আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘উৎসব’ গল্পটি লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ১৯৭৬ সালে। আর প্রকাশিত হয়েছে ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ সংকলনে—সম্ভবত ১৯৭৬-৭৮-এর মধ্যে কোথাও। এই সময় ইলিয়াস ঢাকা কলেজে শিক্ষক হিসেবে দিন কাটাচ্ছিলেন, লেখক শিবির নামে একটা প্রগতিশীল প্ল্যাটফর্ম গড়ছিলেন যেখান তরুণ লেখকরা সমাজের কথা খোলাখুলি বলত। যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র পাঁচ বছর আগে, দেশটা এখনো স্বপ্ন আর হতাশার মাঝামাঝি টলে টলে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক শাসনের ছায়া, খাদ্য সংকট, মূল্যের আকাশছোঁয়া—এসবের মধ্যে ঢাকার রাস্তায়-গলিতে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা, একটা অস্থিরতা ঘুরে বেড়াত। ইলিয়াস সেই সবকিছু তার গল্পে ঢেলে দিয়েছেন, যেন নিজের চোখে দেখা সেই অলিগলির ধুলোবালি, গন্ধ আর শব্দগুলো কাগজে উঠে আসছে।
গল্পের মঞ্চটা ঢাকারই—ধানমণ্ডির ঝলমলে বাড়িঘর থেকে পুরান ঢাকার সরু গলির নোংরা জগতে। এই দুই জগতের মাঝখানে আটকে আছে আনোয়ার আলি, একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। বন্ধুর বিয়েবাড়ি থেকে ফিরে সে তার নিজের জীবনে হঠাৎ বিরক্ত, ক্লান্ত হয়ে যায়। বিয়েবাড়ির সেই চকচকে আলো, রূপসী মেয়েরা, সংস্কৃতি-রাজনীতির গল্প—সবকিছু তার কাছে স্বপ্নের মতো, কিন্তু বাস্তবে ফিরতেই গলির নালার হলদে জল, কুকুরের মল, জুয়াড়িদের হট্টগোল সবকিছু গলায় এসে লেগে যায়। স্ত্রী সালেহা বেগমের সেই গ্রাম্য ভাবভঙ্গি—পেচ্ছাব-থুতু, জবুথবু কথাবার্তা—তার কাছে আরও অসহ্য। এই অস্থিরতা শুধু আনোয়ারের নয়, সেই সময়ের মধ্যবিত্ত যুবকদের মনের ছবি। যুদ্ধের আদর্শ নিয়ে দেশ জিতেছে, কিন্তু বাস্তবে তো আর সেই সমতা এল না—ধনী-গরিবের ফাঁকটা আরও গভীর হয়েছে, স্বপ্নগুলো গলির নোংরায় ধুয়ে গেছে। ইলিয়াস নিজেও ঢাকার এই অলিগলি চিনতেন ভালো করে, পা চষে বেড়িয়েছেন সেখানে, লেখক শিবিরে এসে সেই অস্থিরতার কথা লিখতেন। গল্পটা যেন তার নিজের চোখ দিয়ে দেখা সেই শহর।
আনোয়ারের মনের ভেতরটা এই গল্পের আসল মজা, তার অস্থিরতা ও অভ্যাস্ত স্বপ্নের দ্বন্দ্ব যা পুরো কাহিনীকে জীবন্ত করে তোলে। বিয়েবাড়ির সেই চিরকালীন স্মৃতিতে তার মন ঘুরপাক খায়—সেখানকার হাফিজের মতো লোকেরা আত্মকথা বলে, তাদের অতীতের গল্পে যেন স্বর্ণযুগের ছায়া পড়ে; ইকবালের মতো যুবকরা কূটনৈতিক সাফল্যের গল্প শোনায়, যা শুনতে শুনতে আনোয়ারের চোখে স্বপ্নের ঝিলিক জ্বলে ওঠে। এরা সবাই যুদ্ধের আগের বামপন্থী যুবক ছিল, আদর্শে রাঙা, রাস্তায় রাস্তায় লড়াই করত; এখন তারা প্রতিষ্ঠিত, সমাজের মধ্যম স্তরে বসে আছে, কিন্তু আনোয়ারের কাছে এসব গল্প দূরের, অধরা স্বপ্নের মতো—যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে যাবে, কিন্তু কখনোই ছোঁয়া যায় না। ইলিয়াস এই গল্পে আনোয়ার চরিত্রটিকে উচ্চ স্বপ্নে বিভোর, বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিবর্জিত এক আদর্শ হিসেবে চিত্রিত করেছেন—যা শুধু আনোয়ারের জন্যই প্রযোজ্য, অন্য কারো জন্য নয়। কারণ, আনোয়ার ছিলেন সেই যুগের মধ্যবিত্ত সমাজের একজন সাধারণ প্রতিনিধি; তার চিন্তা ও স্বপ্ন যতই বিশাল, উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভরা হোক না কেন, কার্যপরিধি সীমিত এবং ঝুঁকি গ্রহণ করার সাহস তার পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি—সমাজের চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, অর্থনৈতিক সংকোচ সব মিলিয়ে তাকে বেঁধে রেখেছে। সে চায় সেই কর্নারে যোগ দিতে, যেখানে তার স্বপ্নের সঙ্গীরা জড়ো হয়, কিন্তু চেনা কাউকে না পেয়ে থমকে যায়, পায়ে শিকলের মতো বোঝা অনুভব করে। এই অসহায়ত্বটা ঠিক সেই সময়ের যুবকদের মতো—যারা যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে, রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছে, কিন্তু এখন চাকরি নেই, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নেই; শুধু গলির কোলাহল আর ঘরের ক্ষোভ তাদের সঙ্গী, যা প্রতিদিনের যন্ত্রণাকে আরও গাঢ় করে। রাত গভীর হলে ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় কুকুর দুটোর নির্লজ্জ যৌনসংগম দেখে জনতা উল্লাস করে ওঠে—জুয়াড়িরা গানের প্যারোডি গেয়ে হাসাহাসি করে, হালিমওয়ালা তার খদ্দরের থলে ঝুলিয়ে বিক্রি করে, প্রতিবেশীরা গজগজ করে কিন্তু থামে না। এই কাঁচা, নির্লজ্জ 'উৎসব' যেন যুদ্ধোত্তর শহরের প্রান্তিক যুবকদের আনন্দের খোঁজ—যা পেয়েই তারা যেন সাময়িক ভুলে যায় নিজেদের শূন্যতা। আনোয়ারও হাসে এসব দেখে, কিন্তু তার হাসিতে একটা তিক্ততা মিশে থাকে, যেন স্বপ্নের সাথে বাস্তবের সংঘাত তার বুক চিরে দিচ্ছে। ঘরে ফিরে সালেহার কাছে শরীর টানে, তার উষ্ণতায় শান্তি খোঁজে, কিন্তু মনের দূরত্বটা যায় আসে না—সেই অদৃশ্য দেওয়াল যা তার স্বপ্নকে বাস্তব থেকে আলাদা করে রাখে। এই দ্বন্দ্ব, এই অসম্পূর্ণতাই গল্পের সবচেয়ে গভীর হৃদয়।
এই গল্পে ধানমণ্ডির চকচকে লন আর গলির নোংরা নালার মধ্যে যে পার্থক্য, সেটা শুধু স্থানের নয়—সমাজের শ্রেণির ছবি। ধানমণ্ডি সেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখান রবীন্দ্রসংগীত বাজে, গাড়ি আসে-যায়। গলিটা বাস্তব—নালার হলদে জল, কুকুরের মল, কর্কশ রেস্তোরাঁর গান। আলোর খেলা এখানে অসাধারণ—ঝলমলে আলোর নিচে সৌন্দর্য, ফ্যাকাশে ল্যাম্পের নিচে কুৎসিত উৎসব। ইলিয়াস এই দ্বৈততাকে তার ঢাকাইয়া ভাষায় এঁকেছেন—কথ্য, জীবন্ত, গন্ধময়। কুকুরজোড়া শুধু হাসির উপাদান নয়, প্রতীক—নিম্নশ্রেণির নির্লজ্জ জীবনযাপন, যা মধ্যবিত্তের চোখে ঘৃণ্য কিন্তু অপরিহার্য। গ্লাভস খোলা যৌনতার মুহূর্তে আনোয়ার বাস্তবের কাছে হার মানে, কিন্তু স্বপ্নের দূরত্ব রয়ে যায়। এই রূপকারিতা ইলিয়াসের দারুণ—সমাজের কঠিন সত্যকে কাব্যিক করে তোলে।
শিল্পের দিক থেকে গল্পটা অসাধারণ। ইলিয়াসের ভাষা মিশ্র—ঢাকাইয়া কথ্য, দীর্ঘ বাক্যের প্রবাহে আনোয়ারের মনের ঘুরপাক। হিন্দি গানের প্যারোডি, পশ্চিমী সঙ্গীতের ছোঁয়া শহরের বৈচিত্র্য দেখায়। মনোপ্রবাহ-ন্যারেটিভ স্মৃতি আর বাস্তব মিশিয়ে একটা জয়সের মতো অনুভূতি দেয়। ক্লাইম্যাক্সে কুকুর-উৎসবের কর্কশতা নীরবতায় শেষ হয়—এই চাপটা যুদ্ধোত্তর শহরের অস্থিরতাকে ধরে। ইলিয়াসের এই শৈলী সমকালীন লেখকদের থেকে আলাদা—যেমন শহীদুল জহিরের গাঢ় নৈরাশ্য বা হুমায়ূন আহমেদের হালকা হাসির মধ্যে তার সমাজচেতনা আরও খাঁটি, আরও কাঁচা। সেলিনা হোসেনের নারীদৃষ্টির বিপরীতে এখানে পুরুষ মধ্যবিত্তের অসহায়তা ফুটে ওঠে।
‘উৎসব’ শুধু গল্প নয়, সেই সময়ের ঢাকার জীবন্ত ছবি। যুদ্ধ জিতেছে, কিন্তু স্বপ্ন হারিয়েছে। ধানমণ্ডির আলো গলির নোংরায় মিশে গেছে, আর মানুষেরা অস্থির হয়ে উৎসব খুঁজছে—কখনো ঝলমলে লনে, কখনো কুকুরের ল্যাজনাড়ায়। ইলিয়াস এই সত্যকে এমনভাবে বলেছেন যে পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরাই সেই গলিতে হাঁটছি, সেই উল্লাস শুনছি। এটা তার লেখার জাদু।
আরো পড়ুন...
প্রচ্ছদ: ChatGPT

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম