“লোকসংগীতের বিচিত্র ধারা” সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ‘ড. মাযহারুল ইসলাম তরু’র বইতে

“লোকসংগীতের বিচিত্র ধারা” সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ‘ড. মাযহারুল ইসলাম তরু’র বইতে

লোকসাহিত্যের অন্যতম একটি ধারা হল লোকসঙ্গীত। সারা বিশ্বেই লোকসঙ্গীতের সমঝদার শ্রোতার সংখ্যা বেশী। কারণ সাধারণ জনজীবনের নানাবিধ অভিব্যক্তি লোকসঙ্গীতে সরাসরি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। বাংলাদেশেও লোকসঙ্গীতের জনপ্রিয়তা অন্য সব ধরণের গানের চেয়ে বেশি। দেশের প্রান্তিক মানুষের হৃদয় যথার্থভাবে লোকসঙ্গীতেই আলোড়িত হয়।

বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত নিয়ে আলাদাভাবে তেমন আলোচনা সুধীমহলে খুব একটা চোখে পড়ে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা প্রকার লোকসঙ্গীত প্রচলিত রয়েছে। গণমানুষের হৃদয়বাণী বহন করে চলা এই লোকগীতিগুলো সম্পর্কে সূধীমহলে আলোচনা কম। বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় লোকসঙ্গীত থেকে গেছে প্রান্তিক অবস্থানে। ড. মাযহারুল ইসলাম তরু অন্যদের মত নন। তিনি স্বীকার করেন-
লোকসংগীত চিরায়ত সংগীত। এ সংগীতে আছে মাটির মানুষের প্রাণের ছোঁয়া।
এই লোকগীতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য যেন সহজে পাওয়া যায় সেজন্য রচনা করেছেন “লোকসংগীতের বিচিত্র ধারা” শীর্ষক বই। এতে তেরটি প্রবন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত লোকসঙ্গীতের পরিচিতি ব্যাখ্যা করা এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে এই বই রচনা করেছেন। প্রধান প্রধান লোকগীতিগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত চষে বেড়াতে হয়েছে। বাঙালি সমাজের পাশাপাশি আদিবাসী সমাজে প্রচলিত লোকসঙ্গীতের আলোচনাও তার গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বিস্তারিত বিবরণে যাওয়ার আগে সূচিপত্রটি একবার দেখে নেয়া যাক।
  • সূচিপত্রঃ-
  • প্রথম অধ্যায় : বাংলাদেশের লোকসংগীত পরিচিতি
  • দ্বিতীয় অধ্যায় : আলকাপ
  • তৃতীয় অধ্যায় : গম্ভীরা
  • চতুর্থ অধ্যায় : বারাশে বা বারোমাসি
  • পঞ্চম অধ্যায় : মালসী
  • ষষ্ঠ অধ্যায় : মেয়েলি গীত
  • সপ্তম অধ্যায় : ভাওয়াইয়া
  • অষ্টম অধ্যায় : গারো লোকসংগীত
  • নবম অধ্যায় : ওরাওঁ লোকসংগীত
  • দশম অধ্যায় : সাঁওতাল লোকসংগীত
  • একাদশ অধ্যায় : হাজং লোকসংগীত
  • দ্বাদশ অধ্যায় : রাজবংশী লোকসংগীত
  • ত্রয়োদশ অধ্যায় : বৃহত্তর রাজশাহী জেলার লোকসংগীত
সূচিপত্র দেখে আলোচ্য বিষয়ের পরিধি বোঝা যাচ্ছে। লেখক লোকসঙ্গীতের পরিচিতি দিয়ে শুরু করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে লোকসঙ্গীতের প্রসঙ্গে লোকসাহিত্যের একটি সংজ্ঞায়ন দাঁড় করাতে চেয়েছেন। লোকসাহিত্য বা Folklore কাকে বলে এর বৈশিষ্ট্য কী এসব বিষয়ে তিনি বিভিন্ন মণীষীর দেয়া সংজ্ঞাকে আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন কোন সংজ্ঞাটি যথার্থ বা অধিকতর গ্রহণযোগ্য। বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বই থেকে একটু অংশ তুলে দিলে বোধগম্য হবে।
Folklore এর বাংলা প্রতিশব্দ নির্ণয় করতে গিয়ে বাঙালি লোক বিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। এবারে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। রামনরেশ ত্রিপাঠী Folklore -এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘গ্রাম সাহিত্য’ শব্দটি। আর. পি. চন্দা বলেছেন ‘লোকসাহিত্য’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ ‘লোকবিদ্যা’ ও ‘লোকবিজ্ঞান’ শব্দ গ্রহণের পক্ষপাতী। অন্যদিকে ড. মুহম্মদ এনামুল হক গ্রহণ করেছেন ‘লোকবিদ্যা’ শব্দটিকে। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য ‘লোকশ্রুতি’ ও ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘লোকযান’ শব্দটিকে Folklore এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে গ্রহণের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে ড. বাসুদেব শরণ আগরওয়ালা ‘লোকবার্তা’, ড. শংকর সেনগুপ্ত ‘লোকবৃত্ত’, ড. গোরাচান্দ কুণ্ডু ‘লোকাচার’ শব্দটি গ্রহণের পক্ষপাতি। ড. আশরাফ সিদ্দিকী Folklore-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে ‘লোকবিজ্ঞান’, ‘লোকতত্ত্ব’ এবং ‘লোকসংস্কৃতি’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তবে লোকসংস্কৃতি শব্দটি ব্যবহারে বেশ কয়েকজন পণ্ডিত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এঁরা হচ্ছেন ড. কৃষ্ণদেব উপাধ্যায়, ড. তুষার চট্টোপাধ্যায়, ড. দুলাল চোধুরী, ড. বরুণ চক্রবর্তী প্রমুখ। ড. তুষার চট্টোপাধ্যায় অবশ্য ‘লোকসংস্কৃতি’ শব্দটির পাশাপাশি ‘লোককৃতি’ শব্দটি ফোকলোরের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে ড. ত্রিলোচন পাণ্ডে এবং ড. কিশোরী মোহন শুক্লা ফোকলোরের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘লোকবাচ্য’ ও ‘লোকবাঙ্ময়’ শব্দ দুটি ব্যবহার করেছেন। কোন কোন পণ্ডিত আবার ‘লোকপরিচয়’, ‘লোকঐতিহ্য’, ‘লোকবার্তা’ প্রভৃতি শব্দকে Folklore- এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। পৃ-১৫
এছাড়াও ফোকলোর শব্দটির ব্যাপ্তি নিয়ে রয়েছে নানারকম মতভেদ। লেখক সংক্ষিপ্তাকারে যেভাবে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন তা এরকম।
ফোকলোর এর প্রকারভেদ চাররকম: ক) লোকসাহিত্য, খ) লোকশিল্পকলা, গ) লোকাচার এবং ঘ) লোকখেলাধুলা। লোকসাহিত্য আবার কয়েক রকম। যেমন: লোকসঙ্গীত, ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধা, মন্ত্র, গীতিকা, লোককাহিনী, লোকনাট্য।
লেখকের আলোচ্য প্রসঙ্গ যেহেতু লোকসঙ্গীত সেহেতু এর বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ আলোচনাকেও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। তিনি লোকসঙ্গীতের প্রকারভেদ বিষয়ে ড. ওয়াকিল আহমদ এর মত গ্রহণ করেছেন। নানা ভাব, কাঠামো, বৈশিষ্ট্য বর্ণনা শেষে লেখক জানান
অঞ্চল, উপলক্ষ ও বিষয় ভিত্তিক এমন মিশ্র বিভাগ যুক্তিসঙ্গত নয় বলে বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ ড. ওয়াকিল আহমদ মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে লোকসংগীতের বিষয়ভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য শ্রেণিবিন্যাস নিম্নরূপ হতে পারে-
১. প্রেম ২. ধর্ম-আচার-সংস্কার ৩. তত্ব ও ভক্তি ৪. কর্ম ও শ্রম ৫. পেশা ও বৃত্তি ৬. হাস্য ও কৌতুক ৭. মিশ্রভাব বিষয়ক। পৃ- ২১
উপরের শ্রেণী অনুযায়ী লোকসঙ্গীতগুলো কোন কোন অঞ্চলে প্রচলিত সে সম্পর্কে একটি বিশদ তালিকা দিয়ে প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছেন।

অন্যান্য অধ্যায়গুলোতে বিভিন্ন প্রকারের লোকসঙ্গীত আলোচনা করতে গিয়ে লেখক কোন ছোট প্রসঙ্গকেও এড়িয়ে যান নি। প্রত্যেক প্রকারের লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস, পশ্চাতের কাহিনী, গায়ক এবং তাদের গায়কী ঢং, আচরণ, উদাহরণ, ব্যাকরণগত উপাদান ও বৈশিষ্ট্য, রূপতত্ত্ব অর্থাৎ গবেষকের দৃষ্টিতে যা কিছু আলোচনা করা উচিত তার প্রত্যেকটিকে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে একজন কৌতুহলী পাঠক যেমন লোকসঙ্গীতগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানবেন, তেমনি একজন গবেষক তার গবেষণার জন্য উদ্দীষ্ট উপাদান থেকেও বঞ্চিত হবেন না।

আলোচ্য গ্রন্থের সবচাইতে তথ্যসমৃদ্ধ অংশ হল ত্রয়োদশ অধ্যায়টি। এখানে বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় যত প্রকারের লোকগীতি রয়েছে সবগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিক পরিচিতি বর্ণনা করেছেন। বিশদ বিবরণ, উদাহরণ, উৎপত্তিস্থল, বিস্তৃতিস্থল, লোকসঙ্গীতগুলোর স্রষ্টাদের পরিচিতি, স্থানীয় লোকসঙ্গীত দলের তালিকা, একক ও সমষ্টিক গানের তালিকা, বাণিজ্যিকভাবে মুল্যবান, বিপন্নগান, লুপ্তগান, লোক বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীতগুলোর মেধাসত্বের মালিক, বার্ষিক মূল্যমান, সংরক্ষণের অবস্থা কোন কিছুই বাদ দেন নি। পরিশেষে কিছু সুপারিশমালাও প্রস্তাব করেছেন, যার বাস্তবায়ন প্রচলিত লোকগীতিগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হবে।

ড. মাযহারুল ইসলাম তরু লিখিত লোকসংগীতের বিচিত্র ধারা বইয়ের আলোচনার এই পর্যায়ে এসে  প্রত্যাশা করি লোকসঙ্গীত নিয়ে তার এমন গবেষণা কার্যক্রম সচল থাকুক। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা জনমানুষের প্রাণের সঙ্গীতগুলো নিয়ে তিনি আরও নিবন্ধ রচনা করুন। আশা করি তিনি লোকসঙ্গীতের মূল্যায়নে সকলকে সম্মিলিত করতে পারবেন। তাহলে লোকগানগুলোর অন্তরালে প্রবহমান গণমানুষের আবেগ অনুভূতি সমাজের সূধীমহলে আরও বেশি গ্রাহ্য হবে।

বইটির বাধাইয়ের মান উন্নত। সাদা কাগজে স্পষ্ট ছাপানো। তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও ছাপানোর বা বাধাইয়ের মানে কোন ত্রুটি চোখে পড়েনি। শক্ত মলাটের বোর্ড বাইন্ডিং হওয়ায় বইটি সহজে জীর্ণ হবে না। এই ধরণের বই প্রকাশে উদ্যোগী হওয়ায় প্রকাশককেও ধন্যবাদ। আমি বইটির ব্যাপক পাঠ কামনা করি।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
লোকসংগীতের বিচিত্র ধারা
ড. মাযহারুল ইসলাম তরু

প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ

প্রকাশক: গ্রন্থকুটির, ঢাকা।
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৩০৪
মূল্য: ৪০০.০০
ISBN: 978-984-92448-5-1

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।