‘ড. আবেদা আফরোজা’ রচিত “বাংলাদেশের মহিলা রচিত উপন্যাসে বিষয়–বৈচিত্র্য ও জীবন-চিন্তা”-- যে বই পোড়ায় মগজ: হৃদয়ভুক এক গবেষণা গ্রন্থ - বঙ্গ রাখাল

‘ড. আবেদা আফরোজা’ রচিত “বাংলাদেশের মহিলা রচিত উপন্যাসে বিষয় – বৈচিত্র্য ও জীবন - চিন্তা” যে বই পোড়ায় মগজ: হৃদয়ভুক এক গবেষণা গ্রন্থ - বঙ্গ রাখাল
নারী এক বিস্ময়! নারী সম্পর্কে কতই না উক্তি করা হয়েছে পৃথিবীতে তাঁর কোন ইয়ত্তা নেই। নারী একই সাথে ফুল ও ভুল, বিধাতার দ্বিতীয় ভ্রান্তি। শুধু বিধাতার সৃষ্টি নয়, আপন অন্তরের সৌন্দর্য দিয়ে পুরুষ গড়েছে নারীকে। নারী প্রতিশোধপরায়ন, ধ্বংসাত্মক, প্রেরণার উৎস, আবার সে ধ্বংসেরও কারণ বটে। এ নারী নরকের দ্বার, সে সজ্জাপ্রিয়, সম্পদানুরাগী, বিস্মৃতিপরায়ন। এ অবলা নারী কথা বলে বেশি আবার তা অনর্থক। সে ছলনাময়ী, দুর্বলচিত্ত, রহস্যময়ী, প্রেমসর্বস্ব, সে ভালোবাসে প্রবলভাবে আবার ঘৃণাও করে দ্বিগুণ ভরে। আমি এত সময় যত গুণ বা দোষের কথা বয়ান করলাম সবই কিন্তু পুরুষের উক্তি। নারী যখন নিজে নিজে তার ভাবনার জগতে ভাসতে পেরেছে তখনই নিয়েছে এর ভিন্ন রূপ। উনিশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই আমাদের সমাজ বলি, আর সাহিত্যে বলি, এ জায়গাগুলোতে নতুন নতুন পর্বের বা নতুন অধ্যায়কাল সূচিত হয়েছে। এ সময় সমাজ আর সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই নারীর বিচরণ লক্ষ করা গেছে। নারীর এই বিচরণ থেকেই আমরা কিছু নতুন নতুন ধারণা বা কথা শুনতে পাই। যেমন লেখাপড়া শিখলে নারী বিধবা হয়, আবার অন্য দিকে দেখা যায়, এ সময় বিধবা নারীর বিয়ে দেয়াও উচিৎ, যা আগে ছিল না। আমাদের সমাজ পুরুষ-শাষিত। এ সমাজে নারী সর্বদা হয়েছে নিষ্পেশিত আর অবহেলিত। নারী কে যে সর্বত্র অবহেলার পাত্র ভাবা হয়, তা কিন্তু আমরা ইতিহাসবিদ ব্যাশাসের উক্তি থেকে পাই না- প্রাচীন ভারতবর্ষে নারীকে দেখা হতো একাধারে দেবী ও ক্রীতদাসীরূপে, সন্তনারী গণিকা হিসেবে। এ উক্তির সত্যতা হিসেবে আমরা কিছু গ্রন্থের দিকে আলোকপাত করলে তা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে মনে করি- বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মনসাবিজয় (পঞ্চদশ শতাব্দী), মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল (ষোড়শ শতাব্দী), দ্বিজ মাধবের মঙ্গলচণ্ডীর গীত (ষোড়শ শতাব্দী), আলাওলের পদ্মাবতী (সপ্তদশ শতব্দী), মানিকরাম গাঙ্গুলির ধর্মমঙ্গল (অষ্টাদশ শতাব্দী)। এসব কাব্যে কন্যাদের জন্মের কথা  বলা হয়েছে। যখন কারও সন্তান জন্ম নিচ্ছে তখন তারা কন্যা সন্তানের কামনা করতো। যেমন বিপ্রদাস পিপলাই বলেই ফেললেন,
সুমিত্রা ও সাহে সওদাগর, কন্যা লাগি পূজে হর গৌরী।
কন্যা বেহুলা জন্মালে পিতা মাতার দেখিয়া সানন্দ বাড়ে মনে, এমন কি ধাত্রী পর্যন্ত
হরষিত হৈয়া/কন্যারে কোলেতে লইয়া/নাড়িচ্ছেদ কৈল ততক্ষণে।
মানিকরামের রঞ্জাবতীর জন্মে বেণু রায়ও বিমলার
কন্যা দেখে দোহাকার বাড়িল কৌতুক।
আর আলাওলের পদ্মাবতী রাজকন্যা- তার জন্ম লাভ হলে ৭দিন ধরে আনন্দোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উদাহরণ দিলে এমন অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। কিন্তু আমি এগুলোর মধ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছি নারী দুর্বল নয়, নারী বেদনার কারণ নয়। আমরা সর্বদা তাদের সাথে নিয়ে চললেই পৃথিবী সুন্দর হয়। কিন্তু আমরা পুরুষেরা তাদের নানা বাঁধার মধ্যে বেঁধে রেখেছি।

যাই হোক আমি আমার মূল আলোচনায় আসি- এতো সময় যে নারীর দুর্বলতা বা সফলতা নিয়ে, আলোচনা করলাম, সেই নারী জাতিরই একজন ড. আবেদা আফরোজা। জুলাই ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল বাংলাদেশের মহিলা রচিত উপন্যাসে ‘বিষয়- বৈচিত্র্য ও জীবন চিন্তা’ নামক গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি তুলে এনেছেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৮৭ সাল এই ৪০ বছরের আবহমান বাংলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা সহ ইতিহাস ঐতিহ্য, সমাজবাস্তবতার নানা উপাদান। এমন কোন বিষয় নেই যা তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়নি । এই অভিসন্দর্ভ এর উপর ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৯৫সালে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী অর্জন করেন। যতোদূর জানা যায় সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এত বড় শ্রমসাধ্য মহিলা ঔপন্যাসিকদের উপর আলোচনা হয়েছে বলে মনে হয় না।

বাংলা সাহিত্যে মহিলা ঔপন্যাসিকদের আগমন খুব অল্প দিনের হলেও গ্রন্থ রচনার দিক থেকে মহিলারা বেশি দূরে কিন্তু পরে নেই। মহিলাদের বিষয়গত চিন্তা-ভাবনা যেমন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, গ্রামীণ, শহুরে, আত্মজীবনীমূলক, ভ্রমণবিষয়ক, মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক, মনস্তাত্ত্বিক, জাতীয়তাবাদভিত্তিক, ব্যক্তিনৈঃসঙ্গ এসব লক্ষ্য করার মতো। এটির মধ্য দিয়ে আমরা ১৯৪৭-১৯৮৭ এই ৪০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস, শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজবাস্তবতা ছাড়াও প্রাক-বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল, সাম্প্রদায়িকতা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সহ নানা দিক লেখিকা তাঁর গ্রন্থে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিপুণ তুলির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এগুলো পড়তে গেলে মনে হয়, আমার সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই আমি এই মাত্র মলাটবদ্ধ গ্রন্থে দেখতে পাচ্ছি। এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন মাহমুদ শাহ কোরেশী, যিনি ছিলেন ড. আবেদা আফরোজার গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক এবং আই.বি.এস এর পরিচালক। পরে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে লেখিকা সবার ঋণ স্বীকার করার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকারে গবেষণাকর্মে পরিশ্রমের কথা স্বীকার করে একজায়গায় বলেছেন-
মূল উপন্যাসগুলো সংগ্রহে দেশের অভ্যন্তরস্থ বিভাগীয় শহরগুলো ছাড়াও সদর ও মফস্বলের বিভিন্ন লাইব্রেরী থেকে আমাকে সাহায্য নিতে হয়েছে।
অবতরণিকায় তিনি সমস্ত সাহিত্যের আদি ইতিহাস, মধ্যযুগের ইতিহাস, আধুনিক কালের ইতিহাসের সার কথাগুলো তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। তিনি তাঁর মাধুর্যময় লেখনির মধ্য দিয়ে খুব সুন্দর করে বইটি সাজিয়েছেন। বইটির রয়েছে ৫টি অধ্যায়। যার প্রথম অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে বিষয়- সংশ্লিষ্ট উপস্থিতকালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো, বিবর্তনের গতিধারা এবং সেই সাথে আলোচিত হয়েছে মহিলা ঔপন্যাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞান। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ৪৭ পূর্ব পুরুষ ও মহিলা ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসের বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পগত রূপের পরিচয়। তৃতীয় অধ্যায়ে উন্মোচিত হয়েছে উপন্যাসের চরিত্র তথা জীবন ও তার আত্মার স্বরূপ। চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে মহিলা ঔপন্যাসিকদের অবদানকে কেন্দ্র করে প্রধান মহিলা ঔপন্যাসিকদের গ্রন্থের বিষয়বস্তু বা গ্রন্থ আলোচনা। এ অধ্যায়ে যে শিল্পরূপ বা শিল্পসম্মত লেখা, তার ভুল-ত্রুটি নিয়েও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর সর্বশেষ পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে সমস্ত গ্রন্থের মূল আলোচনা। এটি হলো অধ্যায়গুলোর সুচিন্তিত ফলাফল। পরিশিষ্টে তুলে ধরা হয়েছে মহিলা ঔপন্যাসিকদের ব্যক্তি পরিচিতি। ১৯৪৭-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ তালিকা, লেখিকা পরিচিতি, গবেষণাকর্মে ব্যবহৃত সহায়ক গ্রন্থাবলি ও নির্ঘন্ট। গ্রন্থের শেষে রয়েছে লেখিকাদের সাথে গ্রন্থকারের গবেষণা কর্মের সাহায্যের কাজ নিয়ে আদান-প্রদানের চিঠির নমুনা।

