একাত্তরের যুদ্ধশিশু - সাজিদ হোসেন

একাত্তরের যুদ্ধশিশু - সাজিদ হোসেন

একাত্তরের যুদ্ধশিশু

(কতটা ভালোবাসায় কতটা অবহেলায়)
সাজিদ হোসেন

সময় প্রকাশন, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ: ২০০৯
প্রচ্ছদ ও বই নকশা: ধ্রুব এষ
পৃষ্ঠা: ২৬৩, মূল্য: ৩০০ টাকা

দেশভাগের পরমুহূর্ত থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বপাকিস্তানের ওপর প্রভূত্ব করতে থাকে। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যায় অবহেলিত, বঞ্চিত, অপমানিত। উন্নয়ন, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমরনীতি, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশকে সামান্যতম ছাড় দেয়নি। বরং তুলনামূলকভাবে বুদ্ধিমান বাঙালি স্বীয় মেধার বলে পাকিস্তানীদের চাইতে বেশি প্রাধান্য পেতে পারে এই আশংকায় তারা আতংকিত ছিল। তাই তারা সুপরিকল্পিতভাবে বাঙালির প্রতিবাদী চেতনাকে ধ্বংস করতে চায়। নিজস্ব সংস্কৃতির শিকড় থেকে উপড়ে ফেলার ষড়যন্ত্রে তারা প্রথমে হাত দেয় বাংলা ভাষার উপর।

এর ধারাবাহিকতায় আসে মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সৈন্যরা প্রায় দুই থেকে চার লক্ষ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করে। বাঙালি জাতির বিদ্রোহী জাতিসত্ত্বা ধ্বংস করে পাকিস্তানী পিতার প্রতি অনুগত থাকবে এমন এক শংকর প্রজন্ম তৈরি করা ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে তারা 'এথনিং ক্লিনজিং' এর উদ্যোগ নিয়েছিল। যার ফলে যুদ্ধ শেষে জন্ম নেয় প্রায় পঁচিশ হাজার যুদ্ধশিশু। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই শিশুদের নাম দিয়েছিলেন 'বীরাঙ্গনা-শিশু'। তাদের ঠিকানা দিয়েছিলেন নিজের ধানমন্ডির বাড়ির ঠিকানা। কিন্তু তবুও বাংলাদেশের বাঙালি সমাজ এই অসহায় শিশুদেরকে গ্রহণ করে নি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী জামাত-রাজাকার-আলবদর-আলশামস গোষ্ঠী কর্তৃক ধর্ষিত বাঙালি মায়ের সন্তানদের বিদেশে দত্তক শিশু হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ এই শিশুদেরকে নিজভূমিতে আশ্রয় দেয়নি। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মানবতাবাদী মানুষেরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অপ্রত্যাশিত ফসল হিসেবে জন্ম নেয়া যুদ্ধশিশুদেরকে দত্তক নিয়েছিল। 'একাত্তরের যুদ্ধশিশু' বইতে লেখক সাজিদ হোসেন এক মানবিক বোধ থেকে বিষয়টির অবতারণা করেছেন। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রসঙ্গটির আলোচ্য হিসেবে উপযোগিতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন।

সাজিদ হোসেনের লেখা 'একাত্তরের যুদ্ধশিশু' বইটি মূলত একটি গবেষণাগ্রন্থ। বিভিন্ন প্রসঙ্গ যথাযথ তথ্য, পরিসংখ্যান, বিশেষজ্ঞদের বিবরণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সূচীপত্রটি দেখলেই বইটির গুরত্ব স্পষ্টতর হবে।

সূচীপত্র
  • অধ্যায়- ১: বাংলাদেশে কেন যুদ্ধশিশুর জন্ম
  • মুক্তিযুদ্ধকালে গণধর্ষণ ও যুদ্ধশিশুর জন্ম
  • জেনোসাইড
  • বিদ্রোহী বাঙালি জাতিসত্তা ধ্বংস করে অনুগত 'পাকি-বাঙালি' জাতিসত্তা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র
  • অধ্যায়-২: বাংলাদেশের যুদ্ধশিশু
  • কারা যুদ্ধশিশু
  • বাংলাদেশে যুদ্ধশিশুর সংখ্যা
  • বাংলাদেশের যুদ্ধশিশু সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান
  • মুক্তিযুদ্ধকালে যৌন সন্ত্রাস
  • অধ্যায়-৩: বাংলাদেশে বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশু বিষয়ক পদক্ষেপ
  • পাবনার বীরাঙ্গনা হাসপাতালের দৃশ্যপট
  • মাদার তেরেসার আঁচলে যুদ্ধশিশু
  • বীরাঙ্গনার মনোবেদনা
  • বাংলাদেশে বীভৎস যৌন-সন্ত্রাস
  • জাতীয় সমস্যার পরিদৃষ্টিতে যুদ্ধনারী ও যুদ্ধশিশু
  • যুদ্ধশিশুদের দত্তকায়ন
  • বীরাঙ্গনাদের জন্য সেবাদান কার্যক্রম
  • ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেন
  • অধ্যায়-৪: নারীর শরীরও যুদ্ধক্ষেত্র!
  • সাহসী বাঙালি নারীর দুর্বিনীত প্রতিবাদ!
  • যুদ্ধের অস্ত্ররূপে ধর্ষণ
  • ধর্ষিতার নাজুক অবস্থান এবং গর্ভপাত
  • গর্ভপাতের নৈতিক সঙ্কট
  • অধ্যায়-৫: বিশ্বের যুদ্ধশিশু
  • দেশে দেশে যুদ্ধশিশু
  • ওয়ার অ্যান্ড চিলড্রেন আইডেন্টিটি প্রজেক্ট ২০০১
  • যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের যুদ্ধশিশুদের প্রতি বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি
  • কেস স্টাডি বসনিয়া-হারজেগোভিনা
  • কেস স্টাডি পূর্ব তিমুর
  • কেস স্টাডি ডারফুর
  • অধ্যায়-৬: যুদ্ধশিশুর অধিকার, সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাপরাধ এবং বিচার
  • শিশু অধিকার কনভেনশন
  • মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
  • লিঙ্গভেদ, জাতিসত্তা এবং যুদ্ধশিশুর অধিকার
  • যুদ্ধশিশুদের জন্য বিচার-ভাবনা
  • যুদ্ধশিশু এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি
  • অধিকারের দ্বন্দ্ব
  • প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষা এবং নীরবতা
  • ধারণা এবং বাস্তবতার উভয়সঙ্কট
  • অধ্যায়-৭: উপসংহার
  • পরিশিষ্ট:
  • ১. বাংলাদেশ ছেড়ে নতুন নীড়ের পথে যুদ্ধশিশুরা
  • ২. একাত্তরের যুদ্ধশিশু!
  • ৩. বাাংলাদেশের যুদ্ধশিশু
  • ৪. বাংলাদেশের যুদ্ধশিশু 'অস্ট্রেলিয়ার গীতা'!
  • ৫. পূর্ব তিমুরের যুদ্ধশিশু রাই
  • ৬. সঙ্গীতজ্ঞ যুদ্ধশিশু এরিক ক্ল্যাপটন
  • ৭. যুদ্ধশিশু বিষয়ক কয়েকটি চলচ্চিত্র
  • ৮. ওয়ার বেবীজ (নে দ্য লা আইন) – একটি তথ্য-চলচ্চিত্র
  • ৯. রেমন্দু প্রভেশনার -জীবনচিত্র
  • ১০. পিতার পাপ- ধর্ষণে জন্ম নেয়া শিশুর রেখাচিত্র
  • ১১. সীয়ানা পাসিক ব্যাক টু বসনিয়া
  • ১২. বসনীয় যুদ্ধশিশুদের মনে সুপ্ত প্রশ্ন
  • ১৩. যুদ্ধশিশু বিষয়ক সঙ্গীত
  • ১৪. যুদ্ধশিশু বিষয়ক কবিতা
  • ১৫. যুদ্ধশিশু বিষয়ক সংবাদ
নিজ জঠরে ধারণ করা সন্তানদের আকুতি উপেক্ষা করে বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে বাঙালি মায়েদের কেমন লেগেছিল তা আর জানা যাবে না কোনদিন। কিন্তু সেই নির্বাসিত শিশুরা এখনও বেঁচে আছেন। বিদেশের স্বচ্ছল জীবনযাত্রায় অনেকেই প্রতিষ্ঠিত সুখী জীবন যাপন করছেন। এদের মধ্যে কারও কারও মনে পড়ে যায় জন্মদাত্রী হতভাগিনী মায়ের কথা, মাতৃসম দেশের কথা।

লেখক সাজিদ হোসেন ১৯৭১ সালে ছিলেন এগারো বছরের বালক। পিতার সাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি স্বীকৃতিও পেয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা সাজিদ হোসেন সেসময়ই মনে করতেন নিষ্পাপ শিশুগুলো তো মুক্তিযুদ্ধের ফলেই পৃথিবীতে এসেছে। বাংলাদেশকেই তাদের ধারণ করতে হবে। এই যুদ্ধপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেহেতু তাদের আগমন সেহেতু এদেশ তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারবে না। তাদেরকে নির্বাসনে পাঠানো ঠিক নয়।

পাকিস্তানীরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে আসলে কী করতে চেয়েছিল? তাদের দ্বারা এদেশীয় নারীদের ধর্ষণের মাত্রা এত বেশি কেন? দেশে বিদেশে সকল যুদ্ধেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আজ এটা যুদ্ধাপরাধ বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। জেনোসাইড শব্দের ব্যাখ্যায় লেখক জানান-
জেনোসাইড
জেনোসাইড শব্দের সঠিক প্রতিশব্দ বাংলাভাষায় নেই। মাস কিলিংয়ের অর্থে 'গণহত্যা' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, গণহত্যা জেনোসাইডের একটি অংশ মাত্র। 'জাতিসত্তা ধ্বংস' বললে বিষয়টির অর্থ সম্পূর্ণ না হলেও মোটামুটিভাবে স্পষ্ট হয়। জেনোসাইড মানে ইচ্ছা করে এবং পরিকল্পিত পণ্থায় কোনো বর্ণ, গোত্র, ধর্মীয় গোষ্ঠী বা জাতিকে নির্মূল বা ধ্বংস করা। বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর মধ্যে জেনোসাইডের সঠিক সংজ্ঞায়ও রয়েছে আংশিক পার্থক্য। একটা আইনগত সংজ্ঞা পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অফ দ্যা ক্রাইম অফ জেনোসাইড (সিপিপিসিজি১৯৪৮) কনভেনশনে।
এই কনভেনশনের ২ নম্বর আর্টিকেলে জেনোসাইডকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে: “কোন জাতীয়, বর্ণগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীগত, আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে, ধ্বর্স করার উদ্দেশ্যে এখানে বর্ণিত যে কোনো কর্ম সাধন করা হলে তাকে জেনোসাইড বলা হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে গোষ্ঠীর সদস্যদেরকে হত্যা, শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করা, আংশিক বা পূর্ণরূপে গোষ্ঠীগত কাঠামো ধ্বংসের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোষ্ঠীগত অবস্থার ওপরে চাপ প্রয়োগ করা, কোন গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মনিরোধ করার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে নিরূপিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং জোর করে এক গোষ্ঠীর শিশুদেরকে ভিন্ন গোষ্ঠীতে স্থানান্তর করা।"
সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানীরা বাংলাদেশী জাতিকে একটি শঙ্কর প্রজাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে বেশিরভাগই হতো পাকিস্তানী ধর্ষণকারী পিতার ঔরসে জন্ম নেয়া। এই জাতীয় বাঙালিরা পাকিস্তানী ভাবধারার প্রতি অনুগত থাকবে, পিতার সাথে যুদ্ধ করবে না- এরকম ছিল পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্য।

ড. জেফরি ডেভিস তার 'দি চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড- বাংলাদেশ ১৯৭১-৭২' শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন-
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে সার্বিক পরিকল্পনায়, পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি, যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব তত বেশি, বিবাহিত বা অবিবাহিত বাঙালি নারীকে গর্ভবতী করার জন্য ইসলামাবাদের নির্দেশ ছিল। এর পেছনের মৌলিক যুক্তিটি ছিল যে এর মাধ্যমে বাঙালি জাতির অখণ্ড জাতিসত্তা বিনষ্ট হবে যা কিনা বাঙালির গর্ব।
বাঙালি নারীদের উপর পাকিস্তানী সৈন্যদের ধর্ষণ, এরপরে সমাজে সেই নারীর পিতা ও স্বামীদের লজ্জিত হওয়া ইত্যাদি বিষয় এই বইয়ে খুব মর্মস্পর্শী ভাষায় লিখিত হয়েছে। লেখক বিভিন্ন কেসস্টাডি তুলে ধরে সেই সময়ের মানুষের মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।

যৌন সন্ত্রাস তথা যুদ্ধকালীন গণধর্ষণের শিকার মা-বোনদের নিয়ে আলোচনা চলে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। এরপর তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থেকে হারিয়ে যায়। পরে ১৯৯২ সালে 'জাহানারা ইমামে'র নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত গণআদালতে তিনজন বীরাঙ্গনা নারী স্বাক্ষ্য দেয়। রাজাকার-আলবদর-আলশামস-পাকিস্তানীদের দ্বারা নির্যাতনের বিবরণ দেয়। দেশের নতুন প্রজন্মের সামনে লুকিয়ে রাখা ঐতিহাসিক সত্যগুলো উন্মোচিত হতে থাকে।

লেখক সাজিদ হাসান তার 'একাত্তরের যুদ্ধশিশু' বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য উপাত্তের সমন্বয়ে আলোচ্য বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। যুদ্ধকালীন গণধর্ষণকে জাতিসংঘের 'অপরাধ' হিসেবে চিহ্নিতের পর জাপান কোরীয় নারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। ভিয়েতনামের যুদ্ধে আমেরিকার সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত স্থানীয় নারীদের শিশুরা যুদ্ধকালে তাদের অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য মানবাধিকার বিরোধী অপরাধের শিকার, তার ফলাফল ও পরবর্তী কার্যাবলী এই বইয়ের প্রধান আলোচ্য বিষয়। আবেগপ্রবণ বাঙালি সাজিদ হোসেন উপযুক্ত শব্দ ও বাক্যভঙ্গি ব্যবহারে পারদর্শী। তাই নিবিষ্ট পাঠক পড়তে পড়তে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীর ভেতর অঙ্গীভূত হয়ে যাবেন। আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙালির মনে পাকিস্তানীদের প্রতি ঘৃণাবোধ জন্ম নেবে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের দেশের নির্যাতিত মা-বোনেরা আমাদের কাছ থেকেই যথাযথ সম্মান পায়নি। আক্রমণকারী হানাদাররা পাশ কাটানোর ফায়দা খুঁজবে এ আর বিচিত্র কী? বিদেশের স্বচ্ছল সুখী জীবনে বড় হওয়া শিশুরা তার জন্মদাত্রী মায়ের কথা ভাবতে গিয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকায়। তখন তার হৃদয়ে কী দোলা দেয় তা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সুফলভোগীরা কখনও ভাবিনি।

প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া যুদ্ধশিশুদের অবস্থা, সংখ্যা, তাদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি উপস্থাপন করেছেন। এতদিন শিশু অধিকারকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এদের কাছেও যুদ্ধশিশুরা আলাদাভাবে তেমন মনোযোগ পেত না। কিন্তু এখন বিশ্বে মানবতাবাদী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। মানুষের শিক্ষার হার বেড়েছে। বিশ্বের অন্যান্য সভ্য দেশের মতো আমাদের দেশের মানুষদের হৃদয়েও বিবেকবোধ জাগ্রত হোক। যুদ্ধশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে বা সংশোধন করে বাঙালি জনমানসে মানবিকতার ঢেউ জাগুক – লেখকের এ প্রত্যাশা সম্পূর্ণ মানবিক বোধে জারিত। বইয়ের উপসংহার অংশে লেখক মর্মস্পর্শী ভাষায় তার নিজের মনের ভাবনাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন। সম্পূর্ণ ভূমিকাই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করছে; অল্প একটু অংশ দেখে নিই-
প্রিয় পাঠক, বেদনাহত কলমে পাতার পর পাতা লিখেও হয়তো শেষ হবে না আমাদের বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাক্রান্ত সময়ে গণধর্ষণে জন্ম নেয়া যুদ্ধশিশু এবং যুদ্ধনারীদের বেদনা-বিধুর করুণ গাঁথার কথা। ক্রম-উন্নয়নশীল মানুষের সভ্যতার বিপরীতে ইতিহাসের এই অদৃশ্যমান দৃশ্যপটের প্রচ্ছায়া বড় বেশি কলঙ্কিত। এখানে ধর্ষিত হয়নি শুধু নারী; বরং হয়েছে সমগ্র মানবজাতি। হোঁচট খেয়েছে মানুষের নিজের হাতে গড়া মানব-সভ্যতা।...একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনাদের পবিত্র শরীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্র! সেই বর্বর শরীর দখলের ফসল-রূপে পবিত্র যুদ্ধশিশুরা এসেছে আমাদের ঘরে। যেখানেই থাকুক, তারা আমাদের অংশ। মুক্তিযুদ্ধের আরেক উত্তরাধিকার। তারা স্বাধীন বাংলাদেশের 'প্রথম নাগরিক'।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধশিশুদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে তৈরি করা কয়েকটি স্মৃতিসৌধের চিত্র সংযোজন করা খুবই উপযুক্ত হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে প্রকাশিত পোস্টার, যুদ্ধকালীন নির্যাতিত নারীদের ছবি, যুদ্ধের বিভিন্ন চিত্র ও তথ্যের সংযোজন বইটিকে প্রামাণ্য করে তুলেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সৈন্যদের যুদ্ধকালীন গণধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া শিশুদের নিয়ে বাংলা ভাষায় আরও বই প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের মানবিক বোধ এই শিশুদেরকে বাংলাদেশের প্রথম নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সামর্থ অর্জন করুক। লেখক বীরাঙ্গনা মাতা ও তাদের যুদ্ধশিশুদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধের মতো তেজোদীপ্ত একটি স্মৃতিসৌধ চান। বাঙালি জীবনে 'স্বাধীনতা দিবস' পালনের পাশাপাশি 'বীরাঙ্গনা মা দিবস এবং যুদ্ধশিশু প্রতীকী জন্মদিবস' পালনের আহ্বান জানান। লেখক সাজিদ হোসেন প্রবল দেশপ্রেমকে আশ্রয় করে এই বই লিখেছেন। তাই তার বর্ণনা কোথাও কষ্টকল্পিত বর্ণনাবাহুল্যে ভারাক্রান্ত হয় নি। বাংলাদেশ-প্রেমিক কোন মানুষের পক্ষে নিরাবেগ থেকে এই বই পড়া সম্ভব নয়। ভিজে যাওয়া চোখ মুছতে মুছতে পড়া বইয়ের শেষে লেখকের এই আহ্বানে সহমত জানানো মানবিক দায় হয়ে দাঁড়ায়। 'একাত্তরের যুদ্ধশিশু' বইটির বহুল প্রচার ও পাঠ প্রত্যাশা করি।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।