“সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব” বিশ্লেষণ করেছেন ‘বুলবন ওসমান’

“সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব” বিশ্লেষণ করেছেন ‘বুলবন ওসমান’
চিন্তাবিদগণ সবাই একমত একটি বিষয়ে যে সংস্কৃতি শুধুমাত্র মানুষেরই সৃষ্টি। অপরাপর প্রাণীদের কর্মকাণ্ড প্রবণতার চিহ্ন কিন্তু মানুষের যাবতীয় কীর্তির বহিঃপ্রকাশ সংস্কৃতির রূপে। তবে সংস্কৃতির সংজ্ঞা কী; সংস্কৃতির স্বরূপ কী? - এ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত আছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেচনাবোধ থেকে সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেছেন। পণ্ডিতগণ মানুষের বৈচিত্রময় কর্মকাণ্ডকে বিবিধ দার্শনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন। সংস্কৃতির উপাদান কী কী সে বিষয়েও সংস্কৃতিমান দার্শনিকদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে।

সংস্কৃতি সম্পর্কিত সামগ্রিক ধারনাগুলোকে যে শাস্ত্রে বিস্তারিত আলোচনা করা হয় তার নাম সংস্কৃতিতত্ত্ব। সংস্কৃতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারনা লাভের জন্য ‘সংস্কৃতিতত্ত্ব’কে বিষয় হিসেবে প্রথম প্রস্তাব করেন এ. এল. ক্রোবার। বুলবন ওসমান এই গ্রন্থের ভূমিকায় ব্যাপারটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন -
সেই ১৯৫৯-৬৩ সালে মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ এ.এল.ক্রোবারের ‘জেনারেল অ্যানথ্রোপলজি’ পুস্তকটি আমাকে বেশ আকর্ষণ করে। তিনি এই পুস্তকের সুচনায় বলেন যে সংস্কৃতি পাঠ করার জন্যে পৃথক একটি তাত্ত্বিক বিষয় প্রয়োজন, যে তত্ত্বের নাম হবে সংস্কৃতিতত্ত্ব।
সংস্কৃতিতত্ত্ব সম্পর্কে আলাদাভাবে আলোচনার করার তাগিদেই এই বইয়ের জন্ম। সংস্কৃতি যেহেতু মানুষের সৃষ্টি সেহেতু নৃতাত্ত্বিকগণই এর প্রধান আলোচক। সংস্কৃতির ব্যাপ্তি, প্রান্ত, নির্ভরশীলতা এবং বিভিন্ন পরিবর্ত (Variable) সাপেক্ষে সংস্কৃতিতত্ত্ব স্বতন্ত্র বিষয়ের মর্যাদা পেতে পারে কি না তা নিয়েও নৃতত্ত্ববিদগণের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ মনে করেন সামাজিক নৃতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব আলাদা বিষয়। আবার কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন সামাজিক নৃতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংস্কৃতি। বুলবন ওসমান সংস্কৃতিকে আলাদা প্রসঙ্গ বলে বিবেচনা করার পক্ষপাতি। সংস্কৃতির বিভিন্ন নির্ধারককে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করে তিনি সংস্কৃতি বিষয়টিকে বিশেষভাবে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করতে চেয়েছেন। সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর সামগ্রিক চিন্তার ফসল এই ‘সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব’ বইটি। সূচীপত্র পাঠে বিষয়ের গভীরতা ও ব্যাপ্তি বোধগম্য হবে। মোট আঠারোটি প্রবন্ধে সংস্কৃতির উৎস ও উপাদানসমূহকে লেখক স্পষ্ট করেছেন। প্রবন্ধসমূহ মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দিককে সংস্কৃতির কার্যকারণ ও বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটে সহজবোধ্য করেছে।

সূচীপত্র
  • সংস্কৃতিঃ সংজ্ঞা
  • সমাজ ও সংস্কৃতি
  • সভ্যতা ও সংস্কৃতি
  • বর্ণ ও সংস্কৃতি
  • শিল্প ও সংস্কৃতি
  • ভাষা ও সংস্কৃতি
  • ধর্ম ও সংস্কৃতি
  • মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি
  • ব্যক্তিত্ব ও সংস্কৃতি
  • ব্যক্তিত্ব -প্রকৃতি ও সংস্কৃতি
  • সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি
  • সাংস্কৃতিক পরিবর্তন
  • সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পার্থক্য
  • সাংস্কৃতিক পরিবর্তনঃ বিভিন্ন মতবাদ
  • ভৌগলিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি
  • উৎপাদন পদ্ধতি ও সংস্কৃতি
  • বন্টন পদ্ধতি ও সংস্কৃতি
  • সামাজিক দল ও সংস্কৃতি
বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটি চিরায়ত প্রশ্নটি ঘিরেই। সংস্কৃতি কী? এর সংজ্ঞা কী? এই প্রশ্নটির অবগুন্ঠন ‘সংস্কৃতিঃ সংজ্ঞা’ প্রবন্ধে উন্মোচনের চেষ্টা রয়েছে। বেশ কয়েকজন প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদের মতামত উল্লেখ করে লেখক নিজের ধারনা ব্যাখ্যা করেছেন। বিশ্লেষণ করেছেন বিভিন্ন সংজ্ঞার সম্পর্ক ও পার্থক্য। লেখকের ভাষ্যে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক-
  • সংস্কৃতি হল সমাজে সমগ্র ব্যবহারিক প্রক্রিয়া যা সামাজিকভাবে হস্তান্তরিত হয়, যার জন্য বিভিন্ন প্রতীক চিহ্নের দরকার। মানুষের সমগ্র সৃষ্টির বিভিন্ন নাম, যেমনঃ ভাষা, কলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আইন, দর্শন, রাষ্ট্র, নৈতিকতা, ধর্ম- তাছাড়া সমগ্র যন্ত্রপাতি ও ব্যবহারিক দ্রব্যাদি এবং এই সমস্ত দ্রব্য নির্মাণের সমস্ত বিদ্যা, ঐতিহ্য, রীতি-প্রথা, মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান, অনুষ্ঠান… এর সব পড়ে সংস্কৃতির আওতায়। পৃ - ১৩
তিনি মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও সংস্কৃতির স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। মার্ক্স মনে করেন সংস্কৃতি হল সুপারস্ট্রাকচার বা অতিকাঠামো। আর সমাজের মূল কাঠামো হল উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্ক। এরই উপর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সমাজের সংস্কৃতি। লেখক মনে করেন মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিটিও মূল্যায়নের দাবী রাখে। কারণ সমাজের মূল কাঠামো বুঝতে হলে মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা মূল্যবান, আবার সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে হলে বিভিন্ন নৃ-সমাজবিজ্ঞানীর সাহায্য নেয়া প্রয়োজন। মার্ক্সীয় দর্শন ম্যাক্রো বা কাঠামো কেন্দ্রিক আর নৃ বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা মাইক্রো বা অণুদৃষ্টিজাত। এই দুই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানকে পূর্ণাঙ্গ করতে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।

দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘সমাজ ও সংস্কৃতি’তে লেখক বলেছেন তত্ত্বগতভাবে যদিও পার্থক্য আছে তবুও সমাজ ও সংস্কৃতি এই দুটি পরস্পর অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। সমাজগত মানুষেরা সংস্কৃতি তৈরি করে; কিন্তু সমাজ মারা যেতে পারে। আর সমাজ মরে গেলেও বেঁচে থাকে বা চিহ্ন থেকে যায় সেই সমাজের আচরণীয় নানা সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান। পুরাতাত্ত্বিক স্থাপত্যগুলো আমাদের সামনে সেইসব সমাজের কথা উপস্থাপন করে যে সমাজ একসময় সগৌরবে অস্তিত্বশীল ছিল কিন্তু এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

‘বর্ণ ও সংস্কৃতি’ নামক তৃতীয় প্রবন্ধে লেখক সংস্কৃতিতত্ত্বে বর্ণ শব্দটির বিশিষ্টতা আলোচনা করেছেন। বর্ণ শব্দটি বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় বিবিধ হলেও নৃতত্ত্ববিদগণের মতামত ভিন্নরকম। তাঁরা বর্ণ বলতে বোঝান ‘বংশানুক্রম ধরে একটি দলের সঙ্গবদ্ধতা’ (পৃ:২৭)। বর্ণ বিভাগে যে সমস্ত চিহ্ন ব্যবহৃত হয় সেগুলো হলঃ
১) শারীরিক উচ্চতা, ২) মাথার আকৃতি, ৩) নাসিকার আকৃতি, ৪) চোয়ালের গড়ন, ৫) চুলের গড়ন, ৬) শরীরে লোমের অনুপাত, ৭) শরীর, চামড়া, চুল ও চোখের রঙ, ৮) শরীরে ঘ্রাণ, ৯) চোখ, ঠোঁট ও কানের গড়ন (পৃ:- ২৮)

এই সমস্ত চিহ্নের ভিত্তিতে মানবগোষ্ঠীকে মূলত তিন প্রকার ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এদের প্রত্যেক ভাগের বিভিন্ন উপবিভাগ রয়েছে।
১) নিগ্রো মহাবর্ণ, ২) মঙ্গোল মহাবর্ণ, ৩) ককেশীয় মহাবর্ণ

