হুমায়ুন কবির (১৯০৬ - ১৯৬৯) একজন শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক এবং মননশীল লেখক। তাঁর 'নদী ও নারী' (১৯৪৫) পদ্মানদীর তীরবর্তী মানুষের জীবন বাস্তবতা অবলম্বনে রচিত উপন্যাস। নদী প্রবাহ, জীবন প্রবাহ ও সময় প্রবাহকে একীভূত করে জীবনের সমগ্রতা নির্মাণের প্রচেষ্টা এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু।
নদীর গতিশীল প্রবাহপথে ভাঙনের ন্যায় নদী তীরবর্তী মানুষেরা হয় বিপন্ন। আবার তারা সে নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে ঘরবাড়ি তৈরি করে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে। নদীর এ দ্বিমাত্রিক আচরণের অধীন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও সফলতা- -ব্যর্থতার চিত্র বর্ণিত আছে উপন্যাসে। উপন্যাসের বিশাল ভৌগলিক ক্যানভাসের মানুষেরা প্রমত্তা পদ্মার কাছে যেমন পরাভূত, তেমনি তারা পদ্মার উপর নির্ভরশীল ও নদী এখানে কেবল বিনাশী শক্তি নয়, প্রাণদায়িনীও বটে। প্রমত্তা পদ্মার বৈরিতার বিরুদ্ধে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সংগ্রামী নজুমিয়া, আসগর ও মালেক। এ তিনটি প্রধান চরিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস । এছাড়া নুরু নামের নারী চরিত্রটি উপন্যাসে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এ সকল চরিতের সমন্বয়ে উপনাসে একটি সার্থক জীবন প্রবাহ অঙ্কিত হয়েছে।
উপন্যাসটি তিনটি খন্ডে বিভক্ত। নজুমিয়া, আসগর, নূরু ও সালেক নামে তিনখন্ডের উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত চরিত্রদের জীবন প্রবাহ, প্রণয় এবং টিকে থাকার সংগ্রামই উপন্যাসের পটভূমি। নজুমিয়ার আশানিরাশা তথা জীবন সংগ্রামে মূর্ত হয়ে উঠেছে পদ্মা তীরবর্তী মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার প্রকৃত প্রয়াস। নদীর সাথেই যখন নজুমিয়ার সংগ্রাম তখন তো আর নদীকে ভয় পেলে চলবেনা। উপন্যাসের ভাষায়-
নজুমিয়া ধমক দিয়ে উঠল, মেয়ে মানুষের মতো কথা বলো কেন? বৈশাখ মাসে পদ্মা রাক্ষসী, আষাঢ় মাসে পদ্মা দুরন্ত, ভাদ্রের পদ্মা বিশ্বাসঘাতক, এসব কেচ্ছা শুনলে কাজ চলে না। যাদের মুরোদ আছে তারা কি কোনদিন পদ্মার ভয়ে ঘরে বসে থাকে?
পদ্মা নদী তীরবর্তী রহিমপুর গ্রামকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের আখ্যান ফুটে উঠেছে। নদীর স্রোত যেমন বিচিত্র, মানুষের বিশেষ করে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক ও তেমনি বৈচিত্র্যময়। নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন আর নদীর মধ্যে প্রকৃতিগত যে অসাধারণ ঐক্য তাই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু।
পূর্ববঙ্গের নদীমাতৃক অঞ্চলের ভাঙাগড়ার জীবন অনেক বেশি। দ্বান্দ্বিক ও কর্মচঞ্চল সেই কাহিনি ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। উপন্যাসের সংলাপ-
বৈশাখী ঝড় যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ থেমে গেল। হয়তো ঘণ্টাখানেক তুফান ছিল, হয়তো তার চেয়েও কম। বাতাস শান্ত হয়ে এল, বিরাট পদ্মার বুকে লম্বা ঢেউয়ের রেখা দিগন্ত থেকে দিগন্তে দুলতে লাগল।
'নদী ও নারী' উপন্যাসটি তিনটি খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো নজুমিয়া। তিনি পদ্মাতীরবর্তী রহিমপুর গ্রামের মাতব্বর এবং জোতদার-কৃষক। এই খন্ডে নজুমিয়ার একমাত্র মাতৃহারা পুত্র এবং বৃদ্ধা মা আয়েষার জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে।
দ্বিতীয় খণ্ডের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো আসগর। তার সাথে নজুমিয়ার শত্রুতার সম্পর্ক যেন একে অন্যের জানি দুষমন । তবে পদ্মার তীরে বসতি পত্তনের সময় দুজনই ছিল প্রাণের বন্ধু।
তৃতীয় খণ্ডের প্রধান চরিত্র হলো নুরু ও মালেক। নুরু উপন্যাসের অন্যতম প্রধান নারীচরিত্র। মালেক উপন্যাসের প্রধান চরিত্র এবং নায়ক।
বিপন্ন মালেকের জীবনেও আসে নতুন দিন, সাফল্যের দিন। বিয়ানচরে এসে তারা জীবনকে নতুন করে সাজায় যেখানে নূরুর সাথে তার বাল্য-কৈশোরের ভালোলাগা যৌবনে এসে তা প্রেমে রূপ নেয়। উপন্যাসের সংলাপ-
নুরুর প্রতি তার প্রেম কিন্তু সমস্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে একমাত্র নিশ্চয় সত্য। রাত্রির অন্ধকারের তারাগুলি সব স্থান বদলায় কিন্তু ধ্রুবতারা চিরকাল নিজের স্থানে অমলিন। নূরু যেন মালেকের জীবনে সেই ধ্রুবতারা।
জলদস্যুদের দ্বারা অপহৃত মালেক ফিরে আসার পর তাদের প্রেমের পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল। সে উত্তেজিত হয়ে সরাসরি নুরুর সাথে বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়েছিল। আসগর মিয়া তখন তাদের দুজনকে মুখোমুখি উপস্থিত করে এবং জানায় নির্মম সত্য। মালেক তখন দূর দেশে যেতে চায়। সে একদিকে ভেঙে পড়ে কিন্তু মনোবল অটুট রাখে। নদী যেমন ভাঙাগড়ার মাধ্যমে প্রবাহ ধারার পরিবর্তন করে তেমনই মালেক ও নতুনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে অজানা পথে পা বাড়ায় এবং তারার আলোয় পথ খুঁজে নব প্রভাতের সন্ধানে এগিয়ে চলে
মালেকের ছেলেবেলা, কৈশোর জীবনে নূরুর সাথে স্নেহপ্রীতির সম্পর্ক এবং যুবক বয়সে তাদের মধ্যে প্রণয়ের যে সম্পর্ক গড়ে উঠে তা উপন্যাসে অনিন্দ্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের সর্দার, মাতব্বর ও পঞ্চায়েতের গোষ্ঠীচেতনা বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসে বলা হয়েছে-
নজুমিয়াকে দেখে হাকিম সাহেব প্রায় ছুটতে ছুটতে বাইরে এসে বলল, সেলাম পঞ্চায়েত সাহেব, সেলাম- এই আপনার কথাই হচ্ছিল একটু আগে, আসেন এক ছিলুম তামাক খেয়ে যান।
উপন্যাসের সংগ্রামী এবং আশাবাদী চরিত্রগুলো মাথা নত করেনা পদ্মার প্রমত্তার কাছে। পদ্মার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়েও আবার তারা আশায় বুক বাঁধে, পাড়ি দেয় সুদূর পদ্মায় জেগে উঠা অন্য কোন চরে। প্রকৃতিকে জয় করতে গিয়ে নদী ও মানুষ যেন হয়েছে একাত্ম।
উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে একদিকে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব অন্যদিকে রয়েছে নরনারীর প্রণয়। আর এসবের মাধ্যমে সম্পর্কের জটিলতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে মানবজীবনের এবং ব্যক্তিমানুষের দ্বান্দ্বিক বিচিত্র সম্পর্কই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।
নদী যেমন ভাঙাগড়ার মাধ্যমে গতিপথ পরিবর্তন করে তেমনি মানুষের জীবন ও বিভিন্ন সংকটের চক্রে আবর্তিত হয়। এসব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার বিষয়টি এ উপন্যাসে মূত হয়ে উঠেছে। মানুষের পার্থিব জীবনের বিচিত্র লীলা, আদি প্রবৃত্তির তাড়না এবং নিয়তির অর্থাৎ, নদীতীরের ভাঙাগড়ার সাথে মানুষের জীবন প্রবাহের গতির পরিবর্তনই উপন্যাসের মূল তাৎপর্য।
উপন্যাসটি তৎকালীন নদীতীরবর্তী সমাজের প্রতিচ্ছবি নারীর রূপ ও ভালোবাসাই যেন নদী নিয়ন্ত্রিত পুরুষ জীবনকে ভাঙছে-গড়ছে। তাদের জীবনে নারী যেমন নদীর মতো শুশ্রূষাকারিণী তেমনি তীরভাঙা বন্যা তরঙ্গও বটে।
উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের কেন্দ্রীয় চরিত্র নজুমিয়া। পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে নজুমিয়া তার অতীত দরিদ্র জীবনের কথা মনে করে। বিত্তহীন দারিদ্র্যপীড়িত নজুমিয়া ভাগ্যান্বেষণে এসেছিল পদ্মার তীরে। সে জেনেছিলো, পদ্মার তীরে জমি পাওয়া যায়। সেখানে সে একজন সর্দারের নিকট আশ্রয় পায়। নজুমিয়া নিজের জীবনের জন্য উন্নতির প্রয়াসে সর্দারের নির্দেশ মেনে চলত কারণ জীবনের প্রতি ছিল তার অপরিসীম মমতা।
একমাত্র পুত্র এবং বৃদ্ধা মাকে নিয়ে নজুমিয়ার সংসার। নজুমিয়া তার কর্মকান্ডে মেনে চলে মায়ের পরামর্শ। তবে সংসার পরিচালনায় কর্মঠ ও দায়িত্বশীল হয়েও সমাজ বা জীবন সচেতন হতে পারেনি আয়েষা।
জমিদারের পাওনা মেটানোর জন্য খাজনা আদায়ের প্রয়োজন হয়। আর এ জন্যই নজু মিয়া পদ্মার ভয়ঙ্কর রূপ উপেক্ষা করে, মায়ের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারায়। গভীরভাবে শোকাহত হয় নজুমিয়ার মা আয়েষা। এই মৃত্যু মালেকের জীবনে সৃষ্টি করে এক সংকট। ফলে নজুমিয়ার সম্পত্তি রক্ষা এবং মালেকের দায়িত্ব অর্পণের জন্য পঞ্চায়েত আজগর মিয়ার আশ্রয় প্রার্থী হতে হয়।
আসগরের সংসারে সালেক যেন ফিরে পায় হারানো বাবা-মার আদর। পরবর্তীতে মালেকের দায়িত্ব, ভালো-মন্দের ভার যেন আসগরের স্ত্রী আমিনা অধিকার করে নেয়। তাদের সুখের জীবনে হঠাৎ নেমে আসে দুর্ভোগ। দুর্ভিক্ষ-কবলিত মৃতপ্রায় মানুষেরা পড়ে বন্যার কবলে। তখন সবার মতো আসগর মিয়াও হারায় সহায় সম্বল।
দুঃসহ যন্ত্রণাময় জীবনে আসগর মিয়াকে সান্ত্বনা দেয় মালেক। সে স্বপ্ন দেখে অন্য কোন নতুন দেশে ঘর বাঁধার। কারণ জীবন তো আর থেমে থাকেনা। সময়ের সাথে সাথে সূচিত হয় পরিবর্তন, প্রকৃতিতে ও মানুষের জীবনে। সেদিনের বিপন্ন মালেকের জীবনেও আসে নতুন দিন, সাফল্যের দিন। বিয়ানচরে এসে তারা জীবনকে নতুন করে সাজায় যেখানে নুরুর সাথে তার বাল্য-কৈশোরের ভালো লাগা যৌবনে এসে তা প্রেমে রূপ নেয়। উপন্যাসের সংলাপ-
নুরুর প্রতি তার প্রেম কিন্তু সমস্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে একমাত্র নিশ্চয় সত্য। রাত্রির অন্ধকারের তারাগুলি সব স্থান বদলায় কিন্তু ধ্রুবতারা চিরকাল নিজের স্থানে অমলিন। নুরু যেন মালেকের জীবনে সেই ধ্রুবতারা।
জলদস্যুদের দ্বারা অপহৃত মালেক ফিরে আসার পর তাদের প্রেমের পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল। সে উত্তেজিত হয়ে সরাসরি নূরুর সাথে বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়েছিল। আসগর মিয়া তখন তাদের দুজনকে মুখোমুখি উপস্থিত করে এবং জানায় নির্মম সত্য। মালেক তখন দূর দেশে যেতে চায়। সে একদিকে ভেঙে পড়ে কিন্তু মনোবল অটুট রাখে। নদী যেমন ভাঙাগড়ার মাধ্যমে প্রবাহধারার পরিবর্তন করে তেমনই মালেক ও নতুনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে অজানা পথে পা বাড়ায় এবং তারার আলোয় পথ খুঁজে নব প্রভাতের সন্ধানে এগিয়ে চলে।
'নদী ও নারী' উপন্যাসটিতে নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন প্রবাহ, তাদের আশা-নিরাশা এবং প্রকৃতির সাথে তাদের টিকে থাকার স্পৃহার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। উপন্যাসের কাহিনি নদীর গতিশীল প্রবাহের সাথে মানুষের জীবন প্রবাহকে একীভূত করে। পদ্মাপাড়ের মানুষের হার না মানার মানসিকতা এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কগুলোর জটিলতাই ফুটে উঠেছে উপন্যাসে।
পদ্মা নদী যেমন তার গতিপথে সবকিছু ভেঙে ফেলে বা গড়ে তোলে তেমনই উপন্যাসে বর্ণিত চরের মানুষের জীবনের উত্থান-পতনকে নির্দেশ করে। এখানে বর্ণিত পুরুষ চরিত্রের পাশাপাশি নারী চরিত্রগুলোও সমানভাবে শক্তিশালী এবং জীবন্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। পদ্মার ভাঙন ও বন্যায় বিপন্ন হওয়া এবং সেই নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে নতুন করে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে মানুষের টিকে থাকার লড়াই দেখানো হয়েছে।
উপন্যাসের সংলাপ-
স্রোতের টানে নৌকা ভেসে চলল। সূর্যের কিরণ আবার দীপ্ত হয়ে ওঠে।
হুমায়ুন কবিরের 'নদীও নারী' উপন্যামটি মূলত সামাজিক এবং জীবনধর্মী উপনাস। এখানে পূর্ববঙ্গের নদী-চরের সঙ্গে মানুষের জীবনের ভাঙাগড়ার ছবিটিই পরিস্ফুটিত। উপন্যাসটিতে লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে হার না মেনে যে মানুষগুলো টিকে থাকে মূলত তাদেরই আখ্যান এই উপন্যাসটি।
'নদী ও নারী' উপন্যাসটির সাথে অন্যান্য উপন্যাসের তুলনা করলে কয়েকটি মূল বিষয় উঠে আসে। এ উপন্যাসে পদ্মা নদীর তীরবতী মানুষের জীবন প্রবাহ, সংগ্রামী মানসিকতা এবং প্রকৃতির সাথে টিঁকে থাকার সম্পর্কের জটিলতাকে ফুটিয়ে তোলা
হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের নদীভিত্তিক অন্যান্য উপন্যাস, যেমন- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি' যেখানে পদ্মাপাড়ের জেলে ও মাঝি জীবনের চিত্র, তাদের জীবিকা, সংকট এবং পারস্পারিক সম্পর্কগুলির উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়া অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' এর সাথে তুলনা হতে পারে, যেখানে নদী-তীরবর্তী মালো সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, দুঃখ-দুর্দশা এবং সংগ্রামের কাহিনি ফুটে উঠেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নদীভিত্তিক উপন্যাস 'ইছামতি' যেখানে নীলচাষিদের জীবন চিত্রিত হয়েছে।
অন্যান্য উপন্যাসগুলোর তুলনায় 'নদী ও নারী'র স্বতন্ত্রতা হলো এ উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্রায়ন এবং মূল বক্তব্যে। উপন্যাসে লেখক নদীর সাথে নারীর জীবনের মধ্যে গভীর মিল লক্ষ্য করেছেন। নদী যেমন প্রবাহমান, পরিবর্তনশীল এবং সৃষ্টি শীল তেমনি নারীও জীবনের ধারাকে বহমান রাখে। নদী প্রকৃতির প্রাণ আর নারীর জীবনের ধারাকে চলমান রাখে- এই দুই সত্তার অস্তিত্বে রয়েছে জীবন ভালোবাসা এবং সৃষ্টিশীলতার মর্ম ।
'পদ্মা নদীর মাঝি' কিংবা 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে যেমন গ্রামীণ জীবন, শোষণ ও দারিদ্র্য এবং মানুষের জীবন সংগ্রামের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। অপর দিকে 'নদী ও নারী' উপন্যাসে নদী, নারী সত্তার মতো শক্তি, রহস্য ও বেদনার প্রতীক। নারী এখানে জীবন ও প্রেমের প্রতীক যা সমাজ ও ব্যক্তিসত্তার টানাপোড়েনে বন্দি। অর্থাৎ, উপন্যাসের বিষয়গুলোর তুলনামূলক আলোচনা পর্যবেক্ষণ করলে উপন্যাসের স্বতন্ত্রতা প্রকাশিত হয় ।
নদীর লীলাতরঙ্গ যেমন দুর্বোধ্য, রহস্যময় কখনো বা জীবনবিরুদ্ধ তেমনই নদী তীরবর্তী নর-নারীদের সম্পর্ক ও অতি বিচিত্র জীবনযাত্রায় ও মনস্তত্ত্বে-উপন্যাস পাঠের পর এই বিষয়টিই প্রতীয়মান হয়। একজন নারীকে কেন্দ্র করে নজুমিয়া ও আসগরের দ্বন্দ্ব, মালেকের জীবনে নুরুর প্রেম ও তার সম্পর্কজনিত গোপনীয়তার নিয়তি তাড়িত প্রতিক্রিয়ায় স্বপ্নভঙ্গের যে বেদনা এ বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা যায়। মানুষের জীবনের ভাঙাগড়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নদীর ভাঙাগড়ার বাস্তবতা এবং তার সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই।
উপন্যাসে নদীতীরবর্তী সংগ্রামী মানুষের যে জীবনছবি পাওয়া যায় তা পদ্মানদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা মানুষের। নদীর ভাঙা-গড়ার সঙ্গে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ গাঁথা। পদ্মার বিচিত্র আচরণের অধীন তাদের জীবন। নজুমিয়া, আসগর ও মালেকের জীবনদৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে মূল পাঠ।
নজুমিয়ার অন্তর্কথনে প্রকাশিত হয়েছে পদ্মা তীরবর্তী মানুষের সংগ্রামী জীবনের রূপ। নজু মিয়া ও আসগর, বন্ধু ও একই পর্যায়ভুক্ত জীবন সংগ্রামী হলেও জীবন ভাবনায় ছিল ভিন্নধর্মী। নজুমিয়া জীবন সাফল্যের মধ্যবর্তী সময় মারা যান। অন্যদিকে আসগর উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত উপস্থিত ছিল।
আসগরের জীবনে সফলতা-ব্যর্থতা দুইই ছিল। তার জীবনে অচরিতার্থতার বেদনা আসে মালেক ও নুরুর ভুল প্রেমের ঘটনায়। একই মায়ের গর্ভজাত দুই পিতার সন্তান মালেক ও নুরু। এ তথ্য প্রকাশিত হয় উপন্যাসের শেষে, সঙ্গে সঙ্গে সালেক ও নুরুর গভীর প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে। মালেক, নুরু ও আসগরকে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। সে এক অজানা পথে পা বাড়ায় এবং তার অনিশ্চিত যাত্রা মালেকের জীবনকে নতুন করে বেঁচে থাকার আশাকে স্তব্ধ করতে পারেনা, তা ই যেন নদী ভীরবর্তী সংগ্রামী জীবনসত্ত্বার প্রতীক। গভীর সংকট আর দ্বন্দ্ব-মুখরিত জীবনে বেঁচে থাকার আকুল আকুল আশায় পথচলা নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামী জীবন-ছবির অসাধারণ দলিল 'নদী ও নারী' উপন্যাস।

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম