“মসলার যুদ্ধ” সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিলেন ‘সত্যেন সেন’

 “মসলার যুদ্ধ” সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিলেন ‘সত্যেন সেন’
খাদ্যের স্বাদ বাড়াতে মসলা একটি অত্যাবশকীয় উপাদান। কয়েক হাজার বৎসর আগে থেকে মানুষ মসলাকে খাদ্য রান্নার অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচ জাতীয় মসলার বাণিজ্য ভারতবর্ষের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে যখন ইউরোপীয়রা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। ইউরোপের ভূমি মসলা চাষের উপযুক্ত নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভারতবর্ষ এবং পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয় দ্বীপগুলো মসলার জন্য উর্বর ছিল। আরবীয় ব্যবসায়ীরা এইসব অঞ্চল থেকে মসলা সংগ্রহ করে উচ্চমূল্যে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করতো। ইউরোপ রাজনৈতিক উপায়ে মসলার মূল্য সহনশীল রাখতে চেয়েছিল। সে প্রচেষ্টা বিফল হলে তারা নিজেরা মসলার উৎপাদন কেন্দ্রে এসে ব্যাবসা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। আর এর জন্য যে তোড়জোড় ও রক্তক্ষয়ী ফলাফল-- তা নিয়েই আমাদের আজকের আলোচ্য বই ‘সত্যেন সেন’ লিখিত “মসলার যুদ্ধ”

বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। সমকালে ২০১৬ সালে দ্যু প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় বর্তমান প্রকাশনাটি। ১৯৮০ সালে লেখক জীবিত থাকতে হয়েছিল এর একটি দ্বিতীয় সংস্করণ। নয়টি অধ্যায়ে রচিত বইটি আকারে ছোট। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্যে ঠাসা। মাত্র ৯৬ পৃষ্ঠার বইতে কয়েকশো বৎসরের ইতিহাস এত সাবলীলভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তা না পড়লে বোঝা যাবে না।

