মাহবুব আলীর গল্পগ্রন্থ 'ভয়' : আবহমান জীবনের গল্পচিত্র।। আল-আমীন আপেল

মাহবুব আলীর গল্পগ্রন্থ 'ভয়' : আবহমান জীবনের গল্পচিত্র।। আল-আমীন আপেল
"জীবনে গল্পের বসবাস, গল্পে জীবনের বসবাস; গল্প আর জীবন যেন একে অন্যের ছায়াসঙ্গী, জীবনের ছায়া গল্পের শরীরে পড়লে গল্পরা পরিপূরণ হয়ে ওঠে।"
-হ্যাঁ, এ চিরায়ত সত্যবচনটিই আবিষ্কার করেছি প্রাজ্ঞ গল্পকার মাহবুব আলীর গল্পগ্রন্থ 'ভয়' এ। গ্রন্থটিতে মোট আটটি গল্প।

প্রথম গল্প: অমৃতের হাতে বিষ। নির্মম বাস্তবতায় ভরা জীবনের এক করুণচিত্র এ গল্প।
গল্পে- মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে সংবাদপত্রে কর্তব্যরত পতিধনকে হারিয়ে দিশেহীন জগার মা। বিধ্বস্ত জীবনকে গুছিয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা। স্কুলগামী জগাকে ঘিরে রাজ্যের স্বপ্নে বিভোর সে। জীবনসংগ্রাম ব্যস্ততা বাড়ায়, জগার ঠিকমত খোঁজ রাখতে পারে না। উচ্ছন্নে যায় জগা, পড়ায় মন নেই; কি সব লোকের সাথে মেশে, মাঝেমধ্যে তার পকেটে অনেক টাকার দেখা মেলে; আয়ের উৎস জানতে চাইলে এড়িয়ে যায় ছেলে। সে এড়িয়ে যাওয়াই যে কাল হবে কে জানত! আসলে কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করবে ঠাস ঠাস! সেটাই হয়েছে। একটা ছেলেধন, ওকে ঘিরেই বাঁচা, তাই শাসন করে নি। জগার মা তবুও স্বপ্ন দেখে ছেলে ভালো হবে, আবার পড়ালেখায় মন দেবে; কিন্তু তা আর হয় না। বই ছেড়েছে সেই কবেই! রিকশার হাতলে ভর করে চলতে চায় জগা, পেরে ওঠে না। লাল টুকটুক অল্পবয়সী পুত্রবধূর স্বপ্ন ভেঙে জগার মাকে বরণ করে নিতে হয় ছেলের চে' বয়সে বড় পুত্রবধূকে।

শরীর ভেঙে পড়েছে জগার মায়ের। কাশের ব্যাধি আরো নানা ব্যাধি। জগা চেষ্টা করে মায়ের চিকিৎসার। বউয়ের গলগ্রহ জগার মা।
গল্পের পরিণতি, আফিমমিশ্রিত মধু পান করে বড় আদরের ধন জগাকে রেখে জীবন থেকে পালিয়ে যায় জগার মা।

স্বপ্নের আত্মহনন: আলোচ্য গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প। নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে আনছু আরা হাটে-বাজারে পাটের দড়ি বিক্রি করে। রোজকার মতন সেদিনও বেড়িয়েছে দড়ি বিক্রির উদ্দেশ্যে। পথে ছোটবেলার খেলাসঙ্গী সালিমের সাথে দেখা, স্মৃতিরোমন্থন। সালিম বড়লোকের সন্তান, টাকা-পয়সা খরচা করে বিদেশ গিয়ে ফেরত আসে কাজ না পেয়ে। সেসব কথা শোনে আনছু, দুঃখবোধ হয়। সালিম আনছুকে ভালোবাসার কথা বলে। আনছুও ভালোবাসে। কিন্তু ,  বাস্তবতা, সমাজচিত্রের কথা ভেবে বলে না। তেলে-জলে এক যে হয় না কখনো!

আনছু দড়ি বিক্রির উদ্দেশ্যে সালিমকে এড়িয়ে যায়। শহরে যায়। পেটের খিদে হচ্ছে সবচে' বড় কষ্টের নাম, এ কষ্ট কেউ এড়াতে পারে না; আনছুও পারে না, হাসিনার সাথে সে-ও চল্লিশা খেতে যায়, পেটপুরে খায়। সেখান থেকে তাকে ফিরতে হয় সতীত্বহীন হয়ে। গাঁয়ে ফিরে চিরিনদীর পাড়ে সে চাঁদের সাথে নিজের সৌন্দর্যের তুলনা, কলঙ্কের তুলনা করে। ছেড়াবস্ত্র ছাড়িয়ে বিবস্ত্র হয় আনছু। স্নান করে নগ্ন শরীরকে বৃথা পবিত্র করবার প্রয়াসে। বিয়ের সাধে চনমনে আনছুর বিবস্ত্র মৃতদেহে দুঃখিনী মায়ের লালশাড়ি দিয়ে ঢেকে নেয়ার চেষ্টা। আমগাছের ডালে দড়ি ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করেছে আনছু।

