ক্রৌঞ্চগীতি: ব্যক্তিগত অনুভবে | জ্যোতির্ময় নন্দী

ক্রৌঞ্চগীতি: ব্যক্তিগত অনুভবে | জ্যোতির্ময় নন্দী

একটি সান্ধ্য আড্ডার ধূপবিভূতি এই সংকলন, ‘ক্রৌঞ্চগীতি’, যার শব্দশরীরে কম্পমান প্রাতিস্বিক স্বপ্নক্লৈব্য ও আনন্দবিষাদ। দ্বিধা তার মোহনমুরলী; জীবনের খটখটে রোদে পান করে সে মহানিভৃতির ছায়া। যে-পথে তার যাত্রা তা নতুন কিছু নয়, তবু সে এক অনাস্বাদিতপূর্ব গন্তব্যের অভিসারী।
উপরের উদ্ধৃতিটি এক অসাধারণ কবিতা সংকলনের সম্পাদকীয় বা প্রাক্কথনের সূচনা, যার ধ্রুপদী ব্যঞ্জনা গ্রন্থটি পাঠে আমাকে আগ্রহী করে তোলে। লেখক কপি হিসেবে সংকলনটি আমার ঢাকার ঠিকানায় পাঠিয়েছেন সেটার সম্পাদকদ্বয় মুয়িন পারভেজ ও মেরুন হরিয়াল। ক্রমশ গদ্যময় হয়ে উঠতে থাকা স্বদেশে বা বিশ্বে কবিতার গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তার পারদ যখন হু হু করে নিচের দিকে নামছে, কবিতার বই বিক্রি যখন প্রায় শূন্যের কোটায়, পত্রপত্রিকায় কবিতা যখন প্রায় অপঠিত এবং অঙ্গসজ্জার অঙ্গমাত্র, এমন এক দুঃসহ ক্রান্তিকালে সযত্ন পরিচর্যায় লালিত এই কবিতার বাগান আমাকে যুগপৎ আনন্দিত ও বিস্মিত করেছে।

‘ক্রৌঞ্চগীতি’ নামে সংকলনটি এককথায় অনবদ্য। প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ, সম্পাদনা, সম্পাদকীয় -- সর্বত্রই এর সর্বোচ্চ যত্ন ও পরিচর্যার ছাপ। কোনটা ফেলে কোনটার কথা বলি, লিখতে বসে এটাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এটা আসলে ক্রৌঞ্চগীতির দ্বিতীয় সংস্করণ। প্রথমেই সঙ্কলনটির সম্পাদকীয়ের কথা বলা যাক। এটা একটা অসাধারণ সম্পাদকীয় -- সংক্ষিপ্ত বলে পাঠকের বিরক্তি উৎপাদন করে না, অথচ সুলিখিত বটে। এ সম্পাদকীয় থেকে জানা যায়, প্রথম সংস্করণটি বেরিয়েছিলো ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। প্রায় দেড়যুগ পেরিয়ে এবার বেরুলো দ্বিতীয় সংস্করণ।

ক্রৌঞ্চগীতি নামটাই পাঠককে আভাস দিয়ে দেয়, এটা প্রেমের কবিতার সংকলন। এ নাম স্মরণ করিয়ে দেয়, আদিকবি বাল্মিকীর মুখে উচ্চারিত সেই আদিশ্লোকের কথা।, যেখান থেকে সম্পাদকদ্বয় নিশ্চয় তাঁদের এ সংকলনের নামকরণের প্রণোদনা পেয়েছেন। শ্লোকটা এতে থাকলে ভালো হতো, কিন্তু থাকবে কিনা তা নিয়ে যখন আমি সন্দিহান, তখনই পাতা ওল্টাতে গিয়ে চোখে পড়লো, শুরুতেই আলো করে ফুটে আছে সেই কালোত্তীর্ণ আদিশ্লোকের ফুল, সাবলীল বাংলা ভাষান্তরসহ--

“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমা।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্ ॥”

[রে নিষাদ, তুই কামার্ত ক্রৌঞ্চমিথুনকে বধ করলি। এ জন্যে তুই আর প্রতিষ্ঠা পাবি না ॥]

এ শ্লোক পড়তে গিয়ে আরো বিস্মিত হলাম, যখন দেখলাম এতে কোনো বানান ভুল নেই, সংস্কৃত লিখতে গিয়ে যেখানে ভুল করাটাই সাধারণ নিয়মের মধ্যে পড়ে। আদিকবির নির্ভুল উপস্থাপন কবিতার প্রতি কবি-সম্পাদকদ্বয়ের ভালোবাসা ও নিষ্ঠার জাজ্বল্য প্রমাণ হয়ে আমার চোখে ও মনে চিরস্থায়ী সিলমোহর মেরে দিলো।

