‘মলয় রায়চৌধুরী’র ভাষ্যে “জাঁ আর্তুর ব়্যাবো” পুনরুজ্জীবিত হলেন

‘মলয় রায়চৌধুরী’র ভাষ্যে “জাঁ আর্তুর ব়্যাবো” পুনরুজ্জীবিত হলেন

আমরা এর আগে জাঁ অর্তুর র‍্যাবো | মলয় রায়চৌধুরী শীর্ষক একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রকাশ করেছিলাম। আজ পড়ুন একই বইয়ের একটু বিশদ আলোচনা।

জীবৎকালে যিনি ফ্রান্সে ছিলেন অবাঞ্চিত, আজ তাকে ছাড়া ফ্রান্স অসম্পূর্ণ। 'নরকে অনন্ত ঋতু', ‘ইলুমিনেসন্স' এর অমর স্রষ্টা প্রচলিত সাহিত্যতত্ত্বকে অস্বীকার করেছিলেন। নন্দনতত্ত্বের নতুন সংজ্ঞাকে বেছে নিয়েছিলেন নিজের জীবনে। সমকালের লেখকদের অসম্পূর্ণতাকে স্পষ্ট দাগে চিহ্নিত করেছিলেন যিনি তাঁর জীবন কাহিনী নিয়ে এই বই “জাঁ আর্তুর ব়্যাঁবো”, লিখেছেন হাংরি আন্দোলনের প্রধানতম কবি ‘মলয় রায়চৌধুরী’

১৮৫৪ সালের ২০ অক্টোবর জন্মেছিলেন জাঁ আর্তুর ব়্যাবো, পুরো নাম জাঁ নিকোলাস আর্তুর ব়্যাবো (Jean Nicolas Arthur Rimbau)। কবিতার পুরনো রীতিতে আস্থা ছিল না তার। জীবন যাপনের প্রচলিত বিধানকেও করেছেন সগর্ব প্রত্যাখ্যান। কী খুঁজছেন তা হয়তো নিজের কাছে পরিষ্কার ছিল না; তবে প্রচলিত কোন মূল্যবোধ, শিল্পরীতি, দর্শনচিন্তা, কাব্যাদর্শ তাকে আস্বস্ত করতে পারে নি।

লেখালেখি শুরু করেছেন ১৬ বৎসর বয়সে, একেবারে কিশোর বয়সে। মাত্র চার বৎসর অনবরত লেখালেখি করে বন্ধ করেছেন ১৯, মতান্তরে ২১ বৎসর বয়সে। তার কবিতার ভাষারীতি, চিন্তা প্রকাশের অভিনবত্ব সমস্ত প্যারিসকে এক প্রবল ঝড়ের আঘাতে নাড়া দিয়েছিল। সে সময়ের জনপ্রিয় লেখকগণ রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল তরুণ কবির সক্ষমতা ও স্পর্ধা দেখে।

ব়্যাঁবো শৈশবের সরল ও বিশুদ্ধ অনুভূতিকে নিজের মননে লালন করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন
একজন দ্রষ্টার মতন একটি শিশুও জগতের প্রভাবকে সরাসরি গ্রহণ করে। কোনও প্রশ্ন তোলে না শিশু। তার প্রজ্ঞা বিশুদ্ধ সত্য। পৃষ্ঠা-৩২
তাই তিনি চাপিয়ে দেয়া সাবালকত্বের অনুশাসনগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলাভরে পাশ কাটাতেন। সামাজিক শাসনকে বিবমিষা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করতেন। তিনি এমন একটি জগৎ গড়তে চেয়েছেন যা প্রাপ্তিসাধ্যের দ্বারা শৃঙ্খলিত নয়।

আলোচ্য বইতে মলয় রায়চৌধুরী ব়্যাঁবোর জীবনকে স্বল্প কথায় সহজভাবে তুলে ধরেছেন। সাহিত্যতত্ত্বের জটিলতা এড়িয়ে সহজ ভঙ্গিতে বর্ণনা করে গেছেন। জীবনকাহিনী শুরু করেছেন প্রচলিত পদ্ধতির উল্টোদিক থেকে, ফ্লাশব্যাকের মতো করে।
১০ নভেম্বর ১৮৯১, কখন, ব্যাধির চেতনাহীন রুদ্ধ প্রকোষ্ঠে চুপচাপ, মারা গেলেন জাঁ আর্তুর ব়্যাঁবো, মার্সাইয়ে হাসপাতালের বিছানায়, একটা পা উরু থেকে কেটে বাদ দেয়া, কুঁচকিতে ছেতরাঁনো, গোলাপি ফুলকপির মতন দগদগে ঘা, যে রোগটি ডাক্তার বদিয়ে-র মতানুযায়ী, হারারেতে বাঁধানো উপদংশের শেষ পর্যায়-জনিত।-- পৃষ্ঠা -৭
শিরোনামহীন আটটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন ব়্যাঁবোর বর্ণিল জীবনকে। আসলে তার যাপিত জীবন বর্ণনায় কোন শিরোনামের প্রয়োজন নেই। অনুশাসনহীন জীবনবোধ ও কবিতাচিন্তা দিয়ে তিনি নিজেই প্রচলিত প্রতীকবাদের (Symbolism) প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সমকালীন অন্যান্য প্রতীকবাদী লেখক জাঁ রাসেন, বোদলেয়ার, মালার্মে ও ভর্লেন- এর সৃষ্টি ছাপিয়ে উঠেছিল ব়্যাঁবোর কবিতা। যা পরবর্তীতে উৎসাহ যুগিয়েছিল আরও অনেক শিল্পবোধ ও তত্ত্বের; বিশেষ করে পরাবাস্তববাদ বা কলাকৈবল্যবাদের (Surrealism)।