আমরা অনেক সময় বর্ণভেদে মানুষের মধ্যে গুণের তারতম্যের ভিত্তিতে উঁচু নীচু ভেদাভেদ করি। কিন্তু এ ধরনের বিভক্তি অবৈজ্ঞানিক। লেখক বিভিন্ন উদাহরণ সহযোগে স্পষ্টরূপে প্রমান করেছেন যে, বর্ণভেদ জীববৈজ্ঞানিক কিন্তু দোষ-গুণ বা মেধার কম-বেশি হওয়াটা সম্পূর্ণত সাংস্কৃতিক পরিবেশের বৈশিষ্ট্যগত। তাই লেখক মনে করেন বর্ণগত অভিমান একটা সংস্কার ছাড়া আর কিছু নয় (পৃ- ৩১)।

‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে মানব সমাজে শিল্পের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ তাৎপর্যবহ। নৃতত্ত্ববিদগণ অনুমান করেছেন মানুষের জীবনে প্রথম শিল্পবস্তু হল পাথর ও লাঠি। কারণ আত্মরক্ষা মানুষের প্রাণী হিসেবে প্রথম চাহিদা। এই চাহিদাকে তৃপ্ত করতে গিয়ে মানুষ প্রথমে এই বস্তুদুটোকে হাতে তুলে নেয়। বর্তমানযুগে অবশ্য শিল্পের মৌল উপাদান হয়ে দাড়িয়েছে মনোরঞ্জন ও পরোক্ষে হিতসাধন। সংস্কৃতির সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ সংস্কৃতি হলো মনের সূক্ষ্ম বিকাশ। আর এর ফলেই ঘটে মানুষের সৃষ্টি-ক্ষমতা যার প্রকাশ পায় শিল্পে। সময়ের সাথে সাথে শিল্পের পরিধি বেড়েছে অনেকগুণ। রেনেসাঁ মনোভঙ্গি শিল্প ও শিল্পবোধ এবং বিজ্ঞান এই তিনকে এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখত, যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ত্ব গড়ে তোলা। লেখক জানান-
সেই আদিকাল থেকেই শিল্প কতগুলো নিয়ম মেনে চলছে এবং এ -নিয়মের উৎস প্রকৃতি। প্রকৃতির বিন্যাসে একটা সমতা আছে। গাছের দ্বি-দলপত্র, নদীর দুই কূল, মানুষের দুই হাত-পা, চোখ-নাক এমনি ধারা। এখান থেকেই ধার করে শিল্প কতগুলো নিয়ম করে নিয়েছে- যেমন সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাল-লয়, কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ, চিত্র ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে সমতা-ঐক্য এমনি ধারা সব শিল্প মোটামুটি একটা নিয়ম মেনে চলে, চলেছে এবং চলছে। এমন কী আদিম শিল্প প্রস্তর-হাতিয়ারও ছিল একটা নিয়মের বাঁধনে বাঁধা।
সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে সংস্কৃতিতত্ত্বের অধ্যয়ন প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তার কিয়দংশ ‘বুলবন ওসমান’ বিরচিত ‘সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব’ গ্রন্থটি পাঠে পূরণ হবে। সংস্কৃতি বলতে কি বোঝায় এই চিন্তাটি আলোচ্য গ্রন্থের প্রধান বিবেচ্য। ফলে সংস্কৃতি সম্পর্কে বুঝতে আগ্রহী ব্যক্তির নিকট বইটি আদরণীয় হওয়া উচিত। তাত্ত্বিক প্রসঙ্গ হলেও বইটির ভাষা সহজ সরল। অযথা জটিল শব্দের অবতারণা করে লেখক নিজের লেখাকে ভারী করে তোলেন নি। ফলে সব বয়সের পাঠক বইটি পাঠে সংস্কৃতির স্বরূপ জানার পাশাপাশি একটি নতুন প্রসঙ্গ পাঠের আনন্দ পাবেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন - “সংস্কৃতি হল একটি হীরক খণ্ড আর সভ্যতা তার দ্যুতি”। আমাদের সভ্যতাবোধ ও তার প্রভাবে সৃষ্ট সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ রবিঠাকুরের বক্তব্যের ভাবার্থ অনুধাবনে সচেষ্ট থাকুক- সংস্কৃতিপ্রেমী সংস্কৃতিমান মানুষের এই প্রত্যাশা অবান্তর নয়। ‘সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব’ বইটি প্রধানত চিন্তাশীল পাঠকের জন্য রচিত। সকল পাঠক সংস্কৃতির পরিচয় বোঝার মত চিন্তাসামর্থ অর্জন করুক বইটি পাঠশেষে এটাই প্রত্যাশা।

=================
সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব
বুলবন ওসমান

প্রচ্ছদঃ বুলবন ওসমান
প্রথম জাগৃতি সংস্করণঃ ২০১০
প্রকাশনীঃ জাগৃতি প্রকাশনী, ঢাকা।
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ৯৬
মূল্যঃ ১৪৫ টাকা
ISBN: 978-984-8416-014-3

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। আরও বিস্তারিত কিছু জানাতে চাইলে ই-মেইল করুন।