কবি, ঔপন্যাসিক ও গীতিকার শাহেদ ইকবালের কল্পকাহিনিনির্ভর বই ‘অন্ধমাকড়সা’ : ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রে রূপ’

শাহেদ ইকবালের কল্পকাহিনিনির্ভর বই ‘অন্ধমাকড়সা’

 খান আলাউদ্দিন


‘অন্ধ মাকড়সা’ বৈজ্ঞানিক কল্পগল্পের বইটিতে মোট তিনটি গল্প রয়েছে। গল্প তিনটি হলো অন্ধ মাকড়সা ছায়ামানুষ ও আলমারী বউ। অন্ধ মাকড়সা ও ছায়ামানুষ গল্প দুটিকে বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু আলমারী বউ গল্পটি পুরাই অতিপ্রাকৃত। এটি কোনোভাবেই সায়েন্স ফিকশন হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বরং আলমারি বউ গল্পটিকে আমরা বলতে পারি ‘সায়েন্স ফ্যান্টাসি’।

‘অন্ধ মাকড়সা’ গল্পটি আয়তনে দীর্ঘ, বিষয় বৈচিত্রে সমৃদ্ধ । মূল থিম, পৃথিবীতে মানুষ ব্যতীত আর কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব আবিষ্কার। ই.এস.পি বা এক্সট্রা সেনসরি পারসেপশন। মানুষের হিংস্রতা।

১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সিবিশিষ্ট মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্যালক্সিতে আছে ১০ হাজার কোটি সূর্য। এইসব নক্ষত্র ব্যবস্থার অন্তত ১০ হাজার গ্রহে প্রাণের উদ্ভব এবং সভ্যতা বিকাশের সম্ভাবনা বিদ্যমান। অগ্রসর বহির্জাগতিক প্রাণের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রকল্প যেমন: SETI, ET, META ইত্যাদি পরিচালনা করছেন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আমরা সবসময় পৃথিবীর বাইরে উদ্ভূত  প্রাণের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে, অনুজীব বা রেডিও তরঙ্গ বিকিরণকারী সভ্যতার সন্ধানে উৎসুক। কিন্তু পৃথিবীর জলজ পরিবেশে প্রাণ ধারনের উপযোগী আবহাওয়ায় যে বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ ঘটতে পারে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখি না। ব্যতিক্রম গল্পকার শাহেদ ইকবাল। তার অন্ধ মাকড়সা গল্পে তিনি পৃথিবীর এক বুদ্ধিমান মাকড়সা প্রজাতির কথা বলেছেন। নাম টেগলোদিপলুরা লওরি। নিবাস, মরুভূমির নিচে। প্রত্নতত্ত্ববিদ এন্টনি গ্রের অনুসন্ধানে এই প্রজাতিটি আবিষ্কৃত হয়। আজ থেকে তিরিশ লক্ষ বছর আগে মাটির উপরে বাস করত অন্ধ মাকড়সারা। জলবায়ু শুকিয়ে এলে তারা মাটির নিচে চলে যায়। বিশ শতকে মানুষের সাথে তাদের যোগাযোগ ঘটে। মানুষেরা টেগলোদিপলুরা লওরিদের টেলিপ্যাথির শক্তি অনুভব করে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ডিনামাইট ফাটিয়ে তাদের পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে দেয়। এক নিশ্বাসে গল্পটি পড়ে শেষ করতে পারলেও মন থেকে একটি খটকা কিছুতেই যায়না, টেলিপ্যাথি জানা, আল্ট্রাসনিক শব্দতরঙ্গ উৎপন্নকারী অন্ধ মাকড়সারা কি পারতো না মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ?

যারা মাইন্ড রিডিং, টেলিপ্যাথি রহস্যময় যোগাযোগ পদ্ধতি , রিমোট ভিউয়িং অর্থ্যাৎ প্যারানরমাল বিষয় পড়তে ভালোবাসেন তাদের পাঠ আনন্দ দান করতে পারবে অন্ধ মাকড়সা এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

পদার্থ ও প্রতিপদার্থ পরস্পর সংস্পর্শে এলে একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। পড়ে থাকে শুধু শক্তি। ১৯২৮ সালে পল ডিরাক ডিরাক সমীকরণে ইলেক্ট্রনের মতো আরেকটি কণিকার ধারণা দেন। ইলেকট্রনসদৃশ সেই কণাটির চার্জ হবে ধনাত্মক, যেখানে ইলেক্ট্রনের চার্জ ঋণাত্মক। নতুন এই কণার নাম দেয়া হয় এন্টি ইলেক্ট্রন বা পজিট্রন। পরবর্তীতে শুধু ইলেকট্রন নয়, প্রোটন ও নিউট্রনেরও প্রতিকণা আবিষ্কার হয়। ছায়া মানুষ গল্পে আমরা দেখি বস্তুর যেমন প্রতিবস্তু আছে, মানুষেরও তেমনি প্রতিমানুষ থাকতে পারে। গল্পের প্রধান চরিত্র ইউসুফ সাহেব একদিন জানতে পারেন এই শহরে আরেকজন ইউসুফ সাহেব আছেন। সেই ইউসুফ সাহেব বা প্রতিমানুষকে তৈরী করার ল্যাবরেটরী ঢাকা শহরেই কোথাও গড়ে উঠেছে, গল্পকার যতই গল্পের ছলে এ কথা বলুক না কেন, বর্তমান কালের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অবিশ্বাস্য, চূড়ান্ত রকমের গাজাঁখুরি কল্পনা। বিশেষত আপনি যখন জানবেন, আজকের দিনে একগ্রাম প্রতিপরমাণু তৈরি করতে খরচ পড়বে ১০০ কোয়াড্রিলিয়ন ডলার। প্রতিমানুষ তৈরীর বেলায় সে খরচ যে আকাশছোঁয়া হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আলমারি বউ গল্পটা পরাবাস্তব ঘরানার। গল্পের প্রধান চরিত্র নওফেল বিয়ের পর আবিষ্কার করে তাঁর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী ফাইজা মানে ফাইজা কবীর দিনের বেলা আলমারীর ভেতর পড়ে পড়ে ঘুমায়। তাছাড়া মতি মিস্ত্রির পূর্বপুরুষেরা সবাই ওখানে, ওই আলমারীতে রয়েছে। নওফেল আলমারীর ডালা খুললেই সবাই একে একে বেরিয়ে আসবে ইয়াকুব মিস্ত্রি, আলতাফ মিস্ত্রি, ফারিয়া। কিন্তু লেখক আমাদের জানতে দেন না নওফেল আলমারি খুলার পর প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিলো। তিনি পাঠকের আগ্রহ জিঁইয়ে রাখেন। গল্প শেষে রবীন্দ্রনাথের ’শেষ হয়েও হইল না শেষ’ অমর পঙক্তিটি সামনে চলে আসে।

ছোট ছোট সংলাপ, ঝরঝরে বর্ণনায় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানো গল্পগুলো একনাগাড়ে পড়ে ফেলার মতো। বিজ্ঞানের কচকচানিতে গল্পগুলো ভারিক্কি হয়ে উঠেনি বরং বিজ্ঞান ও কল্পনার মিশেল লেখাগুলোয় যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

:-:-:-:-:-:-:
অন্ধ মাকড়সা
শাহেদ ইকবাল

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী ২০২০
প্রকাশনায় অন্বয় প্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মূল্য: ২০০.০০
ISBN 978 984 94192-5-9

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