অস্তিত্বের গাণিতিক জ্যামিতি ও ছায়াপৃথিবীর অনুবাদ: চঞ্চল নাঈমের ‘ছায়ার ভোঁ’ | ফজলুল করিম

চঞ্চল নাঈমের ‘ছায়ার ভোঁ’ কাব্যের প্রচ্ছদ

 

আধুনিক বাংলা কবিতার মূলধারা যখন রূপক ও প্রতীকের প্রচলিত অলংকারে স্বস্তি খোঁজে, চঞ্চল নাঈম তখন তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'ছায়ার ভোঁ'-তে নির্মাণ করেন এক সম্পূর্ণ নতুন ভাষার সমান্তরাল মহাবিশ্ব। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এই বইটি সময়, অস্তিত্ব, শূন্যতা এবং মানুষের অন্তর্গূঢ় মনস্তত্ত্বের এক দীর্ঘ ধ্যানমগ্ন অম্লান নথি। চঞ্চল নাঈমের কবিতায় জীবনের বিচিত্র ঘাত-প্রতিঘাত, গাণিতিক অনুষঙ্গ এবং ছায়া রূপকের এমন সমন্বয় ঘটেছে যা পাঠককে মুহূর্তেই দৈনন্দিন বাস্তবের পারাপার পেরিয়ে এক আত্মবীক্ষণধর্মী নির্জনতার মুখোমুখি করে দাঁড় করায়।

বইটির উৎসর্গপত্র থেকেই কবি চঞ্চল নাঈমের ইতিহাসচেতনা ও প্রজন্মগত সংবেদনশীলতার এক স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়। তিনি আশি দশকের ভাষানির্মাতা, নব্বইয়ের অন্তর্গত অস্থিরতা, শূন্য দশকের নতুন স্বপ্ন, দ্বিতীয় দশকের প্রশ্ন-প্রতিরোধ এবং তৃতীয় দশকের সম্ভাবনাময় পথিকদের প্রতি এই বই উৎসর্গ করেছেন— যাঁদের শব্দে যুগের স্পন্দন ধরা পড়ে। এই উৎসর্গ হয়ে উঠেছে কাব্যভাষাকে সময়ের প্রেক্ষিতে দেখার এবং আধুনিক কবিতার ঐতিহ্যবাহী উত্তরাধিকারকে ধারণ করার এক আন্তরিক রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রয়াস।

‘ছায়ার ভোঁ’ কাব্যগ্রন্থের প্রধানতম অবলম্বন হলো ছায়া। ফ্রয়েডীয় অবচেতন-তত্ত্ব ও ইউংগীয় মনস্তত্ত্বের আলোকে ছায়া যেমন অবচেতন মনের এক প্রতিচ্ছবি, চঞ্চল নাঈমের কাছে ছায়া তেমনই এক স্বয়ংশাসিত সত্তা। ‘ছায়ার অনুবাদক’ কবিতায় কবি লিখছেন, 

আমার ছায়া আমার থেকে ভালো অনুবাদ করে
সে জানে আলোকে কীভাবে ভাঙতে হয়, পড়তে হয়।

ছায়াকে আলোর প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে আলো ভাঙার এক অনুভবী সত্ত্বা হিসেবে দেখার এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা বইটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। কবি মনে করেন মানুষের আসল আকৃতি তার ছায়ার বাঁকা বিকৃতির ভেতরেই নিভৃতে প্রকাশ পায়। আবার ‘জীবিত ছায়া’ কিংবা ‘ছায়ার ব্যক্তিগত জীবন’ কবিতায় দেখা যায় ছায়াটি মূল মানুষের চেয়েও বেশি জীবিত হয়ে উঠেছে। মধ্যাহ্নের কড়া রোদে অতিরিক্ত সত্যের চাপে যেমন সরলতা সংকুচিত হয়, ঠিক তেমনি আলোর বাড়াবাড়িতেও ছায়ার মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরের গূঢ় গোপনতাকে বাঁচিয়ে রাখে।

গ্রন্থটির আরেকটি অনন্য ও বৈপ্লবিক দিক হলো কবিতার ভাষায় গণিত, সংখ্যাবিজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক এককের নিবিড় প্রয়োগ। আধুনিক কবিরা সচরাচর শুকনো গণিতকে কবিতার কোমল অনুভূতির বাইরে রাখেন, কিন্তু চঞ্চল নাঈম দেখিয়েছেন সংখ্যা ও গণিতের মধ্যেও অনুভূতির এক বিস্ময়কর জগৎ তৈরি হতে পারে। ‘বিদ্যুৎ বিল’ কবিতায় কবির উচ্চারণ— 

