বাংলা নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত “পদ্মরাগ” একটি অনন্য সামাজিক উপন্যাস, যেখানে নারীবাদ মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে। এ উপন্যাসে লেখিকার শিক্ষা, সমাজ ও নারী স্বাধীনতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন নারীদের সামাজিক সমস্যা ও অবস্থা অত্যন্ত বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
রোকেয়া ১৯০২ সালে “পদ্মরাগ” রচনা করেন, যদিও গ্রন্থাকারে এটি প্রকাশিত হয় অনেক পরে, ১৯২৪ সালে। উপন্যাসটিতে মোট ২৮টি পরিচ্ছেদ রয়েছে, এবং প্রতিটি পরিচ্ছেদেরই আকর্ষণীয় শিরোনাম আছে — যেমন প্রথম পরিচ্ছেদ “নিরুদ্দেশ যাত্রা” এবং শেষটির “সহযাত্রী”। সাধুভাষায় রচিত এই উপন্যাসে মাঝে মাঝে ছন্দোবদ্ধ কবিতাও ব্যবহার করেছেন লেখিকা, যা রচনাকে দিয়েছে এক বিশেষ সৌন্দর্য।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় স্থান “তারিণী-ভবন” — এক নারীশক্তির প্রতীক। এখান থেকেই কাহিনির মূল চরিত্র ও সমাজচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে ফুটে উঠেছে তৎকালীন নারীশিক্ষা, সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও নারীর দুঃখ-দুর্দশার বাস্তব চিত্র। তারিণী-ভবন কেবল কল্পনা নয় — রোকেয়ার জীবনের আদর্শ ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন এটি।
সপ্তম পরিচ্ছেদে তিনি লিখেছেন—
তারিণী ভবন হইলো সেই গঙ্গা যাহাতে এক ডুব দিলেই সকলে পবিত্র হইয়া যায়।
এই উপমার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, সেবাশ্রম ও মানবসেবাই প্রকৃত পবিত্রতার পথ।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়নব ওরফে আয়েশা সিদ্দিকা, যিনি বিয়ের পর এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। পরে তারিণী-ভবনে আশ্রয় নিয়ে দীনতারিণী তার নাম দেন “পদ্মরাগ”, আর সেখান থেকেই উপন্যাসের নামকরণ। সিদ্দিকার চরিত্রটি রহস্যময় হলেও ধীরে ধীরে তার আত্মত্যাগী, দৃঢ় ও আদর্শবাদী নারীমূর্তি পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়।
তিনি গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন ব্যারিস্টার লতিফ আলমাসকে, কিন্তু সমাজ ও পরিবারের চাপে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। পরবর্তীতে তারিণী ভবনে তাদের পুনর্মিলন হলেও সিদ্দিকা সংসারে ফিরে না গিয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দেন— নারীসমাজের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। এখানেই সিদ্দিকার মধ্যে ফুটে ওঠে বেগম রোকেয়ার নারীবাদী চেতনা। সিদ্দিকা ছাড়াও তারিণী-ভবনে প্রধান কর্মীদের মধ্যে চারুবালা, সৌদামিনী, হেলেন, জাফরি, সাকিনা, রসিকা, ঊষা প্রমুখরাও স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতা বা নির্দয়তার শিকার। তাদের বিষাক্ত তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে রোকেয়া তৎকালীন নারীদের ওপর বিভিন্ন সহিংসতা ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছেন।
তবে চতুর্থ পরিচ্ছেদ “তারিণী-ভবন”-এ লেখিকা লিখেছেন—
ছাত্রীদিগকে দুই পাতা পড়িতে শিখাইয়া বিশ্ব-বিদ্যালয়ের ছাঁচে ঢালিয়া বিলাসিতার পুত্তলিকা গঠিত করা হয় না... তাহারা আত্মনির্ভরশীলা হয় এবং ভবিষ্যৎ জীবনে যেন কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ পিতা, ভ্রাতা বা স্বামী-পুত্রের গলগ্রহ না হয়, এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়।
এই উদ্ধৃতি থেকেই বোঝা যায়, রোকেয়া কেমন ধরনের নারীশিক্ষা কল্পনা করতেন— যেখানে জ্ঞান, চরিত্র, নীতি ও আত্মনির্ভরতা একসাথে বিকশিত হয়।
উপন্যাসে ধর্ম-বর্ণের বিভেদ অতিক্রম করে রোকেয়া তুলে ধরেছেন মানবতার সর্বজনীন বার্তা। ঈশান কম্পাউন্ডারের মুখে তিনি বলেছেন—
হিন্দু-মুসলিম ব্রাহ্ম-খ্রিষ্টান একই মাতৃগর্ভজাত।
এভাবে “পদ্মরাগ” অসাম্প্রদায়িকতা, মানবপ্রেম ও শিক্ষা-আলোয় আলোকিত সমাজের স্বপ্নকে ধারণ করেছে।

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম