তেজোদ্দীপ্ত লেখনীতে কবি অনিন্দ্য আউয়ালের 'সোনালি ছনের বাড়ি' : নুসরাত জাহান

তেজোদ্দীপ্ত লেখনীতে কবি অনিন্দ্য আউয়ালের 'সোনালি ছনের বাড়ি' : নুসরাত জাহান


কবিতা, কাব্য বা পদ্য হচ্ছে শব্দ প্রয়োগের ছান্দসিক কিংবা অনিবার্য ভাবার্থের বাক্য বিন্যাস--- যা একজন কবির আবেগ-অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তা করার সংক্ষিপ্ত রুপ এবং তা অত্যাবশ্যকীয়ভাবে উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের সাহায্যে আন্দোলিত সৃষ্টির উদাহরণ। কাব্যরূপে এমনি কিছু উদাহরণের সংকলন ঘটেছে প্রগতি ধারার লেখক, তরুণ কবি অনিন্দ্য আউয়াল -এর "সোনালি ছনের বাড়ি" নামক কাব্যগ্রন্থটিতে। বইটি হাতে নিলেই চমকপ্রদ নামের সাথে বর্ণী এবিদ -এর করা প্রচ্ছদের অপার মিল যেকোনো পাঠকেরই হৃদয় কাড়ে।

৮০ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট কাব্যগ্রন্থটিতে স্থান পাওয়া সর্বমোট ৬৩টি কবিতার অধিকাংশতেই রয়েছে এক ভিন্নরকম বিদ্রোহী সুর। বইটির প্রথম কবিতা 'পথ ও পথিক' কবিতায় কবি লিখেছেন, 


"পথে নামলেই পথিক হওয়া যায় না
পথে নামলেই হয় না মিছিলের লোক।
পথে নেমে কতজন বে-পথে বাড়ায় পা
পায়ের ভুলে কতো পথ বিপদ বাড়ায়
পথের ভুলে কতো পা গন্তব্য হারায়
বহুবার হাঁটি-চলি তবুও পথের ভুল মনে হয়
একই পথের আসা-যাওয়া এক নয়।"


আবার পরবর্তী 'প্রতিমা' কবিতায় অনুযোগের সুরেই কবি লিখেছেন,

"নিজেকে ভেঙেছি কী বিপুল উৎসবে
তোমাকে গড়ার জন্য!
তুমি তার কতটুকু জানো?"


বইটির অধিকাংশ কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে এক তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠধ্বনি। পতিতাবাড়ি, ডোমঘর, মাতাল, ঈশ্বরের লোক -এ সবগুলো কবিতা চোখে আঙুল তুলে দেখিয়েছে আমাদের সমাজব্যবস্থার বাস্তব চালচিত্র। 'ঈশ্বরের লোক' কবিতায় কবি লিখেছেন,

"আমরা মরা টানি, লাশ কাটি, শুয়োর চড়াই
আমরা ডোম, আমরা মেথর, আমরা চাঁড়াল।
তোমাদের ডোম ইনো রিয়েল এস্টেট আমাদের নয়
আমরা রেলের বস্তিতে তিনপুরুষ জীবন বদল করি,
বর্ষায় জলে ডুবি, শীতে আগুনে পুড়ি।
আমরা হরিজন, আমরা ঈশ্বরের লোক
ঈশ্বরের কোনো বাড়ি-গাড়ি থাকতে নেই"


'মেরিন ড্রাইভ রোড' কবিতা চোখের সামনে এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। ভেসে ওঠে চাঁদা অনাদায়ে মেরিন ড্রাইভে চিরতরে পড়ে থাকা এক প্রবাসী রক্তজবার আর্তনাদ। মনে আক্ষেপ নিয়েই কবি লিখেছেন,

"লোকটা দেশ ছেড়ে পালানোর টিকেট কেটেছিল
অথচ লোকটার একটা যুদ্ধজয়ী রাষ্ট্র ছিল।"


'ফেরিওয়ালা' কবিতায় দিন এনে দিন খাওয়া লোকের জীবন কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন,

"সবার মাথার ওপর আকাশ থাকে না
সবার পায়ের নিচে মাটি থাকে না
তবু আকাশ মাথায় নিয়ে বহুপথ হাঁটি
ফেরিওয়ালা, বাতাস ভরা আকাশ বেচি।"


"শোক নয়, জলচোখ মুছে ফেলে জ্বলন্ত প্রতিবাদে
জননী, প্রিয়তমা আমাদের কন্যার ধর্ষক
সকল পশুর বিচারের দাবি নিয়ে এসেছি।"


 -এভাবেই 'বিচারের দাবি নিয়ে এসেছি' কবিতায় ধর্ষণ নামক বিভৎস অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি। আবার 'তাজ-ঈ-নুর' কবিতায় বিদগ্ধ হৃদয়ে প্রেমের আকুতি জানিয়েছেন বারংবার। কবি লিখেছেন,

"চৌদ্দটি রক্তগোলাপ পায়ের পাশে জমা
প্রিয়তম, তুমি প্রেম নাকি প্রতারণা!
আমি সেই নতমুখী, সেই অঝোর আকাশ
আমি সেই কাঠচেরা রোদ, বিলীন দুপুর
একবার হুড়কো বানের মতো ডাক দাও
কতোদিন ডাকনামে ডাক শুনি না, প্রিয়তম।"


'নাগ-ঈশ্বরী' -কবিতায় নদীবিধৌত নিজ উপজেলাকেই হয়তো জলের সন্তান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন কবি।

নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীতীরের মানুষের অন্যতম দুঃখ নদীভাঙন। কবির জন্মভূমি ১৬টি নদ-নদী বিশিষ্ট উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে এ দুঃখ যেন আর তীব্র। স্বাভাবিক ভাবেই এ দুঃখ খুব গভীর রেখাপাত করে কবির হৃদয়ে। এই অনুভূতি থেকেই কবি লিখেছেন,

"মাঝরাতে নদী এসে আমার উঠোনে দাঁড়ায়
সাতার জানিনা বলে ডুবে মরি জলের ভাঁড়ায়।"
(কবিতা: নদী ভাঙন দেখতে আসে)


'বাবা' কবিতায় গদ্যছন্দে চমৎকার চিত্রায়ণ ঘটেছে আরোক সমাজ বাস্তবতার। কবি লিখেছেন,

"বাবা এখন অসুস্থ, বিছানায় কাতরায়। আমি ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কত্তো কী যে স্বপ্ন দেখি! ছেলে আমার বড়ো হবে, বড়ো হবে, মস্ত বড়ো।
বাবার স্বপ্নগুলো রাতের অন্ধকারে পুড়ে যায়, দিশা হারায় অকূলে, আমার স্বপ্নগুলো জল ভেঙে এগুতে থাকে, জলের ওপারের কূলে।"


স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। সাতই মার্চের অগ্নিভাষণ কিংবা স্বাধীনতা,একাত্তর, ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত  অস্বীকারকারীকে হুশিয়ার করে এবং সমুন্নত রাষ্ট্রের জন্য যারা সংগ্রাম করেছে, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করেছে তাদের লড়াইয়ের সার্থকতা রক্ষা করবার অভিপ্রায়য়ে কবি লিখেছেন,

"আবার যদি আসে শ্বাপদের দল,
তছনছ করে সোনালি ছনের বাড়ি
লুটে নেয় পানের বরজ, গাভীন গাভী,
পুকুরে মাছ, মাঠের ফলিত ধান,
তিন লক্ষ বীরাঙ্গনা, ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের কসম,
অস্ত্র উঁচিয়ে বেয়নেট খুঁচিয়ে নেবো তার প্রাণ।"


বইটির নাম কবিতা 'সোনালি ছনের বাড়ি' কবিতায় বহুদিন আমার বাড়ি যাওয়া হয় না বলে কবি স্মৃতিচারণ করেছেন তার দুরন্ত শৈশব-কৈশোর আর আটপৌরে জীবনের।  

ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে, অমরাবতী প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত বইটির মুদ্রিত মূল্য ৩০০টাকা মাত্র। কবির প্রথম এ বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন বাবা আজিজুল হক এবং মা আলেয়া বেগমকে। কবিতায় কবি যে কথা বলেছেন,

"আবার যদি আসে শ্বাপদের দল... আমি ঘুমাবো না।"


হ্যাঁ, ঘুমানো যাবে না। জেগে থাকতে হবে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে হবে। তেজোদ্দীপ্ত লেখনী দ্বারা সমাজের প্রতিটি অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কবিতায় এমনি করে প্রতিবাদের ঝড় অব্যাহত রাখতে হবে। এখানেই না কবির স্বার্থকতা।

মতামত:_

2 মন্তব্যসমূহ

  1. মনোমুগ্ধকর লেখনি নুসরাত আপার ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ঠিকঐ কইছেন। নুসরাত আপার লিখনির মতো তার কতাবার্তাও মনোমুগ্ধকর। তিনি একজন আদর্শ লিখক।

      মুছুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।