বিভিন্ন প্রকার “সাহিত্যতত্ত্বের ধারা ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি” সংকলন করেছেন ‘অনুপম হাসান’

বিভিন্ন প্রকার “সাহিত্যতত্ত্বের ধারা ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি” সংকলন করেছেন ‘অনুপম হাসান’
সাহিত্য সম্পর্কে আলোচনা সমালোচনার বিভিন্ন ধারা রয়েছে। সমালোচকগণ বিভিন্ন দার্শনিক, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় অবস্থান থেকে সাহিত্যকে বিচার করে থাকেন। একই প্রসঙ্গ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারার সমালোচকগণ খুব কম সময়েই একমত হয়েছেন। কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাহিত্যের সৌন্দর্য, শিল্প, গুরুত্ব, প্রভাব মূল্যায়ন করে থাকেন। নিজের তাত্ত্বিক অবস্থান তাঁদেরকে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করে তোলে। আর এই বিবিধ সাহিত্যতাত্ত্বিক অবস্থানকে বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন করা হয় সাহিত্যতত্ত্বে।

“সাহিত্যতত্ত্বের ধারা ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি” এরকমই একটি বই। এখানে সাহিত্যের মূল্যায়ন সম্পর্কে একাধিক চিন্তাবিদের নানাবিধ মনোভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। সংকলক অনেক পরিশ্রম করে বিভিন্ন পত্রিকা থেকে আলোচনাগুলো সংগ্রহ করেছেন। সাহিত্যের নানাবিধ সূত্রগুলো একত্রিত করায় সম্পাদক ‘অনুপম হাসান’ বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখেন।

সূচিপত্র
  • ভূমিকা
  • প্রথম অধ্যায়ঃ সাহিত্যতত্ত্বের ধারা
  • রোমান্টিসিজম
  • অনুপম হাসান। রোমান্টিসিজমঃ সহজপাঠ
  • রিয়ালিজম [সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ]
  • বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়। বাস্তববাদ
  • ন্যাচারালিজম
  • বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়। ন্যাচারালিজম বা যথাস্থিতবাদ
  • মার্কসিজম
  • অনুপম হাসান। মার্কসিজমের সূত্রাবদ্ধ ভাবনা
  • ড. আবু মাহমুদ। মার্কসীয় দর্শন [ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদঃ কিছু ধারণা]
  • আফজালুল বাসার। মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব [কয়েকটি মার্কসীয় ধারণা] [মূলকাঠামো ও অধিকাঠামো] [মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষা] [প্রতিফলন তত্ত্ব] [পিয়ের ম্যাশেরির উৎপাদন তত্ত্ব] [ গোল্ডমানের জৈবিক তত্ত্ব] [এডোরনোর নঞ জ্ঞানতত্ত্ব] [ভাষাকেন্দ্রিক তত্ত্ব]
  • ফ্রয়েডিজম [মনোবিকলন] [স্বপ্নতত্ত্ব]
  • সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ঃ মনঃসমীক্ষণ
  • ফেমিনিজম [নারীবাদ] [নারীবাদী অভিধান] [নারীবাদে মতদ্বৈধতা] [নারীবাদের নানামত]
  • শেফালী মৈত্র। নারীবাদী দর্শন ও তার প্রেক্ষাপট
  • অনুপম হাসান। নারীবাদ প্রসঙ্গে কতিপয় বিবেচনা
  • মডার্নিজম
  • দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়। আধুনিকতার ঘরবাড়ি
  • তপোধীর ভট্টাচার্য। আধুনিকতাঃ গন্তব্যহীন যাত্রার আকল্প
  • পোস্ট মডার্নিজম
  • অনুপম হাসান। উত্তর আধুনিকতার বিষয়ক ডিসকোর্স
  • জিললুর রহমান। উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙায়
  •  
  • দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি
  • ইতিহাসমূলক
  • অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। ঐতিহাসিক সমালোচনা
  • তুলনামূলক
  • অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তুলনামূলক সমালোচনা
  • বিশ্লেষণমূলক
  • মূল্যবিচারমূলক
  •  
  • তৃতীয় অধ্যায়ঃ সাহিত্য সমালোচনা
  • আলাউদ্দিন আল আজাদ। সমালোচনাঃ রীতি-পদ্ধতি
  • শ্রীশচন্দ্র দাশ। সমালোচনা [সমালোচক ও সাহিত্যদ্রষ্টা] [বাংলা সমালোচনা সাহিত্য]
  • শ্রী আনন্দমোহন বসু। সমালোচনা সাহিত্য
  • অনুপম হাসান। সাহিত্যের সমালোচনাঃ বিবিধ মত-পথ
  •  
  • চতুর্থ অধ্যায়ঃ সমালোচনার প্রাথমিক কথা ও নমুনা সমালোচনা [মৌখিক গ্রন্থ সমালোচনা] [বই সমালোচনা পদ্ধতি]
  • গ্রন্থ সমালোচনা
  • পদ্মানদীর মাঝি
  • পুতুল নাচের ইতিকথা
  • পথের পাঁচালী
  • নন্দিত নরকে
  • মানিক উপন্যাসের নারীরা
  • অন্ধের আঙুলে এত জাদু
সংকলক বেশ পরিশ্রম করে বেশ কয়েকটি বই, পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন ঘেঁটে সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনাগুলো সংগ্রহ করেছেন। প্রায় প্রতিটি প্রসঙ্গের সংজ্ঞা নিয়েছেন ‘সুরভী বন্দ্যোপাধ্যায়’ এর “সাহিত্যের শব্দার্থকোষ” থেকে। এরপর সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ করে মূল আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রাজ্ঞ আলোচকগণের পাশাপাশি নিজেও কয়েকটি সাহিত্যসূত্র বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর আলোচনা ভঙ্গি সহজ, প্রাঞ্জল। তাত্ত্বিক পর্যালোচনাগুলো পড়তে গিয়ে কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। মনোজ্ঞ উদাহরণ ব্যবহার করে তিনি তার আলোচ্যকে প্রামাণ্য করে তুলেছেন; পাঠকের হৃদয়ে- মননে সহজবোধ্য করতে চেয়েছেন।

সাহিত্যতত্ত্ব খুব একটা জটিল বিষয় নয়। এটা মূলতঃ সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা-শাখা প্রসঙ্গে চিন্তাবিদদের নিজস্ব মতামত মাত্র। সমস্যাটা হচ্ছে একই বিষয়ে নানাজন নানা প্রকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এদের মধ্যে কোন কোন মতামত পরস্পরবিরোধীও বটে। কেউ কেউ আবার অন্যজনের চাইতে একেবারে ভিন্ন অবস্থান থেকে বিষয়কে আলোচ্য করে তুলেছেন। প্রাজ্ঞজনদের এইসব বিবিধ মনোভঙ্গি, চিন্তা, মতামত একজন সাহিত্য আলোচককে বুঝে নিতে হয়। সংকলক ‘অনুপম হাসান’ চিন্তাবিদগণের সেই বিবিধ আলোচনাগুলোকে একত্রিত করার পরিশ্রমসাধ্য কাজটি করেছেন। তার এই প্রচেষ্টাকে উচ্চ প্রশংসা না করলে কৃপণতা হবে।

বইয়ের শেষে আলোচিত সাহিত্যতত্ত্বের বিভিন্ন দিক থেকে কীভাবে সাহিত্য সমালোচনা করতে হয় সে প্রসঙ্গে একটি অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে। লেখক এই অংশে সাহিত্য সমালোচনার বিভিন্ন দিক নিপুণভাবে আলোচনা করেছেন। সমালোচকের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বক্তব্যটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন :-
বই সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সমালোচককে সতর্ক থাকতে হয়, যাতে কোন ধরনের পক্ষপাত না ঘটে; কেননা বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নির্মোহ সমালোচনার কোনো বিকল্প নেই। নির্মোহ-নিরেট পক্ষপাতহীন সমালোচনার মাধ্যমেই কেবলমাত্র দেশ-জাতি-সমাজের নিকট প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত-সত্য প্রকাশ পায়। গ্রন্থের ক্ষেত্রে পাঠকগণ সমালোচকের কাছে প্রকৃত এবং নিরপেক্ষ সমালোচনাই প্রত্যাশা করেন।
লেখকের এই বক্তব্য বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য। কারণ আত্মপ্রশংসাপ্রেমী আমরা অন্যের ত্রুটি অন্বেষণে যতটা সচেষ্ট, নিজের ত্রুটি পরিলেপনে ততোটাই উৎসাহী। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকারে আমরা অনাগ্রহী। ফলে নিরপেক্ষ সমালোচনার যে সমস্যা তার প্রভাব থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই।