মিটার রিডার
বোধ হয় ভুল করে
আমার ঘরের বদলে
আমার ভেতরটা মেপে গেছে।

আবেগের তীব্রতাকে বৈদ্যুতিক এককে (কিলোওয়াট) মেপে নেওয়ার এই অসংলগ্ন আধুনিকতা পাঠকে স্তব্ধ করে দেয়। একইভাবে ‘শতকরা হার ভালোবাসা’ কবিতায় মানুষ যখন বলে “শতভাগ বিশ্বাস করি”, কবি তখন প্রশ্ন তোলেন ভালোবাসার শতকরা ৭২% হওয়ার সম্ভাবনার দিকে। ‘সংখ্যার কবরস্থান’, ‘সংখ্যা-শ্রমিক’, কিংবা ‘রেখাংশ’— প্রতিটি কবিতাতেই গাণিতিক পরিভাষা কেবল কাঠামোগত বিষয় হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে মানুষের নৈসঙ্গ, বিচ্ছেদ ও বিষাদের এক একটি করুণ দীর্ঘশ্বাস।

চঞ্চল নাঈম কবিতার আঙ্গিক ও ভাষার ব্যবহারে এক অপূর্ব পরিমিতিবোধ ও সংক্ষেপণের চর্চা করেছেন। ‘ডট’ বা ‘সুঁইয়ের ছিদ্র’-এর মতো কবিতায় কবি স্বল্প বাক্যে যে বিশাল তাৎপর্য ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। বাক্যের শেষে বা শুরুতে একটি মাত্র ডট যে কীভাবে নীরব সংকেত কিংবা অসমাপ্ত ভাবনার নীরব বাহক হতে পারে, তা তাঁর চোখ এড়িয়ে যায় না। তিনি ক্ষুদ্রতার গুরুত্ব অনুভব করেন। সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে নিস্তব্ধ সুতা পেরোনোর মতো করেই জীবনের নানা জটিলতা মসৃণ সেলাইয়ে রূপ নেয়। এই সংযত ভাষা ও প্রতীকী সংক্ষিপ্ততা তাঁর কবিতাকে একধরনের ধ্রুপদী প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে।

বইটির বেশ কয়েকটি কবিতায় প্রকৃতির রূপক এবং মানুষের ভেতরের গোপন ক্ষতের চমৎকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ রয়েছে। ‘নদীর ব্যক্তিগত জীবন’ কবিতায় আমরা দেখি, নদী যেমন পাথরের আঘাত নীরবতায় সহ্য করে উপর থেকে শান্ত থাকে, মানুষও তেমন তার হাসির নিচে ব্যক্তিগত ভাঙনের ইতিহাস লুকিয়ে রাখে। আবার ‘মেঘের আদালত’ কিংবা ‘বাতাসের জীবনী’ কবিতায় প্রকৃতিকে নাগরিক জীবনের যন্ত্রবানের বিপরীতে এক মুক্ত স্বাধীন ও শাশ্বত বিচারক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। 'ভুলের জাদুঘর' কবিতায় কবি জীবনের সাফল্য নয়, বরং ভুলগুলোকে সশ্রদ্ধভাবে তুলে ধরেছেন। ভুল সময়ের সাক্ষাৎ, অসমাপ্ত চিঠি কিংবা জ্যামিতির বাইরে থাকা অসম্পূর্ণ জীবনকেই তিনি জীবনের আসল সৌন্দর্য বলে মনে করেন; কারণ নিখুঁত হিসাবের ভেতরে যে বিস্ময়ের কোনো জায়গা থাকে না, সে কথাই কবি স্পষ্ট রূপক তুলে ধরে পাঠককে জানিয়ে দেন।

প্রচ্ছদ ও অলংকরণের ক্ষেত্রে গ্রন্থটি বাড়তি নজর কাড়ে। প্রচ্ছদে রাজীব দত্তের সুচারু কাজ এবং গ্রন্থের ভেতরে কবি চঞ্চল নাঈমের আঁকা নিজস্ব রেখাচিত্র বইটিকে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছে। ভেতরের রেখাচিত্রগুলোতে চোখ বা পাখির অবয়ব সমন্বিত এক বিষাদময় উদ্ভিদের আকৃতি কবিতার ভেতরের রূপক ও ভাবনার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘ছায়ার ভোঁ’ গ্রন্থটি তাই রেখা ও শব্দের জুগলবন্দিতে এক রহস্যময় দৃশ্যভুবনে ডুব দেওয়ার অভিজ্ঞতা দেয়।

পরিশেষে বলা যায়, চঞ্চল নাঈমের ‘ছায়ার ভোঁ’ কাব্যগ্রন্থটি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার এক অনন্য সংযোজন। দৈনন্দিন জীবনের অন্তরালে জমে থাকা নীরবতা, হারিয়ে যাওয়া সময়, ছায়ার রহস্য এবং গাণিতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে তিনি আধুনিক মানবসত্তার যে চিত্র এঁকেছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। কবির ভাষায় পরম সত্য হলো অসম্পূর্ণতা ও অনবরত অনুসন্ধানের আনন্দ। ২৪০ টাকা মূল্যের এই বইটি প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমী ও চিন্তাশীল পাঠকের সংগ্রহের তাক সমৃদ্ধ করবে এবং পাঠককে নিজের ছায়ার সাথে নিভৃতে সংলাপে বসতে বাধ্য করবে।

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