আহমদ ছফা' লিখিত 'যদ্যপি আমার গুরু' বই সম্পর্কে আলোচনা: - রাজ্য জ্যোতি

আহমদ ছফা' লিখিত 'যদ্যপি আমার গুরু' বইয়ের আলোচনা: - রাজ্য জ্যোতি


লেখক পরিচিতি

আহমদ ছফা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। তাঁর পিতা হেদায়েত আলী এবং মাতা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মার দ্বিতীয় সন্তান।

আহমদ ছফা একজন বাংলাদেশি লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও সলিমুল্লাহ খানসহ আরো অনেকের মতে, মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন আহমদ ছফা। তার লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে।

বইয়ের নাম নিয় কিছু কথা

যদ্যপি শব্দের দুটি আভিধানিক অর্থ আমি পেয়েছি, যেগুলো হচ্ছে যদিও বা একান্তই। গুরু শব্দের অর্থ তো সকলের জানা, তা হলো “শিক্ষক”। এক্ষেত্রে আমরা বইয়ের নামের অর্থ ধরে নিতে পারি, “একান্তই আমার  শিক্ষক” কিংবা “যদিও আমার শিক্ষক”।

এক্ষেত্রে বইয়ের নামের দুইটি অর্থ হতে পারে! বইয়ের নাম তিনি যদি “একান্তই আমার শিক্ষক” বুঝিয়ে থাকেন, তবে তিনি এর দ্বারা সম্ভবত রাজ্জাক স্যারের প্রতি তার অধিকার স্থাপন করেছেন বা প্রকাশ করেছেন। আর তিনি যদি বইয়ের নামের অর্থ “যদিও আমার শিক্ষক” বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি এর দ্বারা এমন এক সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন যা গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে বন্ধুত্ব  বা এক অন্যরকম  হৃদ্যতার সম্পর্কের জন্ম দিয়েছে। এক্ষেত্রে একটি কথা বলা যেতেই পারে যে, তাদের এই মধুর সম্পর্ক সর্বসাধারণের মাথায় ঢুকবার মত নয়।

আহমদ ছফার দৃষ্টিতে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সমুহের একটি। দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণে, নিষ্কাম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করে নিজের বিশ্বাসের প্রতি স্থির থাকার ব্যাপারে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের মতো আমাকে অন্য কোন জীবিত বা মৃত মানুষ অতোটা প্রভাবিত করতে পারেনি। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসতে পারার কারণে আমার ভাবনার পরিমন্ডল বিস্তৃত হয়েছে, মানসজীবন ঋদ্ধ এবং সমৃদ্ধতরো হয়েছে। - আহমদ ছফার এরুপ বক্তব্যে বোঝা যায়, আসলে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক কত বড় একজন  প্রভাবক ছিলেন, জ্ঞানী ছিলেন।

বইয়ের ঘঠনাচক্র

১৯৭০ সাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ আহমদ ছফা বাংলা একাডেমীর গবেষণা বৃত্তি পান। “১৮০০-১৮৫৮ সাল পর্যন্ত বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব” এই বিষয়ে গবেষণা করবেন তিনি। এখন দরকার একজন থিসিস সুপারভাইজার। বন্ধুদের পরামর্শে তিনি জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের স্মরণাপন্ন হন। এর জের ধরেই পরিচয় এবং তারপর গুরু শিষ্যের সম্পর্কে এক অন্যরকম অন্তরঙ্গতা চলে আসে, কেটে যায় প্রায় ২ দশক।

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের একজন জাতীয় অধ্যাপক, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দিয়েছিল ডিলিট উপাধী। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন চিরকুমার। বাংলাসাহিত্যের বাঘাপুরুষদের সাথেও তার ছিল সু-সম্পর্ক, ছিল মজার ঘটনা। বইটিতে উঠে এসেছে অনেক পরিচিত নাম। অবাক করার মতো ঘটনা ও বক্তব্য।

দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সুবাধেই মূলত আবদুর রাজ্জাক, তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছেন আমহদ ছফার সাথে। সেসব আলোচনাকেই আহমদ ছফা তার 'যদ্যপি আমার গুরু' বইয়ে তুলে ধরেছেন। তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে আমাদের শিল্প, সাহিত্য এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকের নাম।  তাদের কারো কারো নামে আব্দুর রাজ্জাক করেছেন প্রশংসা, এবং কেউ কেউ বা পেয়েছে সমালোচনা।

ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জসীম উদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম ও মুনীর চৌধুরীর প্রশংসা করতে তিনি যেমন কার্পণ্য করেননি, তেমনি বঙ্কিমচন্দ্র, রাজা রামমোহন রায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে কিঞ্চিৎ সমালোচনা করেছেন। আসলে একে সমালোচনা বললে ভুল হবে, একে ঠিক সমালোচনা বলা যায় না। এটাকে রাজ্জাক স্যার এর ব্যক্তিগত মন্তব্য বলা যেতে পারে। যেমন তিনি বঙ্কিমের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বলেছেন, তার সাহিত্যকর্মের উপস্থাপন আধুনিক হলেও, বিষয়বস্তু মধ্যযুগীয় ধর্মকেন্দ্রিক। আবার রাজা রামমোহন রায়কে তিনি বড়সড় কোন সমাজ সংস্কারক হিসেবে মানতে নারাজ। তার মতে 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ' রচনা তার অন্যতম বড় কীর্তি। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যত বড় লেখক মনে করতেন, ঠিক তত বড় মানুষ মনে করতেন না। তার মতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও প্রবন্ধ অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ব্যাক্তি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ নয় । জয়নাল আবেদীনকে তিনি অনেক উচ্চ মানের শিল্পী মনে করতেন। গ্রান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ তার পৃষ্ঠপোষকতাতেই সেরা একজন দাবাড়ু হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। এবং এস এম সুলতানকেও তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছিলেন।

ধর্ম নিয়েও ছিল তার অসাধারণ চিন্তা। তার মতে ইহকাল ও পরকাল দুই দিকেই ইসলাম স্বীকৃত। প্রথাগতভাবে তিনি ইসলামকে পরলোক সর্বস্ব ধর্ম বলে মনে করতেন না। তার মতে মুসলমানদের জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র জগৎ সৃষ্টি প্রয়োজন। তিনি মনে করতেন, মুসলিম বাংলা সাহিত্যিকরা প্রথম পরলৌকিকতার বাইরে সাহিত্য রচনা করেছিলেন। অন্যদিকে অনেক বিখ্যাত হিন্দু সাহিত্যিকরাও এর বাইরে এসে সাহিত্য রচনা করতে সক্ষম হয়ে ওঠেন নি। তার মতে, পাশাপাশি বাস করার পরেও এইসব সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মে মুসলিমদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। মুসলিমদের বিকাশের জন্য তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বকে সমর্থন করতেন। তার সময়কার অনেক ব্যক্তিদের মধ্যে এই প্রবণতাটি ছিল।

বই পড়া নিয়ে ছিল তার এক অসাধারণ বক্তব্য। তিনি মনে করতেন কোন বই পড়ার পরে আপনি যদি সেই বইকে নিজের ভাষায় লিখতে না পারেন তবে আপনার সে বই পড়া হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তার নিজস্ব অভিমত ছিল। তার মতে মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব আরো বাড়ানো প্রয়োজন।  তিনি সমালোচনা করেছেন ডিগ্রী শিক্ষার। তার মতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করতে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়  নয়, দরকার শক্তিশালী হাই স্কুল বা “মিডিল স্কুল”। তিনি বাঙালিকে মনে করতেন অত্যন্ত মেধাবী জাতি। যদি শুধু একটু যত্ন নেয়া হয়, তবে তারা অনেক কিছুই করতে পারবেন, বলে তার ধারণা।

একটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন কি?

বইটির প্রত্যেকটি ঘটনার সাথে আমরা আমাদের বর্তমান জীবনকে রিলেট করতে পারছি। যেমন ধরেন চায়ের দোকানে,  কিংবা বিকেলের আড্ডায়, অথবা কোন ঘনিষ্ঠজনে বাড়িতে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে থাকি, চলে যুক্তিতর্ক, দেয়া হয় নিজস্ব মতামত।  

কিছু উদাহরণ দেই, বছরখানেক আগের কথা এক বড় ভাই ফেসবুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। কমেন্ট করলাম, প্রকাশ করলাম দ্বিমত। শুরু হলো তর্ক। চলল অনেকক্ষন, কমেন্টের পর কমেন্ট তারপর আরো কমেন্ট। শেষমেষ এত বড় বড় ঘটনা কমেন্টে করে করে সেন্ড করা যখন আর সম্ভব হচ্ছে না। তখন তাকে আমন্ত্রণ জানাই, চায়ের দাওয়াতে। সেখানে সাথে এসে যুক্ত হয় আরো দুজন। চলতে থাকে তুমুল তর্ক,  উঠে আসে একেকজনের এক এক ধরনের মন্তব্য, বক্তব্য। কেউ বলছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের প্ররোচনায় চাননী যেন, মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় ঢাকায়। পক্ষান্তরে অন্যজন বলছে তিনি একজন হিন্দু জমিদার থাকায় তিনি মুসলিমদের উন্নয়ন চাননি, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার মত ছিল না। এসব শুনে অন্যজন গর্জে উঠে এবং বলে, এ সকল তথ্যই মিথ্যা ও বানোয়াট যা মূলত দুই বাংলার মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করতে ছড়ানো হয়েছিল। এভাবে আমরা চারজন দিতে থাকে চার রকমের যুক্তি।

কেউ দেই কেউ তো যুক্তি ঠিক আছে কিনা এর জন্য আবার যাই গুগলে-উইকিপিডিয়ায় পড়াশুনা করতে, যুক্তির ভুল ধরতে! এই বই আমাদের অন্যভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে,

আবার ধর্ম নিয়েও কিন্তু আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে থাকি,  যেমন ধরুন এইতো কিছুদিন আগে যখন ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলা করল। কেউ কেউ ইজরাইলকে তথা ইহুদিদেরকে হাজার রকমের গালমন্দ করেছে, কামনা করছে তাদের ধ্বংস। কেউবা গেছে তাদের পক্ষে সাফাই, বলেছে ইজরাইলের স্বাধীনতার পর প্রথম হামলা তো মুসলিমরা, তথা মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ করেছিল। এখন ফিলিস্তিনিরা কেবল তার মাশুল দিচ্ছে মাত্র। আবার কেউবা চলে যাই ভারতের এনআরসি প্রসঙ্গে, ধর্ম নিয়ে দাঙ্গার ব্যাপারে হাজার রকমের কথাবার্তা বলি। ইংরেজদের বুনে যাওয়া ভাগ কর শাসন কর বা ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির বীজ হিসেবে সাম্প্রদায়িকতাকে দোষারোপ করি।

অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য কিন্তু করে থাকি। কেউ সমালোচনা করে সৃজনশীল পদ্ধতির। তো কেউ বলি সৃজনশীল পদ্ধতি থাকলে সমস্যা নেই, সমস্যা হচ্ছে সাতটা সৃজনশীল লেখা নিয়ে। কেউ বা শিক্ষামন্ত্রীকে দোষারোপ করে যাচ্ছেতাই অবস্থা করে ফেলি। আবার কেউ বলি আমাদের উচিত চীনের মতো কয়েক দশক দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা, তার পরিবর্তে চালু করা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, পরবর্তীতে মুখস্থবিদ্যার জোরে ডিসি-এসপিসহ বিভিন্ন পদে বসানো থেকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল করাই, অত্যাধিক প্রয়োজন।

এখানে অবশ্য আপনি বলতে পারেন, তিনি প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে মন্তব্য করেছেন, আর আমরা কেবল চোখ বন্ধ করে ঢিল ছুঁড়েছি।  এটা মানছি যে আপনি যদি এই মন্তব্য করেন তবে আপনি ভুল কিছু বলেননি, কিন্তু আপনি ভুল বুঝেছেন। উদাহরণটি দাঁড়ায় বোঝাতে চেয়েছি, একই ব্যক্তির একেক জনের একেকরকম দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের কিছু কথা

Khaby Lame (খাবি লেম) এর সিম্পল লাইফ হেকস বর্তমান সময়কার প্রায় সকলেরই দেখা। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি বিভিন্ন কাজকে একদম সিম্পলভাবে কোন কথাবার্তা ছাড়াই করে দেখায়। যদিও তার লাইফ হেক্স গুলো  শুধু বিনোদনের জন্যই! তিনি সেটা দিয়ে বোঝাতে চান আমরা সামান্য একটা কাজকে অনেক কঠিন মনে করি, এবং সোজা রাস্তা দিয়ে গিয়ে এর সমাধান না করে ঘুরিয়ে-পেচিয়ে এর সমাধান খুজি!

আবদুর রাজ্জাক স্যারও কিছু লাইফ হ্যাক্স শিখিয়ে গেছেন আহমদ ছফাকে, কিন্তু সেগুলো বিনোদনের জন্য নয়। যেমন ধরুণ, তিনি বলেছেন, নতুন কোন জায়গায় গেলে প্রথমে আমাদের সে জায়গা সম্পর্কে দুটি জিনিস জানা অনেক প্রয়োজন। তাহলে সে জায়গার মানুষ কি খায়  ও কোনধরণের বই পড়ে। কি খায় এটা জানতে তিনি যেতে বলেছেন সেই অঞ্চলের কাঁচাবাজারে। এবং কোন ধরনের বই পড়ে এটা জানতে তিনি যেতে বলেছেন স্থানীয় বইয়ের দোকানে। তার মতে এই দুটি জিনিস জানতে পারলেই সেখানের মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়।

বই পড়া নিয়ে তিনি কি বলেছেন,  তা তো আগেই আলোচনা করা হয়েছে। সে বিষয়ে এবার একটু গভীরে যাওয়া যাক। তার মতে বই পড়াটা অন্য রকম কাজ। একটি বই পড়ার পরে বইটিকে আপনি যদি নিজের ভাষায় লিখতেন না পারেন তাহলে ধরে নিতে হবে আপনার বই পড়া হয়নাই। আপনার শব্দভাণ্ডার কম হতে পারে, লেখক এর মত কঠিন ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা না থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে বইয়ের মূলভাব আপনি যদি রি-প্রডিউস না করতে পারেন।  তাহলে আপনার বই পড়া হয়েছে এটা ভাবার কোন মানে হয় না।

তার কথার মর্মার্থঃ

ভাবতে পারছেন কত গভীরতা এই কথাগুলোর! মূলত তারা কি খায় এটা জানতে পারলে আমরা তাদের খাবার হিসাবে জানতে পারবো। এবং তারা কি ধরনের বই পড়ে, এটা জানতে পারলে আমরা তাদের পড়াশোনা সংক্রান্ত সম্পর্কে জানতে পারবো। মোদ্দাকথা আমরা তাদের সম্পর্কে জানতে পারব।

বইকে তিনি মুখস্ত করতে বলেননি, বলেছেন বইকে অন্তরে ধারণ করতে। এমন ভাবে ধারন করতে বলেছেন যাতে করে আপনার সংক্ষিপ্ত শব্দ ভান্ডার এবং অদক্ষ লেখনীতেও আপনি বইটিকে নিজের মতো করে লিখে ফেলতে পারেন।

বইটি সম্পর্কে কিছু কথা

এই বইটি একটি জীবনী বই হতে পারত, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহকে গোছালোভাবে উপস্থাপনা করে বোঝা মুশকিল কোন ঘটনাটি আগে এবং পরে। শুধুমাত্র এই একটি কমতির জন্য বইটিকে জীবনী বই হিসেবে গণ্য করা যায় বলে আমার মনে হয় না।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন বইটি কেন গুরুত্বপূর্ণ!  সত্যি বলতে আমার দৃষ্টিতে বইটি গুরুত্বপূর্ণ অনেক দিক থেকে, তবে এই বইটির যে বিষয়টি আমার কাছে সব থেকে বেশি ভালো লেগেছে তা হচ্ছে, এই বইটি সফলভাবে সেসময়কার চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে সেসময়কার এসব ঘটনা প্রবাহের সাথে আমরা আমাদের বর্তমানের বিভিন্ন ঘটনাচক্রের তুলনা করতে পারি।

যেমন ধরুণ, আমাদের কারো কোনো বক্তব্য পছন্দ না হলে আমরা কি করি? সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে রোস্ট করে লিখি। অথবা একটি ভিডিও বানিয়ে ইউটিউব-ফেসবুকে ছড়িয়ে দিই।  কিন্তু সেই সময় তো আর ফেসবুক টুইটার ইউটিউব এর মত এত সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। ভাবতেই অবাক লাগে সে যুগেও মানুষ রোস্ট করতো, রোস্টিং কনটেন্ট বানাত। এগুলোকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট না করে কলাম আকারে লিখতো পত্রিকায়। ভাবা যায়! এছাড়াও আড্ডার মাঝে যুক্তিতর্কের কথা তো বললামই!

গ্রন্থ সমীক্ষা

পরিশেষে একটি কথা বলা যায়, প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে স্বীকৃতি যদ্যপি আমার গুরু। সম্ভবত এই বইটি বাংলা জীবনীসাহিত্যের তুলনাহীন একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটিতে লেখকের জীবনের বিভিন্ন মতামত ও আনুষাঙ্গিক গল্প উঠে এসেছে, এবং তার কাজের উপর যে তার গুরুর একটা বড়সড় প্রভাব ছিল এটাও বোঝা যায়। প্রফেসর রাজ্জাক কেন লিখতেন না এবং কেন সুবিধাবাদীদের চেনার পরেও তাদের প্রশ্রয় দিতেন, এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। হয়তো লেখক এটা জানতেন না, কিংবা জেনেও না জানার ভান করেছেন বা আমাদের জানতে দিতে চাননি।

প্রশ্ন জাগতে পারে বইটি লিখে কি লেখক সফল? এককথায় উত্তর দিয়ে দিচ্ছি, হ্যাঁ, উনি সফল। এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করাতে পেরেছেন, তাই তিনি সফল।


--------o--------


    বইয়ের নামঃ যদ্যপি আমার গুরু
    লেখকের নামঃ আহমদ ছফা
    আলোচকের নামঃ রাজ্য জ্যোতি
    বইয়ের ধরনঃ স্মৃতিচারণমূলক
    প্রচ্ছদশিল্পীর নামঃ কাইয়ুম চৌধুরী
    প্রকাশনীর নামঃ মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, বাংলাদেশ
    প্রকাশকালঃ ১৯৯৮
    পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১১০
    মূল্যঃ ১৭৫
    ISBN: 984 410 022 4

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