“প্রাণের শুরু” বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ইতিহাস জানালেন ‘সফিক ইসলাম’

“প্রাণের শুরু” বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ইতিহাস জানালেন ‘সফিক ইসলাম’
বিজ্ঞান বিষয়ক বিতর্কে যে প্রশ্নটি প্রায়ই উচ্চারিত হয় তার উত্তর খোঁজা হয়েছে “প্রাণের শুরু” বইতে। বিখ্যাত ফরাসি লেখক ‘লুই জোনস’ 'How Life Began’ নামে একটি ছোটদের জন্য বই লিখেছিলেন। দশ থেকে পনেরো বৎসর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য লেখা বইটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশ বৎসর আগে অনুবাদক ‘সফিক ইসলাম’ বইটি পড়েছিলেন। সহজ, সরল ও সাবলীল ভাষায় লেখা এই বই বাংলায় রূপান্তর করে তিনি অসাধারণ একটি কাজ করেছেন। মানুষ যখন থেকে ভাবতে শিখেছে, তখন থেকে বা বড় হতে গিয়ে যে ভাবনা দ্বারা বেশি আলোড়িত হয় সেই বহু প্রচলিত বিষয়গুলো নিয়ে বাংলা ভাষায় খুব বেশি বই নেই। কৌতুহলী প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে পরে। নানারকম মনগড়া কথার ফাঁদে আটকে পরে অনেকে। এরকম কৌতুহলী ও উদ্যমী পাঠকের তৃষ্ণা এই বই পাঠে তৃপ্ত হবে। বইয়ের আকার ছোট। মাত্র একশত পৃষ্ঠার এই বই ৭.২×৪.৭ ইঞ্চি আকারের। ফলে ঘন্টাব্যাপী হাতে ধরে রাখলেও ক্লান্তিবোধ হবে না।

লেখকের ভাষ্যে বইটি সম্পর্কে একটু জেনে নেই। তিনি ‘বলে রাখা ভাল’ শিরোনামে বলেনঃ
এমন একটি অসাধারণ বই বাংলায় অনুদিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই বই বিশেষ জরুরি। মানুষের চিন্তার বিকাশের জন্য, যুক্তিশীলতা নির্মাণের জন্য, বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের জন্য এমন একটি বই খুব উপকারী, দরকারী।… তবে বলে রাখা জরুরি একে ঠিক অনুবাদ গ্রন্থ বলা চলে না, আবার এটি পুরোপুরি ভাবানুবাদও নয়। কোথাও অনুবাদ, কোথাও ভাবানুবাদ, কোথাও সংকোচন, কোথাও সম্প্রসারণ। সব মিলিয়ে এটি একটি নির্মাণই।
ছোটদের উপযোগী করে রচিত এই বইয়ের বর্ণনাভঙ্গি আলাপচারিতার মত। লেখক সরাসরি সম্বোধন করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন। যেহেতু ছোটদের উদ্দেশ্য করে বলা সেহেতু ছোট ছোট বাক্যে, সহজ শব্দ ব্যবহার করে সাবলীলভাবে বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের কাহিনী বলে গেছেন। গল্পের মত করে উপস্থাপন করা ঘটনাগুলো বৈজ্ঞানিক তথ্য, উপাত্ত, ছবি ও মানচিত্রের জোরে শুধুমাত্র গল্পকাহিনীতে পর্যবসিত হয় নি।

লেখকের কৌতুকপ্রিয়তা আমাদের আমোদিত করে। বিষয় বোঝানোর জন্য বাস্তব তথ্য এত সহজভাবে মজা করে বলেন যে হাস্যবিগলিত না হয়ে পারা যায় না। তিনি ‘সূর্যই খাবারের যোগানদাতা’ শিরোনামের রচনায় আমাদের বেচে থাকবার প্রধান উপাদান শক্তি যে সূর্য থেকে আসে তা বোঝাবার জন্য এক পর্যায়ে বলে বসেনঃ
তুমি আসলে সূর্যই খাও
বইতে কী আছে তা সূচীপত্র থেকে দেখা আরম্ভ করি।

সূচীপত্রঃ
  • পাথরে প্রাণের ছাপ
  • প্যারিসের হাতি
  • পানি এবং সময়
  • কচ্ছপের দ্বীপ
  • কে বেঁচে থাকে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য?
  • গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের গল্প
  • পেছন ফিরে দেখা
  • আবাস
  • অক্সিজেন কীভাবে এলো?
  • সূর্যই খাবারের যোগানদাতা
  • আকাশে বিশাল ছাতা
  • পৃথিবীর ভূভাগ সরে যাচ্ছে
  • একই রকমের কিন্তু ভিন্ন
  • গল্পের শুরু এখানেই
  • ছোট ছোট ভুল
  • রাতের আকাশ
  • পৃথিবীর সমাপ্তি
  • তোমার শরীর তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়
আঠারোটি শিরোনামে তিনি পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রকারের প্রাণী সৃষ্টির বিবরণ দিয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে পৃথিবী ও সৌরজগত সৃষ্টির কথাও এসেছে। বস্তুগত নির্মাণ না থাকলে প্রাণের বিকাশ হত না। সেজন্য প্রাণীবিজ্ঞান বুঝতে হলে ভূগোলবিজ্ঞানকেও চিনতে হয়।

পৃথিবী ও তাতে প্রাণসৃষ্টি নিয়ে মনুষ্যসমাজে অনেক রকমের মতবাদ আছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রামাণ্য ও বিনয়ী হল বৈজ্ঞানিক মতবাদ। এর প্রতিটি তত্ত্বই প্রাপ্ত প্রমাণের উপর নির্ভর করে উপস্থাপিত। যে প্রশ্নের বা তত্ত্বের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, সে সম্পর্কে অজ্ঞতা স্বীকারও বিজ্ঞান কুণ্ঠিত নয়। জ্ঞানকে আরও সম্প্রসারিত করার জন্য প্রামাণ্য বৈজ্ঞানিক উপাত্ত গ্রহণের ঔদার্য বিজ্ঞানের আছে। ভুল স্বীকার করার বিনয় এক্ষেত্রে সহনশীলতা বজায় রাখে।

লেখক গণিতের শিক্ষক, তাই বিজ্ঞানের দর্শন তার অতিপরিচিত। গণিতের দ্বারা সৃষ্ট যৌক্তিক বোধ তার মধ্যে সদা ক্রিয়াশীল। যার প্রভাব রয়েছে বইটির পাতায় পাতায়। যুক্তি নির্ভরতাকে উৎসাহিত করার জন্য লেখক প্রাণের সৃষ্টি বর্ণনা করার জন্য শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত মতবাদকে বেছে নিয়েছেন। শুরু করেছেন ডারউইনেরও আগে থেকে।

ফ্রান্সের নাগরিক জ্যাক গুটার্ড (১৭১৫-১৭৮৬) তার আশেপাশের মাঠ-জঙ্গল থেকে অনেক শামুক-ঝিনুকের জীবাশ্ম সংগ্রহ করেছিলেন। পাথরের গায়ে চিহ্ন রেখে যাওয়া এই জীবাশ্মগুলি সম্পর্কে তার মধ্যে অনেক প্রশ্ন ছিল। তখন পর্যন্ত জানা মতে ফ্রান্স কখনও সমুদ্রতলে ছিল না। কিন্তু ফ্রান্সের মাঠে সামুদ্রিক শামুক ঝিনুক এল কীভাবে? প্রধান প্রশ্ন ছিল জীবাশ্মগুলো পাথরের গায়ে ফুটে উঠল কীভাবে? সেই সময়ের অপরিণত বিজ্ঞান তাকে খুব বেশি সাহায্য করতে পারে নি। ফ্রান্সের আর এক প্রাণীবিজ্ঞানী ফ্রেড্রিক ক্যুভে (১৭৬৯-১৮৩২) ছিলেন খুবই করিৎকর্মা মানুষ। বিভিন্ন প্রাণীর হাড় নিয়ে তিনি গবেষণা করতেন। সেই সময়ে মাটির উপরে অনেক জীবাশ্ম পাওয়া যেত। আশেপাশের অঞ্চলের দৃশ্যমান বেশিরভাগ জীবাশ্ম তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। তখন তিনি শুরু করলেন মাটি খোঁড়া। মাটির নিচ থেকে তিনি একবার বের করে আনলে সম্পূর্ণ হাতীর হাড়। জানা ইতিহাসে ফ্রান্সে কখনও বন্য হাতী বাস করত না। অথচ ফ্রান্সের মাটির নিচ থেকে বের হয়ে এল আস্ত হাতীর কঙ্কাল। ক্যুভে হাজার রকমের হাড়ের সন্ধান পেয়েছিলেন। এগুলোকে সাজিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে এই প্রাণীদের বেশিরভাগ এখন আর বেঁচে নেই। সমকালীন অবিকশিত বিজ্ঞান এই প্রাণীগুলোর পরিচয় উদঘাটন করতে পারে নি।