 লেখক বইয়ের একেবারে শেষের অংশে কয়েকটি বইয়ের রিভিউ সংযোজন করেছেন। বই রিভিউ কীভাবে করতে হয়, কীভাবে বইয়ের আলোচনাকে এগিয়ে নিতে হয়, সে সম্পর্কে আগ্রহী পাঠক এই অংশ থেকে উপকৃত হবেন একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

সাহিত্যের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে আগ্রহীগণ এই বই পাঠে উপকৃত হবেন। সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা, দর্শন, চিন্তা সম্পর্কে বুঝতে এই আলোচনাগুলো পড়া প্রয়োজন। যারা সৃষ্টিশীল তারা কোন সংজ্ঞা না জেনেই নিজেদের সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটাতে পারেন। কিন্তু নিজের রচনার বিচার করার জন্য প্রাথমিক কিছু তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। না হলে আত্ম সমালোচনার সামর্থ তৈরি হয় না; নিজের শিল্পকার্যের ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো চোখে পরে না। একটি ভুল আত্মবিশ্বাসের মায়াজালে তারা বন্দী হয়ে পরেন। কিন্তু সাহিত্যের বৈশ্বিক বা ভারতীয় বিভিন্ন ধারা, তত্ত্ব, দর্শন, মতবাদ বা আলোচনার সাথে যদি পরিচয় থাকে; অন্তত একবার পড়া থাকলে নিজের দূর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব। আর সেই উদ্দেশ্যলাভের জন্য এই বইয়ের মতো কয়েকটি বই পড়া থাকা দরকার। শুধু পড়া নয়; নিজের সংগ্রহে থাকা উচিত। তাহলে মাঝে মাঝে বইয়ের তত্ত্বগুলো পাঠশেষে নিজের কীর্তির তুলনা করতে সুবিধা হবে।

বইয়ের কোথাও কোন গ্রন্থপঞ্জী উল্লেখ করা হয় নি। “সাহিত্যতত্ত্বের ধারা ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি” বইতে অনেকগুলো বই/ ম্যাগাজিন থেকে প্রবন্ধ সংগ্রহ করা হয়েছে। যদিও তিনি প্রতিটি লেখার শেষে সূত্র উল্লেখ করেছেন, তারপরও সেগুলোর একটি সম্পূর্ণ তালিকা বইয়ের কোথাও একপৃষ্ঠায় সংকলিত হলে পাঠক উপকৃত হত। একনজরে সবগুলো আকরগ্রন্থের নাম তারা পেয়ে যেত। একারণে এই ধরণের গবেষণামূলক বইয়ে একটি গ্রন্থপঞ্জী থাকা খুবই প্রয়োজন। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে গ্রন্থকার বিষয়টির প্রতি মনোযোগী হবেন।

সাদা কাগজে ছাপানো বইয়ের মূদ্রণ মান ভাল। স্পষ্টাক্ষের মূদ্রিত হওয়ায় লেখাগুলো স্পষ্ট ও ঝকঝকে।  শক্ত মলাটের বইটির বাঁধাই উন্নতমানের। ফলে বইয়ের স্থায়ীত্ব নিয়ে পাঠককে দুঃশ্চিন্তা করতে হবে না; বহু ব্যবহারেও বইটি সহজে জীর্ণ হবে না। সাহিত্য নিয়ে চিন্তাশীল পাঠক এই বইটিকে সাদরে গ্রহণ করবেন এই প্রত্যাশা করি।

===============
সাহিত্যতত্ত্বের ধারা ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি
গ্রন্থনা, সম্পাদনা ও সংকলনঃ অনুপম হাসান


প্রচ্ছদঃ নাসিম আহমেদ
প্রকাশনীঃ বুকস্ ফেয়ার, ঢাকা।
প্রকাশকালঃ ২০১৭
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ২৯৬
মূল্যঃ ৩২০ টাকা
ISBN: 984-70158-0323-6

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।