ধার করা স্বপ্ন: জীবনের মধ্যবেলায় এসে একটি বেসরকারি সংস্থার রিজিওন্যাল ডিরেক্টর(নর্দান সেকটর) নমিতা খুঁজে-ফেরে পরিচিত শহরে পেছনে ফেলে আসা অতীত। বাপ-মা হারা ছোটভাইয়ের কষ্টের সংসারের কথা, কলেজজীবনে ভালোবাসার মানুষের কথা মনে পড়ে তার। স্মৃতি হাতড়ে চলতে চলতে একদিন দেখা মেলে প্রেমিক মুনিমের। কিন্তু,  এতদিনে সে অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসার গড়েছে। কি লাভ তাকে মনে রেখে? পিছুহটে নমিতা। পেছনে ফেলে যেতে চায় সেসব নানারঙের স্মৃতি।

কান্নার নকশি আঁকা: মিন্তি, বিন্তি নামের দুই মেয়ে, স্ত্রী অঞ্জলি, ছোটভাই, তার স্ত্রী আর কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে আনন্দের সংসার, আঁকিয়ে এক মানুষের। টাকাচুরির অপবাদ মাথা করে অফিস ছেড়ে ফেরার পথে সভা-সমাবেশের উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত গ্রেনেড-বোমা কেড়ে নেয় তার সব। পা হারাতে হয়, বরণ করতে নিতে হয় পঙ্গুত্ব। ছোটভাইয়ের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকা। নানা রোগর বসবাস শরীরে। মাইগ্রেনের ব্যথাটা প্রবল। সেটাই কাবু করে বেশি। গলগ্রহী জীবন হতে মুক্তি পাবার চেষ্টায় তবুও ব্যস্ত সে। শেষমেশ একটা ব্যবস্থা হয়েও যায়। পরম খুশি-স্বস্তি মিন্তি, বিন্তি, আর অঞ্জলিকে আচ্ছাদন করে। আগামীদিন হতে কাজে যাবে সে, তাই একটু স্বস্তির ঘুম। কিন্তু...সে ঘুমই শেষ হয়ে যায় মানুষটার।

ভয়: গল্পগ্রন্থটির নাম গল্প, এনজিওকর্মী মিনারার জীবনচিত্র যেখানে প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বাপ-মা-পরিবারে কথা মনে পড়ে; কাঁদে, চোখ মোছে আবার কাজের সায়রে স্নান করে সে। এনজিওর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শিহাবকে ভালো লাগে। বলা হয়ে ওঠে না, তার আগেই সে চলে যায়। কাজসমুদ্রে আবার ডুবে যায় মিনারা। চাকরিটার শুরু হতেই একটা এলাকায় কাজ করতে যেতে ভয় হত তার। ভীষণ ভয়ার্ত পুরনো পথ, জঙ্গলের। পুরনো মন্দির হবে হয়ত। সে পথে চলতে এক নারী সহকর্মী তাকে আগেই সচেতন করেছে। তবুও সাবধানে চলেছে এতদিন।

সময়ের পরিক্রমায় শিহাব আবার ফিরে এসেছে। কালেকশন শেষে সেই ভয়াল পথেই যাচ্ছিল মিনারা। পশুমত কারা যেন আছড়ে পড়ে তার উপর, মুখগুলোকে মনে হয় পরিচিত; মনে কয়: কিছুক্ষণ আগে এদের কাছেই সমিতির টাকা কালেকশন করেছে মিনারা।
গল্পকার শেষটা এমন করেছেন, যে আসলে গোলকধাঁধাঁ মনে হয়। আসলে সে কি রেপ্ট হয়ে ফিরতে পারে? ফিরলেও বেঁচে থাকে? বেঁচে থাকলেও কি শিহাবকে পায় সে?..
কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়। এখানটায় গল্পটির সার্থকতা, গল্পকারের সার্থকতা। পাঠকমনে একটা রহস্যজাল তৈরি হয়েছে কিছুটা হলেও।

তুমি কেন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারোনি: চেনা শহর রাজশাহীতে এসেছেন মঈন সাহেব। সাথে মেয়ে রুনা, সহকারী উপ-খাদ্য পরিদর্শক পদের ভাইভা পরীক্ষা দিতে এসেছে। এখানে এসেছে মঈন সাহেবের অতীতের কথা, নিজের জীবনকে সরকারী চাকরিতে নিয়োজিত করতে না পারার যন্ত্রণাস্মৃতি মনে উঠছে। নানা স্মৃতিচারণেরর মধ্য দিয়ে মেয়ের ইন্টারভিউ এর সময় হতে হতে রাত্রি হয়ে আসে। মেয়ের জন্য বাহিরে অপেক্ষমাণ বিপর্যস্ত বাবা, মঈন সাহেব। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধে যেতে চেয়েও পারেননি, সে সব মনে ভাসে।

অপেক্ষার পালা শেষে মেয়ে ভাইভা দিয়ে বের হয়। ভাইভা সন্তোষজনক নয়। বাবা মুক্তিযোদ্ধা হলে, কোটা থাকলে তার চাকরিটা ঠিক হয়ে যেত। আক্ষেপ করে রুনা বাবাকে বলে:
      "একটি মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটও তোমার নেই। তুমি কেন মুক্তিযোদ্ধা হওনি বাবা?"
মেয়ের কষ্টে বুকে দাবানল জ্বেলে ওঠে তার। টু' শব্দটি করবার শক্তি নেই যেন!

প্রতিবন্ধী: তথাকথিত সমাজযন্ত্রে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়াটাকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়। তাকে অন্যের চোখে আড়াল করার চেষ্টা চলে সদা। গল্পে, তেমনটাই হয়েছে। প্রতিবন্ধী রাজাকে বোনের বিয়ের সময় অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়, বরপক্ষকে বলা হয় রিনি-ই একমাত্র সন্তান। রিনি ব্যাপারটা জানত না। রাজাকে বিয়ের সময় দূরে রাখায় কষ্ট হয় রিনির। বিয়ের কর্মকান্ড শেষ হয়। মাস কয়েক চলে যায়। রিনি স্বামীকে নিজের লোক করে নিতে ব্যস্ত তখন। এমন সময় তার মা আর রাজা আসে রিনিকে দেখতে। বদলে যায় স্বামী মঈনের চিরায়ত চেহারা। সে রাজার কথা জানত না। রিনিরা চিটিং করেছে এ ব্যাপারে। এমনটাই অভিযোগ তুলে ফিরিয়ে দেয় সন্তানসম্ভবা রিনিকে। অনেক বোঝাতে চায় রিনি, বোঝে না মঈন। বাধ্য হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে যাওয়া।

কয়েক মাস কেটে যায়। রিনির কোল জুড়ে মঈনের সন্তান। মঈন ফিরে আসে, নিয়ে যেতে চায় রিনিকে। রিনি যেতে চায় না। তার কেন জানি মনে হতে থাকে: মঈন পরমানুষ, দূরের কেউ। বাহির হতে সুপুরুষ, সুস্হ দেখালেও মন-মানসিকতায় প্রতিবন্ধী। এমন লোকের সাথে জীবন চলে? কি করবে রিনি? এমনি এক সিদ্ধান্তহীনতায় গল্পের ইতি টেনেছেন গল্পকার।

ফেরা না ফেরা: জাহাজ ডুবিতে মৃত অথবা জীবিত জামিল উদ্ দীনের কন্যা, আকলিমার কলিজার টুকরো বড় মেয়েটা ফিরে আসছে বিদেশ থেকে। অনেক কষ্টে তাকে আনা হচ্ছে। আকলিমা বিয়ে দিয়েছিল মেয়েকে সে সংসার টেকে নি। জীবনকে চালিয়ে নিতে মেয়ে কাজ করে, সেখানকার কারো মাধ্যমে যায় সৌদিতে। সেখানে বাংলাদেশী নারীশ্রমিকরা কি কাজ করে সেটা বোধ করি সকলেই জানেন, এবং বোঝেন। আকলিমার মেয়ে খুকুকেও সে কাজ করতে হত। সেখান হতেই যা আয় হয় তা দিয়ে বদলে যায় আকলিমার সংসার।

এক সময় হাঁপিয়ে ওঠে খুকু। দেশে ফেরার জন্য আকুতি মায়ের কাছে। মা একে ওকে ধরে, থানা-পুলিশে টাকা ছড়িয়ে অবশেষে মেয়েকে ফিরিয়ে আনে।
_______________
ভয় 
মাহবুব আলী

প্রকাশনী: জয়তী, ঢাকা।
প্রচ্ছদ: মাহবুব আলী
প্রকাশ: ২০১৮
মূল্য: ২২৫টাকা
পৃষ্ঠা: ১০৩
ISBN: 977-984-8054-03-1

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।