“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান” এর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিষয়ে কিছু ব্যক্তিগত আলাপঃ অসীম নন্দন

“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান” এর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিষয়ে কিছু ব্যক্তিগত প্যাচালঃ অসীম নন্দন
বইটা যেইভাবে কালেক্ট করছি, আমি আর ইফতি ছাড়া দুনিয়ার বেবাকজন তার রহস্য জানে না। বইয়ের প্রথম কয়েকটা পেইজ নাই। তবে বইয়ের মূল শুরুর থেকে পেইজ আছে সব। এইটা একটা বিচ্ছিন্ন দারুণ ঘটনা। বই খুলতেই যে ছেঁড়া পেইজটা পাই তাতে লেখা, "একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।"

বেবাকজনের রহস্যরে খোলাসা করে বলি, এইটা চুরি করা বই। বিসমিল্লাহ্ বইলা শুরু করলাম, চুরির সুখ আহরণে!

"কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে"। একখানা দারুণ কথা লেখক বলছেন। লেখক এইখানে যে স্মৃতিচারণ আর ভ্রমণকাহিনী বলে গেছেন তা চমকপ্রদ না হইলেও, আনন্দদায়ক। আর তাঁর রাজনৈতিক ভাবধারার সম্পূর্ণ যদিও তিনি লিপিবদ্ধ করেন নাই--বলে মনে হয়, তবুও বেশ খানিক স্বচ্ছ। তবে পড়তে গিয়া যে অনুযোগটা পাঠক হিসাবে আমার কাছে লাগতেছে, তা হইলো সাল-তারিখের উল্লেখ। বেশ কিছু জায়গায় লেখক সাল-তারিখের উল্লেখের দায় এড়ায়া গেছেন। হয়তো অবচেতন ভাবেই গেছেন। যেহেতু এইটা একটা ঐতিহাসিক অনুলিপি, তাই পাঠক হিসাবে এই অনুযোগটারে আমি এড়ায়া যাইতে পারতেছি না।
হয়তো স্বাধীন দেশের হাজার সমস্যার চাপে তাঁকে দিশাহীন হইতে হইছিল।
তো লেখক যেহেতু একজন বড় মাপের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং লেখাটা অসমাপ্ত আর তাছাড়া তিনি নিজেই বলছেন, লেখাটা আসলে অনুরোধের ঢেঁকি গেলা-স্বরূপ এবং লেখার সময়কালে তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন, তাই লেখা সম্পর্কিত একটু দায়সারা অবস্থারে আমি পাঠক মেনে নিতেছি।

পাঠ করতে গিয়ে লেখকের ভ্রমণ এবং বিচক্ষণতার একটা ঘটনা আমারে যারপরনাই আনন্দিত করছে। লেখক একবার ১৯৫২সালের দিকে চীনে যান, শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে। মোট ৩৭টা দেশের ৩৭৮ জন সদস্যের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। এবং শান্তি সম্মেলনে তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেন। তিনি কিন্তু ইংরেজি বলতে পারেন না, এইরকম ঘটনা না। কিন্তু তিনি নিজের ভাষারে সেই ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচয় ঘটান। এইখানেই তার বিচক্ষণতার সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। তাছাড়া আরেকটা যে কথা তিনি বলে গেছেন তা আমারে নাড়া দিছে। লেখক চীনের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণকালে নিজ চোখে যে ব্যাপারগুলা দেখছিলেন তার মধ্যে থেকে বলেন, "একটা মসজিদে গিয়েছিলাম, তারা বললেন, ধর্মে কর্মে বাধা দেয় না এবং সাহায্যও করে না"। মানে চীন স্বাধীনতা পায় ১৯৪৯ সালে, আর মাত্র ৩ বছরে রাষ্ট্রকে এমন একটা রূপে সাজাইতে শুরু করে যার বর্তমান চেহারা আজকে আমরা দেখতে পাই। এবং লেখক নিজেও তা বিচক্ষণ চোখে দেখছিলেন। এবং নিজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরে সমৃদ্ধ করতে পারছিলেন বলে অনুমান করা যায়।

