উনপিনি ফাতিমাতা মোহাম্মদ এর 'মিডিয়া কালচার এন্ড ডিকলোনাইজেশন' বইয়ের পাঠভাবনা- নাহার তৃণা

উনপিনি ফাতিমাতা মোহাম্মদ এর 'মিডিয়া কালচার এন্ড ডিকলোনাইজেশন' বইয়ের পাঠভাবনা- নাহার তৃণা

উনপিনি ফাতিমাতা মোহাম্মদের ‘Media, Culture, and Decolonization: Re-righting the Subaltern Histories of Ghana’ বইটি উত্তর ঘানার গণমাধ্যম-পরিসর, বিশেষ করে দাগবাম্বা জনগোষ্ঠীর মিডিয়া-সংস্কৃতি নিয়ে এক গভীর ও রাজনৈতিক অনুসন্ধান। উনপিনি পাঠককে এমন এক জগতের স্বাদ দেন, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতারা প্রথাগত লিখিত স্ক্রিপ্টের তোয়াক্কা করেন না; বরং মৌখিক আলোচনার মাধ্যমে যৌথভাবে সৃষ্টি করেন একেকটি কাজ। এখানকার সাংবাদিকরা কেবল সংবাদ পরিবেশক নন, বরং তাঁরা যেন আধুনিক যুগের ‘গ্রীওট (griot)’ বা চারণকবি। এক্ষেত্রে উনপিনির প্রধান যুক্তি হলো, ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক গণমাধ্যমকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। মিডিয়া মানে কেবল রেডিও, টেলিভিশন বা চলচ্চিত্র নয়, বরং ঢাক-ঢোলের ইতিহাস, লোককথা, মৌখিক গল্পকথা ইত্যাদি প্রাচীন ঐতিহ্যও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। উনপিনির গবেষণার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে গণমাধ্যমকে উপনিবেশমুক্ত করার এক শক্তিশালী তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর। তাঁর মতে, আফ্রিকান জ্ঞানব্যবস্থাকে কেন্দ্রে আনলেই কেবল এই মুক্তি সম্ভব। তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন ‘বিলচিইনসি’ দর্শনের সঙ্গে— যা এক ধরনের মানবিক চিন্তাপদ্ধতি, যেখানে মানবমর্যাদাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়। এই দর্শনের সঙ্গে দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার জনপ্রিয় ‘উবুন্টু’ দর্শনের গভীর মিল লক্ষ্য করা যায়। 

এনগুঙ্গি ওয়া থিয়োঙ্গোর ‘লিঙ্গুইসাইড’ বা ভাষাহত্যার ধারণাকে ভিত্তি করে তিনি দেখান কেন আদিবাসী ভাষায় মিডিয়া তৈরি করা একটি রাজনৈতিক লড়াই। থিয়োঙ্গোর মতো উনপিনিও বিশ্বাস করেন, মিডিয়া না থাকলে ভাষা টিকে থাকতে পারে না। এবং যে ভাষায় মানুষ স্বপ্ন দেখে, সেই ভাষায় কথা বলার অধিকারই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অধিকার। পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ-দক্ষিণ সাংস্কৃতিক প্রবাহের ওপর আলোকপাত করেন। বিশেষ করে ভারতের বলিউড কীভাবে উত্তর ঘানা ও উত্তর নাইজেরিয়ার চলচ্চিত্র শৈলীকে প্রভাবিত করেছে, তা তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, বলিউডের মেলোড্রামা বা সংগীতের এই প্রভাবগুলো মিলেমিশে এক ধরনের ‘রাইজোমেটিক’ (rhizomatic) সংযোগ তৈরি করে এবং প্রান্তিক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রে আনার নতুন পথ খুলে দেয়।

বইটির মূল সুর যেন ধরা আছে লেখকের শক্তিশালী এই বাক্যে:

এই বইয়ে আমি ঘানার নীরব করে দেওয়া মিডিয়া-ইতিহাসগুলোকে পুনঃপুনঃ লিখে সাবঅল্টার্ন মিডিয়ার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।


ঘানার ঔপনিবেশিক সরকার এমন সব নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল যার কিছু আজও দেশের অভিজাত শ্রেণি ব্যবহার করে থাকে। যা কিনা উত্তরাঞ্চলকে শিক্ষা, সাক্ষরতা ও বিদ্যুতায়নের মতো মৌলিক অধিকার থেকে পদ্ধতিগতভাবে পিছিয়ে রেখেছে। লেখক এখানে সাবঅল্টার্ন বলতে সেই সব জাতিগোষ্ঠীকে বুঝিয়েছেন, যাদের শুধু জনপরিসর থেকে নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক নির্মাণ থেকেও পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। যে অঞ্চলকে গবেষকেরা সাধারণত উপেক্ষা করেন। এই বইটিতে উনপিনি মিডিয়া স্টাডিজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করার জোড়ালো ইঙ্গিত রেখেছেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে স্থানীয়, জাতীয় এবং বৈশ্বিক স্তরে মিডিয়া উৎপাদন ও ব্যবহারের রাজনৈতিক‑অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করে। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পলা চক্রবর্তীর উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক, তিনি মনে করেন—

উত্তর ঘানার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সম্মিলিত জ্ঞানকে ভিত্তি করে মোহাম্মদ বৈশ্বিক পুঁজিবাদের এই যুগে মধ্যস্থতাকৃত সংস্কৃতিকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করার একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন।



উনপিনি ফাতিমাতার শৈশবের অভিজ্ঞতার অংশটি পাঠককে বিশেষভাবে স্পর্শ করবে। বিশেষ করে তামালির জগবেলি এলাকায় বড় হওয়ার স্মৃতি এবং ঘানার উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের চিত্র সেখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা জানেন, ঘানার এই অঞ্চলটি কতটা অবহেলিত। মিডিয়ায় এখানকার ইতিবাচক চিত্র খুব কমই আসে। যেমন ওখানকার খবর বাইরে পৌঁছাতে সময় লাগে, তেমনি বাইরের দুনিয়ার তথ্যও সেখানে পৌঁছায় অনেক দেরিতে। উনপিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, কীভাবে মিডিয়া চাইলে এই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে পারতো। তাঁর এই বইটিতে সাক্ষাৎকার, আর্কাইভাল তথ্য এবং ‘কমিউনাল কনভারসেশন সার্কেল’-এর এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। তিনি তথ্যদাতাদের কেবল গবেষণার ‘সাবজেক্ট’ হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁদের সহ-স্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে আমরা দেখা পাই ‘BBC’ নামের অভিনেতার, যিনি প্রথম দাগবানলি চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছিলেন; দেখা পাই শেরিফাতু ইসাহ-র, যিনি কোনো লিখিত চিত্রনাট্য ছাড়াই চমৎকার অভিনয় করে যান। নিজেদের মেধামননের প্রতি আস্থাবান এক পরিচালকের কথায় তারই অনুরণন শুনি, 

ঈশ্বর আমাদের এখানকার অভিনেতাদের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক দিয়েছেন।



চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক বিতরণ ব্যবস্থা, সবপর্বেই উনপিনির লেখনী সাবলীল এবং স্বচ্ছ। 

অনেকেই মনে করেন ঘানার চলচ্চিত্র মানেই ‘কুমাউড’ (Kumawood)। কিন্তু উনপিনি তথ্যের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, আশির দশকের শেষভাগে দাগবানলি চলচ্চিত্র শিল্পের মাধ্যমেই ঘানায় এই যাত্রার সূচনা। উত্তরাঞ্চলের নির্মাতারা আন্তর্জাতিক খ্যাতি বা সরকারি অনুদানের জন্য মুখিয়ে থাকেন না। তাঁরা নিজেদের ভাষার দর্শকদের জন্য নিজেদের সীমিত সম্পদ দিয়েই কাজ করে যান। বইটিতে উনপিনি একটি সতর্কবাণীও গুঁজে দিয়েছেন। আদিবাসী ভাষায় উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে না তা নয়। সেই তুলনায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক সময় নারীদের অধিকার ও অংশগ্রহণ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। উনপিনির এই সতর্কতা অগ্রাহ্যের অর্থ হলো নারীদের পিছিয়ে যাওয়ার পথ করে দেওয়া। যা মোটেও কাম্য নয়; যদিও দুঃখজনক সত্যটি হলো ধর্মীয় যাতাকলে নারীদের পিষ্ট করার বিষাক্ত এই সংস্কৃতি এখন যেন মহামারির মতো দেশ থেকে দেশান্তরে সংক্রামিত। লেখক মনে করেন উপনিবেশমুক্তির একটি বড় অংশ হওয়া উচিত ‘সানকোফা’ দর্শন— যা অতীতকে ফিরে দেখা এবং ঔপনিবেশিক প্রকল্পের আগের জীবনকে ধারণ করার প্রেরণা দেয়। ‘সানকোফা’ হলো আকান জনগোষ্ঠীর একটি প্রতীক, যেখানে দেখা যায় একটি পাখি পেছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ডিম তুলে নিচ্ছে। প্রতীকের আড়ালে এটাই বোঝানো: যা ভুলে যাওয়া হয়েছে, ইতিহাসের দ্বারস্থ হয়ে তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। 

 

‘ডিকলোনাইজেশন অ্যান্ড আফ্রো-ফেমিনিজম’ (Decolonization and Afro-Feminism) গ্রন্থের  লেখক সিলভিয়া টামাল যথার্থই বলেছেন, 

এই বইটি জ্ঞান-উৎপাদনের কেন্দ্রকে ইউরোকেন্দ্রিকতা থেকে সরিয়ে আনার অপ্রতিরোধ্য জোয়ারেরই একটি অংশ। যদিও আফ্রিকান নারীবাদী মিডিয়া চর্চাকে আরও পূর্ণাঙ্গ করতে নারী ‘লুন্সি’ বা চারণকবিদের কণ্ঠ আরও সরাসরি শোনা প্রয়োজন ছিল, তাসত্ত্বেও উনপিনির বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হবে। 



বইটির মাধ্যমে উনপিনি ফাতিমাতা মোহাম্মদ (Wunpini Fatimata Mohammed) এবং তাঁর সহ-স্রষ্টারা এমন সব চাবিকাঠি তুলে ধরেছেন, যা স্বাধীনভাবে শিল্প, মিডিয়া, চলচ্চিত্র বা সাহিত্য তৈরি করতে আগ্রহী যে কারও কাজে লাগবে। উত্তর ঘানার এই মিডিয়া-স্রষ্টারা যেন একেকজন জাদুকর। অতি সামান্য উপকরণ দিয়েও কীভাবে অর্থবহ ও মুক্তিকামী ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায়, তা তাঁরা দেখিয়ে দেন। বইটি আমাদের শেখায় সৃষ্টির কেন্দ্রে সর্বদা মানবমর্যাদা এবং শেকড়ের টান থাকা কতটা জরুরি। উনপিনি ফাতিমাতা মোহাম্মদের ‘Media, Culture, and Decolonization: Re-righting the Subaltern Histories of Ghana’ বইটি সাংস্কৃতিক স্টাডিজ এবং উপনিবেশ-পরবর্তী মিডিয়া গবেষণার সকল শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর হওয়ার যোগ্যতা রাখে বলে মনে করি।


বইয়ের তথ্য:

Media, Culture, and Decolonization: Re-righting the Subaltern Histories of Ghana

Wunpini Fatimata Mohammed


  • Rutgers University Press, New Brunswick, New Jersey, United States
  • December 9, 2025
  • ISBN-13:  978-1978841642

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