জন্মদিনের উপহার - তামান্না সেতু

জন্মদিনের উপহার - তামান্না সেতু

জন্মদিনের উপহার
তামান্না সেতু

প্রকাশনী: পাললিক সৌরভ, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ: ২০১৬
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাব্য  কারিম
পৃষ্ঠা: ১৫, মূল্য: ৮০টাকা
ISBN: 978-984-92359-2-7


খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রসঙ্গ, কিন্তু প্রায়ই প্রকাশ্যে অনুচ্চারিত থেকে যায় এমন একটি বিষয় নিয়ে এই বই "জন্মদিনের উপহার"। লেখক তামান্না সেতু খুব সচেতনভাবে বিষয় নির্বাচন করেছেন। বাংলা ভাষায় শিশু কিশোরদের জন্য তাদের নিজস্ব সমস্যার বিষয় নিয়ে বই খুব বেশি বোধহয় নেই।

শিশুদেরকে আদর করতে গিয়ে অনেকেই থামতে চায় না। যা পর্যবসিত হয়ে পরে শারীরিক নির্যাতনে। শিশুদের এই বিষয়টা জানা থাকা দরকার। কোন আদর ভালো আদর, কোন আদর মন্দ আদর তা চেনা প্রয়োজন। শরীরের যে অংশগুলো ব্যক্তিগত অংশ, সেখানে যে অন্যের বিনানুমতিতে হাত দেয়ার অধিকার নেই, ভালো আদর কিরকম অবস্থায় গেলে মন্দ আদর হয়ে যায়- এরকম বহু প্রয়োজনীয় বিষয় লেখক স্বল্প কথায় সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

সমকালীন উন্নাসিক সমাজে শারীরিক নির্যাতনের এই প্রসঙ্গটি আলোচনা দূরে থাক উচ্চারণ করাই কঠিন। লেখক এ বিষয়ে পূর্ণ সচেতন। তাই তিনি আশ্রয় নিয়েছেন গল্পের। গল্পের ঢঙে কন্যাশিশুর প্রতি মায়ের ভাষ্যে প্রয়োজনীয় যা কিছু বলার তা "জন্মদিনের উপহার" বইয়ে সম্পূর্ণ করেই বলতে পেরেছেন। সহজ, সরল শব্দে, সাবলীল ভাষায় তার গল্প বলার ভঙ্গিটি বেশ আকর্ষণীয়।

'পল্লিবালা' নামে ছোট্ট একটি মেয়ের আজ আট বৎসর বয়স পূর্ণ হল। তার জন্মদিনের উপহার হিসেবে তার মা তাকে আদর করে; খেলা করে। জন্মদিনের উপহার হিসেবে তার মা তাকে শেখায় সামাজিক সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি ও তার সমাধান। কন্যা শিশুদের বিপদের মাত্রা অনেক বেশি। তবে পুরুষ শিশুরাও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। নারী-পুরুষ দুই ধরণের শিশুদেরকে সামাজিক এই অনাচার সম্পর্কে শৈশবেই যদি সাবধান করে দেয়া যায়, তাহলে বিপদের মাত্রা কম থাকে। সে নিজেই দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পারবে 'থামো'। না থামলে সে বুঝতে পারবে এটা একটি 'মন্দ খেলা বা আদরে' পর্যবসিত হয়েছে। অতএব এখন খুব জোরে চীৎকার করতে হবে। আশেপাশের মানুষকে ডাকতে হবে, নির্ভয়ে জানাতে হবে। বিষয়টি আইনী অপরাধের মাত্রায় চলে গেছে এটা শিশুটিকে বুঝতে হবে।

লেখক সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাই গল্পের ভঙ্গিতে মা-বাবার সাথে কথোপকথনের ভাষ্যে বর্ণনা করেছেন। লেখক বিষয়ের গভীরতায় আন্তরিক, তাই তার বর্ণনা কোথাও হোঁচট খায়নি। খুব সাবলীল গতিতেই গল্প এগিয়ে চলে।
মানব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিচিতির চিত্র

শরীরের কোন অঙ্গে আদর করা যাবেনা বোঝার জন্য অঙ্গগুলো চেনা প্রয়োজন। আলোচনা শুরুর আগেই শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির পরিচয় শেখানোর জন্য একটি ছবি ছাপানো হয়েছে। লেখক আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক অবস্থান থেকে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের তথ্যবহুল ছবিটি প্রকাশ করেছেন। এই ছবি  শিশুদেরকে নিজের শরীর চিনতে সাহায্য করবে। এক ছোট্ট মেয়ের অবয়বে প্রকাশিত ছবিটি এত মজার যে শিশুরা খুব পছন্দ করবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। ছবিটির প্রচার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে আমরা পূনঃপ্রকাশ করলাম।

লেখক শিশুদেরকে ভালোবাসেন, তাদের মতো করে জগতকে দেখার পদ্ধতি জানেন, তাদের মনোজগতকে চেনেন; আর তাই বইয়ের পাতায় পাতায় বিভিন্ন আকর্ষণীয় তথ্যবহুল ছবির স্কেচ ছাপিয়েছেন। পেন্সিল দিয়ে ছবিগুলোতে রঙ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। গল্পের মাধ্যমে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় শেখা, আবার একই বইয়ের ছবিগুলোতে রঙ করার সুযোগ পাওয়া - এমন অধিকার পেলে যে কোন শিশু খুশি হবে, সেই বইয়ের প্রতি তার আগ্রহ ভালোলাগা তৈরি হবে। লেখক তামান্না সেতু খুব সচেতনভাবে উদ্দেশ্য নিয়ে এ কাজটি যে করেছেন তা বলাই বাহুল্য।

জন্মদিনের উপহার” বইটির ব্যাপক প্রচার ও প্রসার প্রত্যাশা করি। লেখক সচেতন বিজ্ঞানমনস্ক চেতনা থেকে এরকম আরও শিক্ষামূলক বই লিখুক। লেখালেখিতে তিনি আরও নিয়মিত হোন, তাহলে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক শিশুসাহিত্য সমৃদ্ধ হবে। তাঁর মানবিক মননের সান্নিধ্য আমাদের চিন্তাজগতকেও আলোকিত করবে। প্রকাশক পাললিক সৌরভকে এরকম প্রয়োজনী মূল্যবান বই উপহার দেবার জন্য অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।