প্রতিটা লেখার দিকে দৃষ্টি দিলেই আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি যে, লেখিকার একাজ করতে গিয়ে কি পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়েছে, আর কত বই পড়তে হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিটা লেখার শেষে আমরা দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই -তথ্য নির্দেশনার আধিক্য, যা আমাদের চোখগুলোকে ছানাবড়া করে দেয়। লেখিকা সে সময় বলতে ১৯৪৭ সালের মানুষের অভাব, অনটন, মানুষের দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসা -বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তাদের কর্মব্যস্ততা, রাজনীতি সচেতনতা, সমাজ বাস্তবতা, শিক্ষাব্যবস্থা, আঞ্চলিকতা ইত্যাদির কথা তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি সে সময়ের অর্থাৎ ১৯৪৭-৮৭ পর্যন্ত সমস্ত ঔপন্যাসিকের গ্রন্থগুলো পাঠের মধ্য দিয়ে সেটার আঙ্গিক ও বিষয়গত ঐতিহ্যের বর্ণনা করেছেন ধারাবাহিক ভাবে। সে সময়ের মানুষের অভাব-অনটন, যাতনা, প্রেম-ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, ব্যাভিচার, পরকীয়া। এক কথায় সমাজের নানা অসংগতির কথাগুলো পাঠের মধ্যদিয়ে তিনি তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। লেখিকা দুর্দান্ত এক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর রচিত এ গবেষণাকর্মটির মধ্য দিয়ে, যা কোন পুরুষের পক্ষেও করা আজ অবধি সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

ড. আবেদা আফরোজা ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত যে সব উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে তার প্রত্যেকটি উপন্যাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আমাদের সামনে এর মহত্ত্ব বা পাত্র-পাত্রীর জীবন-যাপন, সামাজিক, রাজনৈতিক দিকগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি যে শুধু সমাজ মানুষের দ্বান্দ্বিকতার কথাই তুলে ধরেছেন তা নয়, তাদের প্রেমের দিকও নানা আঙ্গিকে ও সমাজ বাস্তবতার চিরন্তন সত্যের নিরিখে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন, যা প্রতিটা উপন্যসের সারবস্তুর দ্বার খুলে দিয়েছে। আমরা দেখতে পাই- এমন কোন আলোচক নেই, যিনি ৪০বছরের সমস্ত উপন্যাসের সারবস্তুগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, যা কিনা আবেদা আফরোজা করে দেখিয়েছেন। এটা সত্যিই আমাদের কাছে বিরল একটা বিষয়। ড. আবেদা আফরোজা তাঁর গবেষণা কর্মে অর্থাৎ ১৯৪৭-৮৭ সাল পর্যন্ত গবেষণা কর্মের সাহায্যের জন্য যে সব ঔপন্যাসিকদের কর্ম নিয়ে আলোকপাত করেছেন তাঁরা হলেন- দৌলতুন্নেছা খাতুন, নীলিমা ইব্রাহীম, রাজিয়া মজিদ, রাবেয়া খাতুন, রাজিয়া খান, রিজিয়া রহমান, সৈয়দা লুৎফুন্নেসা, জোবেদা খানম, উমরতুর ফজল, আঞ্জুমান আরা বেগম, দিলারা হাশেম, বদরুন্নেসা আবদুল্লা, সামস্ রাশীদ, সেলিনা হোসেন, বেগম জাহান আরা, হাজেরা নজরুল, খালেদা এদিব চৌধুরী, অনামিকা হক লিলি, নাজমা জেসমিন চৌধুরী, মকবুলা মঞ্জুর, আনোয়ারা সৈয়দা হক, আজিজা বেগম, ঝর্ণাদাশ পুরাকায়স্থ, দিলারা জামান, রোমেনা আফাজ, হেলেনা খান।

এ গ্রন্থ প্রণয়ন  করতে লেখিকার পরিশ্রমের কোন কমতি নেই। তারপরও এ বইয়ে অনেক সাল ভুল করা হয়েছে যেটা হয়েছে প্রকাশকের উদাসীনতার ফলে। আশা করি এসব অসংগতি পরবর্তী সংখ্যায় সংশোধিত হয়ে আসবে, তা না হলে এ গ্রন্থে যদি এত ভুল-ত্রুটি থাকে তাহলে পাঠক সর্বদা বিরক্তই হবেন না, নানা সময় বিপদেও পড়বেন। এবার আমার আলোচনার পরিশেষে বলতে চাই লেখিকা তাঁর নতুনধর্মী গবেষণাকর্মের জন্য সর্ব মহলে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন এবং এ গ্রন্থটি সর্ব মহলের পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে বলে আশা রাখি।

~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~

বাংলাদেশের মহিলা রচিত উপন্যাসে বিষয় – বৈচিত্র্য ও জীবন - চিন্তা
ড. আবেদা আফরোজা

প্রকাশন : প্রান্ত প্রকাশন
প্রচ্ছদ : চারু পিন্টু
প্রকাশকাল : জুলাই ২০১৩
মূল্য : ৪৫০ টাকা মাত্র

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।