ব়্যাঁবোকে বর্ণনায় লেখক কোথাও কৃপণতা করেন নি। তার জীবনের একেবারে খুব সাধারণ বিষয়গুলোকেও তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আগের ঘটনা, পিছনের ঘটনা এমনভাবে সাজিয়েছেন যে মনে হয় যেন এক অপার্থিব গল্প পড়ছি; এক মহান লেখকের জীবন নিয়ে রচিত উপন্যাস পড়ছি। প্রসঙ্গক্রমে লেখকের মন্তব্যগুলো বরং পাঠককে কাহিনীর জোয়ারে গা ভাসাতে দেয় না।
ব়্যাঁবোর কবিতা ও জীবনকে আলোচকরা নিজের মতন করে বিশ্লেষণের সুযোগ পান; স্কাউন্ড্রেল বা শহিদ, লোচ্চা বা সন্ত, বিটকেল বা অসাধারণ, নোংরামি বা ঐশ্বরিক, অধার্মিক বা বিশ্বাসী, প্যাগান বা ক্যাথলিক।… অথচ যে জীবন তিনি প্যারি আর লন্ডনে কাটিয়েছিলেন, তা তখনকার সনাতনী মানদণ্ডে অনৈতিক, অবৈধ, দুশ্চারিত্র্য হলেও, তা তিনি গ্রহণ করেছিলেন নিজের কাব্যতত্ত্ব ও জীবনদর্শনের খাতিরে। পৃষ্ঠা-৪২
বইয়ের শেষে ‘চিঠিপত্র’ শীর্ষক পরিশিষ্টটি বেশ আকর্ষণীয়। এখানে বিভিন্নজনকে লেখা ব়্যাঁবোর চিঠি রয়েছে। ব়্যাঁবোকে লেখা মায়ের কয়েকটি চিঠিসহ মোট সংখ্যা ১৭। ব়্যাঁবোকে চিনতে, তার চিন্তাপদ্ধতি, জীবনযাপন ও জীবনদর্শনকে বুঝতে এগুলো সহায়ক হবে।

ব়্যাঁবো সম্পর্কে বাংলাভাষায় রচনার পরিমাণ খুবই কম। নেই বললেই চলে। তার মতো প্রতিবাদী, নতুন নান্দনিকতার স্রষ্টাকে এভাবে উপেক্ষা কেন করা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। তার সমকালে বোদলেয়ারকে আমরা চিনি, সাহিত্য আলোচনায় তাকে স্থানও দিয়েছি, কিন্তু ব়্যাঁবোকে কেন উপেক্ষা করা হল, তা বুঝতে হলে মলয় রায় চৌধুরীর এই বই অবশ্যই পড়া প্রয়োজন। কাব্যামোদী, অনুসন্ধিৎসু, শিল্পপিয়াসী পাঠক এই বইতে পাবেন এক নতুন দিকপালের খোঁজ। আমি ‘মলয় রায়চৌধুরী’র “জাঁ আর্তুর ব়্যাবো” বইটি কাব্যপ্রেমী সকলকে পড়ার আহ্বান জানাই। সেই সাথে ধন্যবাদ জানাই মেঘ প্রকাশনীর কর্ণধার শাহিন লতিফকে এরকম একটি নতুন দিগন্তের সাথে বাঙালি পাঠককে পরিচিতি করে তোলার জন্য।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
জাঁ আর্তুর ব়্যাবো
মলয় রায়চৌধুরী


প্রচ্ছদ: শাহিন লতিফ

প্রকাশকাল: ২০১৯
প্রকাশক: মেঘ, ঢাকা।
পৃষ্ঠা:৫৬
মূল্য: ১৪০
ISBN: 978984028070

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।