চলন্তিকা- আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান- রাজশেখর বসু

চলন্তিকা- আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান- রাজশেখর বসু

চলন্তিকা- আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান
সংকলক: রাজশেখর বসু
প্রকাশক: এম.সি.সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লি. কলকাতা।
নতুন সংস্করণ: ১৪১৮ (সংশোধিত ও পরিবর্ধিত ত্রয়োদশ সংস্করণ)
পৃষ্ঠা: ৮৪০, মূল্য: ২৪০

  • একটি ছোট আকারের অভিধানের প্রয়োজন
  • চলিত ভাষা যাদের সুপরিচিত নয়, তাদের উপযুক্ত
  • বাংলা সাহিত্যের যারা চর্চা করেন, তারা প্রধানত যে প্রয়োজনে অভিধানের সাহায্য নেন তাদের উদ্দেশ্য বিনাবাহুল্যে সাধন করা এই অভিধানের উদ্দেশ্য
  • ত্রিশ হাজারেরও বেশি সংস্কৃত, সংস্কৃতজাত, দেশজ ও বিদেশী শব্দের বিবৃতি
  • বাংলা সাহিত্যে সুপ্রচলিত ও প্রচলনযোগ্য শব্দকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। অল্প প্রচলিত শব্দ বাদ দেয়া হয়েছে
১৩৫৮ সালের ১ ফাল্গুন তারিখে প্রকাশিত সংস্করণের ভূমিকায় রাজশেখর বসুর এই বিবৃতি বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। এই অংশে লেখক তাঁর অভিধানের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। অভিধান সংকলনের কারণ, উদ্দেশ্য, অভিধানে শব্দচয়ন ও সংকলনের পদ্ধতি ইত্যাদি আলোচনা করেছেন।

সেকালে প্রচলিত অন্য অভিধানগুলোর তুলনায় তাঁর সংকলিত অভিধান কী ধরণের স্বতন্ত্রবৈশিষ্ট্যমণ্ডিত তার বিবরণ এই ভূমিকায় বিস্তারিত রয়েছে। কীভাবে এই অভিধান ব্যবহার করতে হবে, শব্দগুলো কীভাবে সাজানো আছে, কোন ধরণের শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে; সহজে কীভাবে শব্দ খুঁজে পাওয়া যাবে ইত্যাদির বিবরণ তিনি দিয়েছেন। বানান রীতির ক্ষেত্রে তিনি 'কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বিহিত বানান পদ্ধতিকে' মান্য মনে করেন। শব্দের উৎস নির্ণয়ের জন্য তিনি 'অধ্যাপক শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এম.এ.ডি লিট মহাশয়ের' Origin and Development of Bengali Language গ্রন্থ থেকে বিশেষ সাহায্য নিয়েছেন।

শব্দের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি যেন না হয় সেজন্য তিনি সতর্ক। সংস্কৃত বা বাংলা শব্দের অর্থ পরিস্ফুট করার জন্য তিনি কখনও কখনও ইংরেজি প্রতিশব্দ ব্যবহার করেছেন। কিছু কিছু শব্দের সমার্থক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। যে বিষয়টি নিয়ে তিনি অধিকতর সতর্ক তা হল শব্দের ক্রিয়ারূপ। কারণ বাংলা শব্দের ক্রিয়ার রূপ অনেক। ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষার মতো স্বল্প নয়। বাংলা শব্দভান্ডারে একই ক্রিয়ার নানান রূপ প্রচলিত আছে। একই ক্রিয়ার 'সাধু, চলিত, পুরুষ, বচন, গুরু-সামান্য-তুচ্ছ, কাল, অনুজ্ঞা, ণিজন্ত প্রয়োগ, কৃদন্ত রূপ প্রভৃতি বহুরূপীয় বিভক্তি সাহিত্যে, কাব্যে উল্লেখ' আছে। কিন্তু অভিধানে তো ক্রিয়ার একটি রূপই দেয়া হয়। রাজশেখর বসু মনে করেন অভিধানকে সম্পূর্ণ করতে ক্রিয়ার সকল রূপের উল্লেখ থাকা উচিত। কিন্তু তা অসম্ভব। তার মতে এমন কোন ব্যাকরণ নেই যা থেকে বাংলা ক্রিয়ার সকল রূপ জানা যাবে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য তিনি দুটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।

(১) ক্রিয়ার অর্থ বুঝাইবার জন্য প্রচলিত প্রথা অনুসারে অভিধানের মধ্যে একটি কৃদন্ত পদ (যাহা gerund বা বিশেষ্যও বটে, past participleবা বিশেষণও বটে) দেওয়া হইয়াছে, এবং তাহার পর [ ] বন্ধনীর মধ্যে ধাতু ও গণ-সংখ্যা দেওয়া হইয়াছে। যথা-করা [ √ কর্-৫ ], শোয়া [ √ শু-৪ ]। এই প্রকার কৃদন্ত পদ অপ্রচলিত থাকিলে অন্য ক্রিয়াপদ দেওয়া হইয়াছে। যথা- পাসরিল [√ পাসর্-৫ ]।
(২) অভিধানের শেষে ক্রিয়ারূপ-প্রকলনে ( পরিশিষ্ট ঙ ) প্রধান প্রধান বাংলা ধাতু (৮০০র অধিক) কুড়িটি বিভিন্ন গণে ভাগ করা হইয়াছে। এই প্রকলনে বাংলা তিঙন্ত রূপ (‘করে, করিয়াছেন, করেছেন' ইত্যাদি ) এবং অসমাপিকা ক্রিয়াবাচক বাংলা কৃদন্ত রূপ (‘করিয়া, করিতে, করতে, করা' ইত্যাদি) পাওয়া যাইবে।
চলন্তিকা অভিধানে উল্লিখিত ক্রিয়ারূপ
চলন্তিকা অভিধানে উল্লিখিত ক্রিয়ারূপ

চলন্তিকা অভিধানের পরিশিষ্ট অংশটি মূল্যবান। অভিধানের শব্দ ও শব্দার্থসংগ্রহকে বুঝতে এই অংশটি বেশ ভালোভাবে সহায়তা করবে। এখানে ব্যাকরণের বিভিন্ন অংশ সুবিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

১৯৩৬ সালের ২০ মে 'কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়' বাংলা বানানের যে নিয়ম প্রকাশ করেছিলেন (৩য় সংস্করণ) তার সম্পূর্ণটুকু এই অংশে প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু সংস্কৃত শব্দের বানান, ণত্ব ও ষত্ব বিধি, সন্ধি, ক্রিয়ারূপ, কাল, পুরুষ, ধাতু-তালিকা ও বিভিন্ন গণের রূপ ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে পারিভাষিক শব্দ। পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি, পদার্থবিদ্যা, মহাকাশ, ভূগোল, জীববিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, অর্থবিদ্যা, মনোবিদ্যা, সরকারি কার্যাবলী ইত্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অধিক ব্যবহার্য পারিভাষিক শব্দের তালিকা।

লেখকের ভাষ্য জানা যায় যে, শব্দের বানান ও প্রয়োগ সন্বন্ধে সাধারণ লেখক ও পাঠকের মনে যেন বিভ্রান্তি বা সন্দেহ দেখা না দেয়া সেজন্য এইসব আলোচনা গ্রন্থের পরিশিষ্টে দেয়া হয়েছে।

অভিধান সংকলনে যাদের পরামর্শে তিনি উপকৃত হয়েছেন তাদের কথা তিনি সকৃতজ্ঞ চিত্তে ভূমিকায় স্বীকার করেছেন।

অধ্যাপক শ্রীযুক্ত দুর্গামোহন ভট্টাচার্য কাব্যসাংখ্যপুরাণতীর্থ, অধ্যাপক শ্রীযুক্ত অমরেন্দ্রমোহন তর্কতীর্থ এবং ভোঁলানাথ ঘোষ মহাশয় এই অভিধান সম্পাদনে অশেষপ্রকার সাহায্য করিয়াছেন। খাঁ বাহাদুর মৌলবী রাজা আলী ওআশত মহাশয় সমস্ত আরবী-ফারসী-তুর্কী-জাত শব্দের মূল রূপ নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন। ইহাদের ঋণ কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করিতেছি।

চলন্তিকা অভিধান সেসময়ের একটি বিখ্যাত অভিধান। বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রখ্যাত ব্যক্তিদের অনেকে এই অভিধান পাঠে উপকৃত হয়েছিলেন। অভিধান থেকে প্রাপ্ত তৃপ্তি তাঁদের শুভেচ্ছা বাণীতে সুস্পষ্টরূপে প্রকাশিত। এই চলন্তিকা অভিধান সম্পর্কে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নমস্য ব্যক্তিগণের দেয়া কিছু বাণী বইয়ের প্রথম ফ্লাপে ছাপা হয়েছে।

  • রবীন্দ্রনাথ- 'বাংলা ভাষার সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিচয় পেতে যে ইচ্ছা করবে তোমার বই ছাড়া তার অন্য গতি নেই।'
  • মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী- 'এ অভিধানখানির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ দিতেছি- এখানি বড়ই উপকারী হইয়াছে।'
  • জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস- ‘আমি বাঙ্গলায় যতগুলি ছোট অভিধান দেখিয়াছি তন্মধ্যে চলন্তিকাতেই অভিধান সংকলন কলার প্রকৃষ্ট পরিচয়।'
  • অধ্যাপক শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়- 'বাঙ্গলা ভাষা আলোচনাকারী ব্যক্তির পক্ষে এই কাজের কথায় পূর্ণ সংক্ষিপ্ত, সরল, সহজ ব্যবহার্য অভিধানখানি যে অপরিহার্য হইবে তাহা সকলেই স্বীকার করিবেন। অভিধানের পিছনে যে বৈজ্ঞানিক ও কৃতকর্মা ব্যক্তির মস্তিষ্ক কাজ করিতেছে তাহা বুঝিতে দেরি হয় না।'
  • প্রবাসী- ‘এই অভিধানখানি প্রকাশিত হইবামাত্র প্রসিদ্ধি ও বিদ্বান ব্যক্তিগণের প্রশংসা লাভ করে। তাহার কারণ ইহার উৎকর্ষ ও ব্যবহারসৌকর্য।'
  • আনন্দবাজার পত্রিকা- ‘চলন্তিকা যুগান্তকারী গ্রন্থ'

প্রত্যেক শব্দসন্ধানী পাঠক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, আলোচকের এই অভিধান সংগ্রহে রাখা উচিত। অনেক পুরনো শব্দ এখানে পাওয়া যায়। আধুনিক অভিধানে পুরনো শব্দগুলো পরিত্যাগ করা হয়েছে। কিন্তু নিবিষ্ট পাঠক অনেক সময় শতবৎসরের পুরনো শব্দের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। তেমন বিব্রতকর সময়ে চলন্তিকা অভিধান সহায়ক হবে এ কথা অতিশয়োক্তি নয়।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।