সম্পাদকীয়তে বাংলা প্রেমের কবিতার পূর্বসুরী সংকলনগুলোর ইতিকথাও সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সম্পাদকদের সাধ্যের সীমাবদ্ধতা ও অক্ষমতার ইতিবৃত্তও। বানান নিয়ে তাঁদের অনুসৃত সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্কেও তাঁরা এ লেখায় আলোকপাত করেছেন।
বানান নিয়ে আমার নিজের একটু শুচিবায়ু আছে বলা যায়, যা অনেকের ঘোর অপছন্দ। এ নিয়ে কর্মজীবনে ও কাব্যচর্চায় বহুবার আমি বহু বিড়ম্বনার শিকার হয়েছি। সৌভাগ্যবশত এ সংকলনে আমার নিজেরও একটা কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লেখাটা পড়তে গিয়ে একটা বানান ‘কোনোদিন’-কে ‘কোনওদিন’ করায় একটু খারাপই লাগলো, যেহেতু এ দুটো বানানে উচ্চারণগত সামান্য পার্থক্যও আছে, এবং এর ফলে কবিতাটির ছন্দও একটু মার খেয়ে যায়। কিন্তু সম্পাদকীয়তে যখন এ ব্যাপারে সম্পাদকদের বক্তব্য পরে জানলাম, তাঁরা ‘কখনো’র বদলে ‘কখনও’র পক্ষপাতি, তখন আমার অসন্তুষ্ট মন একটু সান্ত্বনা পেলো। কারণ তখন বুঝতে পারলাম, এ ভুল অনবধানতা বা অবহেলাজনিত নয়, বরং সুচিন্তিত সম্পাদকীয় নীতিপ্রসূত। একটা নিয়ম ভেঙে যখন নতুন নিয়ম বানানো হয়, তখন তাকে অরাজকতা আখ্যা না দিয়ে স্বাগতই জানানো উচিত, ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি উপেক্ষা করে হলেও।

প্রবীণ মলয় রায়চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক থেকে নবীনতম উপল বড়ুয়া, পার্থ অগাস্টিন পর্যন্ত মোট আশি জন কবির সমসংখ্যক কবিতা সম্পাদকদ্বয় এ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এতে তাঁদের কী পরিমাণ শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়েছে, সহজেই অনুমেয়। সেইসঙ্গে পরিশিষ্টে যোগ করা হয়েছে কবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী বা পরিচিতিও।

সাদা-কালো ড্রয়িংয়ে দৃষ্টিনন্দন ও বিষয়ানুগ প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মইনুল আলম। চমৎকার নামলিপি অন্যতম সম্পাদক মুয়িন পারভেজের নিজের করা। কবিতার মধ্যে মধ্যে গোটা চারেক পুরো পাতার, মোটা তুলির দারুণ স্কেচ ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলোর স্রষ্টা শিল্পী মেহেরুন সুমি। পরিশিষ্টে মইনুর আলম ও মেহেরুন সুমির পরিচিতি তুলে ধরতেও সম্পাদকদ্বয় ভুল করেন নি।

সবশেষে, ‘ক্রৌঞ্চপুরাণ’ শিরোণামে ও অননুকরণীয় ভাষায় মুয়িন পারভেজ বিবৃত করেছেন ক্রৌঞ্চগীতির জন্মকথা, যেটা বাংলা কবিতার প্রতি এদেশের তরুণদের দুর্মর ভালোবাসার অমোচনীয় সাক্ষী হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।

ক্রৌঞ্চগীতি নিয়ে আগামীতে আরো কিছু বলার আশা রইলো।

অপরাহ্ণ ২:০৭
৩০.০৬.২০১৮
ঢাকা

সম্পাদকের সংযোজনঃ
আশিজন কবির প্রেমের কবিতা এবং চারুশিল্পী মইনুল আলমের প্রচ্ছদ ও মেহেরুন সুমির পাঁচটি চিত্রকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হল মুয়িন পারভেজ সম্পাদিত ১৪৬ পৃষ্ঠার সংকলন ‘ক্রৌঞ্চগীতি’৷ ‘ক্রৌঞ্চগীতি প্রথম প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি, ২০০০ এ৷

ষাটের দশকের হাংরি আন্দোলনের পুরোধা জ্যেষ্ঠ কবি মলয় রায়চৌধুরী থেকে তরুণতম কবি পার্থ অগাস্টিনের কবিতা রয়েছে এ-সংকলনে৷ এই দীঘল কবিতাপ্রবাহে—ঐকতান বজায় রেখেও—চিন্তা ও প্রবণতার বিচিত্র ইশারাচিহ্ন ভেসে উঠতেও পারে।

ক্রৌঞ্চগীতি
সম্পাদনায়: মুয়িন পারভেজ ও মেরুন হরিয়াল


সংকলনটির মূল্য ১৫০ টাকা রাখা হলেও আগ্রহী পাঠকগণ বিশেষ ছাড়ে মাত্র ১০০ টাকায় তা সংগ্রহ করতে পারবেন বাতিঘর, প্রেসক্লাব ভবন, জামালখান, চট্টগ্রাম অথবা বইমেলায় লিটলম্যাগাজিন চত্ত্বর থেকে৷

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।