জীবাশ্ম আবিষ্কার ও সে সম্পর্কে সচেতনতার আগে প্রাণীসৃষ্টির ইতিহাস মানুষকে খুব বেশি ভাবায় নি। মাত্র আড়াইশত বৎসর আগে আশেপাশে প্রাপ্ত বিভিন্ন আকৃতির প্রাণীর হাড় ও পরিবর্তিত ভূপ্রকৃতি মানুষকে আগ্রহী করে তোলে। ইংল্যান্ডের প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ল্যায়েল ১৮৩৩ সালে প্রকাশ করেন ‘ভূতত্ত্বের নীতিমালা’ নামের এক যুগান্তকারী বই। তিনি ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্রকারের পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, ভূপৃষ্ঠের গঠন, ভূমির নানা উপাদান এগুলো পরিবর্তনের কারণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর তথ্যের সমন্বয়ে একটি তত্ত্ব দাঁড় করান। তার দেয়া ‘সমরূপতা তত্ত্ব’ অনুযায়ীঃ
পৃথিবীর সর্বত্রই একই প্রাকৃতিক সূত্র মেনে চলে। পৃষ্ঠা: ২৬
 চার্লস ল্যায়েল তিন খণ্ডের এই গ্রন্থমালার প্রথম খণ্ডটি হাতে নিয়ে চার্লস ডারউইন ১৮৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিগল নামের জাহাজে সমুদ্র ভ্রমণ শরু করেন। তখন তার বয়স তেইশ বৎসর। পাঁচ বৎসরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে বীগল জাহাজ যখন ফিরে আসে ডারউইনের সংগ্রহে তখন বিপুল সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিদের নমুনা, কঙ্কাল, কয়েকটি মোটা নোটবই ভর্তি স্কেচ, ম্যাপ, বিবরণ, ভাবনা-চিন্তা, প্রচুর পর্যবেক্ষন থেকে লব্ধ ব্যাপক অভিজ্ঞতা এবং অসংখ্য পরস্পরবিরোধী প্রশ্ন। বিজ্ঞান তখনও বিকশিত হয় নি। ডারউইনের সময় জিন আবিষ্কার হয় নি, তাই তিনিও অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতেন না। বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জীবাশ্ম তখনও মানুষ আবিষ্কার করতে পারে নি। ফলে নির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছিল খুব কঠিন। নিজের আবিষ্কারে প্রাপ্ত জ্ঞান আরো তেইশ বৎসর ধরে বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের দ্বারা যাচাই করে, পর্যবেক্ষণজাত বিশ্লেষণে প্রাপ্ত ধারণা ও তাত্ত্বিক চিন্তামালা একত্রিত করে ১৮৫৯ সালে প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই “প্রজাতির উৎপত্তি” (Origin of Species)। বইতে প্রকাশিত তাঁর ভাবনা-চিন্তাগুলো প্রচলিত ধারণাগুলোকে আন্দোলিত করেছিল। বার বৎসর পরে ১৮৭৯ সালে প্রকাশ করেন ‘মানুষের পূর্বসূরি’ (Descent of Man)। মানুষের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে রচিত এই বইয়ে শুধু ভাবনা নয় রয়েছে সুনির্দিষ্ট যুক্তি ও তথ্য।

ডারউইনের পরে জ্ঞান বিজ্ঞান আরও এগিয়েছে। বইতে সে প্রসঙ্গগুলোও আসে। পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দরকার। প্রকৃতির সরাসরি অংশগ্রহণে প্রাণীরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নিজেদের বৈশিষ্ট্য প্রবহমান রাখতে চায়। তাই পৃথিবী, আকাশ, সমুদ্র কোন প্রসঙ্গই বাদ দেয়া হয় নি। মহাকাশের একটি অংশ আমাদের এই পৃথিবী এমনকি আমরাও। নিজেদেরকে আমরা যতই বিশিষ্ট ভাবি না কেন, যদি গভীরভাবে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, অন্য প্রাণিদের অবয়বের সাথে আমাদের খুব বেশি পার্থক্য নেই।

সফিক ইসলামের রচনায় মূল লেখক লুই জুনস এর How Life Began এর স্বাদ ঠিকঠাকভাবে রয়েছে বলে মনে হয়। পড়তে গিয়ে অনুবাদ পড়ার কথা মনেই হয় না। পেপারব্যাক হওয়ায় বইয়ের দাম সাধ্যের মধ্যে রয়েছে। অল্পবয়সী কিশোর-কিশোরীরা যখন প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করে, জানতে চায় প্রকৃতির রহস্য, তখন এই বইটি তাদের আগ্রহকে সন্তুষ্ট করতে পারবে। প্রাণী সৃষ্টি সম্পর্কে প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক তথ্য বুঝতে প্রাণীবিজ্ঞান সম্পর্কে যতটুকু জানা প্রয়োজন, ততটুকু বৈজ্ঞানিক আলোচনা বিরক্তি উৎপাদন করবে না। আমি নিশ্চিত যে, “প্রাণের শুরু”  বইতে সফিক ইসলামের ব্যবহৃত সহজ শব্দ, ছোট বাক্য সকল শ্রেণীর ও বয়সের পাঠকের হদয়ঙ্গম হবে।

====================
প্রাণের শুরু
সফিক ইসলাম

প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশনায়ঃ প্রকৃতি-পরিচয়, ঢাকা।
প্রথম প্রকাশঃ ২০১৫
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১০০
মূল্যঃ ১০০
ISBN: 978-984-888-2535

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। বিস্তারিতভাবে কিছু জানাতে চাইলে এখানে ক্লিক করে ই-মেইল করুন।