অবশেষে শেষ করে ফেলছি। যত যাই বলি, একটা স্বাভাবিক জাদুরূপ আকর্ষনে পাঠ শেষ হয়া গেছে। কিন্তু শেষ হইয়াও যেন হইলো না শেষ। প্রশ্ন থেকে যাইতেছে মনে। যেহেতু তিনি একজন বিরাট মাপের পাবলিক ফিগার, তাই অসমাপ্তই থেকে গেল জানার পিপাসা। তাঁর ভাষ্যে-লেখনীতে এক রকমের টান কাজ করছে পুরাটা লেখায়। লেখা শেষে কিছু সংযোজন আছে, যা আমারে কিছুটা সন্দেহের দিকে ঠেলে দিছে। যারা লাস্টের সংযোজনটা করছেন তারা অবধারিতভাবেই নিরপেক্ষ থাকতে পারেন নাই। অপরদিকে লেখক যে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ডে আর জনগণের সেবায় গোটা-জীবনটারেই ত্যাগ করে দিছেন, তা সুস্পষ্ট ধরা যায় এই লেখায়। বঙ্গবন্ধু রাজনীতির জায়গায় যে বিচক্ষণ ছিলেন তা সন্দেহাতীত। আবার কিছু দূর্বলতাও তার ছিল বলে মনে হয়। উদারতা তার সবচেয়ে বড় দূর্বলতা ছিল বলে মনে হয়! আমার খালি একটা জায়গায় খটকা লাগতেছে, বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করতেন। এই কথায় আমি সন্দেহ করি না। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেই তিনিই কেন পাকিস্তানে ইসলামী সম্মেলনে (ওআইসি) নিজের দেশরে উপস্থাপন করলেন? এই দিক দিয়ে তিনি কিছুটা দিশেহারা পরিচয় দিছেন। এইখানে আমার মনে পড়ে ১৯৫২ সালে তার চীন ভ্রমণের স্মৃতি। হয়তো স্বাধীন দেশের হাজার সমস্যার চাপে তাকে দিশাহীন হইতে হইছিল। কিংবা এটাও হইতে পারে তরুণ বয়সে যে ভাবাদর্শরে তাঁর ভালো লাগছিল, বয়সকালে এসে সেই ভাবাদর্শে তিনি আস্থা রাখতে পারেন নাই।
একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।
একটা মানুষ জনতার কাছে শুধু নিজের ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠলেন একজন প্রবল ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন বিশ্বাসী রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন যে, স্বাধীনতাপূর্বে পাকিস্তান সময়কালে এক নির্বাচনে--তার অর্থবল কম থাকায় জনগণ তাঁরে নজরানা দিয়ে অর্থের জোগান দেন। তিনি যে পরিমাণে দেশের জন্য ত্যাগ করে গেছেন, কাজ করে গেছেন সারাটা জীবন, তা তাঁকে ভালোবাসায় যেমন পূর্ণ করে তুলছে তেমন শত্রুতে ঘিরেও ফেলছে। শুধু ভালোবাসা আর বিশ্বাসে মানুষ তার কথায় বিশ্বাস করে ঝাঁপায়া পড়ছে জীবন দিতে। অবশ্যই তিনি একজন রাজনৈতিক কবি ছিলেন বলে প্রতিভাত হয়।

লেখকের লেখা থেকে সুস্পষ্টভাবে সেই সময়কার পলিটিক্যাল ক্যাচাল, ষড়যন্ত্র আর মানুষের ক্ষমতার লোভের কুকীর্তি পষ্ট হয়ে যায়। তাঁর রক্তে আদর্শগত ভাবেই যেন আন্দোলন ছিল।

তো বইটা একজন বাঙালির জন্য অবশ্য পাঠ্য বলে আমার মনে হয়।

শেষ করবার আগে বলতে চাই, ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু। আর ভালোবাসা আপনারে।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।