বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস - ফজলুল কাদের কাদেরী, অনুবাদ - দাউদ হোসেন

বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস - ফজলুল কাদের কাদেরী, অনুবাদ - দাউদ হোসেন

'বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস' বইটি হঠাৎ করেই পুরনো বইয়ের দোকানে পেয়ে গেলাম। মাত্র ৫০ টাকাতে কেনার সুযোগ পাওয়ায় নিজেকে বেশ সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। মূল ক্রেতা কেন যে বইটিকে পুরনো বইয়ের দোকানে বিক্রি করে দিয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছেনা। কারণ বইটি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দলিল হিসেবে দেশপ্রেমিক বিদগ্ধজনদের নিকট পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায় যে সব খবরাখবর প্রকাশিত হয়েছিল তার বেশিরভাগ এই বইটিতে সংকলিত হয়েছে।এই বই সকল দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের অবশ্যপাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবী রাখে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ভাষায়। পরে তা বাংলাতে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়। বইটি সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য নিচে এর বাংলা সংস্করণের মুখবন্ধ প্রকাশ করলাম।

বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস

মূল সংগ্রহ ও সম্পাদনা: ফজলুল কাদের কাদেরী
বাংলা অনুবাদ সম্পাদনা: দাউদ হোসেন
বইটি প্রথমে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ সালে।
পরবর্তীতে বাংলায় অনুবাদ প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে।


মুখবন্ধ
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বর্বরতম ও নির্মম গণহত্যার কয়েকটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব। কিন্তু ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের ২৫শে মার্চের রাত থেকে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর বর্বর সৈন্যরা বাংলাদেশের নিরস্ত্র ও নিরপরাধ জনগণের ওপর যে সন্ত্রাস আর নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা ভয়াবহতা আর উগ্রতার সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের এই করুণ ঘটনাবলী সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র ও জনমতের প্রতিক্রিয়া কি ছিল তারই তথ্যসমৃদ্ধ প্রমাণ পাঠকদের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে নজিরবিহীন রক্তপাত আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, জনসাধারণের আত্মত্যাগ, নিদারুণ যন্ত্রণা, দুর্দশা আর দুর্ভোগ, তাদের আত্মবিশ্বাস আর আস্থা, বীরত্ব আর সাহসিকতাই ছিনিয়ে এনেছিল চূড়ান্ত বিজয় আর গৌরব। সেসময় বাংলাদেশের ওপর প্রচণ্ড ঘুর্ণিঝড়ের মতো ঘটে যাচ্ছিল এসব ঘটনা এবং দূর থেকে স্পর্শ করছিল গোটা বিশ্বকে। সেই অন্ধকারময় দিনগুলোতে বিদেশী পত্রপত্রিকা ও জার্নালগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ধারাবহিক বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মিছিল-সমাবেশ আর বক্তৃতা-বিবৃতির প্রতিধ্বনি উঠে এসেছে এসব জ্বলন্ত প্রতিবেদনে। কূটনৈতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তার দোসরদের পরিচালিত গণহত্যা আর স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম সম্পর্কে তাদের মনোভাবও তুলে ধরার প্রয়াস চালানো হয়েছে এই সংকলনে।

আরও কয়েকটি কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছি আমি। বাংলাদেশের জনগণ, তাদের দুর্দশা আর স্বাধীনতা সংগ্রামের খবর বা তথ্য সম্পর্কিত কোন পত্রিকা অথবা জার্নাল সেসময় বাংলাদেশের দখলীকৃত অঞ্চলের মধ্যে রাখাটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, প্রায় অসম্ভবই বলা যায়। এসব পত্রপত্রিকা যাতে দেশের ভেতরে না আসতে পারে এজন্য নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিল পাকিস্তান সরকার, যে কোন আকারে এসব খবরের প্রচারও ছিল নিষিদ্ধ। এধরনের খবরের ছিটেফোঁটাও বাইরে প্রচার করার ব্যাপারে বিদেশী কূটনৈতিক মিশনগুলোর ওর রাখা হয়েছিল কড়া নজর। সংবাদ মাধ্যমগুলোর ওপর এসব কড়াকড়ি আরোপ সত্ত্বেও সাংবাদিক বন্ধুরাসহ আমরা অল্প কয়েকজন যুদ্ধ সম্পর্কিত তথ্য জোগাড় করতে থাকি। ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দে এপ্রিলের পর থেকে বাংলাদেশের ভেতরে বসে যতটা সম্ভব খবরাখবর সংগ্রহ শুরু করি আমরা। শুধুমাত্র অল্পকিছু সংবাদপত্র আর জার্নালই নয়, কূটনৈতিক দূতাবাসগুলোতে কর্মরত আমার কিছু বন্ধুরাও বেশকিছু গোপন তথ্য দিয়েছে আমাকে। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি ও মার্কিন সরকারের মনোভাব সম্পর্কে আমার মতোই আগ্রহী ছিলেন অনেকেই। মার্কিন দূতাবাসের প্রেস সেকশনের গোপন ফাইল থেকে এসব নিউজ আইটেম সংগ্রহ করতে সক্ষম হই আমরা। ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের ২৫শে মার্চের ঘটনাবলী সম্পর্কে ওয়াশিংটনে গোপন রিপোর্ট পাঠান ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনসাল-জেনারেল আর্থার কে ব্লাড। এই রিপোর্টটিও আমাদের হাতে আসে। এ ধরনের সকল রিপোর্টই বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে এই প্রকাশনার কাজ চালাতে থাকি আমি। আমাদের মধ্যে কারও কারও নাম সন্দেহভাজনদের তালিকায় ছিল। ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল যে কোন সময়। পরমাকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের প্রাক্কালেই আল বদরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন আমার বন্ধু নাজমুল হক, নিজামুদ্দীন আহমেদ এবং সিরাজুদ্দীন হোসেন। ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ না করলে এই বইটি প্রকাশ করার জন্য হয়তো বেঁচে থাকতাম না আমরাও। প্রতিনিয়ত এসব তথ্য প্রমাণ নিজের কাছে রাখাটা অস্ত্র কিংবা বিস্ফোরক রাখার চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না। এসব তথ্য-প্রমাণ হাতে আসার সাথে সাথেই কয়েক কপি টাইপ করে সেগুলোর ছবি তুলে রাখতাম আমরা। স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হত বাকি কপিগুলো। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মনোভাব সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করা, তাদের মনোবল বাড়ানো এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা। এসব সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে অনেকগুলো এর আগে গেরিলা বুলেটিন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিশেষে আমি আরও কিছু কথা এ প্রসঙ্গে বলতে চাই। সংগৃহীত তথ্যগুলোর এই সংকলনটিকে একটি সম্পূর্ণ বই বলা যায়না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে আলোকপাতকারী বিশ্বের সকল পত্রপত্রিকা এবং জার্নাল সংগ্রহ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারপরও আশা করছি, আমাদের পাঠক এবং যারাই এই নজীরবিহীন গণহত্যা ও অমানবিক নির্যাতন সম্পর্কে গবেষণা করবেন তারা বইটি পড়ে তার মাত্রা সম্পর্কে অনুমান করতে পারবেন। সেইসঙ্গে সেই সময়কার ঘটনাবলীর গতিপ্রকৃতি এবং বিশ্ব বিবেকের ক্ষোভ সম্পর্কেও অবহিত হতে পারবেন। আমার এই পরিশ্রম সার্থক হবে কেবল তখনই।

ফজলুল কাদের কাদেরী
২২শে অক্টোবর, ১৯৭২

মুখবন্ধে প্রকাশিত বিবৃতিটুকু বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস বইটির গুরুত্ব অনুধাবনে যথেষ্ট সহায়ক। ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দেশপ্রেমিক বাঙালি জনগণ যা অনুভব করেন, তার অনেকাংশ আজও বিশ্বের সামনে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের ভিতরে যুদ্ধরত মানুষের ত্যাগ ও বীরত্বের খবর সারাবিশ্বের সংবাদ মাধ্যম তথা বিভিন্ন মিডিয়ায় হয়তো সেভাবে প্রচারিত প্রকাশিত হয়নি। পাকিস্তান পক্ষের অব্যাহত অপপ্রচারণা যতটা শক্তিশালী ছিল, তার বিপরীতে আমরা সেভাবে নিজেদের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরতে পারিনি। বাংলাদেশ পক্ষের যাবতীয় সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যে সব খবর ও চিত্র বিদেশী মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, বিদেশীরা যে চোখে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছেন, এই বইটি তার পরিচয় কিছুটা হলেও স্পষ্ট করতে পারবে বলে মনে করি।

বাংলা অনুবাদক ও সম্পাদক  দাউদ হোসেন এই বইটি ভাষান্তর করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার প্রবণতা ও কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় ও বেগবান করেছেন। তার অনুবাদ অনবদ্য, কোথাও জটিল বা অপ্রচলিত শব্দের মুখোমুখি হয়ে হোঁচট খেতে হয় না। বাক্যভঙ্গি সরল ও সাবলীল; কষ্টার্জিত পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের দামামা কোথাও চক্ষুকর্ণের বিরক্তি উৎপাদন করে না। তিনি এই বই বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে যে কৃতিত্বের অংশী হয়েছেন, তার জন্য শুধুমাত্র ধন্যবাদ জানানো একেবারে অপ্রতুল। আমি মনে করি, বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস বইটি বাংলা ভাষায় রূপান্তরের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই রচনা ও প্রকাশনার ইতিহাসে দাউদ হোসেন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

1 টি মন্তব্য:

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।