ফুলমণি ও করুণার বিবরণ : বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস || অন্তর চন্দ্র

ফুলমণি ও করুণার বিবরণ : বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস || অন্তর চন্দ্র



হানা ক্যাথেরিন মুলেন্স রচিত ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ (১৮৫২) বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। এটির ঔপন্যাসিক মর্যাদা কতটুকু সেটি নিয়ে সমালোচকগণ নানান মন্তব্য করেছেন, কেউ কেউ প্রথম উপন্যাস হিসেবে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮) অথবা ভবাণীচরণ বন্দোপাধ্যায় রচিত ‘নববাবুবিলাস’ (১৮২৫) গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন সাহিত্যের মহারথীদের মধ্যে একঝাঁক বিতর্ক বাঁধলেও বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস কোনটি এ বিষয়ে তখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। একেকজন সাহিত্যিকের একেক মন্তব্য যখন তীব্র হচ্ছে তখনই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ আলোচনার মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বলা হলো, এটি সার্থক উপন্যাস। 


কিন্তু কলকাতায় জন্ম নেয়া বিদেশিনী লেখিকা হানা ক্যাথেরিনের গ্রন্থটি কি এতটাই অবহেলার অবশ্যই নয়! কারণ যে-সময় তিনি বাংলায় ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ লিখেছেন, তখন ঔপন্যাসিক ধারণা ছিল না। তিনি ধর্মপ্রচারের নিমিত্তে নারীদের উপকার্থে বইটি লিখেছেন। সে সময়কার কথ্য ভাষার সাথে সাধু ভাষার লিখিত রূপের সাবলীল প্রকাশের জন্য অন্ততঃ লেখিকার কাছে ঋণী থাকা যায়। গ্রন্থটি এতটাই সাবলীল ও উপদেশমূলক ছিল যা সাধারণ পাঠকদের আকর্ষণ করে। গবেষকগণ উক্ত গ্রন্থ সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা করলেও যুগের কালক্রমে আধুনিকতা পেরিয়ে তা শুধুমাত্র স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেছে। বর্তমানকালের যুবক-যুবতিরা এ বই সম্পর্কে জানে কি না সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে! তবে প্যারীচাঁদ মিত্রের বইটি এখনও বহুল প্রচলিত।


অতিসকুমার বন্দোপাধ্যায় বলেন, 

আলালের ঘরের দুলাল' উপন্যাসের রচনাকার প্যারীচাঁদ বাঙালী সমাজে সুপরিচিত। বস্তুতঃ 'আলাল'ই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। প্যারীচাঁদের উপন্যাসে নানা ত্রুটি থাকিলেও তাহার প্রথম উপন্যাসে তিনি যে বাস্তব জ্ঞান, সরসতা ও নিপুণ ভাষার পরিচয় দিয়াছেন, তাহাতে তাঁহাকে প্রথম ঔপন্যাসিকের গৌরব দেওয়া সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।



..…..সম্প্রতি আর একখানি উপন্যাসের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হইয়াছে যাহা প্যারীচাঁদের পূর্ববর্তী এবং উপন্যাসের লক্ষণবিচারে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ অপেক্ষা কোন দিক দিয়াই নিকৃষ্ট নহে। ১৮৫২ খ্রীঃ অব্দে কলিকাতা ক্রিশ্চিয়ান ট্র্যাক্ট এ্যান্ড বুক-সোসাইটীর উদ্যোগে হানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স নাম্নী উক্ত মিশনের এক মহিলা 'ফুলমণি ও করুণার বিবরণ' রচনা করেন। ইহাতে দেশীয় খ্রীষ্টান পরিবার, বিশেষতঃ স্ত্রী-চরিত্রের বর্ণনা ও কাহিনী আছে। গোঁড়া পাদ্রীর যত লেখিকা বিশ্বাস করিতেন যে, হিন্দুধর্ম ত্যাগ করিয়া যিশু না ভজিলে বাঙালীর নিস্তার নাই। এই তত্ত্ব প্রচার করিবার জন্যই তিনি এই আখ্যানটি লিখিয়াছিলেন।




তবে ভবানীচরণ মুখোপাধ্যায়ের ‘নববাবুবিলাস’ গ্রন্থকে তিনি উপন্যাসের মর্যাদা দিতে চাননি। এমনকি হানা ক্যাথেরিনের ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’  গ্রন্থটি উপন্যাস হিসেবে লিখলেও সেটি উপন্যাসের গঠনগত দিক থেকে পৃথক এবং ধর্মাচরণের দিকনির্দেশনা, ধর্মান্তরকরণ, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ইত্যাদি বিচার করলে—এটি শুধুমাত্র সে—সমকালের সমাজব্যবস্থা, নারীর অসহায়ত্ব, সন্তানের সুখ ও ধর্ম এবং জীবনাচারণ সংগঠিত হয়েছে। তবে সার্থক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫)। অবাঙালি হিসেবে হানা ক্যাথেরিন মুলেন্সের ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ গ্রন্থটি উপন্যাসের ধাঁচে লেখা প্রথম গ্রন্থ। বাঙালি হিসেবে প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থটি প্রথম উপন্যাস। কিন্তু এর পরেও আরও কিছু গ্রন্থের কথা গবেষকগণ বলেছেন, যেগুলোকে উপন্যাস হিসেবে ধরা যায়। তেমনি প্যারীচাঁদ মিত্রের গ্রন্থটিও কেউ কেউ প্রথম উপন্যাস হিসেবে স্বীকার করতে রাজি হননি। কালের পরিক্রমায় সাহিত্যের দৈনন্দিন পরিবর্তন দেখে বোঝা মুশকিল উপন্যাস আসলে কি? এর গঠনগত দিকনির্দেশনার পার্থক্য অনুযায়ী সাময়িক সাহিত্যের মানদণ্ডে তা কতটা বিচার্য! যদিও সেটি এই আলোচনার প্রসঙ্গ নয়! কিন্তু সাহিত্যের প্রথম বা দ্বিতীয় বলে যে ধারণা মনে পোষণ করা হয় তা নিতান্তই একটা জেনারেশনের একটুকরো স্মৃতিমাত্র।


খ্রিষ্টীয়ান মিশনারী থেকে হানা ক্যাথেরিনের গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এটি খ্রিস্টধর্ম প্রচারমূলক Voyages and travels of a Bible গ্রন্থের অনুবাদ। বলা চলে, মিশনারীরাই এ দেশে মেয়েদের জন্যে আধুনিক শিক্ষার প্রবর্তন করতে সচেষ্ট হয়। তারই ধারাবাহিকতায়, হানা ক্যাথেরিন কিছু ধর্মভীরু মানুষের আচার ও নৈমিত্তিক ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে স্ত্রী-শিক্ষাবিষয়ক নানা গ্রন্থ প্রকাশ হতে থাকে খ্রিষ্টীয়ান মিশনারী থেকে যেমন:— স্ত্রী শিক্ষা বিধায়ক ইত্যাদি। 


উনিশ শতকের সমাজব্যবস্থায় মিশনারির একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ঐ সময়ে বাঙালি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দ্বারা বাংলা ভাষার প্রসার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাসের চর্চা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মিশনারির শিক্ষা কাঠামো উন্নত মানের ছিল‌। নতুন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা বাঙালিরা গ্রহণ করেছিলেন। ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধাঁচে বাঙলায় শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে মুদ্রিত বইয়ের উদ্যোগ মিশনারি থেকেই প্রথম নেয়া হয়। তা থেকে বলা যেতে পারে, উনিশ শতকের শিক্ষা সাহিত্য-সংস্কৃতির যুগে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটা বড় অবদান আছে। যে সময়ে বাঙালিদের মধ্যে কুসংস্কার, ঝাড়ফুঁক, কবিরাজি, ভূতেধরা, অপ-চিকিৎসা ওৎ পেতেছিল—সেই সময়ে তাদের সংস্কারমুখী চিন্তা আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছিল। ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ পড়তে গিয়ে সুন্দরী অর্থাৎ ফুলমণির মেয়ের গর্ভাবস্থায় যে কুসংস্কারের চিহ্ন পাওয়া যায় তা সমাজের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষের বিশ্বাস থেকে উদ্বৃত্ত হয়েছে। এরূপ সমাজের হীনমন্যতার জন্য প্রতিপদে পদে মানুষদের বিপদে পড়তে হয়েছে। বর্তমান আধুনিক সময়েও কোন কোন জায়গায় কুসংস্কারের জন্য বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা হয়েছে। এইসব মূর্খতা থেকেই সমাজের অধঃপতন নিশ্চিত হয়।


ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট খ্রিষ্টধর্ম বিষয়ক প্রচার ও আচার-কানুন। খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের নিমিত্তে একজন বিদেশী ভদ্রমহিলা বাঙালি খ্রিষ্টীয়ান নারীদের ধর্মশিক্ষা দেওয়ার জন্য ফুলমণি নামক ধর্মভীরু নারীর কাছে গিয়ে উপস্থিত হন এবং সেখানেই প্রতিবেশী করুণার সাক্ষাৎ। লেখিকা প্রসঙ্গতঃ একটি সমাজব্যবস্থার দুর্দশার কারণগুলো ব্যক্ত করে, তৎপ্রসঙ্গে জীবনধারণের জন্য ধর্মের পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন, সেদিক থেকে ফুলমণির সাংসারিক জীবন খুবই সুখের ছিল। কারণ সে ধর্ম বিষয়ে সচেতন এবং প্রভু যিশুর সমস্ত উপদেশ পালন করতেন। এদিকে করুণা ছিলেন, ধর্মের প্রতি উদাসীন, স্বামী মদ্যপান করতেন এবং সংসারে অশান্তি লেগেই থাকত। তখন তাকে বিদেশিনী ভদ্রমহিলা উপদেশ বা পরামর্শ দিয়ে যিশুর পদানুসরণ করতে বলেন। স্বামী বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরলে রাগান্বিত না হয়ে হাসিমুখে কথা বলতে বলেন, যাতে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি অনুগত হয়ে মদ্যপান ছেড়ে দিয়ে ধর্মের পথে আসতে পারেন। করুণার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়— প্রত্যেক নারীই পারে ভালোবাসার মধ্যদিয়ে তার স্বামীকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে; করুণাও পেরেছিলেন মদ্যপ স্বামীকে ফিরিয়ে নিতে। লেখিকা প্রথমদিকে মন্তব্য করেছিলেন, ”প্রাচীন  ধার্মিক লোকেদের চরিত্র বর্ণনা করে ঈশ্বর আমাদের মতো মানুষকে শিক্ষা দেন।” এই কথার সূত্রে বলা যায় হানা ক্যাথেরিনের গ্রন্থটিও প্রাচীন লোকেদের চরিত্রের অবলম্বনে ধর্মাচারণের মধ্যদিয়ে ঈশ্বরের অনুগ্রহ পাওয়ার উৎকৃষ্ট জীবনব্যবস্থা। 


উক্ত গ্রন্থের আরেকটি বিশেষত দিক হচ্ছে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের ভঙ্গুর অবস্থায় বিদেশিনী ভদ্রমহিলার সঠিক পথনির্দেশনা। তিনি ১৪ বছরের নিচে মেয়েদের বিবাহের প্রতি আপত্তি জানিয়েছেন ও মদ্যপ ব্যক্তিকে মেয়ের সাথে বিবাহ দিতে বারণ করেছেন। ফুলমণির মেয়ে সুন্দরীর গর্ভ হলে কুসংস্কার হেতু গর্ভ নষ্ট হওয়ার ভয়ভীতি দেখানো পরশীদের প্রতি রাগান্বিত হয়ে তীব্র নিন্দা প্রকাশ এবং গর্ভবতীকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে সকল উৎকন্ঠার বিসর্জন দেন। তারপর সবাইকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবনের থেকে মুক্ত হয়ে—যিশুর পথে চলতে নির্দেশনা দেন। উপন্যাসটির যথার্থতা এটি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ও সংসারের টানাপোড়েনের সময় স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অবহেলাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে সুন্দর জীবনধারণের কথা বলেছেন। এদিকে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার এবং ধর্মান্তরকরণের একটা ব্যাপার চোখে পড়ে। বলা চলে, খ্রিষ্টীয়ান মিশনারী দ্বারা তৎকালীন বাঙালি সমাজের খ্রিষ্টধর্মের প্রচারের যে ব্যাপকতা তারই একটি লিখিতরূপের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।


পূর্বে পড়েছি, খ্রিষ্টীয়ান মিশনারী থেকে হানা ক্যাথেরিনের গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এটি খ্রিস্টধর্ম প্রচারমূলক Voyages and travels of a Bible গ্রন্থের অনুবাদ। কিন্তু শ্রীসবিতা দাস ‘দেশ’ পত্রিকা (৫ই জুন, ১৯৬৩) উল্লেখ করেন, 

 

ফুলমণি ও করুণার বিবরণ THE WEEK নামক একটি ইংরেজি গল্পের অবলম্বনে রচিত। এ তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলা ভাষায় মহিলা রচিত প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ।

 

ড. সঙ্ঘমিত্রা চৌধুরী বলেন, -

 

১৮৫০-১৮৫৯ পর্যন্ত ‘সংবাদ প্রভাকর’ সহ অন্যান্য পত্রিকায় মহিলাদের লেখালেখি প্রকাশ হতে থাকে। সে সময় অর্থাৎ মহিলা রচনা প্রকাশের প্রথম দশকে ৫টি গ্রন্থ ও ৪টি পত্রিকাসহ ২০টির মতো রচনার সন্ধান পেয়েছেন। ৫টি গ্রন্থের মধ্যে হানা ক্যাথেরিনের ৪টি গ্রন্থ। 



যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার ও রাখালরাজ রায় তাঁদের সম্পাদিত ‘সাহিত্য-পঞ্জিকা’-য় (১৯১৫) ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’-কে বাঙলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বলে ঘোষণা করেন।


কিন্তু ক্যাথেরিন রচিত গ্রন্থটি অবহেলায় পড়ে আলোচনা-সমালোচনা একেবারেই উঠে যায়। এমত সময়ে চিত্তরঞ্জন বন্দোপাধ্যায় উক্ত গ্রন্থটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশ করেন এবং এটিকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বলে গণ্য করার জন্য বিশদভাবে কারণ উপস্থাপন করেন। আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা কথা-সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থে স্বীকার করেছেন,

ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’-ই বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মুদ্রিত উপন্যাস।



সুকুমার সেন লিখেছেন, 

বইটি আকারে ও প্রকারে উপন্যাসের মতো। ইহাতে অনুন্নত সমাজের বাঙ্গালী খ্রীস্টানের জীবনচিত্র যথাযথভাবে বর্ণিত। ভাষা সরল ও শোভন, বিদেশিনী লেখিকার পক্ষে অত্যন্ত অপ্রকাশিত। ভারতবর্ষের প্রায় সব অঞ্চলেই বইটি দেশীয় দেশীয় খ্রীস্টানদের বিদ্যালয়ে পাঠ্য হইয়াছিল এবং সেই কারণেই বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হইয়াছিল।


......মিসেস হানা ক্যাথেরীন মলেনস্-এর ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) বাঙ্গালী লেখকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলে বাঙ্গালা উপন্যাসের আবির্ভাব হয়ত ত্বরান্বিত হইত।



বলা চলে, বাংলা সাহিত্যের ঔপন্যাসিক ভূমিকা সৃষ্টিকারী হানা ক্যাথেরিন উপন্যাসের যথার্থতা প্রকাশ করতে না পারলেও একটা ছক এঁকেছিলেন যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যথাযথ পথ অবলম্বনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এটুকু বলা যেতে পারে, মিশনারী ধর্মপ্রচার ও ধর্মান্তরকরণের পাশাপাশি জীবনবোধের যে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটিয়েছিল সেটিও ভারতবর্ষের মতো একটা হিন্দু-অধ্যুষিত জায়গায় যা কিছুক্ষেত্রে বিতর্কের কারণ‌ হলেও কিন্তু বাঙালির সমাজের দায়বদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতার সাথে খ্রিষ্টীয়ান ধর্মবোধের অনুপ্রবেশ এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের যথার্থতা ভিন্নরকম অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে। ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ পাঠে পাঠকগণ অবশ্য ফুলমণির চরিত্রের প্রসংসা করলে চলবে না বরং করুণার মতো অবহেলিত নারীদের জীবনবোধের চরম দুর্দশার দিনে বিদেশিনীর পরামর্শে সংসারে মহৎ হয়ে ওঠা আশ্চর্যের বিষয়! যা আজকালকার সমাজেও নারীদের অসহায়ত্বকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করবে। 




তথ্যসূত্র: 

  • ১. আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত — অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়, মর্ডান বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, পৃ. ৫৫, ৫৮।
  • ২. আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মহিলা রচিত গ্রন্থের ক্রমবিকাশ— ড. সঙ্ঘামিত্রা চৌধুরী, বোনা, ২০০০, পৃ. ২৪
  • ৩. বাংলা কথা-সাহিত্যের ইতিহাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য, ১৩৮১, পৃ. ২১৪।
  • ৪. বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, সুকুমার সেন, তৃতীয় খন্ড, ১৪০১, পৃ. ৩৪, ১৬৩।

 

প্রচ্ছদ: ChatGPT 

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