প্রিন্টার্স লাইনে লেখা রয়েছে বইটি সম্পাদনা করেছেন বদিউর রহমান। সত্যেন সেন লোকান্তরিত হয়েছেন ১৯৮১ সালে। লেখকের অবর্তমানে ২০১৬ সালে বদিউর রহমান কী সম্পাদনা করেছেন তা বোধগম্য হচ্ছে না। তবে তিনি বইয়ের সূচনায় ‘প্রসঙ্গ কথা’ নামে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ সংযোজন করেছেন। এখানে প্রধানত সত্যেন সেনের বর্ণিল সাংগঠনিক জীবনের নানাদিক তুলে ধরেছেন। নতুন পাঠক বইটি হাতে নিয়ে মসলা নিয়ে রাজনৈতিক ডামাডোলের কাহিনী জানার আগেই সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী'র প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে যাবেন। এই অংশে আলোচ্য বইটি সম্পর্কে তিনি সংক্ষেপে যা বলেছেন তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ--
‘মসলার যুদ্ধ’ গ্রন্থে ইতিহাসের একটি পুরনো অধ্যায়কে অত্যন্ত স্বার্থকতার সাথে তুলে এনেছেন সত্যেন সেন। কালিকট রাজ্য এক সময় মসলার ব্যবসা করে সমৃদ্ধ হয়েছিল। সেই সমৃদ্ধি দৃষ্টি আকর্ষণ করে পর্তুগালের পর্তুগালের পথ ধরে আসে ওলন্দাজরা আর ইংরেজরা। উপনিবেশ স্থাপন এবং সাম্রাজ্য বিস্তারে উদ্বেল হয়ে ওঠে দখলদাররা। অন্যদিকে আত্মরক্ষা, স্বাধীনতা-রক্ষা, দেশীয় শক্তি ও সম্পদ বাঁচিয়ে রাখার কঠিন সংগ্রাম। সেই সব মর্মস্পর্শী কাহিনী সরলভাষা আর মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে ‘মসলার যুদ্ধ’ গ্রন্থের পাতায় পাতায়। পৃষ্ঠা- ১২
কলকাতা থেকে বইটির দ্বিতীয় প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। সেই প্রকাশনায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মুখবন্ধ লিখেছিলেন। মুখবন্ধে তিনি বইটি সম্পর্কে স্বল্প কথায় যথাযথ শব্দের যোজনায় একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন-
স্বাধীনতা-উত্তর কালের বেশির ভাগ সময় শ্রীযুক্ত সত্যেন সেন কাটিয়েছেন পূর্ব বাংলার কারাগারগুলোতে রাজনৈতিক বন্দিরূপে। সেই বন্দিদশায় তাঁর বেশিরভাগ বই লেখা হয়। প্রকাশের সঙ্গ সঙ্গে সেসব বই পূর্ব বাংলার পাঠকচিত্তকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
‘মসলার যুদ্ধ’ এই বইগুলোর একটি। এই ছোট বইটিতে ইতিহাসের একটি পুরোনো অধ্যায়কে তিনি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত মনোজ্ঞরূপে। মসলার বাণিজ্য করে কালিকট রাজ্য এককালে সমৃদ্ধিলাভ করেছিল। সেই সমৃদ্ধি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল পর্তুগালের-কালিকটে অধিকার বিস্তার উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু হয় পঞ্চদশ শতকে। কিন্তু শুধু কালিকট নয়। মসলার উৎপাদন বিস্তৃত হয়েছিল পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে। পর্তুগালের দেখানো পথ ধরে সেখানে এলো ওলন্দাজরা, তারপর ইংরেজরা-সপ্তদশ শতাব্দীতে। পৃষ্ঠা- ১৩
সত্যেন সেন তাঁর ‘মসলার যুদ্ধ’ বইয়ের সূচনা করেছেন ১৪৮৮ সাল থেকে। কালিকট রাজ্য সেসময়ে মসলা ব্যবসার বড় কেন্দ্র ছিল। কালিকটের ব্যবসাকেন্দ্রে চীন, রোম, আরব সহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল। কিন্তু আধিপত্য ছিল আরব বণিকদের। রাজসভাতেও তাদের বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। ভাস্কো-দা-গামা ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে কালিকট বন্দরে উপস্থিত হবার দশ বৎসর পূর্বে ১৪৮৮ সালটি এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৎসর। মিসরীয় ব্যবসায়ীদের অর্থগৃধ্নুতায় অতীষ্ট হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজেরাই দক্ষিণ এশিয়ার মসলা উৎপাদন কেন্দ্রে আসতে চাইছিল। রাস্তাঘাটের খোঁজখবর নিতে ১৪৮৮ সালে কালিকট বন্দরে পা রাখে এক পর্তুগীজ গুপ্তচর। তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য জেনে নিয়ে ভাস্কো-দা-গামা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়। ভূমধ্যসাগরে আরবীয় বণিকদের বিদ্বেষজনিত অসহযোগীতার কারণে ইউরোপীয় বণিক ও রাজারা তাদের উপর বিরক্ত ছিল। তাই কালিকট বন্দরে আরবীয় বণিকদের উপস্থিতির খবর তারা সহজভাবে নেয় নি। প্রথম থেকেই পর্তুগীজরা যুদ্ধরংদেহী মনেভঙ্গী নিয়ে দক্ষিণ ভারতে উপস্থিত হয়।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য সেসময় পরাধীন থাকলেও পশ্চিমঘাট পর্বতমালার নিরাপদ আড়ালে কয়েকটি ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্য ছিল। কালিকট ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী। রাজা জামোরিন সকলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করতো। পর্তুগীজদের যুদ্ধংদেহী মনোভঙ্গী তাকে বিচলিত করে তুললেও তিনি কখনো পরাজয় স্বীকার করেন নি। বরং বারবার হওয়া আক্রমণ শৌর্যের সাথে ঠেকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। কালিকটের মসলার বাণিজ্য থেকে সবচেয়ে বেশি মুনাফা লুটতো মিসরের বণিকরা। মিসরের সমৃদ্ধি প্রধানত এর উপর নির্ভরশীল ছিল। কালিকটের যুদ্ধে মিসর কামান দিয়ে অভূতপূর্ব সহযোগীতা করেছিল।

পরবর্তীতে পর্তুগীজদের দেখানো পথ ধরে আসে ডাচ ও ইংরেজরা। শুরু হয় ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। ডাচরা ভারতের পাশাপাশি মালয় দ্বীপপুঞ্জে তাদের অধিকার বিস্তৃত করে বসে। সেখানে বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনীতিতেও তারা আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইংরেজরা কয়েকদশক মসলার বাণিজ্যে যুক্ত থাকলেও ডাচদের চাপে ইন্দোনেশিয়া অঞ্চল থেকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য হয়। তারা তখন শুধুমাত্র ভারতের উপর মনোযোগী হয়ে ওঠে।

লেখকের ভাষা সহজ, উপস্থাপনভঙ্গি আকর্ষণীয়। ফলে এক নিঃশ্বাসে বইটি সম্পূর্ণ পড়ার একটা তাগাদা শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বজায় থাকে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় সালের উল্লেখ পাঠকের সামনে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে ম্লান হতে দেয় না। অর্থাৎ পাঠক এক বসাতে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের পথে ভ্রমণ করতে পারবে।

বইয়ের বেশ কয়েক জায়গায় বেশ কিছু শব্দ, বাক্যাংশ ও বাক্যের ব্যবহার আমাকে অবাক করেছে। সত্যেন সেন এমন বিদ্বেষমূলকভাবে শব্দের ব্যবহার ও ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন তা গ্রহণ করা কিছুটা কঠিন। তবে যেহেতু বইটি তাঁর মৃত্যুর পরে সম্পাদিত, সেহেতু কিছুটা বিভ্রান্তির অবকাশ থেকেই যায়। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণটি পড়তে পেলে পার্থক্যগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করা যেত।

বইটির ছাপার মান ভাল। আমার হাতের বইটি পেপারব্যাক। মলাট বাঁধাইয়ের বইটি কেমন তা জানাতে পারছি না। প্রচ্ছদটি আকর্ষণীয়। বইয়ের ভেতরে বেশ কিছু আকর্ষণীয় অলংকরণ রয়েছে। এজন্য অংকনশিল্পী ধন্যবাদ পেতেই পারেন। তবে প্রচ্ছদে সম্পাদকের নাম কেন লেখা হয় নি, তা রহস্যময় লেগেছে। মসলার বাণিজ্য নিয়ে দক্ষিণ ভারতে কয়েক শতাব্দীব্যাপী চলমান যুদ্ধের ইতিহাস প্রচলিত ইতিহাসের বইতে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই কোন বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তার উল্লেখ থাকলে ভাল হত। সেই বইগুলো ঘেঁটে আগ্রহী পাঠকগণ আরও তথ্য জানতে পারতেন। আগ্রহী পাঠক নিজে পড়া ও অন্যকে পড়তে বলার আগে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকবেন সেই প্রত্যাশা করি।

-0-0-0-0-0-0-0-0-0-0-0-0-

মসলার যুদ্ধ
সত্যেন সেন

সম্পাদনাঃ বদিউর রহমান
প্রচ্ছদ ও আঁকিয়েঃ অয়ন ভট্টাচার্য

প্রথম প্রকাশঃ ১৯৬৮
প্রথম দ্যু প্রকাশ: ২০১৬
প্রকাশকঃ দ্যু প্রকাশন, ঢাকা।
পৃষ্ঠাঃ ৯৬
মূল্যঃ পেপারব্যাক; ১৫০ টাকা, হার্ডকাভার: ১৮০ টাকা
ISBN: 978-984-92152-5-6/7

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।