‘জরীফ উদ্দীন’ এর ভাষ্যে ‘ড. মো. এরশাদুল হক’ সম্পাদিত ভাওয়াইয়া ভাস্কর ভূপতি ভূষণ বর্মা সংবর্ধনগ্রন্থ "নিদান কালের বান্ধব"

‘জরীফ উদ্দীন’ এর ভাষ্যে ‘ড. মো. এরশাদুল হক’ সম্পাদিত ভাওয়াইয়া ভাস্কর ভূপতি ভূষণ বর্মা সংবর্ধনগ্রন্থ "নিদান কালের বান্ধব"
 ভাওয়াইয়া ভাস্কর ভূপতি ভূষণ বর্মা সংবর্ধনগ্রন্থ "নিদান কালের বান্ধব"। জনপ্রিয় লোকসংগীত ভাওয়াইয়ার নন্দিত শিল্পী ভূপতি ভূষণ বর্মাকে নিয়ে দুই বাংলার বিভিন্ন গবেষক, শিক্ষক, কবি-লেখক, সাংবাদিক, গীতিকার, শিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালকদের লেখা জীবনব্যাপী শিল্প সাধনা আলোচনা, স্মৃতিকথা, শিল্পীর কণ্ঠের গান বিশ্লেষণ মূলক প্রবন্ধ মোট ৩৫টি। ১টি সাক্ষাৎকার, ৭টি কবিতা। এছাড়াও ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদের ছায়াচিত্র, বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক সংবর্ধনা সনদ-স্মারক, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র, পোস্টারসহ বিশেষ মুহূর্তের ছবি, ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামতের ছায়াচিত্র ও শিল্পীর জনপ্রিয় কয়েকটি গানের স্বরলিপি নিয়ে রচিত চমৎকার মলাটের পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ড. মো. এরশাদুল হক সম্পাদিত ২৫৪ পৃষ্ঠার একটি অসাধারণ গ্রন্থ। যা পড়ে পাঠক মাত্রই জানতে পারবেন শিল্পী ভূপতি ভূষণ বর্মার খণ্ডিত জীবন চিত্র, ভাওয়াইয়ার রূপ, অতীত-বর্তমান, উত্থান-পতন, ভাওয়াইয়ার পথে প্রান্তরে ভূপতি ভূষণ বর্মার বিচরণ সম্পর্কে। গ্রন্থটির ৩৫ টি প্রবন্ধ যেন ৩৫টি আলাদা স্বাদের মহাকাব্য। একজন বর্মা ও ভাওয়াইয়াকে ৩৫ ভাবে উপস্থাপন। কবিতাগুলো বইটিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। বিবিধ বিষয়গুলো ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন বাংলা একাডেমি, ঢাকার গবেষণা উপবিভাগের উপপরিচালক ড. তপন বাগচী। প্রথম প্রবন্ধ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যপক ড. মাখন চন্দ্র রায়ের 'মহিমান্বিত লোকপুরুষ ভূপতি ভূষণ বর্মা' শিরোনামে স্মৃতিকথামূলক প্রবন্ধ। এতে লেখকের শিল্পীর গানের পরিচয়ানুভূতি এবং শিল্পীর সাথে কিছু সময়ের মুগ্ধতা এবং সেই মুগ্ধতার রেশের কথাই সুন্দর ভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। দ্বিতীয় লেখাটি গ্রন্থটির সম্পাদক, লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক ড. এরশাদুল হকের "ভাওয়াইয়া সংগীতের ভাস্কর : ভূপতি ভূষণ বর্মা' শিরোনামে শিল্পীর সংক্ষিপ্ত জীবনী যাতে ফুটে উঠেছে শিল্পীর শৈশব-কৈশোর-লেখাপড়া- কর্মজীবন, শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পসহ প্রাপ্তি প্রত্যাশা ইত্যাদি।
ভূপতি ভূষণ বর্মা শুধু শিল্পীই নন। তিনি "সাপ্তাহিক গণকথা" পত্রিকায় উলিপুর সংবাদদাতা ছিলেন।
এই লেখাটির আংশিক তথ্য অন্যান্য লেখকের লেখায় দৃশ্যমান। বিরক্তি নয় বরং নতুন রূপে পাঠককে তৃপ্ত করবে। তৃতীয় লেখাটি শিল্পী বর্মার ছাত্রী ভাওয়াইয়া শিল্পী ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জিলুফা সুলতানার "স্মৃতির মানসপটে ভূপতি ভূষণ বর্মা"। এতে লেখক শিল্পীর সাথে পরিচয়, গান তালিম নেওয়া এবং নিঃস্বার্থ ভাবে ভাওয়াইয়ার পথে প্রান্তরে ছুটে চলার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। এর পরের লেখাটি ভারতের শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক গৌতম সরকারের বিশ্লেষণধর্মী লেখা "এক সাধক: এক লড়াই"। একজন শিল্পী নিভৃতচারী হয়েও ভাওয়াইয়ার প্রচার ও প্রসার করে যাচ্ছেন বিশ্বসংগীত সংসারে জাত-পাত বাদ দিয়ে লেখক তার লেখনীতে চমৎকার ভাবে এই বিষয়টা তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করা ‘ছোটনদী’ পত্রিকার সম্পাদক, “উলিপুরের ইতিহাস” গ্রন্থের রচয়িতা প্রভাষক আবু হেনা মুস্তফার "ভাওয়ের মানুষ" লেখায় ফুটে উঠেছে ভাওয়াইয়া ও ভাওয়ের মানুষ ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে। সেই কথাগুলো যেনো লেখকের একার নয় আমাদেরও। গীতিকার, শিক্ষক ও শিশুসাহিত্যিক তৌহিদ-উল ইসলামের 'সংস্কৃতির বিচারে শিল্পী ভূপতি ভূষণ বর্মা'য় লেখক সংস্কৃতির সাথে ভূপতি ভূষণ বর্মার সম্পর্ক এবং সংস্কৃতির সাথে লালিত হওয়া পরিবারের অন্য সদস্যদের কথার ফাঁকে ভূপতি ভূষণ বর্মার শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পই তুলে ধরেন। সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের 'ভূপতি ভূষণ বর্মা এবং ভাওয়াইয়া" তে লেখকের সাথে ভাওয়াইয়ার যে এক আত্মিক সম্পর্ক তাই তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন লেখকের কয়েকটি জনপ্রিয় গানের নাম। এই লেখাটির মাধ্যমে নতুন একটি তথ্য জানতে পারি তা হলো ভূপতি ভূষণ বর্মা শুধু শিল্পীই নন। তিনি "সাপ্তাহিক গণকথা" পত্রিকায় উলিপুর সংবাদদাতা ছিলেন। ভাওয়াইয়া শিল্পী ও শিক্ষক তনু রায় শিল্পীর সাথে পরিচয় এবং তার কাছে থেকে কিভাবে তালিম নিলেন তিনিসহ গোবিন্দপুরের কয়েকজন তা তুলে ধরেন "আলোকবর্তিকা : ভূপতি ভূষণ বর্মা"তে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন এখন ভাওয়াইয়া গান গোবিন্দপুরে ব্যাপক জনপ্রিয়। প্রচ্ছদে নামাঙ্কিত"নিদানকালের বান্ধব" নামে দুইটি লেখা পাওয়া যায় প্রবীণ শিল্পী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুব্রত কুমার ভট্টাচার্য এবং ভারতের শিল্পী গোবিন্দ ধরের। দুটিই আলাদা আঙ্গিকে লেখা নিদানকালের বান্ধব ভূপতি ভূষণ বর্মাকে নিয়ে। ভাওয়াইয়া গানের ভূতভবিষ্যৎ এবং শিল্পীর সাধনা ফুটে ওঠে ভাওয়াইয়ার গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুশান্ত কুমার রায়ের লেখায়। পরের লেখাটি কবি ও শিক্ষক এনামুল কবীরের "ভূপতি ভূষণ বর্মা : কাছে থেকে দেখা একটি দীপ্তিমান নক্ষত্র"। লেখকের সহজ স্বীকারোক্তিতে ফুটে ওঠে লেখকের সাথে শিল্পীর সম্পর্ক এবং ভাওয়াইয়ার জনপ্রিয় গানগুলোর কথা। লেখাটি আমাদের শিল্পীর গানের প্রতি একধরণের প্রেম সৃষ্টি করে দেয়। ভাওয়াইয়ার অতীত এবং ভাওয়াইয়া শিল্পীর মর্যাদা তুলে ধরতে গিয়ে অনেকটা তাত্ত্বিকভাবে শিল্পী বর্মাকে নিয়ে কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার সরদার মোহম্মদ রাজ্জাক এর চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন "কালান্তরের মহাযাত্রায় ভূপতি ভূষণ বর্মা" লেখাটিতে। এর পরের লেখাটি রেডিও সারাবেলার প্রযোজক, কবি ও লেখক কৃষ্ণ কমল এর "শুধু শিল্পী নন ভূপতি ভূষণ বর্মা একজন পথপ্রদর্শক" লেখায় তুলে ধরেন রংপুর বেতারে লেখকের ছোটবেলায় গ্রামের মানুষ তিস্তাপাড়ের ভাওয়াইয়া শোনার জন্য কত আগ্রহী ছিল। আর সেই গানের শিল্পী যদি হয় ভূপতি ভূষণ বর্মা। লেখাটিতে শিল্পী বর্মার সাথে লেখকের বর্তমান গভীর সম্পর্কই দৃশ্যমান।

এছাড়াও অর্ধেকেরও বেশি পাতা জুড়ে স্থান পেয়েছে ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদের ছায়াচিত্র, বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক সংবর্ধনা সনদ-স্বারক, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পত্র, পোস্টারসহ বিশেষ মুহূর্তের ছবি, ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামতের ছায়াচিত্র ও শিল্পীর জনপ্রিয় কয়েকটি গানের স্বরলিপি।

শিল্পী ভূপতি ভূষণ বর্মার সংক্ষিপ্ত জীবনী, ভাওয়াইয়ায় অবদান ইত্যাদি চমৎকার ভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন কবি, লেখক, গীতিকার, নাট্যকার ও সাংবাদিক আব্দুল খালেক ফারুক "ভাওয়াইয়া অনন্য প্রতিভূ" লেখাটিতে। কবি ও লেখক জামাল অন্তর এর "ভ-অক্ষর ভাওয়াইয়ার ভূমিপুত্র ভূপতি ভূষণ বর্মা" শিরোনামটিই লেখাটি সম্পর্কে দুর্দান্ত মনোভাব তৈরি করে। লেখাটিতে লেখকের শৈশবের ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও পরে আর তার নিজের থাকেনি সার্বজনীন হয়ে ওঠেছে। ড. তপন বাগচীর "জয়তু ভূপতি ভূষণ বর্মা" লেখাটির কথা না বললে নয়। এছাড়াও গ্রন্থটিতে লিখেছেন গীতিকার ও দোতরাবাদক সত্যেন্দ্রনাথ রায়, কবি ও গল্পকার তমসুর হোসেন, সঞ্জয় সাহা, ভারতের শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক সুবীর সরকার, পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া কণ্ঠশিল্পী সুভাষ চন্দ্র রায়, বেতার ও টেলিভিশন এর গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী পঞ্চানন রায়, ভারতের শিক্ষক ও লোকসংগীত শিল্পী মঙ্গলনাথ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পী সরকার মো. শহিদুজ্জামান, শিক্ষক ও গীতিকার আব্দুল হামিদ, ভূপতি ভূষণ বর্মার বাল্যবন্ধু সমাজসেবক ও সংগীতানুরাগী অতুল কৃষ্ণ রায়, ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সংগীত শিল্পী জয়ন্ত কুমার বর্মণ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মল্লিকা রঞ্জন রায়, ভারতের রাজবংশী চলচ্চিত্র পরিচালক তপন রায়, ভারতের কবি, লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক রোপ আক্তার আহমেদ, লোকসংগীতশিল্পী, গবেষক ও অধ্যক্ষ অণিমা মুক্তি গমেজ, ভারতের শিল্পী গোবিন্দ ধর। আমার লেখা "ভাওয়াইয়ার জীবন্ত কিংবদন্তি ভূপতি ভূষণ বর্মা" লেখাটি সম্পর্কে কিছুই বলতে চাই না। পাঠকের ওপর থাকল পড়ে মন্তব্য করার দায়বদ্ধতা। ভূপতি ভূষণ বর্মার ব্যক্তি ও শিল্পী জীবনের শৈশব-কৈশোর থেকে শুরু করে বর্তমান অবধি পূর্বে বলা এবং না বলা স্মৃতিবিজড়িত নানা ঘটনার স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় গ্রন্থটিতে একমাত্র সাক্ষাৎকারটি পড়লে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লেখক মনজুরুল ইসলাম। চমৎকার ছন্দে নীলকমল মিশ্র রচিত "ভাওয়াইয়া কাননে ভূপতি ভূষণ" কবিতাটি অন্তরে বাজতে থাকে। হৃদয় ছুঁয়ে যায় আ.ক.ম এরশাদুন নবী আনছারী রচিত "আমার প্রিয় ভূপতি ভূষণ বর্মা" ছোলায়মান মণ্ডল রচিত "সুরের বৈভবে কে তুমি ঋষি" বিষাদ চন্দ্র বর্মন রচিত "হে ভাওয়াইয়া ভাস্কর" শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ রচিত "ভাওয়াইয়া ভাস্কর" এবং অজিত কুমার বর্মা রচিত "ভাওয়াইয়ার বাউদিয়া" কবিতাগুলোয়। মাহমুদা বেগম রচিত "ভক্ত হৃদয়ে তুমিই ভূপতি" কবিতাটি শিল্পী ও ভাওয়াইয়া কালজয়ী গান সম্পর্কিত অসাধারণ একটি কবিতা। এছাড়াও অর্ধেকেরও বেশি পাতা জুড়ে স্থান পেয়েছে ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদের ছায়াচিত্র, বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক সংবর্ধনা সনদ-স্বারক, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পত্র, পোস্টারসহ বিশেষ মুহূর্তের ছবি, ভূপতি ভূষণ বর্মা সম্পর্কে কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামতের ছায়াচিত্র ও শিল্পীর জনপ্রিয় কয়েকটি গানের স্বরলিপি। যা বইটির শ্রীবৃদ্ধি এবং ভূপতি ভূষণ বর্মা ও ভাওয়াইয়া গান সম্পর্কে তথ্য সমৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

_:_:_:_:_:_:_:_:_:_
নিদান কালের বান্ধব ভাওয়াইয়া ভাস্কর ভূপতি ভূষণ বর্মা সংবর্ধনগ্রন্থ
সম্পাদনা : ড. মো. এরশাদুল হক


প্রকাশনী: পার্ল পাবলিকেশন্স
প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০১৯
প্রচ্ছদ : আইয়ুব আল আমিন
মূল্য : ৪০০ টাকা

0/আপনার মতামত?/টি মন্তব্য

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো