যে ১০টি বই বৈশ্বিক নারীবাদকে শক্তিশালী করেছে - প্রথম অংশ

যে ১০টি বই বৈশ্বিক নারীবাদকে শক্তিশালী করেছে - প্রথম অংশ
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে নারী স্বাধীনতার আন্দোলন এক নতুন মাত্রা পায়। নারীবাদী সাহিত্যিকগণ পুরুষের পৃথিবীতে নারী জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিজেদের লেখায় তুলে ধরেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর নিঃশঙ্ক বাক স্বাধীনতা তাদের সহায়ক ছিল। নারীবিরোধী অপদার্শনিক শক্তিগুলো শাসনক্ষমতার বাইরে থাকায় নারীদের মুক্ত পদক্ষেপে বাধা দিতে পারে নি। বেশ কয়েকজন নারীবাদী লেখকের অদম্য প্রচেষ্টায় পৃথিবীর শিক্ষিত জনমানসে নারী স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের ধারণাটি একটি গ্রহণযোগ্য রূপ পেয়েছে। নারীলেখকগণের নিরবচ্ছিন্ন লেখালেখির ফলে নারীরাও যে মানুষ; তারাও যে পুরুষদের মত সম্মান ও স্বাধীনতা লাভের অধিকারী সে ধারণা সাধারণ্যে পরিচিতি পায়। গত অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ে যে বইগুলো নারীস্বাধীনতার দর্শনকে অর্থবহ ও শক্তিশালী করেছে তার মধ্যে আজ আমরা ১০ (দশ)টি বইয়ের সাথে পরিচিত হব।

এক
দ্যা সেকেন্ড সেক্স - সিমোন দ্যা বুভোয়ার (The Second Sex - Simone de Beauvoir, 1949)
সিমোন দ্যা বুভোয়ার
সিমোন দ্যা বুভোয়ার
প্রথম প্রকাশের সাথে সাথে চিন্তাশীল মানুষের মননে আলোড়ন তুলেছিল। লৈঙ্গিক রাজনীতিকে বিশ্বের সামনে পরিচিত করেছে এই বই। এখন দ্বিতীয় লিঙ্গ (The Second Sex) বইটি নতুন ধারার নারীবাদী দর্শনের জন্মদাত্রী হিসেবে স্বীকৃত। এই বইতে সিমোন দ্যা বুভোয়ার স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন:-
কেউ নারী হিসেবে জন্মায় না, সমাজ তাকে পরিণত করে নারীতে

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীরা কিরকম জীবনযাপন করত, সেই উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বর্তমান সমাজে নারীর অবস্থা বিচার করেন। ফরাসী ভাষায় লেখা বইটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ Facts and Myths এবং দ্বিতীয় ভাগ Lived Experience (ফ্রেঞ্চ ভাষায় Les faits et les mythes এবং L’experience vecue)। বইয়ের প্রথম দিকের কয়েকটা অধ্যায় Les Temps Modernes পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। বুভোয়ারের রচিত বইগুলোর মধ্যে ‘সেকেন্ড সেক্স’ নারীবাদী দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত। এই বইয়ের মাধ্যমেই ‘নবনারীবাদ’ (নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউ) এর সূচনা হয়েছিল। বুভোয়ার এই বইতে প্রথম প্রশ্ন করেন “নারী কে?” তিনি যুক্তি দিয়ে দেখান যে ‘মনুষ্যত্ব’ বলতে শুধু পুরুষকেই বোঝান হয়। আর পুরুষ নারীর আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করে নিজের অতিরিক্ত অংশ হিসেবে মনে করে।

বুভোয়ার বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত লেখকের মতামত বাতিল করে দেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড, আলফ্রেড অ্যাডলার এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেন। এঙ্গেলস তাঁর “The Origin of Family, Private Property and the State (1884 )” বইতে নারীর অধীনতার কথা বলতে গিয়ে ব্রোঞ্জ যুগে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণার কথা বলেন। বুভোয়ার দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান যে এঙ্গেলসের এই কথার কোন ভিত্তি নেই। তাঁর মতে দুইটি দিক থেকে নারীর অবস্থার পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায়। উৎপাদনকার্যে অংশগ্রহণ এবং জন্মদানের দাসত্ব থেকে স্বাধীনতা। তিনি মনে করেন মাতৃত্ব নারীকে নিজের শরীরে অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। নিজের ধারণার স্বপক্ষে তিনি বিভিন্ন পুরাণ থেকে ব্যাখ্যা গ্রহণ করেন।

জন্মের সাথে সাথে শিশুর জীবনের পথে যাত্রা শুরু হয়। বয়স যখন তিন কি চার তখন পুরুষ শিশুকে বলা হয় তুমি একজন “ছোট্ট মানুষ”। বিপরীতে নারী শিশুকে তার নারীত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এই বইতে বুভোয়ার স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন অসাম্যকে চিহ্নিত করেন। তিনি মনে করেন বিবাহ সবসময়ই নারীজীবনকে ধ্বংস করে ফেলে। তিনি মনে করেন বিবাহ একটি বিকৃত প্রতিষ্ঠান যা স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের উপর অত্যাচার করে।

নারীবাদী চিন্তা ও নারীবাদী জীবনবোধ কে অনুধাবনের জন্য অনেকেই ‘দ্যা সেকেন্ড সেক্স’ বইটিকে অবশ্যপাঠ্য মনে করেন।

দুই
দ্যা ফেমিন মিস্টিক - বেটি ফ্রাইডেন (The Feminine Mystique - Betty Friedan, 1963)
বেটি ফ্রাইডেন
বেটি ফ্রাইডেন
১৯৫৭ সালে প্রাক্তন কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে গিয়ে বেটি ফ্রাইডেন নারীজীবনের এক অজানা অধ্যায় আবিষ্কার করেন। তিনি দেখতে পান তাঁর বান্ধবীদের প্রায় সবাই সংসার নিয়ে সুখী নন। স্বামী, সংসার, সন্তান সামলাতে সামলাতে তারা ক্লান্ত, নিঃস্ব এবং হতাশাগ্রস্থ। বেটি ফ্রাইডেন তখন একটি জরীপ চালান। দেখেন যে, বেশিরভাগ মহিলা একঘেয়ে বিলাশী ক্লিশে জীবন নিয়ে হতাশায় পর্যবসিত। গৃহিনী জীবনের ভার টানতে টানতে তারা অবসন্ন হয়ে পড়েছে। এই জীবন থেকে তারা প্রত্যেকেই মুক্তি চান।  আমেরিকার সাধারণ ও অভিজাত নারীরা প্রতিদিন একই রকম জীবন যাপন করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তারা জীবনের আরো নানাদিকে বিকশিত হতে চান। কিন্তু বাইরের পৃথিবী যেন শুধু পুরুষের জন্য তৈরি হয়েছে। এখানে নারীদের প্রবেশাধিকার সহজ নয়।

বেটি ফ্রাইডেন তাঁর গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যগুলো দিয়ে কোন বই লিখতে চান নি। মনোবৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে বিশ্লেষিত তথ্য দিয়ে রচিত প্রবন্ধটি ম্যাগাজিন সম্পাদকরা প্রকাশ অযোগ্য বলে মনে করেছিল। কিন্তু বই হিসেবে প্রকাশ হবার একবৎসরের মধ্যে এর প্রায় দশ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে যায়। ননফিকশন শ্রেণীতে মর্যাদা পায় বহুল বিক্রিত বইয়ের। এই বইতে তিনি নারীদের প্রচলিত ‘মাতৃস্বরূপা গৃহিনী’ রূপটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। সুবেশী, সুকেশী, সুন্দরী, সুগৃহিনী হিসেবে নারীদের যে অবস্থানকে পুরুষরা নির্দিষ্ট করে রেখেছিল তার অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরেছেন। বেটি ফ্রাইডেনের এই বই আমেরিকাতে নব নারীবাদের সূচনা করে। তার দেখানো সামাজিক উপাদানগুলোকে সচেতন শিক্ষিত ধনী নারীরা নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে থাকে। যার ঢেউ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে।

তিন
সেক্সুয়াল পলিটিক্স - কেইট মিলেট (Sexual Politics - Kate Millett, 1970)
কেইট মিলেট
কেইট মিলেট
লৈঙ্গিক রাজনীতির আস্ফালনকে এই বইতে উন্মোচন করা হয়েছে। আমেরিকার নাগরিক কেইট মিলেট তাঁর পিএইডি অভিসন্দর্ভ হিসেবে এই বই তৈরি করেছিলেন। তিনি সাহিত্য সংস্কৃতিতে নারীদেরকে যেভাবে যৌনবস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কীভাবে মানুষ হিসেবে তাদের অবস্থানকে খাটো করা হয় তার বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর তীব্র সমালোচনা থেকে ডি.এইচ. লরেন্স, হেনরী মিলার, নরমান মেইলার, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জন স্টুয়ার্ট মিল কেউই রেহাই পান নি।

সাহিত্যতত্ত্বের ইতিহাসে এটাই প্রথম বই যেখানে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষ লেখকদের বইকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তিনি উপর্যুক্ত লেখকদের একাধিক বইয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে তারা নারী চরিত্র বর্ণনায় পুরুষ দৃষ্টিকোণের উর্ধ্বে উঠতে পারেন নি। নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্বের সূচনাকারী এই বইতে কেইট মিলেট স্পষ্টভাবে লেখকদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখান যে, পুরুষ লেখকদের রচনায় নারী একটি যৌনবস্তু মাত্র। নারীর লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট বর্ণনায় যতটা সম্ভব রগরগে ভাষা ব্যবহারে তারা দ্বিধা করেন নি। সিমোন দ্যা বুভোয়ারের ‘দ্যা সেকেন্ড সেক্স’ বইটি তাকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তবে বুভোয়ারের বইয়ের চাইতে এতে আবেগ প্রভাবিত বিশ্লেষণের প্রাধান্য রয়েছে।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কেইট মিলেটের বইটির প্রাসঙ্গিকতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুরুষের যৌনকাতর দৃষ্টিভঙ্গি এখনও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নারীকে মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে না। এখনও নারীরা শিল্পসংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায়- উপাদানে যতটা না মানুষ হিসেবে তার চাইতে বেশি নারী হিসেবে অর্থাৎ রমনীয় আকর্ষণীয় যৌনবস্তু হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

চার
দ্যা ফিমেল ইউনাক - জার্মেইন গ্রির (The Female Eunuch - Germaine Greer, 1970)
জার্মেইন গ্রির
জার্মেইন গ্রির
জার্মেইন গ্রির তার এই বইয়ে দেখিয়েছেন যে শহরবাসী, ভোগী, একক পরিবার একজন নারীকে যৌনতার দিক দিয়ে অবদমন করে, তার শক্তিক্ষয় করে এবং পরিশেষে তাকে খোজা বানিয়ে ফেলে। এই বইতে তিনি এমন কিছু বিতর্কমূলক কথা বলেছেন যা প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে প্রবলভাবে আঘাত করে। ফলে ‘দ্যা ফিমেল ইউনাক’ বইটি সুধীজনের নিকট থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লাভ করে। অষ্ট্রেলিয়াতে জন্মগ্রহণকারী জার্মেইন গ্রির বর্তমানে ইংল্যান্ডে বাস করেন। বিতর্ক উস্কে দেয়া এই বই ১৯৭০ এর দশকে নারীবাদী আন্দোলনে অনেক প্রেরণা দিয়েছিল। আন্দোলনকারী নারীবাদীগণ এই বই সম্পর্কে অনেক আলোচনা-সমালোচনা করে নিজেদের মনোভঙ্গিকে মূল্যায়ন করে নিতেন। বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়, যেমন ‘শরীর’, ‘আত্মা’, ‘ভালবাসা’, ‘ঘৃণা’ ইত্যাদি অংশে লেখক বিভিন্ন ঐতিহাসিক সংজ্ঞাকে পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। সমকালীন ভোগবাদী সমাজ নারীর সাধারণত্বকে আলোচ্য করে তুলতে দেয় না। তিনি নারীর আমিত্বকে বিশ্লেষণ করেন। এক পর্যায়ে উচ্চারণ করেন:-
এই পৃথিবী তার আত্মা হারিয়েছে, যেমন আমি হারিয়েছি আমার যৌনতা
গ্রির ব্যাঙ্গাত্মক, স্থূল ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করে নারীর যৌন অনুভূতিকে সরাসরি ও অকপটভাবে প্রকাশ করেছেন। তার আলোচ্য প্রসঙ্গগুলো সুশীল সমাজে এর আগে তেমনভাবে আলোচিত হয় নি।

গ্রির মনে করেন পুরুষরা নারীদের ঘৃণা করে। এটা ততোটা বোঝা যায় না, তাই পরিশেষে আত্মঘৃণায় পর্যবসিত হয়। তিনি মনে করেন বিবর্তন নয়, বিপ্লবের পথ ধরে নারীদের মুক্তি আসবে। তিনি নারীদেরকে নিজেদের শরীরকে আবিষ্কারের কথা বলেন, যৌনতাকে উপভোগের পরামর্শ দেন। তিনি এমনকি নারীদেরকে নিজ রজস্রাবের রক্তের স্বাদ আস্বাদন করতে বলেন, তাদেরকে কৌমার্য বিসর্জন দিতে এবং বহুগামী হবার জন্য আহ্বান জানান।

পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে গ্রির বলেন মেয়েদেরকে তাদের যৌনকামনা থেকে বিমুক্ত করে ফেলা হয়েছে। তারা নিজেদের যৌনেচ্ছা  নিয়ে সংশয়ী হয়ে গেছে। এ সমাজে মেয়েরা অনেকটা পশুর মত। মালিকের ইচ্ছানুযায়ী বংশবৃদ্ধি করা, মালিকের গোপন ইচ্ছামাফিক আরও উর্বর ও অনুগত হওয়া তার প্রধান কাজ। গ্রির এই সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনকে অবশ্য প্রয়োজনীয় মনে করেন।

পাঁচ
এগেইনস্ট আওয়ার উইলঃ পুরুষ, নারী এবং ধর্ষণ- সুসান ব্রাউনমিলার ( Against Our Will: Men, Women and Rape – Susan Brownmiller, 1975)

সুসান ব্রাউনমিলার
সুসান ব্রাউনমিলারছবিসূত্র
নারীজীবনের সবচাইতে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হল ‘ধর্ষণ’। সুসান ব্রাউনমিলারের আগে এই প্রসঙ্গটির উপর খুব কম লেখক আলোকপাত করেছেন। ধর্ষণের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ ও মনোভঙ্গি পাল্টানোর জন্য অনেকেই এই বইয়ের প্রশংসা করেন। যদিও কোন কোন সমাজবিজ্ঞানী বইটির সমালোচনা এবং যে উপসংহার টানা হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ১৯৭৫ সালে ‘ধর্ষণ’ প্রসঙ্গে লেখা এই বইয়ে লেখক স্পষ্টভাবে বলেন-
ধর্ষণ একটি সচেতন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রত্যেক পুরুষ নারীদের হৃদয়ে এক আতংকের পরিবেশ তৈরি করতে চায়।

ব্রাউনমিলার বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড ভন ক্রাফট এবিং, সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক কার্লমার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের ব্যাপক সমালোচনা করেন। ব্রাউনমিলার মনে করেন এই প্রাজ্ঞ পণ্ডিতগণ নারীর প্রতি সংঘটিত ভয়াবহ ঘটনা ‘ধর্ষণ’কে তাঁদের আলোচনায় পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন।

প্রাকৃতিক পরিবেশে পশু বা পাখীরা কখনও ধর্ষণ করে না। অন্ততঃ জীববিজ্ঞানীরা এর কোন প্রমাণ পান নি। কিন্তু কিছু সামাজিক ধারণা অনুযায়ী কোন কোন নারীর জন্য ধর্ষিত হওয়া প্রাপ্য ছিল- এমন বিশ্বাস প্রসঙ্গে ব্রাউনমিলার উষ্মা প্রকাশ করেন।

যৌন নির্যাতনের প্রধান অনুষঙ্গ ধর্ষণ যে একটি অপরাধ তা ব্রাউনমিলার বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন। তার এই বইয়ের কারণে সারা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ ধর্ষণের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা নোংরা রাজনীতি তথা আধিপত্যবাদকে বুঝতে পেরেছে।

নিপীড়িতকে দোষারোপ করার ধারণা অনেক পুরাতন। গণপিটুনী দেয়ার জন্য যেরকম অজুহাত টানা হয়; একই মনোভঙ্গি ধর্ষণের সমর্থনে অনেক পুরুষ দিয়ে থাকে। ব্রাউনমিলার এই জাতীয় পুরুষদেরকে আদিম চিন্তায় আক্রান্ত ধর্ষণপ্রবণ মানসিকতার অধিকারী বলে চিহ্নিত করেন।

ব্রাউনমিলার যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তিগুলো প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার কোন এক মনোবিশ্লেষণে জানিয়েছিলেন যে নারীরা নাকি কল্পনায় ধর্ষিত হবার প্রত্যাশা করে। ব্রাউনমিলার ফ্রয়েডের এই ধারণার তীব্র প্রতিবাদ করেন।

ব্রাউনমিলারের মতামতের সমালোচনাও কম হয় নি। আমেরিকার একাধিক সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এমনকি জীববিজ্ঞানীরাও তার বিভিন্ন বক্তব্যের সাথে একমত হন নি। কিন্তু তারপরও এই বই সারা পৃথিবীর শুভবোধসম্পন্ন মানুষের চিন্তা-ভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এমনকি এর প্রভাবে বিশ্বের অনেক দেশের ফৌজদারী আইনে এসেছে নানাবিধ পরিবর্তন। সমকালে যখন ধর্ষণের স্বপক্ষে বিভিন্ন অজুহাতকে টেনে আনা হয়, তখন ব্রাউনমিলারের এই বইয়ের বক্তব্যগুলো যেন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

  • এই আলোচনাটি গার্ডিয়ান পত্রিকার From The Second Sex to The Beauty Myth: 10 of the best feminist texts রচনা থেকে অনুপ্রাণিত।
  • লেখক ও বইগুলোর প্রথম সংস্করণের ছবি Wikipedia থেকে সংগৃহীত।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।