মাহমুদ মাসুদের
'ইন ইয়োর ড্রিম' গল্পটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনির আবরণে মোড়ানো। কিন্তু এর ভেতরে আছে মানুষের অস্তিত্বের সংকট। গল্পটা আমাদের নিয়ে যায় এমন এক ভবিষ্যতে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। মানুষ আর তার অবচেতন মনের গভীরে নিজের মতো করে ঘুরে বেড়াতে পারে না। স্বপ্নের প্রতিটি সাদা-কালো দৃশ্য, সব রঙিন কল্পনা এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে। সেই মুহূর্তগুলো এখন ডিজিটাল শৃঙ্খলে বন্দী। এই বন্দিত্বই গল্পের কেন্দ্রে এক ভয়াবহ প্রতিশোধের জন্ম দেয়।
প্রযুক্তি এখানে সুবিধার হাতিয়ার হিসেবে আসে না। এটা মানুষের আত্মাকে ধীরে ধীরে নিরবে খেয়ে ফেলে। NeuroSync 4.5 নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের সবচেয়ে গোপন স্মৃতি আর কল্পনাকে ডিজিটাল ডাটায় পরিণত করা হয়েছে। মস্তিষ্কের নিউরনের সংযোগ পড়ে নিয়ে অচেনা কেউ এসে বসে স্বপ্নের নির্মাতা হয়। নিজের জীবনের ছোট ছোট সুখ বা গভীর দুঃখের উপাদানগুলোও আর ব্যক্তিগত থাকে না। এই অনুপ্রবেশ মানুষের মনের ওপর চাপিয়ে দেয় এক ধরনের প্রকৃত দাসত্ব।
কথকের স্মৃতিহারানোর বিষয়টি গল্পের শোকগ্রস্ত আবহ তৈরি করে। সে তার প্রেমিকার নাম ভুলে যায়, মায়ের মুখ মনে থাকে না, এমনকি নিজের হাত চিনতেও দেরি হয়। এই বিস্মৃতি শুধু শারীরিক সমস্যা নয়। এটা নৈতিক পতনের এক বড় দাম। প্রতিটি স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সে নিজের মানবিকতার একটা অংশ হারায়। সে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে নিজের অস্তিত্বের সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। এতসব হওয়ার পরেও সে এই ক্ষতি মেনে নেয়। তার কাছে ন্যায়বিচার নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বড়।
নীরাদির ঘটনাটি গল্পের সবচেয়ে করুণ অধ্যায়। একটি রোজার দিনে, উপবাসের পবিত্র মুহূর্তে, একটি বাচ্চাকে আইসক্রিম কেনার অপরাধে এক নিরীহ মেয়েকে পিটিয়ে মারা হয়। এই ঘটনাটা কোনো গরিবের খবরের মতো নয়, তাই কেউ খোঁজ রাখে না। এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ধর্মের নামে, পবিত্রতার আড়ম্বরে নিজের পৈশাচিক ইচ্ছার প্রকাশ ঘটান। আইনের চোখে এই অপরাধের কোনো বিচার হয় না। ক্ষমতার জোরে তা চেপে যায়, যেমন চেপে যাওয়া যায় মাটিতে একটি পিঁপড়ার জীবন। এই অবিচার কথকের মনে বছরের পর বছর ধরে এক তিক্ত বিষ জমিয়ে তোলে।
প্রতিশোধের পদ্ধতিটি অত্যন্ত পরিকল্পিত আর নিষ্ঠুর। কথক স্বপ্নের ভেতরে প্রবেশ করে সেই ডিজিটাল জগতে অপরাধীকে খুঁজে বের করে। বাস্তবের ন্যায়বিচারের অভাবটুকু সে নিজে পূরণ করতে চায়। সে অপরাধীকে এমন এক দুঃস্বপ্নের ফাঁদে ফেলে যেখানে তার ক্ষমতার অহংকার চুরমান হয়ে যায়। হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে নিজের করা অত্যাচারের প্রতিফলন দেখতে থাকে। এই মৃত্যু শারীরিকভাবে প্রাকৃতিক মনে হয়। কিন্তু এটা আসলে মানসিক নির্যাতনের চূড়ান্ত পরিণতি।
গল্পের ভাষা আর বয়ানশৈলী পাঠককে প্রথম থেকেই এক অদ্ভুত পরিবেশে নিয়ে যায়। কবরের পাশে বসে মৃত ব্যক্তির সাথে কথা বলার দৃশ্যটা গল্পের গতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। পড়ার সময় মনে হয় আমরা সেখানে উপস্থিত আছি। শীতের মাটির ছিমছাম অনুভব করছি। প্রযুক্তির রূঢ়তা আর কবরের শীতল নিস্তব্ধতার মিশ্রণ একটা রোমহর্ষক পরিবেশ তৈরি করে। লেখক সরল ভাষায় কঠিন সত্যগুলো তুলে ধরেছেন। পড়ার সময় পাঠকের বুকের ভেতর এক অজানা চাপ সৃষ্টি হয়। গল্পটি শেষ হওয়ার পরও পাঠকের মন দীর্ঘক্ষণ এক অন্ধকার ঘোরে থেকে যায়।
মাহমুদ মাসুদ এই গল্পে আমাদের বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভরতার একটি ভয়াবহ ভবিষ্যৎ রূপ এঁকেছেন। মানুষ যখন নিজের মনের সবচেয়ে গোপন জগতটুকুও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন সে বাইরের যেকোনো শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। প্রতিশোধের আগুন যেমন কথকের সত্তাকে গ্রাস করেছে, ঠিক সেভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহারও সমাজকে গ্রাস করতে পারে। গল্পের শেষটি হয়তো এক ব্যক্তিগত প্রতিশোধের, কিন্তু তার ইঙ্গিত সামাজিক আর সর্বজনীন।
এই গল্প আমাদের ভাবিয়ে দেয়—মানুষ কতটুকু এখনও নিজের, আর কতটুকু যন্ত্রের দখলে চলে এসেছে। আমরা প্রতিদিন সুবিধার নামে কত কিছু যে ত্যাগ করছি কিন্তু আমাদের আত্মা কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাবে? এই প্রশ্নগুলো গল্পের শেষেও আমাদের সাথে থেকে যায়।
**********
ছবি: chatgpt
0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম