্তোষ দত্ত


১৯৯২ সালে প্রকাশিত বইয়ে লেখক ইউরোপ মহাদেশে ভাস্কর্য শিল্পের বিকাশের ইতিহাস, রীতিবৈশিষ্ট্য প্রভৃতি আলোচনা করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে মিশর, পশ্চিম এশিয়া, মেসোপটেমিয়া, সুমের, আক্কাদ, ব্যবিলন, ক্রীটসভ্যতাসহ মহেঞ্জোদারো হরপ্পা সভ্যতার ভাস্কর্য নিয়েও আলোচনা করেছেন।

মাইকেল এঞ্জেলো তৈরি করেছিলেন এক অমর প্রস্তরকাব্য 'পিয়েটা'। কুমারী মাতা মেরীর কোলে পূর্ণবয়স্ক ক্রুশবিদ্ধ প্রাণহীন নিথর যীশুর অন্তিম শয়ান। এই একটি ভাস্কর্য ইউরোপের ধ্রুপদী যুগের ভাস্কর্যশিল্পের অনন্য উদাহরণ। তাই শিল্পী সন্তোষ দত্ত এই 'পিয়েটা'র চিত্রকেই প্রচ্ছদের প্রধান অবয়ব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।


প্রাচীন ভারতীয় লিপিমালা - গৌরিশঙ্কর হীরাচাঁদ ওঝা বইয়ের প্রচ্ছদ

(৯) প্রাচীন ভারতীয় লিপিমালা - গৌরিশঙ্কর হীরাচাঁদ ওঝা

প্রচ্ছদশিল্পী: মামুন কায়সার


১৯১৮ সালে রায়বাহাদুর পণ্ডিত গৌরীশঙ্কর হীরাচাঁদ ওঝা হিন্দি ভাষায় গ্রন্থটি রচনা করেন। ভারতবর্ষে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষার লিপির উদ্ভব, নক্‌শা, বিকাশ, পাঠজ্ঞান বইয়ের আলোচ্য বিষয়। ব্রাহ্মীলিপি, খরোষ্ঠীলিপি, গুপ্তলিপি, কলিঙ্গলিপি, কুটিললিপি, নাগরীলিপি, বাংলালিপিসহ দক্ষিণ পশ্চিম ভারতের তেলেগু, কনাড়ীলিপি, শারদা (কাশ্মীরী) লিপি, তামিল লিপিসহ ভারতীয় ভাষাগোষ্ঠীর বিস্তারিত বিবরণ বইয়ের প্রাণ। ১৯৮৯ সালে অধ্যাপক শ্রীমণীন্দ্রনাথ হায়দারকৃত বাংলা অনুবাদ বাংলা একাডেমী প্রকাশ করে।

প্রচ্ছদশিল্পী মামুন কায়সার প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় বইয়ের আলোচ্য প্রসঙ্গকে প্রাধান্য দিয়ে লিপিবৈচিত্রকে গ্রহণ করেছেন। বইয়ের নাম, লেখক ও অনুবাদকের নাম হস্তলিপিশৈলীতে উপস্থাপন করেছেন। প্রচ্ছদ পরিকল্পনাটি একারণে বাস্তবানুগ মনে হয়েছে। হালকা নীল রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা রঙে বিভিন্ন ভাষার বর্ণের এলোমেলো সজ্জা একটি ভাষাবহুল কোলাজ তৈরি করেছে। বইয়ের শিরোনাম গাঢ় রঙের হওয়ায় সহজে পড়া যায়।


বিজ্ঞানে শব্দের কথা - আবুল আব্বাস খন্দকার বইয়ের প্রচ্ছদ

(১০) বিজ্ঞানে শব্দের কথা - আবুল আব্বাস খন্দকার

প্রচ্ছদশিল্পী: কাজী হাসান হাবীব


আমাদের কান প্রকৃতির যে রহস্যটি অনুধাবন করার জন্য কাজ করে, তা হল শব্দ বা ধ্বনি। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শব্দ কী? আমরা কী করে শব্দ তৈরি ও অনুধাবন করি, অন্যান্য প্রাণীর শব্দ, শব্দের ঢেউ বা তরঙ্গ, শব্দের সেতু বাতাস, তরল পদার্থ ও কঠিন পদার্থে শব্দের তরঙ্গ যেভাবে কাজ করে, শব্দের গঠন, শব্দচিহ্ন, শব্দতরঙ্গের বিভিন্ন ধর্ম প্রভৃতি নিয়ে আলোচনার এই বই প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৮৪ সালে।

বিষয়কে মাথায় রেখে শব্দের ঢেউয়ের বক্রতাকে প্রচ্ছদ হিসেবে অংকন করেছেন প্রচ্ছদশিল্পী কাজী হাসান হাবীব। বোঝা যায় শব্দের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে তিনি নিজের কল্পনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিজ্ঞানমনস্কতার বাইরে গিয়ে তিনি শব্দকে অতীন্দ্রিয় কিছু মনে করেননি। শব্দের যে বিজ্ঞানসম্মত ইন্দ্রিয়জ রূপ সেখানে শব্দতরঙ্গ সমানভাবে ক্রিয়াশীল। অতএব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং ইন্দ্রিয়াতীত শব্দরেখার অবয়ব প্রচ্ছদে ফুটে উঠবে সেটাই যেন প্রচ্ছদশিল্পীর চোখে স্বাভাবিক।


উপসংহার

দশটি বইয়ের প্রচ্ছদ-আলোচনার এই আয়োজনের মাধ্যমে গ্রন্থগত ওয়েবসাইটের উদ্যোগে বাংলা ভাষায় বইয়ের প্রচ্ছদ-আলোচনার নতুন ধারার সূচনা হল। আজকের আলোচিত বইগুলো দৈবচয়ন ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে। কোনরকম বিষয় বা লেখক ভিত্তিক বাছাই বা নির্বাচন প্রক্রিয়া এক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়নি। বই উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও কোন শ্রেণীবিন্যাস অনুসরণ করা হয়নি।

বইপ্রেমী পাঠককে প্রচ্ছদ আলোচনার এই ধারাটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে আরও নতুন নতুন প্রচ্ছদপটকে উপজীব্য করে তোলা হবে। বহু বিচিত্র দৃষ্টিকোণ ও শ্রেণীকরণ অনুযায়ী বাংলা ভাষায় প্রচ্ছদচিত্রচর্চার এই ধারা বহমান থাকলে পাঠক সমাজ বইয়ের শৈল্পিক সৌন্দর্যকে সহৃদয়তার সাথে অনুভব করতে শিখবে। নান্দনিক নৈকট্যে ঘটা আত্মিক সংযোগ গড়ে তুলবে এক মননশীল মার্জিত সমাজ।


~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~

বাংলা ভাষায় বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে অনলাইনে পাওয়া কয়েকটি কার্যক্রম-


~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~

# প্রচ্ছদকর্ম: ১০টি বইয়ের প্রচ্ছদচিত্র প্রদান করাতে মনোহারী প্রচ্ছদটি তৈরি করে দিয়েছে chatgpt

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