অমিতাভ অরণ্য'র রিভিউঃ ট্রাম দুর্ঘটনার আটদিন পর শম্ভুণাথ হাসপাতাল | সোয়েব মাহমুদ

 ট্রাম দুর্ঘটনার আটদিন পর শম্ভুণাথ হাসপাতাল | সোয়েব মাহমুদ
আলোচকঃ অমিতাভ অরণ্য

শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ ছয় ফাল্গুনের তপ্ত দুপুরে দুই হাতে দু-কাদি ডাব ঝুলিয়ে হাটতে হাটতে আটকে গেলেন ট্রামের ক্যাঁচারে। ভেঙ্গে গেলো কণ্ঠী, মচকে গেলো উরু আর চুরমার হয়ে গেলো পাজর। কবি উঠে দাড়াতে চাইলেন- কিন্তু পারলেন না। এখান থেকেই শুরু সোয়েব মাহমুদের ‘ট্রাম দুর্ঘটনার আটদিন পর শম্ভুণাথ হাসপাতাল’ কাব্যপুস্তিকার যাত্রা।

কবির না পারার ফিরিস্তি নেহাত কম নয়, জীবনের প্রতি পদে ব্যর্থতার গ্লানি আর বিষাদের ছোঁয়া; যে ছায়াকে বাঙময় করে তুলেছেন সোয়েব মাহমুদ তার ১৬ পৃষ্ঠার একটি মাত্র কবিতার সাজানো গ্রন্থটিতে। আত্ম-জবানীতে পঙক্তির পর পঙক্তি ভরে গেছে ব্যক্তিগত জীবনালেখ্যতে; এবং তা এতটাই চেনা পরিমণ্ডল থেকে বাইরে যে, কবিকে মনে করিয়ে দিতে হয়েছে-

আপনাদের বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না বোধহয়!

তবু আমরা বিশ্বাস করে নেই; বেদনার প্রতিঘাতে কাব্যের নিগুঢ় সৌন্দর্য প্রতিভাত হয়। নিশ্ছিদ্র বেদনার অভিঘাত না পেলে কবি কোথায় পেতেন তার ধুসর পাণ্ডুলিপি, ঝরাপালক, মহাপৃথিবী, বনলতা সেন, রূপসী বাঙ্গলার মতোন মিহিন বিষাদময় অমৃতধারা? তবু সব ছাপিয়ে দ্বিধান্বিত, ব্যথিত কবির কণ্ঠ চিরে বারবার উঠে এসেছে একটি কথা-

আমার নাম জীবনানন্দ দাশ,
মা কুসুমকুমারী দাশ
আমি ১৮৩, ল্যান্সডাউন রোড নীচতলা বাসাটায়
একটা সোফার উপর থাকি।

চিন্তা-চেতনা-জীবনবোধে আপাদমস্তক কবি সোয়েব মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম, নিভৃতচারী এবং সবচেয়ে চর্চিত কবি জীবনানন্দ দাশের মনোজগতের অতল সাগরে যেন ঝাপ দিয়েছেন; বিলীন হয়ে গেছেন তার চিন্তাধারায়। মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন সোয়েব মাহমুদ আর জীবনানন্দ দাশ। তাই তো কালো অক্ষরের ভাজ থেকে ভেসে আসে-

প্রতিটা আত্মহত্যার পরে সবাই বলাবলি করে আত্মহত্যা মহাপাপ,
অথচ প্রতিটা আত্মহত্যার জন্য দায়ী থাকে ক্রমাগত
আক্রমণ আর কতগুলো হত্যা রোজকার নিয়মে,
কেউ কি তা জানে? কেউ কি চেষ্টা করে জানার?
কেউ কি রাখে খবর কোথায় শ্মশান কোথায় কবর?
কেউ কি শোনে চিৎকার?
আত্মহত্যাটুকুন বাদে কোথায় কোথায় পালাবো আমি, কোথায়?

এমন সহজ স্বীকারোক্তি হৃদয়কে বিবশ করে দেয়, চোখকে আর্দ্র করে তোলে। কবি কোথা থেকে আনলেন এ অনুভূতি? নাকি ব্যক্তিগত জীবনে তিনিও জীবনানন্দের মতো নিঃসঙ্গ নক্ষত্র?... সে বিচারে আমরা না হয় নাই গেলাম, তার চেয়ে আমরা জীবনানন্দ দাশের জবানীতে কবির আহবানে সাড়া দেই-

পত্রিকার পাতায় তোমাদের কাছে হত্যাকাণ্ডের খবরটাই অনেক,
অথচ জরুরি, হত্যাকাণ্ডের চেয়েও জরুরি ছিলো,
হত্যাকাণ্ডের কারণ জেনে নেওয়া।

দুই শতাব্দীর যুগ সন্ধিক্ষণে জন্মেছিলেন কবি। মা ছিলেন সাহিত্যসাধক, পিতা ব্রাহ্মসমাজের সাথে যুক্ত! অথচ তিনি চির লজ্জিত, আত্ম-নিপীড়িত... পড়াশোনায় পিছিয়ে যাচ্ছেন, চাকরিতে ছাটাইয়ের তালিকায় তার নাম সর্বাগ্রে, নিজের মন খুড়তুতো বোন বেবির ওরফে বনলতার কাছে রেখে এসে লাবণ্য দাশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন, প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে; তবু সবকিছুর মধ্য চলছে সাহিত্যসাধনা।

রবীন্দ্র বলয়ের বিপুল স্বচ্ছ, স্বাদু প্রবাহকে আঘাত হেনে তাকে গতিশীল করার দৃঢ় প্রত্যয়ে নেমেছেন যে পঞ্চকবি; তাদের মধ্য নিভৃতচারী অথচ সবচেয়ে প্রভাবশালী সত্তা জীবনানন্দের জীবন কাটছে দোয়েল, ঘাসফড়িং কিংবা শালিকের চঞ্চলতায়। এর মাঝেই তিনি উচ্চারণ করছেন-

তবে বলয় ভাঙ্গতে অতিবিপ্লব,
অথবা এমিবার মতো জেঁকে বসা অতি দাসত্বে নেই আমি।

অশ্লীলতার দায়ে গালি খাচ্ছেন, চাকরি থেকে ছাটাই হচ্ছেন, স্ত্রী জারি করছে শরীর ছোঁয়ার কারফিউ আর তার জীবন কাটছে ল্যান্সডাউন রোডের নিচতলায় একটি সোফার উপরে! শৈশবে মায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা মনে পড়ে যায় বারেবার... আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে? মায়ের ছেলে কি হতে পেরেছেন মিলু? নিজেকে খুঁজে ফিরছেন কবি, আবিষ্কার করছেন সম্পর্কের গভীর সুতো। কতখানি শক্তিশালী সে সুতোর জোর?

আমার স্ত্রী- আমার সংসার,
আসলেই কি ছিলো অথবা আছে কিছু?
ছিলো কি বুকের ভেতর কোনো ভিটা?
শম্ভুনাথ হাসপাতালের বেডে শুয়ে চিন্তা করছেন কবি! কোথাও কোনো আলোড়ন নেই। কে খোজ রাখে নিভৃতচারী এই কবির? ভূমেন্দ্র গুহ মাঝে মাঝে দেখে যাচ্ছেন; দিন কতক পরে এলেন সজনীকান্ত! হ্যা, শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত; তার কবিতাকে চিরকালীন তীক্ষ বাক্য বাণে জর্জরিত করেছেন যে। তার অনুরোধে এলেন বিধান রায়ও; কিন্তু কবি যে ততক্ষণে নক্ষত্রলোকের টিকেট কেটে ফেলেছেন; ল্যান্সডাউন রোড নীচতলা বাসার সোফা থেকে উড়াল দেবেন অমৃতলোকে!

অনুভূতির তীব্রতায় মাখানো প্রতিটি লাইন নিয়ে সাজানো কাব্যটি যেন কাব্য নয়, জীবনানন্দের মানসলোকে ভ্রমণের ছাড়পত্র। তার জটিল মনস্তত্ত্ব, স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক, কবিতার সাথে বসবাস সবকিছু উদ্ভাসিত হয়েছে সাবলীলভাবে! কবিতার ভাষা আমার কাছে অতি বেশি সুপাচ্য মনে হয়নি, বরং বেশ খটোমটোই লেগেছে- হতে পারে তা ব্যক্তিক অক্ষমতা। অথবা উত্তরাধুনিক কবিতার এটাই হয়তো বিশেষত্ব- কবি শব্দজাল বোনেন আর পাঠককেই সেই জাল কেটে বেরিয়ে আসতে হয়। একসময় বেরিয়ে এসেছি জাল থেকে; তার জন্য ঝড়ঝাপটাও গেছে কমবেশি- কিন্তু আফসোস নেই।

আমার কাছে ‘ট্রাম দুর্ঘটনার আটদিন পর শম্ভুণাথ হাসপাতাল’-কে মিহি মোহনভোগ লাগে নি, দানাদার কড়া পাকের সন্দেশ মনে হয়েছে; ধীরে ধীরে যা চাখতে হয়।

আরেকটি কথা, দুয়েক জায়গায় ব্রাহ্মণ সমাজ কথা টা এসেছে। জীবনানন্দ ব্রাহ্মণসমাজের সাথে যুক্ত ছিলেন না- ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সাথে। ব্রাহ্মণ সমাজ আর ব্রাহ্ম সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। যে ফন্টে বইটা ছাপানো হয়েছে, তা চোখের জন্য বেশ পীড়াদায়ক লেগেছে।

-----<>-----<>-----<>-----<>-----<>-----
ট্রাম দুর্ঘটনার আটদিন পর শম্ভুণাথ হাসপাতাল
সোয়েব মাহমুদ


প্রকাশকঃ সোয়েব মাহমুদ, ঢাকা।
প্রচ্ছদ: ইবনে শামস
প্রথম প্রকাশ: ২০১৯
পৃষ্ঠা- চব্বিশ
মূল্য- পঁয়ত্রিশ।


কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।