“প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” ও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বর্ণনা করলেন ‘মো. আদনান আরিফ সালিম’

“প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” ও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বর্ণনা করলেন ‘মো. আদনান আরিফ সালিম’

‘মো. আদনান আরিফ সালিমের’ লেখা “প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” বইটি হাতে নিয়ে খুশি হয়েছিলাম। বাংলাভাষায় প্রত্নতত্ত্বের উপর বই খুব কম লেখা হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ছাড়া অন্য প্রকাশনীরা প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক বই প্রকাশনায় খুব একটা আগ্রহী নয়। এরকম একটি অবস্থায় প্রকৃতি-পরিচয় প্রকাশনী প্রত্নতত্ত্বের বই প্রকাশ করেছে, লিখেছে তরুণ প্রজন্মের প্রত্নতাত্ত্বিক- এটা আনন্দের ঘটনাই বটে। আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে মুক্তি দিতে পারে প্রত্নতত্ত্ব।  কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে জানাশোনা মানুষের পরিমান কম। সে জন্য প্রত্নতত্ত্ব কী, সেটাই আমরা অনেকে জানি না। লেখক সে বিষয়ে সচেতন, তাই ভূমিকাতেই প্রত্নতত্ত্বের সংজ্ঞা স্পষ্ট করেছেন। তিনি ভূমিকাতে বলেনঃ

অতীতকালে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পর মানুষের রেখে যাওয়া পরিত্যক্ত বস্তুগত উপকরণের অবশেষ নিয়ে কাজ করে প্রত্নতত্ত্ব। এগুলোর গবেষণায় আমাদের পূর্বপুরুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির চালচিত্র তুলে ধরা বিষয়টির উদ্দেশ্য।

বাংলা ভাষায় বিষয়টির চর্চা যত বেশি হবে, আমরা ততবেশি আমাদের অতীত প্রজন্মের মানুষের জীবনযাপনের নানা বৈশিষ্ট্য জানতে পারব। বাঙালি ও বাংলাদেশ অঞ্চল আমাদের পূর্ব পুরুষের অসংখ্য বুদ্ধিবৃত্তিক সৌকর্যের ইতিহাসে সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ছিল একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছিল শিল্প নগরী। ছিল ইউরোপীয় নগরের চাইতে উন্নততর ‘মহাজনপদ’ ব্যবস্থা। বাঙালীর পূর্বপুরুষেরা তিন হাজার বৎসর আগে বিদেশে পণ্য রফতানী করত। এই ইতিহাস স্পষ্টাক্ষরে লেখা থাকে বিভিন্ন প্রত্ন উপাদানে।

আজকের আলোচ্য গ্রন্থ “প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” এ রয়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যময় প্রত্নসম্পদের উপর প্রতিবেদন, ইতিহাস ও বিবরণ। ঢাকার প্রকৃতি-পরিচয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত 'জ্ঞান ও সভ্যতা গ্রন্থমালা' সিরিজের এটা তৃতীয় বই। এই সিরিজের প্রথম দুটি বই নিয়ে আমরা ইতোপূর্বে গ্রন্থগত ওয়েবসাইটে আলোচনা করেছি {আগ্রহী হলে পড়ুন: (১) “প্রাচীন মেলুহা- সিন্ধু সভ্যতার ইতিবৃত্ত” - ‘ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী’ এবং (২) “মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন” প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী “আরাফাত রহমান” -এর আলোচনা }“প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” বইয়ের লেখক ‘মো. আদনান আরিফ সালিম’ আটটি অধ্যায়ে বাংলাদেশ অঞ্চলে মানুষের সমাজ সংস্কৃতি বিবর্তনের ইতিহাস কয়েক হাজার বছর আগে থেকে ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত বর্ণনা করেছেন। সূচীপত্রের শিরোনামে বিষয়ের পরিধি স্পষ্ট করা হয়েছেঃ-

সূচীপত্রঃ
  • প্রথম অধ্যায় প্রত্নতত্ত্ব পরিচিতি, ভূমিরূপ ও প্রাগিতিহাস
  • দ্বিতীয় অধ্যায় তাম্রপ্রস্তর, লৌহ যুগ ও মেগালিথিক সংস্কৃতি
  • তৃতীয় অধ্যায় মৌর্য ও গুপ্ত যুগের প্রত্ননিদর্শন
  • চতুর্থ অধ্যায় দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও স্বাধীন বঙ্গরাজ্যের ঐতিহ্য
  • পঞ্চম অধ্যায় পাল ও সেন যুগের নিদর্শন
  • ষষ্ঠ অধ্যায় সুলতানি ও মোগল ঐতিহ্য
  • সপ্তম অধ্যায় ঔপনিবেশিক স্থাপনা
  • অষ্টম অধ্যায় বাংলাদেশের প্রত্নচর্চা

লেখক শুরু করেছেন প্রত্নতত্ত্বের পরিচিতি দিয়ে। এটা ভাল হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন, তাই সংজ্ঞা ও কিছু বৈশিষ্ট্যের বিবরণী থাকায় সকলে উপকৃত হবে। প্রত্নতত্ত্ব কী, এটা কী জাতীয় বিজ্ঞান? বিজ্ঞান নাকি অপবিজ্ঞান?-- এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর রয়েছে বইয়ের এই অংশে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় কী লাভ করা যেতে পারে সে বিষয়ে অনেকেই সন্দিহান। লেখক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা জানেন, তাই অন্যদের বোঝার সুবিধার্থে বলেনঃ

… প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তিনটি মূল উদ্দেশ্য থাকে। অতীতকালের গবেষণায় এগুলো হচ্ছে-
১) সাংস্কৃতিক ইতিহাস পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।
২) জীবনধারা বা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা ও উপব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।
৩) মানুষের সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া ও এর বিবর্তন সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করা।

এক্ষেত্রে গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইতিহাসের চর্চা তুলনামূলক কম। বিশেষ করে বস্তুগত উপাদানের মাধ্যমে কোন বিশেষ সময়ের রাজা কিংবা তার শাসন সম্পর্কিত গুণকীর্তন করাটা যেমন কঠিন তেমনি অযৌক্তিক। অন্যদিকে সে সময়ের শিল্পকলা, মানুষের জীবনযাত্রার ধরণ, বসতিবিন্যাস এমনকি তাদের রুচি ও আচার-আচরণ সম্পর্কে পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে অনুমান ও পদ্ধতিগতভাবে যাচাই করে দেখা সম্ভব। পৃষ্ঠা- ১৬-১৭

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সাথে তার পরিপার্শ্বের ভূমিরূপ চেনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সকল অংশ নতুন পাললিক ভূমি দ্বারা তৈরি নয়। কিছু অংশ যেমন হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর, বগুড়ার মহাস্থানগড় প্রাচীনকালে তৈরি ভূমি দ্বারা গঠিত হয়েছে। লাল মাটির জায়গাগুলো পাইও-পাইওস্টোসিন যুগের তৈরি। এই অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই মানুষের বসতি ছিল। উয়ারী বটেশ্বর এলাকায় তিন হাজার বৎসর আগে শিল্প নগরী ছিল। প্রাক-নবোপলীয় যুগ থেকে এই অঞ্চলে মানুষের বসতি থাকার কথা জানা গেছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ ও কুমিল্লা এলাকায় সবচেয়ে প্রাচীন মানুষের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই বাংলাদেশ অঞ্চলে মানুষ বসবাস করে আসছে।

‘মো. আদনান আরিফ সালিম’ একজন পরিণত লেখকের মত বলতে থাকেন বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্যের বিজ্ঞানসম্মত বিবরণ। তার কাছ থেকে জানতে পারি বাংলাদেশে মানুষের বসতির চিহ্ন পাথর যুগ, তামার যুগ, লোহার যুগ প্রত্যেকটিতে পাওয়া গেছে। লেখক বিভিন্ন প্রত্ন উপাদানের ছবি ও ম্যাপ ব্যবহার করে বাঙালি সংস্কৃতির প্রাচীনত্যের প্রমাণ দেখান। বিশেষ করে উয়ারী বটেশ্বরের রফতানী পণ্যের খোঁজ এখনও মেলে। এত উদ্বৃত্ত পরিমাণে তৈরি হয়েছিল যে তিন হাজার বৎসর পরেও একটু বৃষ্টিতে মাটি ধুয়ে গেলে সেগুলো উন্মুক্ত হয়ে পরে। ছোট ছোট বর্ণিল কারুকাজশোভিত পুঁতিগুলি বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঙালি জ্ঞানচর্চার ইতিহাস আরও ঐতিহ্যপূর্ণ করেছে।

“প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” বইতে লেখক একে একে বাংলার প্রাচীন সভ্যতার চিহ্নগুলোর বিবরণ দেন। লৌহযুগে বাংলাদেশের মানুষেরা নিত্যব্যবহার্য জিনিস যেমন লাঙলের ফলা, কাস্তে, নিড়ানি, কোদাল, তীরের ফলা, বর্শা, ছুরি, পেরেক ইত্যাদি তৈরি করতে পারত। মহাস্থানগড় বা পুণ্ড্রনগরে লৌহ সভ্যতার বিকাশ ভালভাবে হয়েছিল। লোহার তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করে এখানে পরিখা খনন করা হয়েছিল। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে লেখা ছিল ‘পুডনগল’। এই পুডনগল যে পুণ্ড্রনগর এর ভিন্ন উচ্চারণ এ বিষয়ে পণ্ডিতগণ একমত। এখানে মৌর্য শাসনের প্রমাণস্বরূপ তাম্রশাসন পাওয়া গেছে।  সিলেটের জৈন্তাপুর পাহাড় ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় দুইহাজার দুইশত বৎসর পুরনো মেগালিথিক মেনহির ও ডলমেন পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ অঞ্চল মৌর্য শাসনের পর কুষাণযুগ, গুপ্তযুগ পার হয়ে আধুনিক যুগে এগিয়ে আসতে থাকে। লেখক গল্পের ভঙ্গিতে প্রত্নখননে প্রাপ্ত উদাহরণ ব্যবহার করে পুনঃগঠিত ইতিহাস বর্ণনা করতে থাকেন।  একে একে বিভিন্ন ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণ দেন। কিন্তু এক পর্যায়ে ইতিহাসের মধ্যে নিজে ঢুকে পরেন। লেখক বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আলোচনা করতে করতে যেভাবে রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের বর্ণনা দিতে শুরু করেন তা পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে আমি অস্বস্তি বোধ করেছি। এই জায়গাগুলোতে বইয়ের আলোচনা আর প্রত্নতত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি। প্রচলিত ঐতিহাসিকগণের মত বিশেষ পক্ষের গুণের আতিশয্য ও অপরপক্ষের প্রতি বিকট বিশেষণের ব্যবহার শুরু করে দেন। ফলে মনে হয় অনাবিষ্কৃত এক কল্পনার রোমাঞ্চকর জগতে ঘুরতে ঘুরতে যেন হিংসাবিদ্বেষময় বাস্তব পৃথিবীতে ছিটকে এসে পড়লাম। এটা ঠিক যে, যে কোন বইয়ের প্রতিটি শব্দে লেখকের স্পর্শ থাকে। এটা গল্প কবিতা নাটক উপন্যাস তথা কল্পসাহিত্যে যতটা আকাঙ্ক্ষিত, নৈর্ব্যক্তিক তথ্যমূলক রচনায় ততোটাই অবাঞ্ছিত। তবে এটাও ঠিক যে বাংলাভাষায় নির্মোহ ইতিহাস রচনার সংস্কৃতি এখনও সেভাবে দৃশ্যমান নয়।

“প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ” বইটি একটি আকর্ষণীয় বিষয় নিয়ে রচিত। তথ্যপ্রাচুর্য, অসংখ্য চিত্র ও ম্যাপ ব্যবহার করায় বইটিকে বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সাম্প্রতিক প্রকাশনা হবার কারণে সমকালীন সময়ে যে সব নতুন আবিষ্কার বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করছে, সে সবের বিস্তারিত বিবরণ লেখক যোগ করেছেন। ফলে আধুনিকতম প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য উপস্থাপনে বইটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন পাবে।

-------------------
প্রত্নচর্চায় বাংলাদেশ
মো. আদনান আরিফ সালিম
প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশনায়ঃ প্রকৃতি-পরিচয়, ঢাকা।
প্রথম প্রকাশঃ ২০১৫
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১২০
মূল্যঃ ১২৫ টাকা
ISBN:978-984-888-2528

পাঠক আরও যে বইগুলোর আলোচনা পড়েছেনঃ
প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা প্রসঙ্গে-
পৃথিবীতে সামগ্রিকভাবে মানুষের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির ইতিহাস সম্পর্কে-

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