“মগ্ন মধ্যাহ্ন” এর 'আলমগীর রেজা চৌধুরী': একজন অনার্যের কৃষক সন্তানঃ বঙ্গ রাখাল

আলমগীর রেজা চৌধুরী: একজন অনার্যের কৃষক সন্তানঃ বঙ্গ রাখাল
ইতোমধ্যে শাহবাগকে আমার দেখা হয়ে গেছে। তখন শাহবাগ অভিজাত হোটেল। মফস্বল থেকে আগত ঢাকাকে আবিষ্কারের মধ্যে যে দূরত্ব কিশোরের ক্ষিপ্র আবেগ ভরা মনে রমনা পার্ক, চিড়িয়াখানা, রেসকোর্স, গুলিস্তান, বলাকা হল, নিউমার্কেট, শাহবাগ হোটেল-এর নাম ও ছিল। ঢাকা ফেরত কিশোর মফস্বলের সহপাঠী বন্ধুদের ইনিয়ে-বিনিয়ে সহস্র কথামালায় বর্ণনা করতে হবে এ প্রস্তুতি হিসেবে শাহবাগ নামটি গুরুত্বসহকারে স্থান করে নিয়েছিল মনে।
“মগ্ন মধ্যাহ্ন” আত্মজৈবনিক রচনা যা স্বাধীনতা উত্তর কাব্যঘোর লাগা জীবনকে তিনি উপস্থাপন করেছেন।
(মগ্ন মধ্যাহ্ন: আলমগীর রেজা চৌধুরী)
আলমগীর রেজা চৌধুরী (১০ই মার্চ ১৯৯৫, টাঙ্গাইল) সাহিত্যে এক পরিচিত নাম। বিংশ শতাব্দীর সত্তর দশকের খ্যাতিমান কবি ও কথা সাহিত্যিক। সত্তরের খ্যাতিমান কবি হলেও অনেক গল্প, উপন্যাস আর অনুবাদের জনক তিনি। কবি কিংবা গল্পের মধ্যে অন্তরজগতে লালন করেন সামাজিক দ্বন্দ্ব কিংবা স্বপ্নবাস্তবতার একরৈখিকতার মধ্যে বহুরৈখিক চিত্রের চিত্রায়ন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিজের জ্বলন্ত  বোহেমিয়ান জীবনাভিজ্ঞতার উপাদান করে পাংশুটে অনুভবের দীর্ঘায়িত কিংবা গুঙ্গানি দিয়ে ফেটে পড়া মানুষকে নিয়ে সাজিয়ে তোলেন গল্প, উপন্যাসের ডালি আর সেই ডালিতেই চরিত্রগুলো হাত-পা আচড়িয়ে পাঠকের সম্মুখে রোদন করে জানান দেয় রক্তাক্ত মুখচ্ছবির জীবন্ত মানুষের রূপ আর এ ক্ষমতাধারী যে স্রষ্টা তিনি সত্তরের খ্যাতিমান কবি ও কথাসাহিত্যিক আলমগীর রেজা চৌধুরী।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় কবির জীবনে ঘটে যাওয়া স্মৃতিময় ঘটনা বহুলতার জাগরণের রাত কিংবা দিনের তীব্রতা কিংবা কবি হওয়ার হিংসুটেময় সাহস যাকে আজকের কবি বা কথাসাহিত্যিক হতে সাহায্য করেছে সেই অভিযোগ-অনুযোগ অথবা নিতান্তই একজন গোবেচারাময় জীবনের ছাপমারা ইতিহাসকেই যেন অতি সহজ সরল সাবলীল ভাষায় তিনি “মগ্ন মধ্যাহ্ন” গ্রন্থে উপাস্থাপন করেছেন। এ গ্রন্থের প্রতিটি লেখায় তার রক্তক্ষয়ে জল করার তীব্র অভিজ্ঞতার ফসল যা ধারাবাহিকভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন, যেখানে ইতিহাসকে বর্ণনা করে গেছেন অতি সহজেই আর এ গ্রন্থ পাঠেও পাঠকের মনে কোন বিরক্তি উপস্থিত হবে না বরং ইতিহাসকে অতি সহজভাবেই পাঠক গলাধকরন করবে।

“মগ্ন মধ্যাহ্ন”
আত্মজৈবনিক রচনা যা স্বাধীনতা উত্তর কাব্যঘোর লাগা জীবনকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। এ সময় তিনি একজন উন্মাদনায় ছুটে চলছেন শব্দশ্রমিক হয়ে। যার জীবনের সাথে আজ বাংলা সাহিত্যের বৈচিত্র্যময় ঘটনার সাক্ষী তিনি। প্রগাঢ় ইচ্ছাশক্তির ফলেই তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন সাহিত্যে, যেখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছে ইতিহাস আর কালক্রমে “মগ্ন মধ্যাহ্ন” এক বিরল গ্রন্থ হিসেবেই ইতিহাসকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে। এখানে তিনি ছোট কাগজের বিরল সব কাহিনিময় সম্পাদকদের উপস্থাপন করে নিজের লেখক হওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করে গেছেন অতি সহজ সরল বয়ানে যেখানে কারচুপিময় ভাষার আশ্রয় নিতে হয়নি লেখককে।

আলমগীর রেজা চৌধুরী মফস্বলের একজন সাধারণ ছেলে যে কাব্যঘোর মাথায় করে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করেন। সেসময় একমাত্র সম্বল কবিতা। মুক্তিযুদ্ধের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত খুঁজে ফিরেছেন। সাহিত্য আড্ডাতে যান, পরিচয় হয়- রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, আবু কায়সার, শাহাদাৎ বুলবুল, শিহাব সরকার, আবিদ আজাদ, ইকবাল হাসান, শহীদ কাদরীদের সাথে। সেই বয়সের কৈশোরোত্তীর্ণ কবি। কবি এবং কবিতার আড্ডায় তিনি বুদ হয়ে থাকেন। বোহেমিয়ান জীবন মেনে নিয়েই আলমগীর রেজা চৌধুরী নিজেকে সর্বশেষ কবিতায় উত্থান-পতন আর জীবন তোলপাড়ের স্বাক্ষী করে দগ্ধ জীবনের সার্থক আত্মার মানুষ হিসেবে তৈরি করেন আর দিনরাত্রির পরিকল্পনাহীন জীবনকে সঙ্গী করে সিনেমা হলগুলোতে হানা দেন, প্রিয় কবিদের সঙ্গী হন কিংবা জর্জের কাছে খোলা চিঠি দিয়ে শেখ মুজিবকে নানা মাত্রায় স্মরণ করেন।
মূলত একাত্তর থেকে আমাদের শিল্পের পরিবর্তিত যা কিছু নির্মাণ তার কুশীলব, নির্মিত ফলাফলকে নিয়েই আবর্তিত হয়েছে “মগ্ন মধ্যাহ্নের” বিস্তৃত মাঠ প্রান্তর
একজন দাপিয়ে ফেরা তরুণের জীবনে ঘটে যাওয়া কিংবা দিগন্তপ্লাবী তুষার মাথায় করে বেড়িয়েছেন শাহবাগের পাড়া অথবা সাহিত্য আড্ডা। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, তসলিমা নাসরিন, কবি সাবদার সিদ্দিকীর মতো বৈচিত্র্যময় কবির সাথেও জীবনযাপন আর উদাসীনময় জীবনের পথে হেঁটেছেন তিনি যা আজ একান্তই আলমগীর রেজার জীবনেতিহাস হয়ে উঠেছে।

“মগ্ন মধ্যাহ্ন” গ্রন্থের লেখক- রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তসলিমা নাসরিনের প্রেমের মাধ্যম ছিলেন  সেকথাও আমরা এ গ্রন্থের মাধ্যমে জানতে পারি। লেখকের হাত দিয়েই খাম চালাচালি হতো। লেখকের ভাষায়- একদিন দুজনে মুখোমুখি হয় আমাদের ময়মনসিংহের বাড়ি “রাসেল ম্যানর” এ। নাসরিন রুদ্রকে আবিষ্কার করে। রুদ্র নাসরিনকে। রুদ্র আর তসলিমার প্রেম, ভালবাসা কিংবা অভিমান কতটা গাঢ় ছিল তার প্রমাণ মেলে তসলিমার চিঠিতে। যে চিঠিটা প্রকাশিত হয়েছিল রুদ্রের মৃত্যুর পর ভোরের কাগজে- ‘রুদ্র আমাকে স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছে। যে আমি কেবল নদীই দেখেছি, সেই আমাকে উথাল সমুদ্র যেমন দেখিয়েছে, ঘোলা জলাশয়ও কিছু কম দেখায়নি। রুদ্র আমাকে পূর্ণিমা দেখিয়েছে। অমাবস্যাও কিছু কম নয়। রুদ্রের হাত ধরে আমি খোলা মাঠে হাওয়ায় নেমেছি, গহীন অরণ্যে হেঁটেছি আর আঠারো-উনিশ-বিশ-একুশ করে বয়স পেরিয়েছি। আমি এক অমল রমণী, রুদ্রের উদ্যম উদগ্র জীবনে এসে স্তম্ভিত দাঁড়িয়েছিলাম। যে কবিকে আমি নিখাদ ভালোবাসি, যে প্রাণবান যুবককে ভালোবেসে আমি সমাজ-সংসার তুচ্ছ করেছি, হৃদয়ের দুকূল-ছাওয়া স্বপ্ন নিয়ে যাকে প্রথম স্পর্শ করেছি, তার প্রতি ভালোবাসা যেমন ছিল আমার, প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ছিল। আর রুদ্র সেই মানুষ, সেই প্রখর প্রশস্ত মানুষ, যে একই সঙ্গে আমার আবেগ এবং উষ্মা, আর ভালোবাসা এবং ঘৃণা ধারণ করবার ক্ষমতা দেখেছে। রুদ্রকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, দূর থেকেও। রুদ্র সেই মানুষ, রুদ্রই সেই মানুষ, যাকে যেকোন দূরত্ব থেকে ভালোবাসা যায়’।

এ গ্রন্থে মূলত একাত্তর থেকে আমাদের শিল্পের পরিবর্তিত যা কিছু নির্মাণ তার কুশীলব, নির্মিত ফলাফলকে নিয়েই আবর্তিত হয়েছে “মগ্ন মধ্যাহ্নের” বিস্তৃত মাঠ প্রান্তর আর এ মাঠ প্রান্তরের একজন দক্ষ কৃষক হয়ে লেখক বুনে গেছেন মাঠের নকশীকাঁথা যেখানে উঠে এসেছে রাজনীতি, সাহিত্য আর সংস্কৃতির যারপরনায় ইতিহাস। ষাট-সত্তর দশকের কবি সাহিত্যিকদের, রাজনীতিকদের অবস্থানকে লেখক চাক্ষুষ অবলোকন করেছেন আর অন্তর দৃষ্টিতে অবলোকনকৃত দৃশ্যকেই তিনি আজ বয়ান করে চলেছেন অনায়াসে যা একজন অনার্য কৃষক সন্তানকেই উপস্থাপন করে।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।